| বাংলার জন্য ক্লিক করুন

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   প্রবন্ধ -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
ঐতিহাসিক বদর দিবসের তাৎপর্য, গুরুত্ব ও শিক্ষা

ইসলামের ইতিহাসে বদর একটি অন্যতম বিজয় প্রান্তর। বদর পবিত্র মদীনা শরীফ হতে প্রায় ৮০ মাইল দূরবর্তী একটি কূপের নাম। এ নামে একটি গ্রামও রয়েছে। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ সংগঠিত হয় হিজরী ২য় সনের ১৭ রমজান মোতাবেক ৬২৪ সনের ১৮ নভেম্বর শুক্রবার। মতান্তরে ৬২৪ সনের ১৭ মার্চ। ইতিহাসে ইহাই বদরের যুদ্ধ নামে অভিহিত। ইসলামের ইতিহাসে ইহা-ই সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। সংক্ষিপ্তাকারে বদর যুদ্ধের ইতিহাস, গুরুত্ব,তাৎপর্য ও শিক্ষা সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

বদর যুদ্ধের কারণ ও পটভূমি : মক্কাবাসীদের মধ্যে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে কুরাইশরা তাদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায়। তাদেরকে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত ও তাদের ধন-সম্পদ জবর দখল করে নেয়া হয়। অন্যদিকে যে সব দেশে মুসলমানগণ আশ্রয় গ্রহণ করেন কুরাইশরা সে সব দেশের শাসক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যার্থতায় পর্যবেসিত হয়। (তারীখে তাবারী-১/১৬০৩, ইবনে হিশাম ২১৭ পৃঃ) অপরপক্ষে মুসলমানরাও হিযরতের পর মদীনা থেকে প্রতিশোধ গ্রহনের ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত হতে থাকে। তারা কুরাইশদের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। কুরাইশদের সমস্ত গৌরব, অহংকার ও শক্তির প্রধান উৎস ছিল শাম দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। তাই রাজনৈতিক দৃষ্টকোন থেকে তাদের গর্ব ও অহংকারকে বন্ধ করার উদ্দেশ্যে মুসলমানরা তাদের উপর ঝটিকা আক্রমণ চালায় এবং ব্যবসার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। একবার নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট মদীনায় এ সংবাদ এসে পৌছে যে, আবু সুফিয়ান একটি বাণিজ্যিক কাফেলার পণ্য সামগ্রী নিয়ে সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে যাচ্ছে। আর এই বাণিজ্য মক্কার সমস্ত কুরায়েশদের অংশীদার। ইবনে আকবার বর্ণনাতে, মক্কার এমন কোন কোরায়েশ নারী বা পুরুষ ছিল না যার অংশ এ বাণিজ্যে ছিল না। কারো কাছে এক মিসকাল পরিমাণ সোনা থাকলে, সেও তার এ বাণিজ্যের অংশ হিসেবে লাগিয়েছে। এ কাফেলার মোট পুঁজি সম্পর্কে ইবনে আকাব বলেন, তা ছিল ৫০ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা দিনার। ১৪০০ বছর পূর্বে যার মূল্য ছিল ২৪ লাখ টাকা। যা বর্তমান বাজারে প্রায় ১৫০ কোটির অপেক্ষা ও বেশি। প্রকৃতপক্ষে এ বাণিজ্য কাফেলাটি ছিল কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কোম্পানী।

 

ইমাম বাগাভী (রহঃ) বলেন, একথা সকলের জানাছিল যে, কুরাইশদের এ বাণিজ্য এবং এ বাণিজ্যিক পুঁজিই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। এর উপর ভরসা করে তারা রাসুল (সাঃ) ও সাহাবীদের উপর উৎপীড়ন করে মক্কা থেকে মদীনায় যেতে বাধ্য করেছিল। সে কারণেই নবী করীম (সাঃ) যখন সিরিয়া থেকে এ কাফেলা ফিরে আসার সংবাদ পেলেন তখন তিনি স্থির করেন যে, এখনই কাফেলার মোকাবেলা করার। কুরাইশদের ক্ষমতাকে ভেঙ্গে দেয়ার উপযুক্ত সময়। তিনি সাহাবায়ে কেরামদের সাথে পরামর্শ করে নির্দেশ দিলেন যে, যাদের নিকট এ মুহুর্তে সাওয়ারী উপস্থিত রয়েছে এবং জেহাদের যেতে চান, শুধু তারাই যাবে। আরও যারা যুদ্ধে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু তাদের সাওয়ারী ছিল গ্রাম এলাকায়, তারা গ্রাম থেকে সাওয়ারী এনে পরে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেন। কিন্তু তখন এতটা অপেক্ষা করার সময় ছিলনা। কাজেই নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে আগ্রহীদের মধ্য হতে খুব কম সংখ্যককে তিনি সাথে নিতে পারলেন। তাদেরকে নিয়েই তিনি রওয়ানা হলেন যুদ্ধ যাত্রায়। বি’রে সুকাইয়া নামক স্থানে পৌছে মহানবী (সাঃ) কায়েস ইবনে সাদাআ (রাঃ)-কে সৈন্য গণনা করার নির্দেশ দেন। তখন তিনি গণনা করে জানালেন যে, সৈন্য সংখ্যা ৩১৩ জন। মহানবী (সাঃ) একথা শুনে আনন্দিত হয়ে বললেন, তালুতের সৈন্য সংখ্যাও তাই ছিল। কাজেই লক্ষণ ভালো। বিজয় ও সফলতার লক্ষণ বটে। সাহাবায়ে কেরামদের সাথে মোট উট ছিল ৭০টি। প্রতি ৩ জনের জন্য ১টি। যাতে তারা পালাক্রমে সাওয়ার করেছিলেন। এমনকি স্বয়ং রাসুল (সাঃ) নিজেরও পালাক্রমে পালা এলে পায়ে হেটে যেতেন। অপরদিকে সিরিয়ার বিখ্যাত স্থান ‘আইনে যোরকায়’ পৌছে একব্যক্তি কুরাইশ কাফেলার নেতা আবু সুফিয়ানকে এ সংবাদ দিল যে, নবী করীম (সাঃ) তাদের এ কাফেলার অপেক্ষা করছেন। তিনি এর পশ্চাদ্ধাবন করবেন। আবু সুফিয়ান সতর্কতা মূলকঃ প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। যখন হেজাজের সিমানায় কাফেলাটি পৌঁছল, তখন জনৈক দমদম ইবনে ওমরকে কুঁড়ি মিসকাল স্বর্ণ অর্থাৎ তখনকার প্রায় ২ হাজার টাকা মজুরি দিয়ে এ ব্যাপারে রাজী করাল যে, সে একটি দ্রুতগামী উষ্ট্রিতে চড়ে যথাশীঘ্র মক্কায় গিয়ে এ সংবাদটি পৌছে দিবে যে, তাদের কাফেলা সাহাবায়ে কেরামের আক্রমণে আশঙ্কার সম্মুখীন হয়েছে। দমদম ইবনে ওমর সেকালের বিশেষ রীতি অনুযায়ী আশঙ্কার ঘোষণা দেয়ার উদ্দেশ্যে তার উষ্ট্রীর নাক-কান কেটে এবং নিজের পরীধেয় বস্ত্রের সামনে পেছনে ছিড়ে ফেলল এবং হাওলদাটি উল্টোভাবে উষ্ট্রীর পিঠে বসিয়ে দিল। এটি ছিল সেকালে ঘোর বিপদের চিহ্ন। যখন সে এভাবে মক্কায় এসে ঢুকলো, গোট মক্কা নগরীতে এক হৈ-চৈ পড়ে গেল। সাজ সাজ রব উঠলো। সমস্ত কুরাইশ প্রতিশোধের জন্য তৈরি হয়ে গেল। মাত্র ৩দিনের মধ্যে সমগ্র কুরাইশ বাহিনী পরিপূর্ণ সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। তাদের বাহিনীতে ১০০০ সৈন্য, ২০০ ঘোড়া, ৬০০ বর্মধারী এবং সারী গায়িকা ও বাঁদীদল তাদের বাদ্যযন্ত্রসহ বদর অভিমূখে রওয়ানা হলো। প্রত্যেক মনজিলে তথা বিরতীতে তাদের খাবারের জন্য ১০টি করে উট জবাই করা হতো। অপরদিকে রাসুল (সাঃ) শুধুামাত্র একটি বাণিজ্যিক কাফেলার মোকাবেলা করার অনুপাতে প্রস্তুতি নিয়ে ২য় হিজরীর ১২ রমজান শনিবার মদীনা থেকে রওয়ানা হন। কয়েক মঞ্জিল অতিক্রম করার পর বদরের নিকট এসে পৌঁছে দু’জন সাহাবীকে আবু সুফিয়ানের সংবাদ নিয়ে আসার জন্য পাঠালেন। (মাযহারী) সংবাদ বাহকের ফিরে এসে জানালেন যে, আবু সুফিয়ানের কাফেলা মহানবী (সাঃ)-এর পশ্চাদ্ধাবনের সংবাদ জানতে পেরে নদীর তীর ধরে অতিক্রম করে চলে গেছে। আর কুরাইশরা তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ও মুসলমানদের সাথে মোকাবিলা করার জন্য হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছে। (ইবনে কাসীর) মুশরিকদের সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিল আবু জেহেল ইবনে হিশাম। কুরাইশদের ৯জন বিশিষ্ট ব্যক্তি খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১দিনের ৯টি, অন্যদিনের ১০টি এভাবে উট জবাই করা হতো।

পক্ষান্তরে রাসুলে করীম (সাঃ) মুসলিম সেনা বিন্যাস এভাবে করেছিলেন যে, একদল ছিল মুজাহিদ এবং অন্যদল ছিল আনছার। মুসলমান রোজা ও ক্ষুধা অবস্থায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। (আর রাহীকুল মাখতুম) অভিশপ্ত ইবলিস ছোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জাশআম মুদলিজীর রূপ ধারণ করে এসেছিল। মুশরেকদের নিকট থেকে সে তখনো আলাদা হয়নি। কিন্তু মুশরিকদের বিরুদ্ধে ফেরেশতাদের প্রস্তুতী গ্রহণ দেখে সে ছুটে পালাতে লাগল। কিন্তু হারেস ইবনে হিশাম (রাঃ) তাকে ধরে ফেললেন। তিনি ভেবেছিলেন, লোকটি আসলেই ছোরাকা ইবনে মালেক। শুরাকাকে বলতে লাগল, ছোরাকা ইবনে তুমি কোথায় যাচ্ছ? তুমি কি বলনি যে, আমাদের সাহায্য করবে। আমাদের নিকট থেকে দূরে সরে থাকবে না? ছোরাকা বলল, আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাওনা। আল্লাহকে আমার ভয় হচ্ছে। তিনি কঠোর শাস্তিদাতা। এরপর ইবলিশ সমুদ্রে গিয়ে আত্মগোপন করল। যুদ্ধে সময়কালীন আগে-পরের কিছু ঘটনা এ যুদ্ধে হযরত ইকাশা ইবনে মুহসিন আসাদীর তালোয়ার ভেঙ্গে যায়। তিনি নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলেন। নবী করীম (সাঃ) তাকে এক খণ্ড কাঠ টুকরো দিয়ে বললেন, এটি দিয়ে লড়াই কর। সেই কাঠখণ্ড হাতে নিয়ে সোজা করতেই একখানা ধারালো চকচকে তলোয়ারে পরিণত হলো। এরপর তিনি সেই তরবারী দিয়ে লড়াই করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে মুসলমারা জয়লাভ করেন। সেই তরবারীর নাম রাখা হয় ‘আওন’ অর্থাৎ সাহায্য। সেই তরবারী ইকাশার নিকটই থাকতো। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে এ তরবারী ব্যবহার করতেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। সেই সময়েও ঐ তরবারী তার সাথেই ছিল। মুশরিকদের লাশ যখন কুফে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া হলো, তখন ওতবা ইবনে রবীয়ার লাশ কূয়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সে সময় রাসুল (সাঃ) ওতবার পুত্র হুযাইফার দিকে তাকালেন। লক্ষ করলেন, আবু হুযাইফা বিষন্ন গম্ভীর। নবী করীম (সাঃ) বললেন, হে হুযাইফা! তুমি কি তোমার পিতার ব্যপারে মনে কষ্ট পাচ্ছ? তিনি বললেন, জ্বীনা, হে আল্লাহ্’র রাসুল (সাঃ)। আমার মনে আমার পিতার হত্যকাণ্ডের ব্যপারে কোনা আফসোস নেই। তবে আমার ধারণা ছিল আমার পিতার কিছু বুদ্ধি ও বিবেক আছে। তার দ্বারা তিনি ইসলামের শীতল ছায়াতলে আসবেন। কিন্তু এখন তার পরিণাম দেখে খুব খারাপ লাগছে। বলাবাহুল্য, এ সংবাদে অবস্থার মোড় পাল্টে গেল। তখন রাসুল করীম (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামের ইতিবাচক পরামর্শে রাসুল (সাঃ) অত্যন্ত খুশী হলেন এবং স্বীয় কাফেলাকে হুকুম করলেন, আল্লাহ্ পাক ওয়াদা করেছেন যে, এ দু’টি দলের মধ্যে একটির উপর আমাদের বিজয় দান করবেন। দু’টি দল বলতে, একটি হল আবু সুফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলা, আর অপরটি হল মক্কা থেকে আগত সৈন্যদল। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ও মাজহারী) বদর প্রান্তরে পৌঁছার পর মহানবী (সাঃ) কয়েকজন সঙ্গী-সাথী নিয়ে সমতল ভূমির উপর চলাফেরা করলেন। যে স্থানে কুরাইশ বাহিনীর প্রধাণরা নিহত হবে, অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তিনি সাহাবায়ে কেরামকে সে স্থানটি দেখালেন। তিনি সকল স্থান চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন। ঠিক সেখানেই নিহতদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। সে যুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহ সাধারণত সকালের দিকে শুরু হত। সে কারণেই মহানবী (সাঃ) মুসলিম বাহিনীর সমাবেশের জন্য এমন একটি স্থান নির্বাচন করলেন যেখানে দাঁড়ালে উদীয়মান সূর্যের তীক্ষ্ম রশ্মি মুসলিম বাহিনীর চোখে পড়ে চোখে প্রতিফলিত হবে এবং তাদের গতিকে বিঘিœত করবে। (আল-ওয়াকিদী)

বদরের রণাঙ্গনে খোদায়ী সাহায্য : বদরের রণাঙ্গণে আল্লাহর সাহায্য স্বরূপ ফেরেস্তাগণ নেমে আসেন। হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি বদরের কূপ থেকে পানি আনছিলাম, এমন সময় একটা তীব্র দমকা হাওয়া অনুভব করিনি। কিছুক্ষণ পর আরও একটি দমকা হাওয়া এল। আসলে পর পর ৪ বার দমকা হাওয়া এলো। আসলে এটা ছিল প্রধান প্রধান ৪ ফেরেস্তার আসার আলামত। তারা ১০০০ ফেরেস্তা নিয়ে তাবুর ডান দিকে সারিবদ্ধভাবে কাফেরদের উপর আক্রমণ করে। এতে কাফেররা দিগ-বিদিক হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বনী গেফারের এক ব্যক্তি বলল, আমি এবং আমার চাচাত ভাই বদরের এক টিলায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধের দৃশ্য অবলোকন করছিলাম, আমাদের পরিকল্পনা ছিল বিজয়ী দলে সাথে মিশে গিয়ে লুটতরাজে অংশগ্রহণ করব। কেননা, তখন আমরা মুসলমান ছিলাম না। হঠাৎ একখণ্ড মেঘ বুকে পড়তে দেখলাম এবং আমরা ঘোড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। হে খায়রুম! আগ্রসহ হও। খায়রুম হচ্ছে হযরত জিব্রাইল (আঃ)-এর বাহনের নাম। আমার চাচাত ভাই সেই আওয়াজ শুনে ভয়ে ঢলে পড়লো। আমি মৃত প্রায় ছিলাম ঃ কিন্তু বেঁচে গেলাম। (শাওয়াহেদুন নবুয়্যত) যুদ্ধের সূচনায় প্রথমে কুরাইশদের ৩জন এগিয়ে আসলো। মুসলমানদের মধ্য হতে হযরত আলী (রাঃ) হযরত হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) এবং হযরত ওবায়দা বিন হারেছ (রাঃ) তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ৩জন কাফেরই নিহত হল। এরপর ভীষন য্দ্ধু চলতে থাকে। একদিকে ভয়াবহ অবস্থা অন্যদিকে সাইয়্যেদুল মুরসালিন (সাঃ) সিজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে সাহায্যের প্রার্থনা করেছেন। অবশেষে গায়েবী সুসংবাদে মহানবী (সাঃ) শান্ত হন। যুদ্ধের ফলাফল এ যুদ্ধে মুসলমানদের মধ্যে ১৪ জন মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। এবং আবু জাহেল সহ ৭০ জন কাফের নিহত হন। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসের বদরের যুদ্ধের তাৎপর্য ও বিজয় অবিস্মরণীয়। কারণ বদরের যুদ্ধের জয়লাভের ফলে একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রের পরবর্তীতে রূপ চলে আসে। ইসলাম সত্য, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) সত্য বাণী নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন তার বাস্তবতা ফুটে উঠে। সর্বোপরী মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস তৈরী হয়। মহানবী (সাঃ) বলেন, এ যুদ্ধ সত্য মিথ্যার পার্থক্য তৈরি করে দেয়। যুদ্ধ অস্ত্র, সৈনিক ও বাহু বলের দ্বারাই শুধু জয়লাভ সম্ভব নয় আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল, আত্মবিশ্বাস, ঐক্যতা ও সঠিক নেতৃত্ব এবং যুদ্ধাস্ত্র দ্বারাই বিজয় সম্ভব। বদর দিবসে করণীয় বদর দিবসে করণীয় হলো বদরী সাহাবীদের জন্য আমাদের কল্যানার্থে দোয়া কামনা করা। তাদের উছিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং বদরী সকল সাহাবীর প্রতি মহাব্বত ও ঈমানী ভালোবাসা রাখা। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে বদর দিবসের মর্যাদা রক্ষা করার তাওফীক দান করুন এবং তামাম বিশ্ব মুসলমানদের উপর বদর দিবসের চেতনা আবার ফিরে আসুন। গর্জে উঠুক সেই হুঙ্কার, ঈমানী শ্লোগান, ভেঁসে উঠুন আকাশে বাতাসে ইসলামের জয়গান। আমীন!

 

লেখক : নুরুল আফছার আরমান

ঐতিহাসিক বদর দিবসের তাৎপর্য, গুরুত্ব ও শিক্ষা
                                  

ইসলামের ইতিহাসে বদর একটি অন্যতম বিজয় প্রান্তর। বদর পবিত্র মদীনা শরীফ হতে প্রায় ৮০ মাইল দূরবর্তী একটি কূপের নাম। এ নামে একটি গ্রামও রয়েছে। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ সংগঠিত হয় হিজরী ২য় সনের ১৭ রমজান মোতাবেক ৬২৪ সনের ১৮ নভেম্বর শুক্রবার। মতান্তরে ৬২৪ সনের ১৭ মার্চ। ইতিহাসে ইহাই বদরের যুদ্ধ নামে অভিহিত। ইসলামের ইতিহাসে ইহা-ই সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। সংক্ষিপ্তাকারে বদর যুদ্ধের ইতিহাস, গুরুত্ব,তাৎপর্য ও শিক্ষা সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

বদর যুদ্ধের কারণ ও পটভূমি : মক্কাবাসীদের মধ্যে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে কুরাইশরা তাদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায়। তাদেরকে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত ও তাদের ধন-সম্পদ জবর দখল করে নেয়া হয়। অন্যদিকে যে সব দেশে মুসলমানগণ আশ্রয় গ্রহণ করেন কুরাইশরা সে সব দেশের শাসক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু সব প্রচেষ্টা ব্যার্থতায় পর্যবেসিত হয়। (তারীখে তাবারী-১/১৬০৩, ইবনে হিশাম ২১৭ পৃঃ) অপরপক্ষে মুসলমানরাও হিযরতের পর মদীনা থেকে প্রতিশোধ গ্রহনের ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত হতে থাকে। তারা কুরাইশদের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন। কুরাইশদের সমস্ত গৌরব, অহংকার ও শক্তির প্রধান উৎস ছিল শাম দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। তাই রাজনৈতিক দৃষ্টকোন থেকে তাদের গর্ব ও অহংকারকে বন্ধ করার উদ্দেশ্যে মুসলমানরা তাদের উপর ঝটিকা আক্রমণ চালায় এবং ব্যবসার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। একবার নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট মদীনায় এ সংবাদ এসে পৌছে যে, আবু সুফিয়ান একটি বাণিজ্যিক কাফেলার পণ্য সামগ্রী নিয়ে সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে যাচ্ছে। আর এই বাণিজ্য মক্কার সমস্ত কুরায়েশদের অংশীদার। ইবনে আকবার বর্ণনাতে, মক্কার এমন কোন কোরায়েশ নারী বা পুরুষ ছিল না যার অংশ এ বাণিজ্যে ছিল না। কারো কাছে এক মিসকাল পরিমাণ সোনা থাকলে, সেও তার এ বাণিজ্যের অংশ হিসেবে লাগিয়েছে। এ কাফেলার মোট পুঁজি সম্পর্কে ইবনে আকাব বলেন, তা ছিল ৫০ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা দিনার। ১৪০০ বছর পূর্বে যার মূল্য ছিল ২৪ লাখ টাকা। যা বর্তমান বাজারে প্রায় ১৫০ কোটির অপেক্ষা ও বেশি। প্রকৃতপক্ষে এ বাণিজ্য কাফেলাটি ছিল কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কোম্পানী।

 

ইমাম বাগাভী (রহঃ) বলেন, একথা সকলের জানাছিল যে, কুরাইশদের এ বাণিজ্য এবং এ বাণিজ্যিক পুঁজিই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। এর উপর ভরসা করে তারা রাসুল (সাঃ) ও সাহাবীদের উপর উৎপীড়ন করে মক্কা থেকে মদীনায় যেতে বাধ্য করেছিল। সে কারণেই নবী করীম (সাঃ) যখন সিরিয়া থেকে এ কাফেলা ফিরে আসার সংবাদ পেলেন তখন তিনি স্থির করেন যে, এখনই কাফেলার মোকাবেলা করার। কুরাইশদের ক্ষমতাকে ভেঙ্গে দেয়ার উপযুক্ত সময়। তিনি সাহাবায়ে কেরামদের সাথে পরামর্শ করে নির্দেশ দিলেন যে, যাদের নিকট এ মুহুর্তে সাওয়ারী উপস্থিত রয়েছে এবং জেহাদের যেতে চান, শুধু তারাই যাবে। আরও যারা যুদ্ধে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু তাদের সাওয়ারী ছিল গ্রাম এলাকায়, তারা গ্রাম থেকে সাওয়ারী এনে পরে যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেন। কিন্তু তখন এতটা অপেক্ষা করার সময় ছিলনা। কাজেই নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে আগ্রহীদের মধ্য হতে খুব কম সংখ্যককে তিনি সাথে নিতে পারলেন। তাদেরকে নিয়েই তিনি রওয়ানা হলেন যুদ্ধ যাত্রায়। বি’রে সুকাইয়া নামক স্থানে পৌছে মহানবী (সাঃ) কায়েস ইবনে সাদাআ (রাঃ)-কে সৈন্য গণনা করার নির্দেশ দেন। তখন তিনি গণনা করে জানালেন যে, সৈন্য সংখ্যা ৩১৩ জন। মহানবী (সাঃ) একথা শুনে আনন্দিত হয়ে বললেন, তালুতের সৈন্য সংখ্যাও তাই ছিল। কাজেই লক্ষণ ভালো। বিজয় ও সফলতার লক্ষণ বটে। সাহাবায়ে কেরামদের সাথে মোট উট ছিল ৭০টি। প্রতি ৩ জনের জন্য ১টি। যাতে তারা পালাক্রমে সাওয়ার করেছিলেন। এমনকি স্বয়ং রাসুল (সাঃ) নিজেরও পালাক্রমে পালা এলে পায়ে হেটে যেতেন। অপরদিকে সিরিয়ার বিখ্যাত স্থান ‘আইনে যোরকায়’ পৌছে একব্যক্তি কুরাইশ কাফেলার নেতা আবু সুফিয়ানকে এ সংবাদ দিল যে, নবী করীম (সাঃ) তাদের এ কাফেলার অপেক্ষা করছেন। তিনি এর পশ্চাদ্ধাবন করবেন। আবু সুফিয়ান সতর্কতা মূলকঃ প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। যখন হেজাজের সিমানায় কাফেলাটি পৌঁছল, তখন জনৈক দমদম ইবনে ওমরকে কুঁড়ি মিসকাল স্বর্ণ অর্থাৎ তখনকার প্রায় ২ হাজার টাকা মজুরি দিয়ে এ ব্যাপারে রাজী করাল যে, সে একটি দ্রুতগামী উষ্ট্রিতে চড়ে যথাশীঘ্র মক্কায় গিয়ে এ সংবাদটি পৌছে দিবে যে, তাদের কাফেলা সাহাবায়ে কেরামের আক্রমণে আশঙ্কার সম্মুখীন হয়েছে। দমদম ইবনে ওমর সেকালের বিশেষ রীতি অনুযায়ী আশঙ্কার ঘোষণা দেয়ার উদ্দেশ্যে তার উষ্ট্রীর নাক-কান কেটে এবং নিজের পরীধেয় বস্ত্রের সামনে পেছনে ছিড়ে ফেলল এবং হাওলদাটি উল্টোভাবে উষ্ট্রীর পিঠে বসিয়ে দিল। এটি ছিল সেকালে ঘোর বিপদের চিহ্ন। যখন সে এভাবে মক্কায় এসে ঢুকলো, গোট মক্কা নগরীতে এক হৈ-চৈ পড়ে গেল। সাজ সাজ রব উঠলো। সমস্ত কুরাইশ প্রতিশোধের জন্য তৈরি হয়ে গেল। মাত্র ৩দিনের মধ্যে সমগ্র কুরাইশ বাহিনী পরিপূর্ণ সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। তাদের বাহিনীতে ১০০০ সৈন্য, ২০০ ঘোড়া, ৬০০ বর্মধারী এবং সারী গায়িকা ও বাঁদীদল তাদের বাদ্যযন্ত্রসহ বদর অভিমূখে রওয়ানা হলো। প্রত্যেক মনজিলে তথা বিরতীতে তাদের খাবারের জন্য ১০টি করে উট জবাই করা হতো। অপরদিকে রাসুল (সাঃ) শুধুামাত্র একটি বাণিজ্যিক কাফেলার মোকাবেলা করার অনুপাতে প্রস্তুতি নিয়ে ২য় হিজরীর ১২ রমজান শনিবার মদীনা থেকে রওয়ানা হন। কয়েক মঞ্জিল অতিক্রম করার পর বদরের নিকট এসে পৌঁছে দু’জন সাহাবীকে আবু সুফিয়ানের সংবাদ নিয়ে আসার জন্য পাঠালেন। (মাযহারী) সংবাদ বাহকের ফিরে এসে জানালেন যে, আবু সুফিয়ানের কাফেলা মহানবী (সাঃ)-এর পশ্চাদ্ধাবনের সংবাদ জানতে পেরে নদীর তীর ধরে অতিক্রম করে চলে গেছে। আর কুরাইশরা তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ও মুসলমানদের সাথে মোকাবিলা করার জন্য হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছে। (ইবনে কাসীর) মুশরিকদের সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিল আবু জেহেল ইবনে হিশাম। কুরাইশদের ৯জন বিশিষ্ট ব্যক্তি খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১দিনের ৯টি, অন্যদিনের ১০টি এভাবে উট জবাই করা হতো।

পক্ষান্তরে রাসুলে করীম (সাঃ) মুসলিম সেনা বিন্যাস এভাবে করেছিলেন যে, একদল ছিল মুজাহিদ এবং অন্যদল ছিল আনছার। মুসলমান রোজা ও ক্ষুধা অবস্থায় যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। (আর রাহীকুল মাখতুম) অভিশপ্ত ইবলিস ছোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জাশআম মুদলিজীর রূপ ধারণ করে এসেছিল। মুশরেকদের নিকট থেকে সে তখনো আলাদা হয়নি। কিন্তু মুশরিকদের বিরুদ্ধে ফেরেশতাদের প্রস্তুতী গ্রহণ দেখে সে ছুটে পালাতে লাগল। কিন্তু হারেস ইবনে হিশাম (রাঃ) তাকে ধরে ফেললেন। তিনি ভেবেছিলেন, লোকটি আসলেই ছোরাকা ইবনে মালেক। শুরাকাকে বলতে লাগল, ছোরাকা ইবনে তুমি কোথায় যাচ্ছ? তুমি কি বলনি যে, আমাদের সাহায্য করবে। আমাদের নিকট থেকে দূরে সরে থাকবে না? ছোরাকা বলল, আমি এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা দেখতে পাওনা। আল্লাহকে আমার ভয় হচ্ছে। তিনি কঠোর শাস্তিদাতা। এরপর ইবলিশ সমুদ্রে গিয়ে আত্মগোপন করল। যুদ্ধে সময়কালীন আগে-পরের কিছু ঘটনা এ যুদ্ধে হযরত ইকাশা ইবনে মুহসিন আসাদীর তালোয়ার ভেঙ্গে যায়। তিনি নবী করীম (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলেন। নবী করীম (সাঃ) তাকে এক খণ্ড কাঠ টুকরো দিয়ে বললেন, এটি দিয়ে লড়াই কর। সেই কাঠখণ্ড হাতে নিয়ে সোজা করতেই একখানা ধারালো চকচকে তলোয়ারে পরিণত হলো। এরপর তিনি সেই তরবারী দিয়ে লড়াই করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে মুসলমারা জয়লাভ করেন। সেই তরবারীর নাম রাখা হয় ‘আওন’ অর্থাৎ সাহায্য। সেই তরবারী ইকাশার নিকটই থাকতো। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে এ তরবারী ব্যবহার করতেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। সেই সময়েও ঐ তরবারী তার সাথেই ছিল। মুশরিকদের লাশ যখন কুফে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া হলো, তখন ওতবা ইবনে রবীয়ার লাশ কূয়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সে সময় রাসুল (সাঃ) ওতবার পুত্র হুযাইফার দিকে তাকালেন। লক্ষ করলেন, আবু হুযাইফা বিষন্ন গম্ভীর। নবী করীম (সাঃ) বললেন, হে হুযাইফা! তুমি কি তোমার পিতার ব্যপারে মনে কষ্ট পাচ্ছ? তিনি বললেন, জ্বীনা, হে আল্লাহ্’র রাসুল (সাঃ)। আমার মনে আমার পিতার হত্যকাণ্ডের ব্যপারে কোনা আফসোস নেই। তবে আমার ধারণা ছিল আমার পিতার কিছু বুদ্ধি ও বিবেক আছে। তার দ্বারা তিনি ইসলামের শীতল ছায়াতলে আসবেন। কিন্তু এখন তার পরিণাম দেখে খুব খারাপ লাগছে। বলাবাহুল্য, এ সংবাদে অবস্থার মোড় পাল্টে গেল। তখন রাসুল করীম (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামের ইতিবাচক পরামর্শে রাসুল (সাঃ) অত্যন্ত খুশী হলেন এবং স্বীয় কাফেলাকে হুকুম করলেন, আল্লাহ্ পাক ওয়াদা করেছেন যে, এ দু’টি দলের মধ্যে একটির উপর আমাদের বিজয় দান করবেন। দু’টি দল বলতে, একটি হল আবু সুফিয়ানের বাণিজ্যিক কাফেলা, আর অপরটি হল মক্কা থেকে আগত সৈন্যদল। (তাফসীরে ইবনে কাসীর ও মাজহারী) বদর প্রান্তরে পৌঁছার পর মহানবী (সাঃ) কয়েকজন সঙ্গী-সাথী নিয়ে সমতল ভূমির উপর চলাফেরা করলেন। যে স্থানে কুরাইশ বাহিনীর প্রধাণরা নিহত হবে, অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তিনি সাহাবায়ে কেরামকে সে স্থানটি দেখালেন। তিনি সকল স্থান চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন। ঠিক সেখানেই নিহতদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। সে যুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহ সাধারণত সকালের দিকে শুরু হত। সে কারণেই মহানবী (সাঃ) মুসলিম বাহিনীর সমাবেশের জন্য এমন একটি স্থান নির্বাচন করলেন যেখানে দাঁড়ালে উদীয়মান সূর্যের তীক্ষ্ম রশ্মি মুসলিম বাহিনীর চোখে পড়ে চোখে প্রতিফলিত হবে এবং তাদের গতিকে বিঘিœত করবে। (আল-ওয়াকিদী)

বদরের রণাঙ্গনে খোদায়ী সাহায্য : বদরের রণাঙ্গণে আল্লাহর সাহায্য স্বরূপ ফেরেস্তাগণ নেমে আসেন। হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি বদরের কূপ থেকে পানি আনছিলাম, এমন সময় একটা তীব্র দমকা হাওয়া অনুভব করিনি। কিছুক্ষণ পর আরও একটি দমকা হাওয়া এল। আসলে পর পর ৪ বার দমকা হাওয়া এলো। আসলে এটা ছিল প্রধান প্রধান ৪ ফেরেস্তার আসার আলামত। তারা ১০০০ ফেরেস্তা নিয়ে তাবুর ডান দিকে সারিবদ্ধভাবে কাফেরদের উপর আক্রমণ করে। এতে কাফেররা দিগ-বিদিক হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বনী গেফারের এক ব্যক্তি বলল, আমি এবং আমার চাচাত ভাই বদরের এক টিলায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধের দৃশ্য অবলোকন করছিলাম, আমাদের পরিকল্পনা ছিল বিজয়ী দলে সাথে মিশে গিয়ে লুটতরাজে অংশগ্রহণ করব। কেননা, তখন আমরা মুসলমান ছিলাম না। হঠাৎ একখণ্ড মেঘ বুকে পড়তে দেখলাম এবং আমরা ঘোড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। হে খায়রুম! আগ্রসহ হও। খায়রুম হচ্ছে হযরত জিব্রাইল (আঃ)-এর বাহনের নাম। আমার চাচাত ভাই সেই আওয়াজ শুনে ভয়ে ঢলে পড়লো। আমি মৃত প্রায় ছিলাম ঃ কিন্তু বেঁচে গেলাম। (শাওয়াহেদুন নবুয়্যত) যুদ্ধের সূচনায় প্রথমে কুরাইশদের ৩জন এগিয়ে আসলো। মুসলমানদের মধ্য হতে হযরত আলী (রাঃ) হযরত হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) এবং হযরত ওবায়দা বিন হারেছ (রাঃ) তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ৩জন কাফেরই নিহত হল। এরপর ভীষন য্দ্ধু চলতে থাকে। একদিকে ভয়াবহ অবস্থা অন্যদিকে সাইয়্যেদুল মুরসালিন (সাঃ) সিজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে সাহায্যের প্রার্থনা করেছেন। অবশেষে গায়েবী সুসংবাদে মহানবী (সাঃ) শান্ত হন। যুদ্ধের ফলাফল এ যুদ্ধে মুসলমানদের মধ্যে ১৪ জন মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। এবং আবু জাহেল সহ ৭০ জন কাফের নিহত হন। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসের বদরের যুদ্ধের তাৎপর্য ও বিজয় অবিস্মরণীয়। কারণ বদরের যুদ্ধের জয়লাভের ফলে একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রের পরবর্তীতে রূপ চলে আসে। ইসলাম সত্য, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) সত্য বাণী নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন তার বাস্তবতা ফুটে উঠে। সর্বোপরী মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস তৈরী হয়। মহানবী (সাঃ) বলেন, এ যুদ্ধ সত্য মিথ্যার পার্থক্য তৈরি করে দেয়। যুদ্ধ অস্ত্র, সৈনিক ও বাহু বলের দ্বারাই শুধু জয়লাভ সম্ভব নয় আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল, আত্মবিশ্বাস, ঐক্যতা ও সঠিক নেতৃত্ব এবং যুদ্ধাস্ত্র দ্বারাই বিজয় সম্ভব। বদর দিবসে করণীয় বদর দিবসে করণীয় হলো বদরী সাহাবীদের জন্য আমাদের কল্যানার্থে দোয়া কামনা করা। তাদের উছিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং বদরী সকল সাহাবীর প্রতি মহাব্বত ও ঈমানী ভালোবাসা রাখা। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে বদর দিবসের মর্যাদা রক্ষা করার তাওফীক দান করুন এবং তামাম বিশ্ব মুসলমানদের উপর বদর দিবসের চেতনা আবার ফিরে আসুন। গর্জে উঠুক সেই হুঙ্কার, ঈমানী শ্লোগান, ভেঁসে উঠুন আকাশে বাতাসে ইসলামের জয়গান। আমীন!

 

লেখক : নুরুল আফছার আরমান

নির্বোধ
                                  

সন্ধ্যার সময় আক্লিমার বোন আক্লিমাকে তার বেগম সাহেবের বাসায় বাঁধা কাজের জন্য নিতে নিতে বলে,এই তোর এগারো নম্বর বাসা। এইখানে যদি থাকতে না পারোস, তাইলে দুনিয়ার অন্য কোথাও তোর জায়গা হইতো না। আমার বেলী বেগম খুব ভালো আর দরদী মানুষ। তোর জন্য খাটতে খাটতে আমার জান শেষ, তোর জন্য তোর দুলাভাইয়ের আর কতো গালি খামু,কতো? একটু মন লাগাইয়া কাজ র্কবি। যা’ যা’ কাজ কইব, মন দিয়া শুন্বি। আমার মান- সম্মান নষ্ট করিস্ না। ম্যাডাম্ আমাকে অনেক ভালো জানে। অনেক বুঝাইয়া তরে দেওনের জন্য রাজী করাইছি। সাহেব তো রাজী ছিল না। ম্যাডামের মায়া বেশী, তাই রাজী হইছে।“ বুয়া বক্ বক্ র্কতে র্কতে বোনকে নিয়ে হাজির হয়।
আক্লিমাকে প্রথম দেখেই বেলীর হাসির উদ্রেক হলো, যখন জিজ্ঞেস করলো, তোমার নাম কি? উত্তর ছিল” ভিউটি বেগম। “বুয়া বলে,“ ভাবী, ওর নাম আক্লিমা খাতুন, নিজে নাম দিছে, বিউটী বেগম। আর কইয়েন না, ভাবী; ঠিক মতন কথা কইতে পারে না। কোথাও কাজ দিলে হয় ওকে তাড়ায় দেয়; আর নাইলে, কয়দিন পর ও নিজেই আইয়া হাজির হয়। ও আইলে, আমার স্বামী দুই চোখে দেখ্বার পারে না। বাবার কাছে গেলে, সৎমা জায়গা দেয় না। সবার অভিযোগ, ওর স্বভাব ভাল না; ভাবীরে, বোন আমার ভাল; কিন্তু সমস্যা হলো ঠিক মতন আচার-ব্যবহার র্কতে পারে না। বোকা, গাধা, হাব্লা যার যার মনে আসে কয়। কিন্তু ভাবী, একদম চোর না; কেউ এই অভিযোগ করে না। আপনি যদি সারাদিন খাবার না দেন, তাইলেও হাত দিয়া নিয়ে খাবে না। বোনটাই আমার পোড়া কপালী। ও কোলে থাকতে মা মইরা গেল, বাপ আবার বিয়া কইরা ফ্যালাইলো। সৎ মা দুই চোখে দেখতে পারে নাই। বড় অবহেলায় মানুষ হইছে, আচার ব্যবহারও ঠিক মতন শিখায় নাই। ডাঙ্গর হইতে না হইতে দুইটা বিয়া দিয়া দিছে সৎ মা। কিন্তু একটাও টিকে নাই। একটা দিছিলো সৎ মার বুইরা মামার লগে। বাবার মুখে কোন রা ছিল না। সৎমা শুধু আপদ বিদায় করার ধান্দায় ছিল। ওর দুই স্বামীর অভিযোগ ছিল আকলিমা সংসার করার উপযোগী না।”
বেলীর কানে যাচ্ছিল বুয়ার কথা; আর চোখ ছিল বিউটীর উপরে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত অবলোকন করছিল। শুকনা বলতে শুকনা শরীরে হাড়ের উপর চামড়া ছাড়া আর কিছু নেই। ছোট্ট খাট্টো কালো রং। কিন্তু তার মাঝেও কেমন একটা স্রিগ্ধভাব। নিজেকে পরিপাটি করে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। পরিধানের শাড়িটা পরিপাটি করে পড়া। চুল গুলো তেল দিয়ে আঁচ্ড়িয়ে একটা বেনী করে রেখেছে। ওকে স্রিগ্ধ দেখার কারণটা বেলী আবিষ্কার র্কতে র্পাল, ওর কপালের ছোট্ট কালো টিপটা। অসুন্দর মেয়েটা নিজেকে সুন্দর রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে, সেটা বুঝা যায়। নিজের একটি আধুনিক নামও দিয়েছে সুন্দর উচ্চারণ র্কতে যেয়ে বিকৃত হয়ে ‘বিউটি’ হয়ে যাচ্ছে ‘ভিউটি’। বেলীর মেয়েটার উপর মায়া ধরে যায়। একদম অবলা। মনে মনে বলে, দেখিনা মেয়েটার অসংগতি গুলো দূর করা যায় কিনা। কাজ যা পারে করুক, বুয়া তো রইল। শুরু হলো ‘ভিউটিকে’ ‘বিউটি’ করার অভিযানে। যখনই বিকৃত উচ্চারণ করে বেলী সাথে সাথে তা ঠিক করে বলা শিখিয়ে দিতে ল্গালো। কোনো কথা বলতে গেলে চোখ, মুখ, নাক কুচ্কে বলে। বেলী সংশোধন করে দিতে লাগ্ল। আর কাজ শুরু করার পর, বেলী হাড়ে হাড়ে র্টে পেতে লাগ্লো। একদম হ, য, ব, র, ল অবস্থা। কোন একটা কাজ ঠিক মতন করতে পারে না। অসম্ভব ধীরে কাজ করে। বেলী আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে লাগ্লো। তবে বিউটীর আন্তরিকতার অভাব নেই। কিভাবে কাজটা সঠিক হবে, ঐ বোধটাই কাজ র্কতো না। বেলী মনে মনে বলে, মানসিক প্রতিবন্ধি। বেলী স্বামী রাসেলকে বলায়, বলে,ওরে বিদায় করে দাও। কিন্তু বেলী দেয়। অসহায় একটা মেয়ে ছোট বেলায় মা হারা, অনাদর, অবহেলায় সঠিক পুষ্টির অভাবে ওর মানসিক, শারীরিক বিকাশ ঠিক মতন হয়নি। অসহায় মেয়েটি নিজের অসহায়ত্বটুকুও উপলব্ধি র্কতে পারে না। কাউন্সিলিং করে করে যদি মেয়েটির জীবনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা যায় ক্ষতি কি? অন্ততঃ এতোটুকু তৃপ্তি হবে যে একটা মেয়ের জন্য ভালো কিছু বেলী র্কতে পেরেছে।
বিউটির কাজ শেষ হোক আর না হোক আযান কানে গেলেই বাথরুমে ঢোকা চাই। গোসল করে চুল শুকিয়ে নিজেকে পরিপাটি র্খাতে হবে। বেলী ওর তামাশা দেখে দেখে হয়রান। নিজের বাচ্চাকে সামলানোর সাথে সাথে ওকেও সামলাতে হয়। বকাবকি করেও কেনো লাভ হয় না। কোনো কারণে বকার পরিমানটা একটু বেশী হল্ েঅনেকক্ষন বেলীর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় সাহস সঞ্চয় করে এবং নাক-মুখ কুঁচ্কে কেমন মায়া মায়া মুখ করে করুন গলায় বল্তো,“ভাবী,আমারে বইকেনা না। “আহারে, অবলা, মনের কষ্টটাও ঠিক মতন বল্তে পারে না। বেলীর খুব মায়া লাগ্ত, অনুশোচনায় শেষ হয়ে যেত। বিউটিকে খুশী করার জন্য অস্থির হয়ে যেত। কানের দুল, চুড়ী, মালা যা’ যা পেত, তাই দিত। বিউটির ঝল্মলে চোখের দৃষ্টি দেখে বেলীর অনুশোচনা দূর হতো।
দোষ র্কলে বিউটির সব কিছুতেই দোষ ধরা যায়। বিউটির বোনের হুকুম ছিল, দোষ দেখ্লে পিটুনী দেওয়ার। কিš, বেলীর কাছে কাজের লোকের গায়ে হাত দেওয়া পৃথিবীর জঘন্যতম কাজ। অন্যের গায়ে হাত তোলার অধিকার কারো থাকা উচিৎ নয়। অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে নাক-মুখ কুচ্কে কথা বঁল্ত।‘ভাবীকে বল্ত’, বাবী,’ ‘বাব’ুকে বলতো ‘ভাবু’, ‘ভাত’কে বলতো ‘বাত’, ‘বাথ্রুম’কে বলত ‘ভাত্রুম’। বেলী মাঝে মাঝে হেসেই র্মত। নিজেও ওমন করে কথা বল্ত।
শুধু একটা কাজই বিউটি নিষ্ঠার সাতে পালন র্কত। সপ্তাহে দুইদিন দুপুরের খাওয়ার পর বেড়াতে যাওয়া। বেড়ানো বল্তে বাপের ঘরে আর বোনের ঘরে। খাওয়ার পর বস্তো সাজ্তে এক ঘন্টা ধরে সাজ্ত, সাজের সাজ্ কিছু না। চুলটা সুন্দর করে আঁচ্ড়ে নিত। মুখে পাউডার আর কপালে ঐ কালো টিপ্। কালো টিপ্টা অসুন্দরের মাঝে একটা মায়া ভরা ভালো লাগা ছড়িয়ে দিত বিউটির মুখটায়। যেটা বিউটি নিজেও বুঝ্ত না। বেড়িয়ে সন্ধার আগেই ফিরে আস্তো। বেলী কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস র্কতো, বিউটি বেগম, মা কি খাওয়াইলো? নাক-মুখ কুঁচ্কে বিউটি বল্ত, কি আর খাওয়াইব গো বাবী; গেলে বস্তেই দিতে চায় না। তাও যাই বাবী, না গেলে কইব ভিউটী বড়লোক হয়ে গেছে, তাই আসে না।“ এই হলো সহজ সরল বিউটি বেগম। নির্বোধ বিউটির বড় গুন সততা। কোনো মিথ্যা বল্ত না, চুরিতো দূরের কথা; খাবার না দিলে, কখনো মুখে তোুলেনি। বেলী কতো বল্তো, খিদা লাগ্লে যেটা মন চায় খেয়ে নিতে। কিন্তু, কোনোদিন খায়নি। ওর এই সততার কোনো নাম ছিল না। কেউ সততা দেখার চেষ্টাও করেনি। ওর অসুন্দর ব্যাপারটা সবাই মূল্যায়ন র্কত।
অসুন্দর-নির্বোধ বিউটিকেও বিকৃত পুরুষের লালসার শিকার হতে হয় খোদ বেলীর বাসায়। রাসেলের চাচাতো ভাই গ্রাম থেকে বেড়াতে আসে। সুদর্শন, শিক্ষিত ও রুচিশীল দেবর এতো নীচ কাজ র্কবে, বেলী কল্পনাতেই ভাবে নি। ছেলেকে স্কুলে দিয়ে চলে আস্তো, আবার নিয়ে আস্তো। এতোটুকু সময়ের মাঝে এমন জঘন্য একটা কাজ হয়ে গেল, অথচ বেলী কিছুই বুঝ্তে পারলো না। বিউটিও কিছু বলে নি। একদিন বিউটি বোনের বাসায় যায়। সন্ধ্যার সময় বোন ওকে নিয়ে এসে কাঁদ্তে লাগ্ল। কাঁদ্ত কাঁদ্ত বলে,“ভাবীগো, গাধাটারে আপনার বাসায় দিয়া নিশ্চিন্তে ছিলাম; অথচ সেই আপনার বাসায় ওর কি সর্বনাশ হইয়া গেল।“ কি হয়েছে, বেলী জান্তে চায় মাগীটা পেট বাধাইছে বলে বোনকে আবার র্মাতে থাকে। বেলীর বুকটা টিপ টিপ র্কতে থাকে পায়ের নীচ থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। আতংকে কাঁপা গলায জিজ্ঞেস করে, “কে করেছে? বুয়া বলে, “আপনার বাসায় যে বেড়াইতে আইছিল, এক সাদা মূলা দেবর। সেই হারামী। মাগী কিছু কয় না দেখি বমি করে, সন্দেহ হইলে, চাইপ্পা ধরায় স্বীকার হইছে। এখন কি হইব; ভাবী গো? মাগীটা জীবনের ষোলোকলা পূর্ণ কইরা ফ্যালাইলো। আপনার ঘরে এমন কান্ড হইল; আর আপনি কিছুই বুঝ্তে র্পালেন না। রাগে লজ্জায় বেলী থম্কে আছে। কেনো কথা বল্তে র্পাল না কিছুক্ষন। বিউটিকে জেরা করে জানা গেল, বেলী স্কুলে গেলে বদমায়েশটা বিউটির দিকে হাত বাড়ায়। প্রথম দিকে বিউটি বাঁধা দেয়। কিন্তু লম্পটটা যখন প্রেমের অভিনয় করে, তখন আর সাড়া না দিয়ে পারে নি। ঘৃনায় বেলীর গা রি-রি করে ওঠে। মনে হচ্ছিল, বদটাকে ধরে বিউটির সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে। কতো নি¤œরুচী হলে পারে বিউটির দিকে হাত বাড়াতে। রাসেল এলে সব শুনে হতভম্ব হয়ে যায়। বেলীকে বলে, ওর বোনকে টাকা পয়সা দিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা’ করার র্কতে। আর বিউটিকে বিদেয় করে দিতে। বেলীও রাসেলকে বলে, “এরপর থেকৈ তোমার ঐ ভাইর সাথে চিরতরে সম্পর্ক শেষ।”
বিউটিকে নিয়ে যাওয়ার মাস খানেক পর বুয়া বল্লো, বিউটির বিয়া ঠিক হইছে। বেলী বুয়ার হাতে বিউটির জন্য হাজার টাকা দেয়। স্বামী বেশ বয়স্ক বউ মারা গেছে একটা ছেলে; আছে রিকশা চালায় কিছুদিন ঐ স্বামীর ঘরে ছিল এক মেয়ে হয়; ছেলেটাকেও আপন করে নেয়। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় বিউটি এসে হাজির বাবী, আমারে কাজে রাখেন, আমি আর ঐ ব্যাটার ঘরে যাব না। খালি পিটায়। বেলী তো অবাক। এতো ছোট মেয়েকে কার কাছে রেখে এলা? দুই মাসের মেয়েকে কিভাবে একা ফেলে এলা? বেলীর মুখে উৎকণ্ঠা। বিউটি বলে, জানি না কে দেখ্ব। দেখেন, শরীরে খালি পিটানির দাগ। আমি নাকি কোনো কাম কাজ পারি না কয় আর পিটায়। বেলীর মনটা খারাপ হয়ে যায়। বলে, “যাও আগে মেয়েকে নিয়ে এসো, তারপর সব শুন্ব।” সত্যি সত্যি বিউটি যেয়ে এক ঘন্টার মধ্যে মেয়েকে নিয়ে এলো, মজার বিষয় সৎ ছেলেটাকেও সাথে নিয়ে এসেছে। বেলীতো অবাক “ওকে এনেছো কেন?” “কি র্কব বাবী, আমাকে ছাড়ে না, আমার সাথে আস্ব, মায়া লাগ্ল,তাই নিয়ে আইলাম।” বেলী বলে, “কিন্তু বিউটি, এতো মানুষ আমি কই জায়গা দিব?” বিউটির চোখ দিয়ে জল পরে আর ম্নিম্ন করে বল্তে লাগ্লো, “বাবী, আমারে খেদায় দিয়েন না। আজীবন আপনার পায়ে পইরা থাক্ব।” এমনই সহজ সরল বিউটি, নিজের খাওয়া পরার ঠিক নাই। অন্যের বাচ্চা নিয়ে হাজির। বেলীর খুব মায়া লাগে। ঐ রাত কোনো রকম পার করে পরের দিন বুয়া এলে বেলী বিউটির স্বামীকে আন্তে পাঠায়। বিউটির স্বামী এসে ওর নামে নানা অভিযোগ দেয়, অভিযোগের সীমা নেই। সব শুনে বেলী শুধু বলে, সব বুঝ্লাম বিউটি অযোগ্য। কিন্তু ভেবে দেখেন, আপনার ছেলেকে কতোটা ভালোবাসে যে, ছেলেটা ওর সাথে চলে এলো। আপনার বাচ্চা দুইটারে তো আদর করে মানুষ করবে, শুধু এই জন্য নিয়ে যান। মেয়েটা ভাল, বাচ্চা দুইটা মায়ের আদর পাবে। বেলীর কথায় ওর স্বামী মনে হয় ভরসা পেল। ওর স্বামীর হাতে পাঁচশ টাকা দিল। বিউটি খুশী খুশী মনে স্বামীর সাথে ফিরে গেল।
এক বছর পর বিউটি বেগম আবার বেলীর বাসায় এসে ওঠে; সম্পূর্ণ একা। বেশ চটপটে ভাবে বলে, “বাবী, আমার তালাক হয়ে গেছে। মেয়েটাকে একখানে পাল্তে দিয়া দিচ্ছি এই বার আমারে রাখেন।” কিন্তু তখন বুয়ার মেয়ে বেলীর কাছে বাঁধা থাকে। পরে ওর বোন অন্য কোথাও কাজ দেয়। আবার এক দিন এসে বলে, “বাবী, আমার মেয়েটা মইরা গেছে। বিউটির কোনো ঠিকার নেয় আবার বিউটিকে ওর বোন বিয়ে দেয় দেশের বাড়িতে সেই স্বামীও বুড়ো বিপত্র¥ীক। ছেলে-মেয়ে সব আলাদা, বুড়োকে দেখার কেউ নেই। বুয়ার কথায়ঃ এবার বিউটির ভালো বিয়া হইছে। অবস্থা ভালো, পেটে বাতে ভালো থাকবে। “বুয়ার কথায় পেটে ভাতে বেঁচে থাকাটাই বিউটির সুখ। এভাবেই একের পর এক নিয়তি বিউটিকে নিয়ে তামাশা করেছে। কিন্তু বিউটি নির্বাক, কোন ঠিকার নেই। বিউটি সব নিরবে মেনে নিত। ভাগ্যের স্পর্শ র্কবো না এমনই নির্বোধ বিউটি বেগম। লেখক: খূকু খালেদ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক সূচনা ২৬শে মার্চ
                                  

শামীমা সুলতানা

 

২৬ মার্চ সুজলা সুফলা সবুজে ঘেরা আমাদের এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে রক্তের অক্ষরে লেখা গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। এই দিনটির জন্য ৩০ লাখ শহীদের রক্ত¯œাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। হাজার বছরের শোষণ-বঞ্চনার শাপমুক্ত হওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল এই দিনেই।
১৯৭১ এর ৭ মার্চ সাবেক রেসর্কোস ময়দানে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া এক ঐতহিাসিক ভাষণের সময় মুহূর্মুহু গর্জনে উত্তাল ছিল জনসমুদ্র লক্ষ কণ্ঠের একই আওয়াজ উচ্চারতি হতে থাকে দেশের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। ঢাকাসহ গোটা দেশে পত পত করে উড়ছিল সবুজ জমিনের উপর লাল সূর্যের পতাকা।
স্বাধীনতা দিবস বাংলাদেশের মানুষের কাছে মুক্তির প্রতিজ্ঞায় উদ্দীপ্ত হওয়ার ইতিহাস।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশীদের স্বাধীকার আন্দোলন, এমনকি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের আইনসঙ্গত অধিকারকেও রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শুরু করেছিল সারাদেশে গণহত্যা। সেইরাতে হানাদাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হল, শিক্ষকদের বাসা, পিলখানার ইপিআর সদরদপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে একযোগে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে হত্যা করে অগণিত নিরস্ত্র দেশপ্রেমিক ও দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। পাকহানাদার বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একাধিক গণকবর খুঁড়ে সেখানে শত শত লাশ মাটি চাপা দিয়ে তার ওপর বুলডোজার চালায়। নগরীর বিভিন্ন স্থানে সারারাত ধরে হাজার হাজার লাশ মাটি চাপা দেয়া হয়। পুরানো ঢাকার বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়া হয় নিহতদের লাশ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ধানম-ির ৩২ নম্বরের বাসভবনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতারের আগমুহূর্তে দেওয়া সে ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ ও নির্দেশ দেন। ঘোষণা হ্যান্ডবিল আকারে প্রথমে ইংরেজি ও বাংলায় ছাপিয়ে চট্টগ্রামে বিলি করা হয়। আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামের ইপিআর সদর দপ্তর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়্যারলেস মারফত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান দুপুর ২টা ১০ মিনিটে এবং ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণায় সেদিনই ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুরো জাতি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার এক আমবাগানে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত এ সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে।
৪৮ বছর আগে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। পাকিস্তানি শোষকদের কবল থেকে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলার দামাল ছেলেরা। ৯ মাস বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে অর্জিত হয় বিজয় ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব। জাতি অর্জন করে একটি স্বাধীন দেশ নির্মিত হয় একটি জাতীয় পতাকা রচিত হয় প্রাণের সঞ্চার জাতীয় সঙ্গীত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে বেশ বর্ণাঢ্য ভাবে উদযাপন করা হয়। ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসের শুভ সূচনা করা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন রঙের পতাকা দিয়ে সজ্জিত করা হয়। জাতীয় স্টেডিয়ামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের সমাবেশ, কুচকাওয়াজ, ডিসপ্লে ও শরীরচর্চা প্রদর্শন করা হয়। এই দিনটিতে সরকারি ছুটি থাকে। দেশের পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। বেতার ও টিভি চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে।

আজন্ম অধিকার বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার নারী
                                  

শাহনাজ পলি


যুগ যুগ ধরেই অধিকার বঞ্চিত ও অবহেলার শিকার নারী। সেই মানব সভ্যতার শুরু থেকেই। আদিতে এটা ছিল পুরুষের শক্তিমত্তার জন্য । পরবর্তীতে তা আরো বৃদ্ধি পায় সামাজিক বৈষম্যের কারনে। আজকের যুগে সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষা ও সচেতনার অভাবের কারনে।
সামাজিক ও পারিবারিক বৈষম্যের কারণে নারীর উপলদ্ধি সৃষ্টি হলেও নানা প্রতিকুলতায় তা কাটিয়ে উঠতে পারছে না নারী। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা শিক্ষা সংম্কৃতি ও রাজনীতিতে এগিয়ে আসছে ঠিকই কিন্তু হয়রানী ও বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। ঘরে বাইরে সবখানেই নারীর নিরাপত্তার অভাব। নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্যের ব্যবধান কমলেও সুরক্ষার বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত। কর্মজীবি নারীদের জন্য সুরক্ষা আইন থাকলেও তাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীদের সুরক্ষার জন্য বেশকিছু আইন প্রণীত হয়েছে ।
তারপরও আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের নারী প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতা আইন করে বন্ধ করা যাবে না ; এ জন্য সকলের সচেতনতা দরকার।
আমাদের দেশে নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। পরিবারে শারিরিক বা মানষিক নির্যাতন, যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, পাচার বা খুনের মত ঘটনা ঘটছে নিত্য দিন। ঘরের বাইরে বখাটেদের অত্যাচারে নারীর স্বাভাবিক জীবন বিঘ্নিত হচ্ছে। কিশোরীরা ইভটিজিংয়ের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। কর্মস্থলে বেতন বৈষম্যের চেয়ে ভয়াবহ রূপে দেখা দিয়েছে পুরুষ সহকর্মীদের যৌন হয়রানীর ঘটনা। এ সবের কতটাই বা প্রকাশ পায়?
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় নারী ও পুরুষের সমান অধিকার ঘোষিত হয়েছে ঠিকই কিন্তু বাস্তবে নারীরা একজন মানুষ হিসেবে তাদের জন্য প্রদত্ত অধিকারগুলো পুরুষের মতো সমভাবে ভোগ করতে পারে না। মানবাধিকার জন্মগতভাবে প্রতিটি মানুষের একই সাথে সহজাত ও আইনগত অধিকার। যা মানুষ ভোগ করবে এবং চর্চা করবে। স্থানীয়,জাতীয়,আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম দায়িত্ব হল এসব অধিকার মানুষ ভোগ করবে কিন্তু অন্যের বিনষ্টের কারণ হতে পারবে না। মানবাধিকার সব জায়গায় এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হলেও বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের বিষয়টি এখন আরো প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে। শিক্ষা, খাদ্য. কর্মক্ষেত্রে সব খানেই তারা ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না। মৌলিক অধিকার ছাড়াও বাল্য বিয়ে, সন্তান জন্মদানে তাদের মতামতকে উপেক্ষা, যৌতুক প্রথা, যৌন হয়রানি, গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবায় তাদের সঠিক মুল্যায়ন নেই। দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে দেওয়া সুবিধাগুলো কারখানার নারী শ্রমিকেরা পাচ্ছেন না।
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের প্রচলিত সংস্কৃতি,ঐতিহ্য, আইন-কানুন বা রীতি-নীতি,বিচার ব্যবস্থায় দেখা যায় নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক। এমন কি নারী শিশু ধর্ষণের শিকার হলেও তারা সুবিচার পাচ্ছে না। ধর্ষণকারী রয়ে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বিচার তো দুরের কথা ধর্ষণের জন্য মামলা করতে গিয়েও অনেকে হেনস্তার শিকার হচ্ছে যা খুবই দুঃখজনক।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, মামলা দিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ নারী শিশুর অর্ধেকই হেনস্তার শিকার হতে হয়। দেখা যায়, মামলা করার সময় নারী শিশুর সঙ্গে পুলিশের আচরণ মানবিক নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ধর্ষণের মামলা রেকর্ড করতে পুলিশ হেলাফেলা করেছে। এর জন্য টাকা খরচ করতে হয়েছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ আসামি ধরতে পারে না। আসামী ধরতে না পারার পেছনে পুলিশ রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় মাস্তান ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়ী করছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুলিশ স্টাফ কলেজের গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে থানায় যাওয়ার পর থেকে নারী ও শিশুরা বিচারের প্রতিটি ধাপে কী কী প্রতিবন্ধকতার শিকার হয় তা দেখানো হয়েছে।
পুলিশ তদন্তে দেখা গেছে, ধর্ষণের শিকার নারীদের দুই তৃতীয়াংশ শিশু। এবং ধর্ষকের সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবেশী। এছাড়াও সহপাঠী বা ফেসবুক বন্ধুদের দ্বারাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। তারপরে মামলার গাফিলতি তো রয়েছেই। ধর্ষিত নারী শিশুদের একটা বড় অংশই বিচার চাইতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয় আথবা বিচারের প্রাথমিক পর্যায় পেরোতেই হিমসিম খায়। থানায় পুলিশের কটুক্তির কারণেও মামলা করতে অনেক সময় নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে।
কিন্তু কোথায় নারীর অধিকার। বাংলাদেশে নারী শ্রমিকের প্রায় অধের্ক নারীই কাজ করে তৈরি পোশাক কারখানায়। সেখানেও তারা নানা বৈষম্য এবং হেনস্তার শিকার হচ্ছে। এক গবেষনায় জানা যায়, নারী শ্রমিকদের ১২৬ জন কর্মক্ষেত্রে মৌখিক নির্যাতনের শিকার হন। আর যৌন নির্যাতনের শিকার হন ১৮ জন। মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন যথাক্রমে ১০৬.৫ এবং ৩০ জন। ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মরত ১৫০ জন নারী শ্রমিকের ওপর দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বেশির ভাগ নারী পোশাক শ্রমিক কাজে যোগ দেওয়ার সময় নিয়োগ সংক্রান্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাঁরা নিয়োগপত্র,পরিচয়পত্র,পে-স্লিপ,সার্ভিস বই, উপস্থিতির কার্ড পান না। তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত সময়ের কাজ করতে না চাইলেও অনেক সময় তাঁদের বাধ্য করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের মৌখিক নির্যাতনের শিকার হতে দেখা যায়। মৌখিক নির্যাতন বলতে তারা কর্তৃপক্ষ ও সুপারভাইজার কর্তৃক বকাঝকা এবং নিজেদের ও মা-বাবা তুলে গালাগাল করার কথা শোনা যায়। মালিকের মন মত না চললে কর্মক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি রয়েছে। নারী শ্রমিকদের ওপর করা গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে,শ্রম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না। অনেক সময় গর্ভবতী হওয়ার পর অনেক নারী শ্রমিকের চাকরি চলে যায়। তা ছাড়া মাসিক চলাকালীন তাঁরা আগে চলে যাওয়া,কাজের কম চাপ এবং বসে কাজ করা এবং ওষুধ ও স্যানিটারি ন্যাপকিনের সুবিধা পান না।
কিন্তু একটা দেশের উন্নয়নে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ সেখানে নারীর অধিকারকে আগে নিশ্চিত করা দরকার। নারী পোশাক শ্রমিকদের শ্রম আইনের বিভিন্ন ধারা-নিয়োগপত্র,কর্মঘণ্টা,বিশ্রাম ও ছুটি,কর্মপরিবেশ,কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষা এবং নারীবান্ধব কর্ম পরিবেশ গড়েতুলতে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। নারী পোশাক শ্রমিকদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পেশাগত অগ্রগতি সহায়ক ভূমিকা রাখা দরকার। সমাজে নারী পুরুষ বৈষম্য কমিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকারের সাথে সকল নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে। সরকার কর্তৃক যে আইন আছে বাস্তবায়নের দায় তো শুধু সরকারের না। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বা নানা স্তরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। সমাজ এগিয়ে না আসলে নারীর অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব না আবার নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে সমাজের উন্নয়ন সম্ভব না।
নারীর মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কোনো অনুগ্রহ নয়,বরং তা একজন মানুষ হিসেবেই সেটা তাদের প্রাপ্য। সমাজ বা জাতির উন্নয়নের মূলে যেমন একজন পুরুষ দরকার তেমনই দরকার একজন নারীরও।
নারীর মানবাধিকার হচ্ছে ন্যায় বিচারের অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই খাদ্য, শিক্ষা, আশ্রয়, সম্পদ, সম্পত্তি, যৌনতা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, মতপ্রকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সকল প্রকার নির্যাতন থেকে মুক্তিসহ সব কিছুতেই নারীর সমান অধিকার থাকতে হবে। এগুলো হলোমানুষ হিসেবে নারীর জন্মগত ও সহজাত অধিকার।
কবির কথায় ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ এটা যদি আমরা মানি তাহলে নারীকে অবহেলা বা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়
                                  

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চল্লিশ বছর পূর্তিতে আবদুলাহ আবু সায়ীদ 

আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে একটা বেদনা আমার সারা অস্তিত্বকে অসম্ভবভাবে কামড়ে ধরেছিল। সে বেদনা আমার জাতির অজ্ঞতার বেদনা। তখন আমাদের দেশ জাতীয় জীবনের দীর্ঘ নেতিবাচক ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করে প্রথমবারের মতো স্বাধীন হয়েছে। যুগ যুগের পরাধীনতা, দাসত্ব, দুঃখ আর লাঞ্চনার নিগ্রহে জাতি তখন মুমূর্ষু। জ্ঞানের অভাবে, মনের সংকীর্ণতায়, অজ্ঞতায়, দারিদ্র্যে ও অন্ধকারে দেশ যেন ভবিষ্যৎহীন। অথচ আমরা তখন একটি জাতীয় যুদ্ধ সাফল্যজনকভাবে শেষ করে নিজেদের জন্যে একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি।
অনেক নৈরাজ্য ও বেদনার পাশাপাশি মানুষের মন তখনও এক অফুরন্ত আশা ও স্বপ্নে জাগ্রত। দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে তাই তখন এক নিদ্রাহীন উৎকণ্ঠা: কী করে সেই নিষ্ক্রিয়তা আর জাড্য থেকে দেশ ও জাতিকে শক্তি গতি ও সামর্থ্যের জগতে উন্নীত করা যায়।
আমি শিক্ষক মানুষ। একজন শিক্ষক যেভাবে এমন পরিস্থিতির জবাব দেবার কথা ভাবতে পারেন আমি সেভাবেই ভাবলাম।
স্পষ্ট দেখলাম যুগ যুগের নিঃস্বতা আর দারিদ্র আমাদের জাতীয় চেতনার চারপাশে এক দুরারোগ্য অন্ধকারকে চিরস্থায়ী করে রেখেছে। তাই দেশকে বড় করে তুলতে হলে যেভাবেই যতদিনেই হোক এই দুর্ভেদ্য অন্ধকারের জড়ীভূত জগদ্দল ভেঙে আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে। আর তা করতে হলে এই জাতির প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে জ্বালিয়ে তুলতে হবে আলো- জ্বলিত উদ্যত ও অপরাজেয় আলো- কেননা আলোর দীর্ঘ জাগ্রত উজ্জ্বল বর্শাই সেই আয়ুধ যা দিয়ে অন্ধকারের হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করা যায়।
তখন প্রশ্ন উঠল: যে মানুষদের হৃদয়কে আমাদের প্রজ্বলিত করতে হবে তাঁরা কারা? প্রথমেই স্পষ্ট হল যাঁরা বয়স্ক, নির্জীব, নিষ্ক্রিয়; যাঁরা বৃদ্ধ, অথর্ব, অক্ষম, যাঁরা সৃজনক্ষমতায় নীরক্ত ও নিঃশেষিত তাঁরা আমাদের মূল লক্ষ্য হবে না। আমাদের এই মূল লক্ষ্য হবে শিশুরা, কিশোরেরা, তরুণরা, নবীনেরা- যারা আগামী দিনের বাংলাদেশ- যারা কচি, উন্মুখ, উৎকর্ণ; যারা অনুভূতিময়, স্পর্শকাতর, গ্রহণক্ষম। মনে হল, এদের তরুণ জীবনে শুভ-স্বপ্নের বীজ যদি কোনও মতে একবার বুনে দেওয়া যায় তবে পাথুরে মাটির রুক্ষ অনুর্বরতা তাদের ব্যর্থ করতে পারবে না। তাদের কাঁচা বয়সের পলিপড়া নরম উর্বর মাটিতে সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে একটু একটু করে বিকশিত হয়ে চলবে। একসময় তাদের কান্ড গজাবে, ডাল হবে, পাতা আসবে, শাখা-প্রশাখায় ফুলে-ফলে তারা ভরে উঠবে। আর তাদের সেসব ফল চারপাশের মাটিতে পড়ে পড়ে সেখানে জন্ম দেবে আরও অনেক নতুন গাছ। এমনি করে গোটা এলাকাটা একদিন অরণ্য হয়ে উঠবে। এই জন্য একটি শিশুর হৃদয়কে আলোতে প্রজ্বলিত করা এত জরুরি। এতে সে যে শুধু নিজে আলোকিত হয় তা নয়। জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় চারপাশের জগৎকেও সে আলোকিত করে চলে। তারপর একদিন সেই উজ্জ্বল মশাল সে তুলে দেয় পরবর্তী প্রজন্মের হাতে।
মৌমাছিদের যেমন চাক থাকে, তেমনি একটি দেশের কিশোর-তরুণদের জীবনের সেই চাক হল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এ তাদের উৎকর্ষে বসতি। আমরা ভেবে দেখেছিলাম আমরা যদি আমাদের উৎকর্ষ কার্যক্রমগুলো নিয়ে দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিশোর-তরুণদের কাছে পৌঁছাতে পারি তবে তা হবে আগামী দিনের সম্পন্ন বাংলাদেশের কাছেই পৌঁছানো। তাই আমরা তাদের আলোকিত জীবনের লালনক্ষেত্র হিসেবে মূলত এই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেছে নিয়েছিলাম।
প্রথমেই আমাদের ভাবতে হয়েছিল কী কী উপায়ে আমাদের কিশোর-তরুণদের চিত্তকে আলোকিত করে বড় জীবনের স্বপ্ন ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে তোলা যায়। আমাদের মনে হয়েছিল দুটি ব্যাপার এই লক্ষ্যে বড় রকমের অবদান রাখতে পারে:
এক. তাদের মন ও বয়সের উপযোগী শ্রেষ্ঠ ও অনিন্দ্যসুন্দর বইগুলো পড়িয়ে তাদের জীবনকে অনুভূতিময় সৌন্দর্যস্নাত ও উচ্চমূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তোলা । বইয়ের ওপর আমরা জোর দিয়েছিলাম একটি কারণে। তা হল, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের আত্মার আলো এদের ভেতর জ্বলছে। ওইসব মানুষদের হৃদয়ের ভেতরকার যা কিছু সুন্দর, গভীর, ঐশ্বর্যময়, কল্পনাসমৃদ্ধ, মহৎ ও বৈভবসমৃদ্ধ- তাদের ওই বইগুলোর মাধ্যমে সেই সব দীপ্তি ও উজ্জ্বলতার সাহচর্যে বিকশিত হলে আমাদের তরুণদের হৃদয়েও এসবের সংক্রাম অনিবার্য হবে।
দুই. পড়ার পাশাপাশি সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ভেতর দিয়ে তাদের বড় করে তোলা।
ফলে বইপড়ার ভেতর দিয়ে ঘটবে তাদের বৌদ্ধিক জীবনের সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ভেতর দিয়ে ঘটবে তাদের হৃদয়ের পরিশীলন। এতে তারা উন্মীলিত হবে আলোকস্নাত কার্যকর ও দীপান্বিত মানুষ হিসেবে। গত চল্লিশ বছরের নিরন্তর চেষ্টায় বইকে আমরা আজ জাতির কাছে জনপ্রিয় করতে পেরেছি এ-ও আমাদের একটা অর্জন।
আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে মাত্র দশজন তরুণ ও তাদের জন্য দশটি বই কেনার দাম বাবদ এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে পাওয়া ৩৫টি টাকা সম্বল করে শুরু হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রর যাত্রা। আমাদের সেই সভ্যসংখ্যা আজ বছরে ২৮ লক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে। গত চল্লিশ বছরে নব্বই লক্ষ কিশোর-তরুণ আমাদের বিভিন্ন উৎকর্ষ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলোর স্পর্শ পেয়েছে। আমরা আশা করছি আগামী ২০২২ সাল নাগাদ বছর প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিতভাবে আমাদের উৎকর্ষ কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হবে।

এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ২৫০টি উপজেলার প্রায় ১৫,০০০ স্কুল ও কলেজে, এক কথায় প্রায় সব স্কুল ও কলেজে, আমাদের এই কর্মসূচি প্রসারিত হয়েছে। কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি গত বিশ বছর ধরে দেশের ৫৬টি জেলায় পাঠকদের বাড়ির দোরগোড়ায় বই পৌঁছে দিয়ে আসছে। আগামী জুন মাসের মধ্যে এই লাইব্রেরি সারা দেশের সবখানে, অর্থাৎ দেশের প্রতিটি জেলা শহরে, উপজেলার শহরে, ইউনিয়নে এমনকি বর্ধিষ্ণু গ্রামে পাঠকদের দরজায় বই পৌঁছানোর কাজ শুরু করবে।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রকাশনা কার্যক্রমের আওতায় বাংলাভাষার চিরায়ত বইসহ অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বইগুলোর প্রকাশের কাজ চলছে। এই বিভাগ থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচশ বই বেরিয়েছে। ‘আলোর ইশকুল’ স্কুল-কর্মসূচির মাধ্যমে মানব জ্ঞানের ৭৫টি শাখার ব্যাপক পঠন-পাঠন, শ্রবণ ও দর্শনের ভেতর দিয়ে উচ্চায়ত মানুষ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ‘আলোর পাঠশালা’ কর্মসূচির মাধ্যমে অন-লাইন বই পড়ার কর্মকান্ড অব্যাহত রয়েছে।

৭. ২০ বছর আগে লেখা আমার একটি জর্নাল উদ্ধৃত করে এই প্রসঙ্গ শেষ করি :
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রর আসল লক্ষ্য কী, এ নিয়ে নানান লোকের কাছে নানান কথা বলি। কিন্তু আমি তো জানি এই কেন্দ্রের সামনে আজ যদি সত্যিকার করণীয় কিছু থাকে তবে তা হচ্ছে দুটো :
এক, আজকের তরুণদের অর্থাৎ আগামীদিনের মানুষদের বড় করে তোলা;
দুই, তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা।
ভালো সময় বলতে কী বুঝি আমরা? ভালো সময় মানে সেই সময়- যখন ভালো মানুষেরা সংঘবদ্ধ আর খারাপেরা বিভক্ত এবং পরাজিত। এর উল্টোটা হলেই তাকে আমরা বলি দুঃসময়।
আমাদের দেশে সব জায়গায় আজ শুধু অশুভের সংঘবদ্ধতা। কোথাও একটা দুর্বৃৃত্ত হেঁকে উঠলে মুহূর্তে সব দুর্বৃত্ত সংঘবদ্ধ হয়ে যায়।
আমাদের দেশে ভালো মানুষেরা আজ বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগহীন- যে যার আলাদা ঘরে শুয়ে একা একা কাঁদছে। পরস্পরকে খুঁজে পাচ্ছে না।
তারা পরস্পরের কাছে অপরিচিত আগন্তুক এবং প্রত্যেকের মাঝখানে এক আকাশ অন্ধকার। তাদের মাঝখানকার এই বিচ্ছিন্নতার দেয়াল ভাঙতে হবে।
তাদের সকলকে করতে হবে- ‘একত্রিত, সমবেত, আয়োজিত’।
এতগুলো বছর তাদের একত্রিত করার উপায় বের করতেই শেষ হয়েছে। এখন পথ জানা হয়ে গেছে। এখন সংগ্রাম গন্তব্যর জন্যে।
কাজ এখন একটা: প্রদীপ উঁচিয়ে রাখা। ‘ভাই হে, তোমাদের মশালগুলো যেন পলকের জন্যেও না-নেভে।’

ঈদ-উল ফিতরঃ জয়হোক মানবতার
                                  


প্রবন্ধ
ঈদ-উল ফিতরঃ জয়হোক মানবতার

শান্তি আর মানবতার বাণী নিয়ে ধরায় আসে পবিত্র ঈদ। ভ্রাতৃত্বেরমোহনী সুরেডেকে যায় বারংবার। উন্মোচিত হয়সৌহার্দ আর সম্পৃতির দ্বার। পবাহিত হয় খুশিরজোয়ার। আনন্দের বন্যা বয়ে যায় সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
ঈদ-উল ফিতর উৎসব হিসেবে যেমন আনন্দের তেমনি তাৎপর্যের। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ আর মাৎসর্য এই ষড়রিপুগুলোকে নিয়ন্ত্রণের অদম্য বাসনা নিয়ে এবং আত্মগঠন ও জাতি গঠনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিম বিশ্ব পালন করে ঈদ-উল ফিতর।
ঈদ-উল-ফিতর সর্বাধিক অর্থবহ একটি মহান দিবস। আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা আর ভালোবাসায় ভরপুর এক স্বর্গীয় পরশ। যা পাপ পঙ্কিল সমাজ থেকে স্বার্থপরতার মূলোচ্ছেদ ঘটিয়ে শান্তিময় সমাজ ও দেশ গড়তে উৎসাহ প্রদান করে। প্রতি বছর ঈদ আসে ধনী-দরিদ্রের আকাশ-পতাল প্রভেদ দূরীভূত করতে সাম্য ও অধিকারের মহান শিক্ষা নিয়ে। ঈদ-উল্ ফিতরের প্রাক্কালে এক মাস রোজা রাখার বিধান দিয়ে ইসলাম তার অনুসারীদের এই মহান শিক্ষাই দেয় অনাহারে থাকা ক্ষুধার যন্ত্রণা কত বেদনার; কত নিস্পৃহ। কিন্তু এই রোজা বা ঈদ থেকে আমরা কতটুকু শিক্ষা নিজেদের চরিত্রে লালন করতে পারি এটাই ভাবনার বিষয়। আমরা কি পেরেছি অন্নহীন-বস্ত্রহীন মানুষের দুঃখ বুঝে তাদের মুখে খাবার কিংবা শরীরে বস্ত্র তুলে দিতে? আজও অনাহারে অর্ধাহারে অগণিত মানুষ হাত পাতছে অন্যের দ্বারে।
ঈদের ছুটিতে শহরের লাখ লাখ মানুষ পাড়ি জমায় গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু বাড়ী যাবার পূর্বে ফুতপাতে যে হত দরিদ্র মানুষকে অন্ন-বস্ত্রহীন দেখেছিল তার খবর কে রাখে। একবারও কি ঈদ আয়োজনের অর্থ থেকে তাদের জন্য হয়েছে কোন বরাদ্দ?
নির্বাচন এলে প্রার্থীদের কত অঙ্গীকার! ঈদের ব্যানার ফেস্টুনে সে দৃশ্য কম নয়। কিন্তু সে অঙ্গীকার পূরণে বাস্তবতা কতটুকু? শিল্পপতি, ধনবান, রাজনীতিবীদদের কেউ কেউ বিতরণ করেন যাকাতের শাড়ি কিংবা লুঙ্গি। আর তা আনতে গিয়ে পদপৃষ্ঠ হয়ে প্রাণ হারানোর নির্মম ঘটনা শুনিনি এমন নয়। যাকাত গরিবের প্রতি ধনীর করুণা নয় বরং ধনীর সম্পদে গরিবের অধিকার। বাংলাদেশ দারিদ্র্য প্রধান দেশ। তারপরেও এদেশের কিছু কিছু বিত্তবানদের বিদেশী ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বাদ দিলাম সে কথা। শুধুমাত্র এ দেশের ব্যাংকে যে পরিমান টাকা জমা আছে তা থেকে যদি যাকাত প্রদান করা হয় তাহলে এক বছরের যাকাতের অর্থ দিয়ে এ দেশের হত দরিদ্র মানুষেরা অন্তত পাঁচ বছর চলতে পারবে সুতরাং ৮৯.৭% মুসলমানের এ দেশে যাকাতের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ কাজ থেকে আমরা আছি অনেক দূরে।
ঈদ যে ভ্রাতৃতের শিক্ষা দেয় তা আমরা নিজেদের জীবনে কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেবেছি? পবিত্র করআনের ভাষ্য “ইন্নামাল মু’মিনুনা ইখওয়া-নিশ্চয়ই মুমিন মুসলমানেরা ভ্রাতৃ সম্পর্কীয়।” হাদিস শরিফে বলা হয়েছে মুসলমানেরা একটি দেহের ন্যায়।’ শরীরের একটি অংশ কাটলে যেমন সমগ্র শরীরে ব্যথা অনুভূত হয় তেমনি পৃথিবীর কোন প্রান্তে একজন মুসলমান নির্যাতিত হলে কিংবা কষ্ট পেলে গোটা মুসলিম জাতি তার পাশে এসে দাঁড়াবে । আজ পৃথিবীতে অর্ধশত মুসলিম দেশ রয়েছে। রয়েছে প্রায় দুইশতকোটি মুসলমান। আছে মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, কোথায় সেই ওআইসি? তারা কি দায়িত্ব মুক্ত ফিলিস্তিন, মিয়ানমার, ইরাক, সিরিয়া, কাশ্মীর, মিশরে মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো থেকে! সম্প্রতি ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে ইসরাঈলদের আক্রমণে নিহত হলো অর্ধ শতাধিক নিরাপরাধ মুসলমান । চলছে মুসলিমদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাসকে নিয়ে ভয়াল ষড়যন্ত্র । কিন্তু ফিলিস্তিনে কিংবা মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধে এবং পবিত্র জেরুজালেম রক্ষার্থে মুসলিম দেশগুলোর ভূমিকা কতটুকু?
ঈদের শিক্ষা নৈতিকতার অবক্ষয় নয়। রমজানের রোজা আমাদেরকে শিখিয়েছিলো কুপ্রবৃত্তি পরিহার করে নৈতিক পদস্খলন থেকে দূরে থাকতে, আলল্লাহভীতির চেতনা বাস্তব চরিত্রে লালন করতে। আমরা কি পেরেছি? তাহলে কেন ঘটছে নারীর শীলতাহানী ? এক সময় প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ জাতীয় ঘটনার অবতারণায় আমরা শিউরে উঠতাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ সেই ঘটনাগুলোকেও যেন হারাতে বসেছি। চলছে শয়তানি, নোংড়ামি, আর বদরামির প্রতিযোগিতা। মাইক্রোতে, বাসে, ট্রাকে এমনকি নৌকায়ও ঘটছে এমন ঘটনা। জলপথ আর স্থলপথ শেষ; এখন অবশিষ্ট শুধু আকাশপথ। হতভাগ্য লম্পটগুলোর হাত থেকে জানিনা সে পথটিও রক্ষা পাবে কি না!
কেউ ছুটেছে নারীর মোহে কেউ খুঁজিছে ধন,
দ্বীনের তরে নেই যে আর মুসলমানের মন!
অথচ ইতিহাস বলে, ঈদ ও রোজার প্রকৃত শিক্ষা মুসলমানেরা যখন ধারণ করেছিল তখন উন্মুক্ত হয়ে কোন নারী হেটে গেলেও কেউ তার দিকে ফিরে তাকাতো না। দল-মত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জীবনে নেমে এসেছিল শান্তির ছায়া। সুখে-দুঃখে, জীবনে-মরনে এক সাথে ছিল তাদের প্রতিটি কাজ।
হায়! আজ আমরা কোন পথে?
ঈদের জামাতে কী চমৎকার দৃশ্য! একসাথে দাঁড়ানো, একসাথে বাসা, একসাথে সিজদা আর কোলাকুলি। যা আমাদের শিক্ষা দেয় শৃঙ্খলাপূর্ণ শান্তিময় সমাজ গঠনে। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র আমাদের ভূমিগুলো গোলযোগে ভরপুর। প্রতি মূহুর্তে ঘটছে রক্তক্ষয়। কখনও শিয়া-ছুন্নির দন্দ্ব, কখনো রাজনৈতিক সংঘাত। চলছে দুর্বলদের ওপর সবলদের অত্যাচার। ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে আমরা অনেক দূরে। তাইতো আজ আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছে মানবতা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে “তোমরা পরস্পর সংঘবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে আকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন থেকো না।”
(সূরা আলে ইমরান-১০৩)
নবী করিম (স) বিদায় হজ্বের ভাষণে বলেছিলেন, “আমি তোমাদের নিকট রেখে যাচ্ছি দুটি নির্দেশনামা, তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হবে না যদি এই দুটো জিনিসকে মেনে চলতে পার। এক-আল্লাহর কিতাব কুরআন আর দুই-আমার সুন্নাহ-রীতি পদ্ধতি।” (মুয়াত্তা )
জানিনা কবে শুভবোধদয় হবে বিশ্ব মুসলিমের। ঈদের শিক্ষা আকড়ে ধরার মাধ্যমে ফিরে আসবে মানবতা। আরকানে রোহিঙ্গাদের জীবনে , ফিলিস্তিনে মুসলিমদের জীবনে ফিরে আসবে সোনালী দিন আর বিশ্ব জুড়ে বন্ধ হবে মানবাধিকার লঙ্ঘন।
সমাগত ঈদে এই প্রত্যাশা রেখে শেষ করেছি- ঈদ-উল-ফিতর জয় হোক মানবতার।
আজো পথের ধারে অসহায় নিঃস্ব শিশুরা
সদা দিবা-নিশি কাঁদে,
আজো কুকুরের সাথে ফুটপাতের শিশুদের
খাবার নিয়ে বাঁধে ।
আজো গরিবের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে ধনী
সোনার প্রাসাদ গড়ে,
আজো ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে মানুষ
অন্যের দ্বারে ঘোরে ।
আজো থামেনি নিরীহ মানুষের উপরে
সেই জুলুম -নির্যাতন,
আজো ন্যায্য অধিকার পাবার আশায়
হয় মিছিল অনশন ।
অশ্রু ভেজা এই দুঃখের ঈদ যে কবে
খুশির ঈদ হবে?
যেদিন ধনী-গরিব মিলিয়ে কাঁধ
সাম্যের গান গাইবে!
লেখকঃ কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলাম প্রচার পরিষদ ও সহকারী সম্পাদক, মানবাধিকার খবর ।

বেলা ডুবে যায়, জাগ্রত হও
                                  

দিন যায়, মাস যায় বছর যায় এভাবে জীবন হতে চলে যায় অনেক কাল। ৩ ভাগের ২.৫ ভাগ চলে গেছে বাকি আছে আধা ভাগ আজও চিনতে পারলাম না নিজেকে। নিজেকে আড়াল করে সম্মুখে দাড় করায়েছি মায়াবিনী সংসার।  ছেলের ভবিষ্যত মেয়ের ভবিষ্যত কিভাবে সুন্দর হবে তা নিয়ে করেছি ব্যস্ত স্ত্রীর মহব্বতের চাদরে ঢেকে রয়েছি। কখনো নয়ন মেলে নিজের দিকে তাকাই নাই, একবারও প্রশ্ন করি নাই কে আমি। যাদের চিন্তায় ছিলাম বিভোর তারা যখন পাখির মতো পাখনা মেলতে শিখেছে তখন তারা আমা হতে থাকে ফারাক। শরীরেও বেধে আজ রোগের বসত। কখনও কাশি কখনও জ্বর হাটতে পা ব্যথা বসতে কোমরে ব্যথা উঠতে মাথা গোড়ায় আস্তে আস্তে সব ¯œান হয়ে যাচ্ছে। যৌবনের রসনা এখন ধূসর। আর কখন চিনব আমার সত্বাকে আমার প্রভুকে। আয়াতে আছে ‘মান আরা নাপছাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু।’ অর্থাৎ যে নিজেকে চিনেছে সে যেন তার প্রভুকে চিনেছে। কি করেছি সারাটা জীবন যে সবচেয়ে আপন যে আমার অন্তর কালের সাথী মীশে আছে আমার সাথে সর্বক্ষন তাকে রেখে এই নশ্বর দুনিয়া নিয়ে রইলাম ব্যস্ত। হায়রে আমার মানব জীবন। কি জবাব দিব আল্লাহর কাছে বিচার দিনে তিনি সেদিন হবে কাহার (কঠিন)। প্রতিটি কর্মের চুলচেড়া বিচার হবে। সে দিন আমার থাকবেনা কোন সুপারিশ আমি যে রয়েছি মায়াবীনি সংসার মোহে আবদ্দ।
          হে আদম সন্তান একটা ভুলের কারনে আদিপিতা আদম(আঃ) কেঁদেছে ৩৬৫ বৎসর। নয়ন মেলে দেখি আমার ভুলের শেষ নাই কিভাবে ক্ষমা পাবো কত জনমে মুক্তি পাবো। যে নবীর উছিলায় আদম পেয়েছে মাফ তার সাথে করিনাই প্রেম তাকে করিনা স্বরণ করি না অনুকরন অনুসরণ অথচ তার মত মায়াবী বন্ধু জগতে আর নেই। তাকে দূরে রেখে সয়তানের সাথে করেছি দোস্তী আজ আমার পরন্ত বেলা নেই যৌবনের জৌলশ। আল্লহকে ডাকতে গিয়ে হারায় ফেলি আমার বাক্য তাই দেখে সয়তান হাসে মুচকি হাসি।
              হে মানুষ যৌবনে চিনে নাও নিজেকে দমে দমে ডাকো আল্লহকে। আল্লহ সপ্তম আকাশে নেই আছে আপনার অতি নিকটে। ধর্মের মূলে ফিরে আস। আজ যে ইসলাম  দেখছি তা অধিকাংশ লোভী বিলাসী মুয়াবিয়া- ইয়াজিদের ইসলাম। কারণ ইসলামে নেই লোভ লালসা বিলাসীতা আছে প্রেম মায়া মমতা। মুয়াবিয়া-ইয়াজিদ শাসনামলের পূর্বে ইসলামকে জানুন দেখবেন ইসলাম অনেক সুন্দর। কারবালার প্রান্তরে মুয়াবিয়ার নীল নক্সা অনূযায়ী  ইয়াজিদ চেয়েছিল মোহাম্মদী ইসলাম ধ্বংস করতে। কিন্তু হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর আত্ম ত্যাগে আজও ইসলাম জাগ্রত আছে। ইসলামের উপর যত আঘাত এসেছে তা কোন বিধর্মীদের কাছ থেকে আসে নাই ইসলামকে আঘাত করেছে মুসলমানেরা। কারবালার  প্রান্তের ইমাম হোসেন (রাঃ) এর শেষ কথায় তিনি বুঝায়ে গিয়াছেন খাঁটি মুসলমান ও মুনাফেক মুসলমানের পার্থক্য।
            ইমাম হোসাইন (রাঃ) শাহাদাতের পূর্বে শেষবারের মত ইয়াজিদ সৈন্যদের উদ্দেশ্য যে ভাষণটি দিয়ে ছিলেন তা শুুুধু ইয়াজিদের সৈন্য নয় বরং কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মুসলমানদের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে রইল। তিনি বলেছেন তোমরা কি আমাকে চেনো না চেয়ে দেখ আমি রাসূল (সাঃ) এর প্রিয়তম  দৌহিত্র, শেরে খোদা হযরত আলী (রাঃ) এর ছেলে আমি খাতুনে তুযযহরার ¯েœহের লাল। তোমরা কি নানাজানের মুখে শুননি আমি এবং আমার ভাই হাসান জান্নাতের সরদার আমি  তোমাদের ক্ষতি করেছি যে তোমরা আমাকে হত্যা করতে চাও। আমাকে হত্যা করে তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) কে কি জবাব দেবে? অতঃপর তিনি যে কথাটি বললেন তা সত্য এবং মিথ্যাকে, মুমিন এবং মোনাফেকদের পৃথকী করনের জন্য সমস্ত মুসলিম জনগনের কাছে শিক্ষা হয়ে রইল। তিনি বলেছিলেন তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাওনা তোমাদের মধ্যে কি একজন  মুসলমানও নেই? অথচ ইয়াজিদের পক্ষে সেদিন ৩০ হাজার সৈন্য ছিল সবই মুসলমান ।
             সত্যিই সেদিন ইয়াজিদের পক্ষে একজনও মুসলমান ছিলনা। ছিল মুসলমান নামধারী সব মোনাফেক।  ইমাম হোসাইন সম্পর্কে নবীজি (সাঃ) বলেছেন ”আলা হোসাইন মিন্না” ওয়া আনা মিনাল হোসাইন” অর্থাৎ হোসাইন আমা হতে আর আমি হোসাইন হতে। আর তাকেই মুসলমানেরা কারবালা প্রান্তরে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। যা ইতিহাসে বিরল। ইমাম হোসাইন (রাঃ) হত্যার পর ইয়াজিদ এমন হত্যাযোগ্য করেছে লুটপাট করেছে যা আইয়ামে জাহেলিয়ার কাফেরদেরকেও হার মানিয়েছে। ইমাম হোসাইন (রাঃ) হত্যার পর সত্য ঘটনা জানার পর চারদিক থেকে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের  ঝড় উঠল। তখন ইয়াজিদপন্থী মোনাফেক মৌলভীগণ হাদিস দিল যাহা কিছু ঘটেছে। হোসেনের হত্যা আল্লহর হুকুমে হয়েছে সাধারণ মুসলমানেরা এ কথা বিশ্বাস করায় আন্দোলন স্থিমিত হয়ে যায়। আজো এ হাদিস আমরা মেনে চলেছি। হে জ্ঞানী ভাইগণ একটু বিচার করে দেখুনএ হাদিসের সততা কি? আল্লাহ কি হত্যার হুকুম দিতে পারে জেনা করা কিংবা ব্যবিচারে হুকুম দিতে পারে? কখনো না আল্লাহ পবিত্র সত্ত¦া আল্লাহ ভালো কাজের হুকুম করে এবং মন্দ কাজের কখনও হুকুম করেননা তিনি দয়ালু তারমত আর মায়া কার আছে। মন্দ কাজ সয়তানের তথা ইয়াজিদের কাজ। সুতারাং এমন হাদিস বিশ্বাস করা যায় না।
              আজ যখন দেখি এক মুসলমান আর এক মুসলমানকে হত্যা করে জেনা করে ব্যবিচার করে তখন মনে পড়ে ইয়াজিদের কথা আসলে এরাই ইয়াজিদে অনুসারী এরা নামধারী মোনাফেক মুসলমান। কোথায় সেই সত্য মোহাম্মদী ইসলাম সবই ”! তারে নারে না”, ইসলাম আজ পৃথিবীর মানুষের কাছে সন্ত্রাসের দল আই এস এর দল। জাগ্রত হও হে মুহাম্মদের আদশের মুসলমান হোসাইনের লোক, মিথ্যা পুড়ায়ে সত্য ইসলামকে তুলে ধর গাও ইসলামের জয়গান মোনাফেকদের ভয় পেয়ো না আজ সময় এসেছে সত্য কথা বলার। নিজেকে নবীর আদর্শে আদর্শবান কর মুছে ফেল জগতে পাপরাশি ধ্বংশ হউক ইয়াজিদের ইসলাম। আর কত গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন থাকবে। বেলা ডুবে যায় , জাগ্রত হও, জবানে বল আল্লহু আকবার, বল আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহি।
লেখক ঃ সহকারী পরিচালক(এস্টেট ও ভূমি-১)
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা।

আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে!
                                  

ইলিয়াস সাগর

ছোটবেলা নানুর মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। গল্পটি হলো- অনেকদিন আগের কথা। এক দেশে ছিল এক গোয়ালা। গোয়ালার ছিল বিভিন্ন প্রজাতির কয়েকশ’ গরু। আর এই গরুগুলোকে কেন্দ্র করে গোয়ালা স্বপ্নের জাল বুনত। কারণ, গোয়ালার পৈতৃক নিবাস ছিল অজো পাড়াগাঁয়ের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানকার মানুষগুলো ছিল অত্যন্ত দরিদ্র এবং অশিক্ষিত। আর যেখানে অশিক্ষা বাসা বাঁধে সেখানে কুসংস্কার দাপিয়ে বেড়ায়। কুসংস্কারের কালো থাবায় আচ্ছন্ন সমাজ বা গোষ্ঠীর মানুষগুলোর শিক্ষা ও চেতনা ক্রমেই লোপ পায়। শিক্ষাহীন জাতি কখনোই ভাগ্যের উন্নয়ন করতে পারে না। ফলে তারা ক্রমেই ধাবিত হয় দারিদ্র থেকে দারিদ্র সীমার আরও নীচে। ক্ষুধা নিবারণের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের যোগাড় করাটাই তাদের পক্ষে অত্যন্ত দূরূহ হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্রতার যাতাকলে নিষ্পেষিত অভূক্ত মানুষগুলো পুষ্টিহীনতার ফলে রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জরাগ্রস্ত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই জরাজীর্ণ মানুষগুলোকে বোঝা থেকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করাই ছিল গোয়ালার বাবার লক্ষ্য। তাই বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত প্রজাতির গরু কিনে এনে গড়ে তুলেছিলেন এই ফার্ম। গোয়ালার বাবা স্বপ্ন দেখতেন এই ফার্মটি অনেক বড় হবে এবং সেই সাথে হবে এলাকার দুস্থ অসহায় মানুষের কর্মসংস্থান। পুষ্টিহীনতার ফলে একটি মানুষও রোগে ভুগবে না। কর্মচাঞ্চল্যে মুখর নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে সচেষ্ট হবে। স্বপ্নপূরণের আগেই গোয়ালার বাবা তিন দিনের জ্বরে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। বাবার মৃত্যুর পর সুযোগ্য পুত্র হিসেবে গোয়ালার ফার্মটির হাল ধরে। অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে কিছু দিনের মধ্যে ফার্মের পরিধির প্রসার ঘটে। গরুর সংখ্যাও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সেই সাথে যুক্ত হয় কিছু তোষামোদকারী ও চাটুকারের দল। তোষামোদকারীরা মধুর মাছির মতো গোয়ালার চারপাশে সারাক্ষণই ঘ্যাঁন ঘ্যাঁন করত।

গোয়ালারকে চাটুকারদের চটকদার মিষ্টি কথার ফাঁদে ফেলতে খুব একটা সময় লাগল না। গোয়ালা চাটুকারদের শুভাকাঙ্খি ভেবে ফার্ম রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোতে তাদের নিয়োগ দিল। চাটুকাররা নিয়োগ পেয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে দেখল, গোয়ালা যদি প্রতিদিন ফার্মে এসে তদারকি করে তবে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই তারা একদিন গোয়ালাকে বলল- ‘প্রতিদিন কষ্ট করে আপনার ফার্মে আসার দরকার কি? আমরা তো রয়েছি। আপনি মালিক মহাশয়। আপনি বসে বসে আয়েশ করবেন, ঘুমোবেন আর আমাদের হুকুম দেবেন। আপনার বাবা ছিলেন আমাদের জ্যাঠামশাই। মানুষের কল্যাণ করাই ছিল তার কাজ। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যদি আপনি এতটা পরিশ্রম করতে পারেন তবে আমরা পারব না কেন?”

এহেন কথায় সরল গোয়ালা ভীষণ খুশী হয়ে গেল। এরপর থেকে সে বাড়িতে বসে আয়েশ করত আর ঘুমাত। মাসেও একবার ফার্মে যেত না। এই সুযোগে যে যার মতো পারল লুটেপুটে খাওয়া শুরু করে দিল। কিছুদিনের মধ্যে ফার্মটি ধ্বংসের মোহনায় এসে দাঁড়ল। গরুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ল। আর অসুস্থ গরুর দুধ কেউই কিনতে চাইল না। তাই গরুগুলোর চিকিৎসার জন্য বাধ্য হয়ে গোয়ালা সুদী কারবারীদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিল। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। একে একে সবকটি গরু মারা গেল। নিঃস্ব গোয়ালা চাটুকারদের কাছে সাহায্য চাইল। কিন্তু কেউই তাকে সাহায্য করল না। সবাই তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। অবশেষে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাগলপ্রায় গোয়ালা অচিন দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যাওয়ার সময় শুধু বিড়বিড় করে বলল- ‘সেই ঘুম তো ভাঙল, কিন্তু সময় থাকতে ভাঙল না।’

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি-

প্রত্যেক জাতির জীবনেই বিশেষ কিছু গৌরবময় দিন থাকে যা অত্যুজ্জল হয়ে থাকে মানুষের মনের মনিকোঠায় এবং মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে সেসব দিবস উদযাপন করে। বাংলাদেশে বিজয় দিবস এমনি একটি মর্যাদাপূর্ণ ও গৌরবময় দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালী জাতির বিজয় সাধিত হয়েছে আর সেই সাথে বিশ্বের মানচিত্রে অঙ্কিত হয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মানচিত্র। আমরা অর্জন করেছি সবুজের মাঝে রক্তিম লাল সূর্য খচিত একটি গৌরবময় স্বাধীন দেশের পতাকা। এই বিজয় আমরা একদিনে অর্জন করিনি। বিজয় অর্জন করতে আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। দীর্ঘ নয় মাসের কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লাখ লাখ কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-যুবক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী সকলের তাজা প্রাণ আর অসংখ্য মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। অর্জন করেছি স্বাধীনতা। কিন্তু এর বীজ বাঙালীর মনে বপিত হয়েছিল আরোও অনেক আগে। ৫২`র ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতিতে সংঘটিত হয় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে জাতিকে মুক্ত করার সংগ্রাম; মুক্তির সংগ্রাম।

৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহসিক ভাষণ- `এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম!` বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণের বাণীতে কোটি কোটি বাঙালীর তিমিত রক্ত টগবগ করে ওঠে। মুক্তি নেশায় শিহরণ জাগে প্রতিটি মানুষের প্রাণস্পন্দনে। এ ভাষণ কেবল ভাষণই ছিলনা, এটি ছিল বাঙালীর বিজয় অর্জনের চালিকা শক্তি; স্বধীনতার মূলমন্ত্র। এ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই বাংলার মানুষ দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয় অর্জন করে। বাঙালীর স্বাধীনতার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ইয়াহিয়া সরকার ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করার জন্য জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর নেতৃত্বে সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, সাবেক ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, কৃষক-শ্রমিক প্রভৃতি গোষ্ঠির সমন্বয়ে গঠিত হয় মুক্তি বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা নামে মাত্র ট্রেনিং নিয়ে অদম্য সাহসিকতার সাথে মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান নিয়াজী ৯৩ হাজার সৈন্যসহ আত্মসমর্পন করে। এভাবেই অর্জিত হয় আমাদের গৌরবময় বিজয়।

`স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন` এর সত্যতা বাঙালী জাতি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছে। যে চেতনা ও সাহস নিয়ে বাঙালী মুক্তিযুদ্ধ করেছে, বাংলাদেশের সাহিত্যে সেই মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ ও পর্যাপ্ত প্রতিফলন এবং প্রতিভাস পড়েনি। বরং জাতীয় জীবনের অনেক স্তরেই আজ মিথ্যার কালিমা লেপ্টে আছে। এর ফলে আমাদের সব গৌরবই যেন অনেকাংশে ঢেকে যেতে বসেছে। মানবিক মূল্যবোধ প্রায় নিঃশেষিত ও বিপন্ন। বিবেক ও মনুষ্যত্ব আজ লাঞ্ছিত ও অপমানিত। এমতাবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রমের মূল্যে অর্জিত বিজয় আজ কতটুকু অটুট ও অক্ষত আছে ? নয় মাস ব্যাপী অবরুদ্ধ বাংলাদেশে কী অমানবিক নির্যাতন চলেছিল তার কোন স্মৃতি আমাদের আছে বলে মনে হয় না এবং নতুন প্রজন্মকেও আমরা হস্তান্তর করিনি সেই অভিজ্ঞতা ঘটনা পঞ্জি। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তথা বাঙালীর ত্যাগ তিতিক্ষা ও বীরত্বের সঠিক ইতিহাস ধোয়াচ্ছন্ন।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ প্রতিফলন ঘটেনি। এজন্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভুলুন্ঠিত হতে চলেছে। সাধারণ মানুষ আজ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল ও মূল্যস্ফীতির ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্যায়, অবিচার, অনাচার ও অসত্য আজ সমাজে দেদীপ্যমান। বিজয় অর্জনের এতোটা বছর পরে এসে আমরা বিজয়ের স্বা’দ কতটা গ্রহন করতে পারছি ? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গণাদের আজও কী আমরা দিতে পেরেছি তাদের প্রাপ্য অধিকার ? আজও ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ! দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে বিচারপতিদের শপথ গ্রহনকে কেন্দ্র করে চলে পেশী শক্তির মহরা ! ব্যক্তিস্বার্থকে তরান্বিত করতে হরতালের নামে চলছে জালাও পোড়াও সংস্কৃতি ! ধ্বংস হচ্ছে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। অপরাজনীতির নির্মম থাবায় অকালে ঝরে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ ! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে অধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে লাশের মিছিল ! প্রতিদিন সকালে পত্রিকা খুললে এখনো দেখি পত্রিকার সিংহ ভাগ দখল করে আছে খুন ধর্ষণ আর রাহাজানির সংবাদ ! মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ ছিল পরাধীনতার বলয় থেকে জাতিকে মুক্ত করে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা আজও কী পেয়েছি মৌলিক অধিকার ? এখনো দু’মুঠো ভাতের জন্য আমাদের মা বোনদের প্রতিনিয়ত করতে হচ্ছে হাড়ভাঙা পরিশ্রম। দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও পাচ্ছে না তাদের ন্যায্য মজুরি। প্রাপ্য বেতন ভাতা আদায়ের দাবীতে মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে আমাদের মা বোনেরা অহরহ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
বিগত দিনে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। “ক্রস ফায়ার” শব্দটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড অনেকাংশে বেড়ে যায়। তৎকালীন সময়ের প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগ এসব কর্মকান্ডের প্রবল বিরোধীতা করলেও বিএনপি-নিজামী সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একটি বিবৃতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ। তা হলো- “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ।” “আইন শৃঙ্খলা আগের চেয়ে অনেক উন্নত ও কোথায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটছেনা।” মহাজোট সরকারের এক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীও এ দুইটি বিবৃতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। রানা প্লাজা ধ্বসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী সরকারের এক মন্ত্রী মিডিয়ায় বিবৃতি দিতে এসে বলেছিলেন- “রানা প্লাজার কাঠামো একটু দুর্বল ছিল। বিরোধীদল মিছিল নিয়ে এসে রানা প্লাজাকে ধরে ঝাকাঝাকি করেছিল তাই রানা প্লাজা ধ্বসে পড়েছে।” বিশ্বের স্বাধীন সর্বভৌম কোন দেশের কোন মন্ত্রী কোনও কালে কখনও এমন উক্তি করেছে কিনা আমার জানা নেই। অপরদিকে এলিট ফোর্স হিসেবে স্বীকৃত র‌্যাব এর ভুল টার্গেটে বলী হচ্ছে বাপ্পীরা। এলিট ফোর্স র‌্যাব এর কিছু বিপথগামী সদস্যকে ভাড়াটে খুনির ভুমিকায় অবতীর্ন হতে আমরা দেখেছি। উদাহরণ স্বরূপ নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার এর কথা বলা যেতে পারে। পুলিশের ডিডেক্টিভ ব্র্যাঞ্চ এর কিছু অসাধু সদস্যকে আমরা অপহরণ এর মত নোংরা কর্মে লিপ্ত হতে দেখেছি। বিজয়ের ছিচল্লিশ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে এসেও পুলিশি হেফাজতের নামে নিরিহ মানুষকে জিম্মি করে কতিপয় বিপদগামী পুলিশ সদস্য কর্তৃক চলছে ঘুষ বাণিজ্য। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ধাবা থেকে বেরিয়ে এসে নিজ নিজ দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষে ব্রিটেন ও ভারতের মত দেশ যখন ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করছে। ঠিক তখনই আমাদের মত উন্নয়ণশীল দেশে এম.পি. মন্ত্রীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সেই সাথে চলছে এম.পি. ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের জন্য বিলাস বহুল গাড়ি আমদানীর মহড়া। অপর দিকে এনজিও’র খোলসে কতিপয় সুদী কারবারীদের সুদের বোঝা পরিশোধ করতে গিয়ে সল্প আয়ের মানুষগুলো শেষ সম্বর ভিটে মাটি বিক্রি করে ভাসমান জনতায় পরিণত হচ্ছে। কেউ কেউ সুদের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

পক্ষান্তরে আমাদের অর্জনও নেহায়েত কম নয়। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মত বিশাল সম্মান আমাদের ঝুলিতে জমা হয়েছে। আমাদের ছেলেরা জ্ঞান বিজ্ঞানে অবদান রাখার জন্য বিশ্বের দরবারে প্রশংসিত হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মূলধারার রাজনীতিতে আমাদের সন্তানরা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রেখে চলেছে। বিশ্ব ক্রিকেটে শক্তিধর অবদান রাখার ফলে বাংলাদেশে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট এর আসর। অমর একুশে বিশ্বের বুকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এর স্বীকৃতি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। যুদ্ধাপরাধীর বিচারও হয়েছে বাংলার মাটিতে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অবদানের জন্য বিশ্ব আমাদের ঝুলিতে গুজে দিয়েছে বিশেষ স্বীকৃতি। বিজয়ের ৪৬ বছর পর আমাদের আর নতুন করে কোন অঙ্গীকার করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। যে আদর্শ ও চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ বিজয় অর্জন করেছে সেই আদর্শকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই আমরা দেখতে পাবো আমাদের স্বপ্নের সেই সোনার বাংলা। প্রতি বছর বিজয় দিবস আমাদের কর্ণকুহরে যে পরিবর্তন ঘটায় বাস্তব জীবনে তা থেকে আমরা আর বিচ্যুত না হই। আমরা যেন বিজয়ের চেতনাকে মশাল করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য চেষ্টায় মেতে উঠি। আসুন আমরা সেই আশায় বুক বেধে সফলতার জন্যে অপেক্ষা করি। আসুন আমরা বাঙালী জাতির বিজয়ের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে একতাবদ্ধ হই। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান স্বাধীনতার খোলসে মোড়ানো স্বেচ্ছাচারীতার ভূতটাকে দূর করি। কারণ প্রকৃত স্বাধীনতা ছাড়া কোন জাতি গৌরবের আসনে উন্নীত হতে পারেনা। আমরা চাই বাঙালী জাতির মানবিক বিজয়। আর এই বিজয় প্রতিষ্ঠার জন্য যে সততা ও জবাব দিহিতার প্রয়োজন তা আমরা পাচ্ছি কোথায়! বিগত সব সরকারের আমলেই রাঘব বোয়ালদের আমরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকতে দেখেছি। সেই সব রাঘব বোয়ালদের মদদপূষ্ট পুটি টেংরাদের ধরতেই কেবল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর থাকতে দেখেছি। ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার খবরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন- “আমরা এখনও আইনের সু-শাসন দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি।” তবে কি সেই গোয়ালার মতো আমরাও ঘুমিয়ে পড়েছি! যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আজ বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে- ‘আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে?’

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
প্রধান নির্বাহী, বিশ্বসাহিত্য একাডেমি।
ই-মেইল :eliasshagar@gmail.com

মানবাধিকার
                                  

 

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষনা দেয়া হয় জাতিসংঘের সাধারন পরিষদ কর্তৃক। অনেকের মতে, এই দলিলটি হলো বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন (দঞযব ংরহমষব সড়ংঃ রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ড়ভ ঃযব ঃবিহঃরবঃয পবহঃঁৎু’), কেননা এতে রয়েছে বিশ্বময় সাধারন মানুষের অধিকার সংক্রান্ত কিছু সর্বজনীন দাবি। তা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর স্বীকৃত ও হয়েছে। কিন্তু বিগত ছয় দশকেও সেই ঘোষনায় বিধৃত দাবিগুলি বাস্তবে রূপলাভ করেনি। বিশ্বময় মানবাধিকার অত্যন্ত নির্মমভাবে দলিত মথিত হয়ে চলেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে পশ্চাত্যের উন্নত গনতান্ত্রিক দেশসূহ উচ্চবাচ্য করলেও নিজেরা নিজ নিজ দেশে, এমন কী নিজ স্বার্থে অন্যান্য দেশে এই অধিকার লঙ্ঘন করতে বিন্দুমাত্র কার্পন্য করছে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্ব ১৯৪৮ সালের পূর্বে যেমন বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যিক ছিল এখনও প্রায় তেমনই রয়েছে।

মানবাধিকার পর্যালোচনার সময় প্রায় আমরা নাগরিক অধিকার (ঈরারষ ষরনবৎঃু) সম্পর্কে মনোযোগী বেশি হই। সাধারনভাবে মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করেই কিন্তু আমাদের অগ্রসর হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর কারন দুটি। এক, নাগরিক অধিকার মঞ্জুর করা হয় উপর থেকে, রাষ্ট্র কর্তৃক। এসব অধিকার রাষ্ট্র এবং নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত হয় এবং কিছু শর্ত সাপেক্ষে, কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নাগরিকদের উপভোগ করতে হয়, বিশেষ করে সংবিধানের কাঠামোয়। দুই, তাই নাগরিক অধিকার স্থান, কাল, পাত্র ভেদে বিভিন্ন হতে পারে। কিন্তু মানবাধিকার উপভোগের সুযোগ আসে বিশ্বজননী নৈতিক বোধ থেকে, মানবের শ্রেষ্ঠতম গুণ ইনসাফবোধ থেকে, যে নৈতিক সচেতনতায় স্বীকৃত হয় প্রতেক ব্যক্তির জীবন সত্তার সাম্য এবং যা সকল সমায়ে, সর্বত্র, সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। নীতিগতভাবে তাই এই অধিকার কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। এই জন্যেই মানবাধিকারকে চিহ্নিত করা হয় মানুষের জন্মগত অধিকার রুপে।

মানবাধিকারের তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেøখযোগ্য : এক, মানবাধিকার সর্বজনীন এই অর্থে যে, ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্তা, নারী-পুরুষ, বয়স বা রাজনৈতিক বিশ্বাস অথবা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্যে এই অধিকার। দুই এই অধিকার অপরিবর্তনীয় (ওহপড়হঃৎড়াবৎঃরনষব) সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ (অনংঁষধঃব) এবং সহযাত বা অন্তর্জাত (ওহহধঃব)। এই অধিকার কোন রাষ্ট্র বা কোন কর্তৃপক্ষ থেকে প্রদত্ত নয় এবং কোন রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ এই অধিকার কেড়ে নিতেও পারে না। এমন কী, কোনরুপ দায়িত্বের বন্ধনেও তা আবদ্ধ নয়। তিন, মানবাধিকার হলো আত্মগত বা আত্মনিষ্ঠ (ঝঁনলবপঃরাব) এই অর্থে যে, এই অধিকার তার ব্যক্তিত্বের সম্পত্তি। যেহেতু ব্যক্তির রয়েছে বিচারবুদ্ধি (জধঃরড়হধষরঃু) এবং স্ব-শাসনের ক্ষমতা তাই এই অধিকার তার সহজাত।

যদিও সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে ১৯৪৮ সালে, অধিকারের দাবি কিন্তু মানব জাতির ইতিহাসের মতই প্রাচীন। যে কেউ মানবাধিকার সম্পর্কিত ভাবনা-চিন্তার পরিচয় পেতে পারেন গ্রীক লেখক সফোকিøস (ঝড়ঢ়যড়পষবং), প্লেøটো (চষধঃড়), এরিস্টটলের (অৎরংঃড়ঃষব) লেখায়। পেতে পারেন আইন বিশেষজ্ঞ সিসেরো এবং সেনেকার লেখায়।‘‘বিশ্বের নাগরিকের (পরঃরুবহংযরঢ় ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ) ধারণারও তারা তাদের লেখায় পেতে পারেন। থমাস হবস (ঞযড়সধং ঐড়ননবং) জন লক (ঔড়যহ খড়পশব), রুশো (জড়ঁংংবধঁ) হেগেল, কান্ট, মার্ক্স (ক. গধৎী), ম্যাক্সওয়েবার প্রমুখ দার্শনিকরা মানুষের অধিকার সংরক্ষণ সম্পর্কে উচ্চকন্ঠ ছিলেন। আঠার শতকের আলোকিত যুগ (ঊহষরমযঃবহসবহঃ অমব) মানবাধিকার সংরক্ষন ক্ষেত্রে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। শুধু তাই নয়, গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঐতিহাসিক আন্দোলন এবং শান্তিপূর্ন পৃথিবীর স্বপ্ন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত গণঅধিকার সংরক্ষন এবং অধিকারের গ্যারান্টি নিশ্চিত করার পদক্ষেপের সাথে। জনগনের অধিকারই যদি সংরক্ষিত না হলো তবে কিসের গনতন্ত্র? গনতন্ত্র হলো দ্বন্ধ ও সংঘাতের শান্তিপূর্ন সমাধানের প্রকৃষ্ট পন্থা। অন্য কথায়, গনতন্ত্র হলো নাগরিকদের সমাজ ব্যবস্থা এবং নাগরিকদেও সমাজ ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত না হলে সে ব্যবস্থা গনতন্ত্রই নয়।

কীভাবে মানবাধিকার সংরক্ষন করা সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। কারো মতে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এবং সাধারন মানুষ আইন মেনে চললে তারা নিজ নিজ অধিকার সংরক্ষন করতে পারেন। কেউ বা বলেন, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এবং প্রশাসকগনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে অধিকার লঙ্ঘনের কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে। আবার অনেকের মতে জনগন তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে এবং অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তীব্রভাবে প্রতিবাদী হলে অধিকার ক্ষুণœ হবার ঘটনা হ্রাস পেতে থাকে। কারো মতে আইনের শাসনের সাথে বিচার বিভাগ যদি তৎঃপর হয়ে ওঠে তাহলেও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কমে যাবে। কেউ কেউ আবার বলেন, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম এবং সচেতন সুশীল সমাজ এক্ষেত্রে মণিকাঞ্চন স্বরূপ। আমার ধারনা কিন্তু ভিন্নরূপ। আমি মনে করি, স্বশাসন ও সুশাসনের চমৎকার সমন্বয়ই গনঅধিকার নিশ্চিত করার স্বর্ণালী পন্থা। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা এক্ষেত্রে অপরিহার্য। জনগনের নির্বাচিত সরকার স্বচ্ছভাবে নীতি প্রনয়ন করবেন। দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং দল-নিরপেক্ষ প্রশাসকরা সেই নীতি বাস্তবায়ন করবেন এবং তাদের নীতি ও কাজের জন্য জনগনের নিকট সম্পূর্ন ভাবে দায়ী থাকবেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন ভঙ্গকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন দল-নিরপেক্ষভাবে এবং স্বাধীন বিচার বিভাগের কর্মকর্তাগন নিজেদের বিবেক পরিচ্ছন্ন রেখে বিচার করবেন। তাহলেই তো হয়। একজনের অধিকার রক্ষার জন্যে প্রয়োজন হলে তারা অন্য কয়েকজনের শাস্তি বিধানে কার্পন্য করবেন না।
সার্বজনীন অধিকারের ঘোষনা দান জাতিসংঘের অতীব গুরুত্বপূর্ন অবদান। জাতিসংঘের অনেক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মানবাধিকার সংরক্ষনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অবদান নেহাত অপ্রতুল নয়। মানবাধিকার কমিশন গঠন, শরনার্থীদের অধিকার সংরক্ষনের লক্ষে হাইকমিশন গঠন, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষন কমিটি গঠন, ১৯৬৬ সালের চুক্তি মনিটর প্রভৃতি এক্ষেত্রে উল্লেøখযোগ্য। তবে জাতিসংঘ হলো স্বাধীন সার্বভৌম সদস্য রাষ্ট্রসমূহের তৎপরতার উপরই জাতিসংঘের কৃতিত্বের অনেকটাই নির্ভরশীল। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের অধিকাংশ গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ। কোন কোন ক্ষেত্রে এসব নব্য গনতান্ত্রিক দেশের শাসক-প্রশাসকরা ভীষন ক্ষমতাশ্রীয়। নির্বাচিত হলেই তারা নিজেদের গনতান্ত্রিক সরকার বলে বাগাড়ম্বর করেন। গনতন্ত্রে নির্বাচন অপরিহার্য বটে, কিন্তু নির্বাচন শুধু ঐ জনপদকে গনতন্ত্রের মহাসরকে টেনে তোলে। গনতন্ত্রকে জনগনের নিকট অর্থপূর্ন করতে হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দল-নিরপেক্ষ দক্ষ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা, দল-নিরপেক্ষ জনকল্যাণকামী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সীমিতভাবে ক্ষমাত প্রয়োগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন বিশেষ করে কার্যকারী মানবাধিকার কামিশন এবং সু-শাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমে গণতন্ত্রের জন্যে অপরিহার্য। এসব দেশে এমন ব্যবস্থা অনুপস্থিত বলে নব্য গনতন্ত্র রূপান্তরিত হয়েছে ওষষরনবৎধষ ফবসড়পৎধপু ব্যবস্থায় যেখানে মানবাধিকার সংরক্ষিত হবার কোন সম্ভবনা নেই। বাংলাদেশে মানবাধিকার রয়েছে এক করুন অবস্থায়। দেশে যখন কিছ’ ব্যক্তি আইনের ঊর্ধে উঠে যায় তখনই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটে থাকে। অন্য কথায়, দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা যখন ঐসব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয় অথবা তাদের বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখনই এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, সিয়েরালিওন প্রভৃতি দেশে এভাবেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ঐগুলি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত হয়। বর্তমানে এমনি বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডের জন্যে পাকিস্তান, ইয়েমেন, সুদান, কসোভো, সার্বিয়া, জর্জিয়া প্রায়-ব্যর্থ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে সাবধান হতে হবে আগে থেকেই। সরকারের প্রিয়ভাজনদেও বিচার হবে না, যেহেতু তারা “আমাদের লোক” এমন অবস্থা কাঙ্খিত নয়। এই প্রেক্ষাপটে দেশে গনতন্ত্রেও স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই। দেশের পত্যেকটি প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের অভিশাপে অভিশপ্ত। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন আকাশছোঁয়া। ক্ষমতাশ্রয়ের মাত্রা উচ্চতম শিখর স্পর্শী। দায়িত্বহীনতা চরম। এই অবস্থায় মানবাধিকার সংরক্ষনের কথা শুধু কথার কথা। তবে এসব কথা উচ্চারিত হোক সর্বত্র। দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত। দেশের সাধারন মানুষ এসব কিছু জানুক এবং প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠুক। জনগনই পারেন অন্ধকার এই অচলায়তনে অধিকারের আলো জ্বালাতে। তারাই পারেন মানবাধিকারের আলোয় চারদিককে ঝলমল করে তুলতে।

লেখক : সাবেক উপাচাযর্, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রধানমন্ত্রী ও রোহিঙ্গানীতি এবং দেশের সংখ্যালঘু ইস্যু
                                  

রোহিঙ্গা কারা? বার্মার এই জনগোষ্ঠীর কোনও দেশ নেই। তারা সেখানকার বৃহৎ জনগোষ্ঠী, তারা আক্রান্ত ও অপমানিত। নিজের দেশ থেকে তারা পালাতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা অভিমুখে। ’শান্তির দেশ’ বার্মাতে নির্বিচারে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। বার্মা সরকারের কার্যত প্রধান সু কি, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত। মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তিনি সারা বিশ্বের সামনে থেকেছেন। সবার মর্যাদা পেয়েছেন। পারিবারিক ঐতিহ্যেও তিনি সম্মানিত। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট প্রশ্নে তিনি কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেননি। রাখাইন বার্মার একটি রাজ্য।

এখানেই বেশি রোহিঙ্গাদের বসবাস। একসময় স্বাধীন-স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল। এই রাজ্য বা প্রদেশকে আরাকানও বলা হয়। বার্মার সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা রাখাইনের কোনও ঐতিহ্যবাহী নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। তারা বহিরাগত এবং ব্রিটিশ আমলে রাখাইনে বসতি গড়ে তুলেছে। অনেক ইতিহাসবিদ এটাকেই জোর প্রচার করেন। কিন্তু ঘটনা পুরো উল্টো। আরাকানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এই এলাকায় প্রথম ইসলাম ধর্মের আর্বির্ভাব ঘটে অষ্টম-নবম শতাব্দীতে। তখন এখানে শাসন কাজ চালাতেন চন্দ্রবংশীয় হিন্দু রাজারা। রাজধানী ছিল উজালি। বাংলা সাহিত্যে যা বৈশালী নামে পরিচিত।

রোহিঙ্গা কারা এবং এই শব্দের উৎপত্তি কিভাবে? এই নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক আছে। কিন্তু মোটামুটি একটি সাধারণ বিষয় তার মধ্য থেকে প্রকাশ পেয়েছে তা হলো, আরবীয় মুসলমনেরা সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এই এলাকার তীরে ভিড়লে ’রহম’ ’রহম’ শব্দ উচ্চারণ করে স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। ’রহম’ শব্দের অর্থ ’দয়া করা’। স্থানীয় মানুষেরা মনে করতেন এরা ‘রহম’ জাতির লোক।

রহম শব্দটি বিকৃত হয়ে রোয়াং এবং রোয়াং থেকে রোহাংগ, রোসাঙ্গ ও রোহিঙ্গা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। এরা প্রকৃত অর্থে ধর্মে মুসলমান।

সাম্প্রতিককালে এই রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চরমে উঠেছে। কিন্তু সমস্যা বহু বছরের পুরনো। বৌদ্ধ রাজা বাইন-নুঙ্গের (১৫৫০-১৫৮৯) মুসলমানদের হালাল মাংস খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, কোরবানি করতে বাধা দেয়, জোর করে ধর্মান্তর ঘটায়। ১৯৯২ সালে সামরিক সরকার প্রধান নে উইন সামরিক বাহিনী থেকে মুসলমানদের বের করে দেয়। বামিয়ানে বুদ্ধমুর্তি ধ্বংসের সময় নির্বিচারে মুসলমান হত্যা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে বার্মার জান্তা সরকারের আমল থেকে আক্রমণ আরও তীব্র হয়। কেমন হিংস্র আক্রমণ তার সামান্য একটা বর্ণনা দেই। রেঙ্গুন থেকে একটি বাস ফিরে যাচ্ছিল রাখাইনে। মাঝপথে বৌদ্ধরা সেটা থামায়। ৯জন মুসলমানকে বাস থেকে নামায়। তার মধ্যে তিনজন ধর্ম প্রচারের কাজে যাচ্ছিলেন। সবাইকে টুকরো টুকরো করে কেটে মৃতদেহের উপর মদ ও থুথ ছেটানো হয়। সারা বিশ্ব তখন এই ছবি দেখেছে।

বার্মায় বৌদ্ধদের রাখাইন বলা হয়। শান্তির বাণী তারা প্রচার করে। মানুষ তো বটেই, পশু হত্যাও ধর্মত তাদের নিষেধ। তারা কেন এত চিন্তার অগম্য।

আসলে ধর্মের আধিপত্য ও সম্প্রদায়গত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতার কাছে ’ধর্ম মানুষের জন্য’ একথা নিতান্তই আপ্তবাক্য। এই ছবি সবাই দেখেছেন, একদল রোহিঙ্গাকে তরবারি উচিয়ে তেড়ে নিয়ে যাচ্ছে ’শান্তিবাদী’ রাখাইনেরা আর বাংলাদেশ সীমান্তে বন্দুক তাদের দিকে তাক করে আছে। সমুদ্রে ভাসছে অসহায় মানুষদের নৌকা। তা ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জল, খাবার কিছু নেই। মা নিজের জিভ সন্তানের মুখে দিয়ে চুষতে বলছেন-তৃষ্ণা মেটাবার জন্য। একটু বয়স হওয়া মেয়েরা বাধ্য হয়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন নানা দেশের পতিতালয়ে। এমন অত্যাচারও করা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মের নামে।

কোথাও কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলা হলেই রোহিঙ্গাদের দিকে নজর পড়ছে। অভিযোগ উঠেছে পুলিশ ফাঁড়ি, সেনা ছাউনি আক্রমণের। অভিযোগ হয়তো অস্বীকার করার নয়, তবে আন্তর্জাতিক চক্র যে এতে মদত দিচ্ছে, সময় সুযোগমত তাতে ঘৃত ঢেলে দিচ্ছে, একথা কি অস্বীকার করা যাবে? যখন কোন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হয়, সন্ত্রাসী হওয়া ছাড়া আর কি উপায় থাকে তাদের।

অত্যাচারিতদের পক্ষে আত্মরক্ষা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সন্ত্রাসী হওয়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এজন্য সরকার সন্ত্রাসী অভিযোগ তুলে আক্রমণ করবে, নির্যাতনের নৃশংসতা বাড়িয়ে দেবে, তারা দেশের নাগরিক নয় ইত্যাদি অভিযোগ তুলে বিশ^বাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করবে এটাও স্বাভাবিক। তাই ইদানিং তাদের নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। প্রাণের ভয়ে নদী-নালা সাঁতরিয়ে, নৌকা করে দুর্গম বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে হাজারে হাজারে অসহায় রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে ঢুকছে।

বাংলাদেশ সরকারের ওপর এই অনাকাঙ্কিত বোঝা সেই ’৭৮ সাল থেকে। এবারের মতো এত বড় আকারে শরণার্থী আগে আসেনি। সরকারও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণে তেমন জোরালো উদ্যোগ নেয়নি। যারা এসেছিল তাদের অনেকেই দেশের মূল স্রোতের সাথে মিশে গেছে।

যারা শরণার্থী ক্যাম্পে ছিল তারা একসময় বিহারীদের মতো থেকে যাবে এমনটিই অনুমান করা যাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে বি জি বি এবং বার্মার সীমান্তরক্ষীদের মাঝে ফ্লাগ বৈঠক হয়েছে, এই যা। রোহিঙ্গারা ব্যবহৃত হয়েছে ড্রাগ ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের অপকর্মে।

এবার একসাথে এত বিরাট সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী আসায় সরকারের কিছটা টনক নড়েছে। এত বড় বোঝা বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

তথাপি অত্যাচারের নির্মমতায় মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার সহানুভূতি দেখিয়েছে। সেটা যত বাধ্য হয়েই হোক আপাতত মানবতাই তো বড় বিষয়। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে যত শীঘ্র সম্ভব বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত। এজন্য সরকার আক্রমণ নির্যাতনের তীব্রতা ও শরণার্থী অনুপ্রবেশের চিত্র বি বাসীর কাছে তুলে ধরেছেন।

ইতিমধ্যে তার প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জাতিসংঘ সহ প্রধান প্রধান অনেক দেশ এগিয়ে এসেছে। বার্মা সরকারের প্রতি তাদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বানও জানানো হয়েছে। শরণার্থীদের জন্য বিভিন দেশ সাহায্য নিয়েও এগিয়ে এসেছে।

এমনি সময় জাতিসংঘের বাৎসরিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ সপ্তাহে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক পৌছেছেন। বিশ্ব বাসীর কাছে রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে ধরা এবার তাঁর অন্যতম প্রধান বিষয় বলে জানা গেছে।

গতবছর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে সিরিয়ার শরণার্থীদের পাশে থাকার জন্য বিশ্ব বাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবিতে ভেসে আসা শরণার্থী শিশু আজলানের লাশের দৃশ্য দেখে বিশ^বাসীর ন্যায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মনও ভারাক্রান্ত হয়েছিল। এবার মানবতার দৃষ্টিকোন থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, একাত্তরে তিনি নিজেও শরণার্থী ছিলেন। শরণার্থী হওয়ার যন্ত্রণা তিনি উপলব্ধি করেন। তার এ মমত্ববোধ ও মানবিক আবেগে অবশ্যই আমরা গর্ববোধ করি।

আমরা চাই এবং আশা করি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আবেগ-উচ্ছ্বাস, মমত্ববোধ ও ন্যায়পরাছুতা এরূপ মাপকাঠির নিরিখেই পরিমাপিত হবে। কিন্তু কেন জানি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দু’চোখা দ্বৈত নীতি অবলম্বন করে চলেছেন। বিদ্বেষ ও বিমাতাসূলভ আচরণ দেখাচ্ছেন। বার্মা সরকারের অভিযোগ রোহিঙ্গারা সেদেশের নাগরিক নয়। তারা নাকি বাংলাদেশের নাগরিক।

ধরে নিলাম এই অভিযোগে তাদেরকে দেশছাড়া করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসীরা তো জন্মসূত্রে এদেশের নাগরিক। তারা কেন দেশছাড়া হবেন। শোনা যায় রোহিঙ্গারা মুসলিম বলে তাড়িয়ে দিতে তাদের ওপর বৌদ্ধদের এই অত্যাচার-আক্রমণ। তাহলে ধরে নেওয়া কি অন্যায় হবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসীরা মুসলিম নয় বলে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে?

বিষয়টি সত্য বলে বিশ^াস করতে চাইনা। কিন্তু যখন দেখি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের সমব্যথী হয়ে বিশ্ব বাসীর কাছে আবেদন জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য সমব্যথী হন, আজলানের লাশ দেখে ব্যথিত হন, তখন তারই দেশের সংখ্যালঘু আদিবাসী, পাহাড়ীরা আক্রান্ত হচ্ছে দেখে মনে সে প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া অযৌক্তিক মনে করি না।
যখন দেখি রোহিঙ্গাদের ন্যায় রাজশাহীর চিলিরবন্দর, পাবনার সাথিয়া, গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর, নোয়াখালির বেগমগঞ্জ, চট্টগ্রামের হাটহাজারি, রামু, লংগডু, ব্রাম্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং পাহাড়ীরা একই কায়দার আক্রমণের শিকার, তখন প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। দেশের সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং পাহাড়ীরা দেশত্যাগ করছে, তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এটা দেশের পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে।

স্বাধীনতার পর ৩৩ শতাংশ সংখ্যালঘু এখন ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। চট্টগ্রামে পাহাড়ী ও আদিবাসীরা ছিল ৯১ শতাংশ। সেখানে বাঙালি অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সে সংখ্যা এখন ৪৯ শতাংশ। আর কয়েক বছরে সেখানে বাঙালিদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বাঙালি অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশে।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে রোহিঙ্গা অত্যাচারের সমাধান চাইবেন, ভালো কথা। চাওয়া অবশ্যই যৌক্তিক এবং প্রয়োজন, এতে দ্বিমতের অবকাশ নেই। দেশের জনগণও এ বিষয়ে একমত সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে চরম মানবতা দেখিয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য মানবতা দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। বার্মা সরকারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে এক্ষেত্রে সমঝোতার সুযোগ নেই। যদি ব্যাপারটি তাই হয়, তবে বাংলাদেশের যেসব সংখ্যালঘু ভারতে শরণার্থী হয়েছেন তাদেরকে ফিরিয়ে আনার দাবিটিও নিশ্চয় যৌক্তিক। সাথে যদি রোহিঙ্গাদের সেদেশে থাকার নিশ্চয়তার দাবি তোলা হয়, একইভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের থাকার নিশ্চয়তা বিধানের দাবি তোলাও নিশ্চয় ন্যায়সঙ্গত।আরো যে কারণে যৌক্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত তাহলো, যদি তিনি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন তবে সকলের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সমান।

তবে একথাও ঠিক, গণতন্ত্রের গায়ে তিনি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের আলখেল্লা পরিয়ে রেখেছেন। সুতরাং তাকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা কিংবা নিরপেক্ষ বলি কিভাবে?

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সমস্যা জাতিসংঘে উত্থাপন করতে পারেন না। আপনি নিজের বিরুদ্ধে নিজে অভিযোগ দায়ের করতে পারেননা। অতএব, রোহিঙ্গা ইস্যুই আপনার মূল ইস্যু। এজন্য দুঃখ ও আক্ষেপ করে বলেই রেখেছেন, বিশে^র সব মুসলমান এক হলে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধান কোন বিষয়ই নয়।

অতএব মুসলমান রোহিঙ্গাদের ইস্যুতেই আপনাকে সোচ্চার হতে হবে। আমি কেবল আপনার একমুখী মানবতা ও আড়াল রাখা কর্তব্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিলাম মাত্র।

লেখক: কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

পরিবর্তিত জলবায়ু ও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা
                                  

ড. মুহা: শফিকুর রহমান

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারনে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কৃষি তথা সার্বিক জীবনযাত্রার উপরে। ভৌগলিক অবস্থান, জনসংখ্যার আধিক্য, আর্থসামাজিক অবস্থার কারনে জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বিপদাপন্ন দেশ হিসেবে পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি বিষয়, যা সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ডকে প্রভাবিত করতে পারে। পৃথিবী সৃষ্টির আদিকাল থেকে পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু। এর প্রভাব পড়েছে পরিবেশ ও মানুষের উপরেপরিবেশ, মানুষ ও জলবায়ু অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে আন্ত:সম্পর্কযুক্ত। আমাদের কৃষির সাথেও পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষিক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে পরিবর্তিত পরিবেশে বদলে যাচ্ছে এদেশের খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থা। কৃষিতে সূর্যের আলো, তাপমাত্রা, বাতাসের আদ্রতার মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তনের সাথে ফসলের ধরন, জাত, চাষ পদ্ধতি, উৎপাদনশীলতা নির্ধারিত হয়ে থাকে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমানে তারতম্য ঘটছে এবং এর প্রভাব পড়ছে ফসলের উৎপাদনশীলতার উপর। এ কারণে দেশে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। বাংলাদেশের কৃষি মূলত আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি নির্ভর হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মাত্রাও কৃষিখাতে সবচেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অসম বৃষ্টিপাত, বন্যা, ভুমিক্ষয়, জলবায়ু, শুষ্ক মৌসুমে অনাবৃষ্টি, উপকুলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, শীত মৌসুমে হঠাৎ শৈত্যপ্রবাহ, খরা, টর্নেডো, সাইক্লোন, জলোচ্ছাসের প্রভাবে প্রাদূর্ভাব ও মাত্রা বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও এ দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে ক্রমাগত বিপর্যস্ত করে যা মানব কল্যান ও জনগোষ্ঠির টেকসই জীবনযাত্রা এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিরূপ পরিস্থিতির সাথে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সামঞ্জস্য বিধান করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষিকে মুক্ত রাখা বা ঝুঁকি কমানো, দূর্যোগমুক্ত সময়ে শস্য বহুমূখীকরন পুষিয়ে নেয়া বিশেষ ভাবে বিবেচ্য। এ রকম পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও দূর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য উপাত্ত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উপযোগি কলাকৌশল ও সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট কারণ। প্রাকৃতিক কারনগুলোর মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রার হ্রাসবৃদ্ধি, মহাসাগরে উত্তাপ শক্তির পরিবর্তন, সুমদ্র স্রোতের পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির দূষন, লানিনো এবং এলনিনোর প্রভাব ইত্যাদি। মনুষ্য সৃষ্ট কারনগুলোর মধ্যে- শিল্প বিপ্লবের পর ঊনবিশংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে জীবাশ্ম জালানীর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া, বন উজাড়, জৈবিক পচন, কৃষিক্ষেত্রে সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারসহ বহুবিধ কারনে বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন প্রকার গ্যাস বিশেষ করে কাবন-ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, এবং গ্রীনহাউজ গ্যাসের পরিমান বেড়ে যাওয়ায় সূর্য থেকে আগত তাপ রশ্মিকে পুনরায় মহাকাশে প্রতিফলিত হওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি করে। ফলে পৃথিবী ক্রমাগত উষ্ণ হচ্ছে। আইপিসির (ওহঃবৎ মড়াবৎহসবহঃ ঢ়ধহবষ ড়হ পষরসধঃব পযধহমব) সমীক্ষা অনুযায়ী বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি। আইপিসির পঞ্চম সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্ব তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে ফসল উৎপাদন, পানির প্রাপত্যা, জীব বৈচিত্র, তাপ প্রবাহ, অতিবৃষ্টি, উপকূলীয়, জলোচ্ছাস ইত্যাদির উপর প্রভাব পড়েছে। ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা একবিংশ শতাব্দীর শেষে ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করবে ও বিশ্ব পানি চক্রে অসমতা পরিলক্ষিত হবে।

আশংকা করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১.০ ডিগ্রী, ২০৫০ সালে ১.৪ ডিগ্রী এবং ২১০০ সালে ২.৪ ডিগ্রী বেড়ে যেতে পারে। সম্প্রতি দেশে উষ্ণ ও শৈত্য প্রবাহের মাত্রা বেড়েছে। বাংলাদেশের ক্রমান্বয়ে শীতকালীন ব্যাপ্তি ও শীতের তীব্রতা দুই-ই কমে আসছে। বেশির ভাগ রবি ফসলেরই স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে ফসলের উপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এছাড়া শীত মৌসুমে উষ্ণ প্রবাহ দেখা দিলে বেশি সংবেদনশীল ফসল যেমন গমের ফলন খুব কমে যায় এবং উৎপাদন অলাভজনক হয়। শৈত্য প্রবাহের সাথে দীর্ঘ সময় কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে অনেক ফসল বিশেষ করে গমের পরাগায়ন ও গর্ভধারন (ফার্টিলাইজেশন) না হওয়ায় আংশিক বা সম্পূর্ণ ফসল চিটা হয়ে যায় এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। এছাড়া প্রজাতি বৈচিত্র কমতে পারে ও প্রজননে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

ধানের ফুল ফোঁটা বা পরাগায়নের সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা তার উপরে গেলে চিটার সংখ্যা বেড়ে যেয়ে শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে। যা ধানের ফলনকে কমিয়ে দেবে। ধানের প্রজনন পর্যায়ে বাতাসের গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে ধানগাছের অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ও অতিরিক্ত চিটা হয় ও ফলনের মারাত্বক প্রভাব পড়ে।

এ কথা অবশ্য স্বীকার্য যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বৈরী জলবায়ুর ( বন্যা, খরা, লবনাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অধিক তাপ সহিষ্ণু) সাথে খাপ খাওয়ানোর মতো উচ্চ ফলনশীল ফসলের নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন ও ব্যবহার এবং এগুলোর চাষাবাদ বাড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে। নতুন শষ্য পর্যায় ও অভিযোজন কৌশলের উপর ব্যাপক গবেষনা জোরদার করতে হবে।

অভিযোজন কৌশল ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে। লবন সহিষ্ণু, বন্যা সহিষ্ণু, খরা সহিষ্ণু, ঠান্ডা ও তাপ সহিষ্ণু, আলোক সংবেদনশীল ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করে ভবিষ্যত কৃষিকে টেকশই করার জন্য অগ্রাধিকার ভিক্তিতে কৃষিকে যান্ত্রিকিকরন করা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, দেশের প্রতিটি উপজেলায় জলবায়ু ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করে কৃষি, খাদ্য ও অবকাঠামোসহ সবগুলো বিষয় নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা, গবেষনার মাধ্যমে বৈরী জলবায়ুর সাথে অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তার স্বত:স্ফূর্ত বাস্তবায়ন ঘটানোর মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: পরিবেশ চিন্তক


একজন নোবেল বিজয়ী বনাম রাষ্ট্রহীন একজাতি এবং কিছু কথা
                                  

ইলিয়াস সাগর

ছোটবেলা থেকেই আমার পশু-পাখি পোষার শখ। আব্বা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। যার দরুন আমার ছেলেবেলার অধিকাংশ সময়ই কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আমার পৈত্রিক নিবাস গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানাধীন বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের তালুকদার বাড়ীতে কৈশোরে কিছুটা সময় কাটিয়েছি। তখন আমি দু’টো কুকুর পোষতে শুরু করেছিলাম। কুকুর দুটিই ছিল মাদি কুকুর। একটির রং ছিল সাদা ও আরেকটির রং ছিল কালো। সাদা কুকুরটির নাম রেখেছিলাম ‘ধবলী’ আর কালো কুকুরটির নাম রেখেছিলাম- ‘কাজলী’ কিছু দিনের মধ্যেই কাজলী ও ধবলী আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছিল। ওরা দিনের বেশীরভাগ সময়ই আমাদের ঘরের দরজার সিড়ির দুপাশে বসে থাকতো। আম্মা দরজা খোলা রেখে বাহিরে কাজ করার সময় ধবলী ও কাজলী কে বলতেন “দেখিস, কেউ যাতে ঘরে না আসে” ওরা আম্মা আসার আগ পর্যন্ত একটি মুরগীকেও ঘরে ঢুকতে দিতো না।

আমাদের বাড়ীতে থাকা অবস্থায় ধবলী বেশ ক’টি বাচ্চা প্রসব করলো। ধবলীর বাচ্চাগুলোকে কাজলী মায়ের মতো আগলে রাখতো। একবার আমাদের পাশের বাড়ীর একটি ছেলে একটি বাচ্চাকে ধরেছিলো, অমনি কাজলী সেই ছেলেকে ধাওয়া করে পুকুরে নিয়ে ফেলেছিল।

ধবলী ও কাজলী একসাথে থাকতে থাকতে ওদের মাঝে মমত্ববোধ গড়ে উঠেছিল। যা বর্তমানে মানুষের মাঝে দেখা যায় না। কুকুরদের কিন্তু গোত্র বা ধর্ম নেই। আর ওদেরকে ধর্মপরায়ণ ও মানবিক করার জন্যে পৃথিবীতে কোনকালেই কোন মহামানবের আগমন ঘটেনি। পক্ষান্তরে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষগুলো বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মে বিভক্ত। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন মহামানবের আগমন হয়েছে। আমার জানা মতে প্রতিটি ধর্মই ন্যায়ের কথা বলে, কোন ধর্মই অন্যায়কে সমর্থন করে না। যদিও বিশেষ কোন ধর্মকে নিয়ে আমার অতিমাত্রায় মাথাব্যথা কেনোকালেই ছিল না, এখনও নেই। প্রতিটি ধর্মের মূলমন্ত্রই মানবতা রক্ষা। আমি সাম্প্রদায়িকতার পূজারী নই। আমি বরাবরই অসাম্প্রদায়িক; মানবতার পক্ষে। তবুও যখন দেখি কোন নির্দিষ্ট দল বা গোত্র কোন নির্দিষ্ট গোত্র বা নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের উপর নির্বিচারে লুন্ঠন, হত্যা, ধর্ষণ চালিয়ে তদেরকে দেশছাড়া করছে তখন একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে আমি চুপ করে থাকতে পারি না। তাই আজ আমার এই লেখার অবতারনাÑ

সাম্প্রতিক বিশ্বে জাতিসংঘের বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের অর্থ হলো নৌকার মানুষ, যারা সমুদ্রজলে নৌকা ভাসিয়ে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ‘রোহিঙ্গা’ মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে বসবাসকারী এক মুসলমান জনগোষ্ঠীর নাম। মায়ানমারে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রতিনিয়ত মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা চালাচ্ছে এবং তাদের নেতৃত্বেই দেশ থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ণে চলছে- লুন্ঠন, ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগের মত ঘৃণিত কর্মযজ্ঞ। আর এই রোহিঙ্গা নির্যাতনের পৃষ্ঠপোষক এমন এক মহামানবী যিনি ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। এই মহামানবী ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার আনার পথে নিউইয়র্কবাসীর সামনে তার মুখ গহ্বর থেকে একটি অমূল্য বানী প্রসব করেছিলেন। বাণীটি হলোÑ ‘চূড়ান্তভাবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ বাস্তুচ্যুত, গৃহহীন ও আশাহীন মানুষ মুক্ত একটি পৃথিবী নির্মাণ। তা হবে এমন একটি পৃথিবী, সেখানে প্রতিটি মানুষ থাকবে স্বাধীন এবং তাতে থাকবে শান্তিতে বসবাসের পরিস্থিতি।` ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের পক্ষে(!) কাজ করার জন্য মহামানবী কে নোবেল কমিটি পুরষ্কারটি প্রদান করেন। ১৯৯১ সালে মায়ানমারের সামরিক সরকার কর্তৃক গৃহবন্দি থাকায় ২০১২ সালে তিনি পুরষ্কারটি গ্রহণ করেন।

প্রিয় পাঠক, সবচেয়ে মজার বিষয় কি জানেন ? শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এই মহামানবী আর কেউ নন। নৃশংসতার জন্য হিটলারের পর যার নামটি সাম্প্রতিক বিশ্বে সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে; যিনি রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের মূলহোতাÑ অং সান সু চি !

অং সান সু চি একজন বৌদ্ধ ধর্মালম্বী মানুষ। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক- গৌতম বুদ্ধ। বৌদ্ধ ধর্ম মতে ‘জীব হত্যা মহাপাপ’। তাই তারা নিরামিষ ভোজী। তারা আমিষ অর্থাৎ মাছ-মাংস খায় না। সেই ধর্মের অনুসারী হয়ে সে কিভাবে লুন্ঠন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘৃনিত নৃশংস কর্মযজ্ঞের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন তা কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে বোধগম্য নয়।
এই একবিংশ শতাব্দীতে কি পৃথিবীর আর কোথাও রোহিঙ্গাদের এমন কোন জনগোষ্ঠী আছে যারা অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে পারে না, আর হাসপাতালে গেলেও তাদের চিকিৎসা দেয়া হয় না। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না, তরুণ-তরুণীদের বিয়ে ও সন্তান ধারণে বাঁধা দেয়া হয়। শত শত বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাস করলেও তাদের নাগরিকত্ব নেই। এত অত্যাচার-নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করেও বর্তমানে প্রায় ৮ লক্ষাধীক রোহিঙ্গা মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে বসবাস করেছে। বিভিন্ন সময়ে অত্যাচারের মাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ ও ওআইসি মিয়ানমার সরকারকে এই সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানালেও মায়ানমার সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না।

প্রতিনীয়ত প্রাণ বাঁচাতে ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধরা ছোট ছোট নৌকায় করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোও তাদের গ্রহণ করতে চাচ্ছে না।

আরাকানের রোহিঙ্গারা সেখানে বসবাস করছেন কয়েক শতাব্দী ধরে। প্রচলিত ধারণায় রোহিঙ্গারা ষোলশ শতকের দিকে আরকানে (বর্তমান রাখাইন রাজ্য) আসা আরব বনিকদের বংশধর। আর মগরা রাখাইন রাজ্যের ভূমিপুত্র। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। পূর্ব ভারত হতে খৃস্টপূর্ব ১৫০০ এর দিকে অস্ট্রিক জাতির একটি শাখা ‘কুরুখ’ এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এরপর ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু (পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম), পাঠান, পার্সিয়ান, আরব, তুর্কি ও মোঘলরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর আবাসস্থল গড়ে তোলেন। বস্তুত এ সকল নৃগোষ্ঠী শঙ্করজাতই রোহিঙ্গা।

পক্ষান্তরে ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজ্য দখলদার কট্টর বৌদ্ধ বর্মী রাজা ‘আনাওহতা’ (অহধধিযঃধ) মগদের বার্মা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে আসেন। রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করে আরকানে বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করেন। সে হিসেবে রোহিঙ্গাদেরকেই আরাকানের প্রকৃত ভূমিপুত্র বলা যায়, আর মগদের অভিবাসী। পরবর্তীতে সম্রাট নারামেখলার (১৪৩০-১৪৩৪) বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ শাহের সহায়তায় আরকান পুনর্দখল করে এই অঞ্চলের নাম দেন রোসাং বা রোহাং। ধারণা করা হয়, এখান থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি। সেই থেকে আরকানে পাশাপাশি দু’টি ভিন্ন জাতির বসবাস। মোঙ্গোল বংশোদ্ভূত মগ আর পূর্ব-ভারতীয় রোহিঙ্গা। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ পর্যন্ত এখানকার প্রায় ২২ হাজার বর্গমাইলের একটা অঞ্চল রোসাংগ নাম নিয়ে স্বাধীন থাকে।

এ সময় ছোটখাট কিছু দুর্ঘটনা ঘটলেও মগ আর রোহিঙ্গারা মোটামুটি সহাবস্থানেই ছিল। এরপর আসে মহান ব্রিটিশ রাজ। যাদের কূটনামি হিন্দি সিরিয়ালের বউ শাশুরিদের কাজকারবারকেও হার মানায়। আঠার’শ সালের দিকে ব্রিটিশরা এমন একটা খেলা খেলে, যে খেলা পরবর্তীতে উপমহাদেশের মানচিত্রই পাল্টে যায়। খেলার নাম ঐতিহাসিক ‘ডিভাইড এন্ড রুল’। রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে তৎকালীন বার্মার ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীকে তালিকাভুক্ত করে ব্রিটিশরা খেলার বাশিটা বাজিয়ে দেয়। স্বভাবতই ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মুসলিম নিধনের এহেন বাম্পার সুযোগ চিনিতে ভুল করার কথা না, করেনি। রোহিঙ্গারা বহিরাগত আরকানে জোর করে বসতি স্থাপনকারী, মগরা এধরনের প্রোপাগান্ডা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এর চাইতে রোহিঙ্গাদের হত্যা করা, তাদের সম্পদ লুট করার গ্রহণযোগ্য কারণ আর কি হতে পারে। যার ফলে আরকানে ছড়িয়ে পড়ে জাতিগত বিদ্বেষের ভয়ঙ্কর দাবানল। যার সাময়িক অবসান ঘটে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বার্মা তথা বর্তমান মিয়ানমারের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে।

নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবীদদের মতে, বাংলার সঙ্গে আরাকানের রয়েছে হাজার বছরের দীর্ঘ সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক যোগসূত্র। আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসতি হাজার বছরের পুরনো। ঐতিহাসিক এন এম হাবিব উল্লøাহ রচিত ‘ রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস’ বইয়ে লেখা হয়েছে, ৭ম শতকে আরব বণিকদের মাধ্যমে আরাকানের সঙ্গে মুসলমানদের প্রথম পরিচয় ঘটে। আরাকানের চন্দ্রবংশীয় রাজবংশের সংরক্ষিত ইতিহাস ‘রদজাতুয়ে’ এ তথ্য উল্লেøখ রয়েছে। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ এ সম্পর্কের সূত্রপাত দেখিয়েছেন খলিফা হজরত ওমর বিন আব্দুল আজিজের সময়কালে। নানা ইতিহাসগ্রন্থের সাক্ষ্য মতে, ১৪০৬ সালে মিয়ানমার রাজা আরাকান আক্রমণ করলে রাজা নরমিখলা বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তিনি সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন। ১৪৩০ সালে গৌড়ের সহায়তায় আরাকান পুনরুদ্ধার করেন। ১৫৩০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০০ বছর গৌড়ের সুলতানকে কর দিতো আরাকান। ১৫৩০ সালের পর গৌড়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে আরাকান স্বাধীন হয় এবং ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ম্রাউক রাজবংশের অধীনে শাসিত হয়। দীর্ঘ এ সময় পর্যন্ত আরাকানের সব শাসক তাদের নামের সঙ্গে মুসলিম উপাধি ব্যবহার করতেন। গৌড়ের অনুকরণে তাদের মুদ্রার এক পিঠে আরবিতে কালিমা ও রাজার মুসলিম নাম ও তার ক্ষমতা আরোহণের সময় উল্লেøখ থাকতো। সরকারি ভাষা ছিল ফার্সি এবং সৈনিকদের প্রায় সবাই ছিল মুসলমান। পরে জেকুক শাহ’র আমলে পুর্তুগীজ নৌ-সেনাদের সহায়তায় মগদের নিয়ে গঠিত তাদের নৌবাহিনী পরবর্তীতে জলদস্যুতে পরিণত হয়। মগ জলদস্যুরা চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় নির্বিচার লুণ্ঠন আর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সময় অগণিত মুসলমান নর-নারী ধরে নিয়ে যায় আরাকানে এবং তাদের দাস হিসেবে বিক্রি করে। এভাবেও বিপুলসংখ্যক মুসলমানের আগমন ঘটে আরাকানে। ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা ভোদাপায়া দখল করে নেয়ার পর তাদের অধীনে শাসিত হয় আরাকান।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য আরাকান নামে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত প্রায় সব সময়ই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১৭৮৫ সালে বার্মা রাজ ভোদাপায়া আরাকানের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে রাষ্ট্রটি দখল করে নিজ রাজ্যভুক্ত করেন। তখন থেকে আরাকান বার্মার একটি প্রদেশ হিসেবেই আছে।

১৮২৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর সংঘটিত চুক্তিতে আরাকান, আসাম ও ত্রিপুরার ওপর থেকে দাবি প্রত্যাহার করে তৎকালীন বার্মা সরকার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা ভোদাপায়া আরাকান দখল করে নিয়ে এককালের স্বাধীন আরাকান রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটার পাশাপাশি বর্মী বাহিনীর অত্যাচারে রোহিঙ্গা হিন্দু-মুসলিম, রাখাইন নির্বিশেষে দলে দলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে প্রবেশ করে। বর্মী বাহিনীর হত্যা ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে ১৭৯৮ সালে আরাকানের তিন ভাগের এক ভাগ জনসংখ্যা আশ্রয় নেয় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। ১৯৪৮ সালে বার্মা বৃটিশ কর্তৃক স্বাধীনতা লাভ করার পর বিপুলসংখ্যক আরাকানি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আসে। বিশেষ করে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় দুটি জনগোষ্ঠী চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠী।

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। সমস্যা হল সামরিক শাষকদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে সবসময় শত্রু শত্রু খেলা খেলতে হয়। নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের জন্য জনগণের সামনে বাস্তব হোক আর কাল্পনিক একটা শত্রু দাড় করাতে হয়। নে উইনেরও একটা গ্রহণযোগ্য কিন্তু দুর্বল শত্রু দরকার ছিল, যাকে ইচ্ছা মত মারধর করা যাবে। কিন্তু তার পক্ষ নিয়ে বাঁধা দেওয়ার মত কেউ থাকবে না। নতুন করে শত্রু খোঁজার চাইতে নে উইন পুরানো দুর্বল প্রতিপক্ষ রোহিঙ্গাদের বেছে নিলেন। নানাভাবে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে দেয় তার নাসাকা বাহিনী! সাথে যোগ দেয় উগ্র ধর্মান্ধ কিছু মানুষ।

একাধিক ইতিহাসবীদের উপরোক্ত লেখাগুলো বিশ্লেষণ করে এটাই প্রতিয়মান হয়েছে যে শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে অনেক উত্থান পতনের পরও বংশানুক্রমিকভাবে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেই বসবাস করছে। ওরা মিয়ানমারেরই নাগরীক। বিভিন্ন সময়তারা বৌদ্ধদের কর্তৃক শোষণের শিকার হয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ে যেসব তথ্য সামনে এসেছে তাতে বোঝা যায়, সমস্যা অতি পুরনো ও অত্যন্ত জটিল। ৭০০-৮০০ বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন বা আরাকানে বসবাস করা সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করছে না। বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে সমস্যাটিকে ব্যবহার করে আসছে।

১৯৭৮ সালে দিনের বেলা রোহিঙ্গাদের উপর নেমে আসে নিকষ কালো অন্ধকার, সরকারি বাহিনী সামরিক অভিযান পরিচালনা করে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের উপর। নিপীড়নের দেয়ালে শেষ পেরেক ঠুকে ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে। যাকে মগের মুল্লøুক বলে আর কি। সেই থেকে রোহিঙ্গা আদ্যবধি রাষ্ট্রহীন জাতি। ঐতিহ্যগত ভাবে ভারতীয়দের সহ্য ক্ষমতা অসীম এবং কিছুটা স্বার্থপর যে কারণে তাদের শোষণ করা অন্যান্য অঞ্চল থেকে তুলনামূলক সহজ। রোহিঙ্গারাও এর বাইরে না। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে তাদের শিক্ষা, ভ্রমণ, বিয়ে, সন্তানগ্রহণের মত মৌলিক অধিকারের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও বাংলাদেশে প্রবেশ করা ছাড়া স্থানীয় রোহিঙ্গাদের দিক থেকে দৃশ্যমান কোনো প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি। এই সুযোগটি লুফে নিয়ে সামরিক সরকার নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। পূর্বে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেও ১৯৮২ সালের পর তারা এই পথ থেকে সরে আসে। যেকোনো ভাবে রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়া করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এক্ষেত্রে ধর্মীয় উস্কানির মাধ্যমে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া ছিল সামরিক জান্তা সরকারের তুরুপের তাস।

১৯৯১-৯২ সালে এসে সামরিক জান্তা সফল হয়। রোহিঙ্গাদের সাথে মগদের ভয়াবহ দাঙ্গা বেধে যায়। পেছন থেকে মগদের সাহায্য করে সেনাবাহিনী। দাঙ্গায় প্রায় ৮,০০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা এবং ২ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি এবারও রোহিঙ্গারা দৃশ্যমান প্রতিরোধ করতে ব্যার্থ। তাদের লক্ষ্যই যেন মগদের ঠেঙ্গানি খেয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ। ২০১০ সালে অং সান সু চি বন্দিত্ব দশা থেকে মুক্তি পান। রোহিঙ্গারা নতুন আশায় বুক বাধে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেত্রী নিশ্চয় তাদের জন্য শান্তি বয়ে আনবেন। কিন্তু বোকা রোহিঙ্গারা জানে না নেত্রীর লক্ষ্য শান্তি কায়েম না, ক্ষমতার হিস্যা হওয়া। ২০১২ সালের নির্বাচনে তিনি সেটা পেয়েও যান। এরপর রোহিঙ্গারা বাঁচল না মরল তা নিয়ে উনার ভাবার অবকাশ কোথায়! নিউইয়র্ক, নরওয়ে স্টোকহোমে বক্তৃতা দিলে অনেক হাততালি জোটে। খামোখা রোহিঙ্গা নিয়ে কথা বলে মোড়ল দেশগুলোর বিরাগভাজন হতে যাবেন কেন? আশাহত রোহিঙ্গাদের সামনে সশস্ত্র আন্দোলন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

২০১২ সালের জুলাইয়ে সু চি যখন নিউইয়র্কবাসিকে বাস্তুহীন মানুষের জন্য কাল্পনিক পৃথিবী গড়ার ফাকাবুলি আওড়াচ্ছিলেন, তখন তার জাত ভাইয়েরা আরও বেশি মানুষকে বাস্তুহীন করার জন্য প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছিল। এবার অবশ্য বর্মীরা রোহিঙ্গা নিধনে খুব বেশি সফল হতে পারেনি।

অবশ্য বাস্তুহীন করার ক্ষেত্রে এবারো তারা সফল, আনুমানিক ২২ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে ঘরছাড়া হয়। বার্মার গণতান্ত্রীক সরকার! বুঝতে পারে শান্তিপূর্ণভাবে আর রোহিঙ্গা নিধন সম্ভব না। দীর্ঘদিন মার খেতে খেতে এরা প্রতিরোধ শিখে গেছে। তাই রাখঢাক ছেড়ে ২০১৫ থেকে আবারো সামরিক অভিযান শুরু করে। আইওয়াশ হিসেবে বিশ্ববাসীকে দেখায় আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা সংক্ষেপে আরসার সৃষ্টিকে যা আরকানের অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী বলে দাবি করা হয়। ২০১৫ থেকে দফায় দফায় নানা ছুতোয় সেনাবাহীনি রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন জারি রাখে। কখনো উসিলা দেখায় নিরাপত্তা চৌকিতে আক্রমন, আবার কখনোবা বর্মী নারী ধর্ষণ। আমরাও নাসাকা বাহিনীর প্রোপাপান্ডা গিলে বলছি রোহিঙ্গারা জন্মগতভাবে অপরাধী। অথচ একবারও ভেবে দেখিনি নাসাকা বাহীনির কথা! যদি সত্যিও হয় তবু একজন মানুষের অপরাধে তারা কিভাবে একটা নৃগোষ্ঠীকে বাস্তুহীন করার অধিকার পায়? কোনো বেসামরিক মানুষকে হামলা না করে সামরিক চৌকিতে হামলা করার পরও আরসাকে আমরা জঙ্গি বলছি।

রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কিছুই নেই। আছে ফোর্স লেভার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। টেকনাফ ও উখিয়ার পথে পথে মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষদের জানা গেছে- রাষ্ট্রীয় কাজে বিনে পারিশ্রমিকে রোহিঙ্গাদের শ্রম দিতে বাধ্য হওয়ার এমন অনেক গল্প। তবু তারা নিজ দেশেই থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক সরকার যে উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা শুরু করেছিল, তা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

বৃটিশ আমলসহ বিভিন্ন সময়ে এসব অঞ্চল একই প্রশাসনের অধীনে থাকায় নানা সময়ে নানা জনগোষ্ঠীর মানুষ মিয়ানমারে যেমন গেছে, তেমনি এসেছে বাংলায়। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে বঙ্গ এবং চট্টগ্রাম থেকে যেমন মানুষ আরাকানে গেছে তেমনি আরাকানসহ মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দলে দলে রাখাইন, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর লোকজন এসেছে বাংলাদেশে। বর্তমানে তারা চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করছেন। ইতিহাসবিদরা বলছেন, মিয়ানমারের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর নাম। মাত্র দুই দশক আগেও বার্মার মূলধারার রাজনীতি এবং নির্বাচনে ছিল তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি। কিন্তু দেশটির সামরিক জান্তা দেশ, রাজধানী, আরাকান, আকিয়াবের নামের মতোই পাল্টে দিয়েছে অনেক কিছুই। সুপরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলতে চাইছে একটি জাতিগোষ্ঠীর চিহ্ন।

আজকে রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে এসেছে, এক সময় চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের রাখাইনরাও কিন্তু সেখান থেকে শরণার্থী হিসেবেই এদেশে এসেছিল। স্বার্থ ও রাজনীতির কারণে এখন যুক্তি ও মানবতা মার খাচ্ছে।

সু চি দেশে-বিদেশে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছে । বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে মেনে নেয়নি সু চি’র সে অযৌক্তিক দাবি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে একাধিকবার।

রাশিয়া, চীন ও ভারত মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। অনেক সরকার ও কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ মানবিক বিপর্যয় দেখে সেদিক থেকে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে থেকে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ বাংলাদেশের ভূমিকার খুব প্রশংসা করছে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কথার ওপর আস্থা রাখা যায় না। আর জাতিসংঘে তো শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোরই সংঘ।

রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সিভিল সোসাইটি সেভাবে উপলব্ধি করছে বলে মনে হয় না। তাদের বক্তব্যেও পারস্পরিক ভিন্নতা ফুটে ওঠে। এনজিও মহল তাদের অবস্থানে থেকে কথা বলছে এবং কাজ করছে। এই বহুত্ববাদী বাস্তবতায় বাংলাদেশের জাতীয় অনৈক্য প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুত্ববাদ দারুণ জাতীয় অনৈক্যের পরিচয়কে প্রকটিত করছে। এর ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে দুর্যোগের মুহূর্তে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে ঐক্যহীন ও দুর্বল প্রমাণ করছে। আমরা চাই, বহুত্ববাদ নয়, বহুত্বমূলক সংহতি; আমরা চাই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। বহুত্ব ও বৈচিত্র্যকে যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে ঐক্য। এনজিও ও সিএসও মহল থেকে প্রচারিত বহুত্ববাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জনজীবনের জন্য সমূহ বিপদের কারণ হচ্ছে। আমি তবুও মানবিকতার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের সমস্যা উত্তরণের পক্ষে
রোহিঙ্গাদের ওপর এহেন ভয়াবহ নির্যাতনের পরও বিশ্ববিবেক যেন বধির। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এতোদিন কোন কার্যকর পদক্ষেপ না নিলেও এখন কিছুটা নড়েচরে বসতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব এক বিবৃতিতে বলেছেন- মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের যে তথ্য পাওয়া গেছে তা রক্ত হিম হওার মতো। নোবেল কমিটি অং সান সু চি’র নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করেছে। কানাডা সু চি’র নাগরিকত্ব বাতিল করে তাকে জাবতজীবন কারাদ-ে দন্ডিত করেছে। বিভিন্ন শক্তিধর দেশগুলো সু চি’র উপর চাপ প্রেয়োগ করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইতোমদ্ধেই বহির্বিশ্বে জনমত তৈরী করতে শুরু করেছে। বিশ্বেও বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বিশ্বসাহিত্য একাডেমি, বাংলাদেশ চলচিত্র পরিবার, বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, মানবাধিকার খবরসহ অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনগুলো মায়ানমাওে রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবাদে সোচ্চার রয়েছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চাপের ফলে অং সান সু চি কে ভোল পাল্টাতে দেখা যাচ্ছে। সু চি তার এক ভাষনে রোহিঙ্গাদেও ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিন্তু পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক চাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য এটা সু চি’র একটা নয়া কৌশল। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে সমস্যার সাময়িক সমাধান হতে পারে। তাছাড়া মিয়ানমারকে প্রভাবমুক্ত করে রাখাইনকে আবার স্বাধীন আরাকানে পরিণত করতে পারলেই শুধু এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তা না হলে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বাঁচানো সম্ভব নয়। জাতিসংঘ, ওআইসি, মুসলিম বিশ্ব ও বিশ্বের সকল মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হলে এবং এ ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলেই নির্যাতনের অবসান সম্ভব।

আজ কয়েক যুগ পরে ‘ধবলী’ ও ‘কাজলী’কে আমার বড্ড বেশী মনে পরছে। ওদের মধ্যে যে মমত্ববোধ আমি দেখেছি তা সত্যিই দৃষ্টান্ত স্থাপনের দাবীদার। ওরা কুকুর হয়েও একে অপরের বাচ্চাকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে। যা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রানী মানুষের মাঝে তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না। আর মিয়ানমারের বৌদ্ধদের মধ্যেতো নয়ই। কিছুদিন একসাথে থাকার ফলে ‘ধবলী’ ও ‘কাজল’র মধ্যে যে মমত্ববোধ গড়ে উঠেছিল তার কিয়দাংশ যদি মায়ানমারের বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের মাঝে গড়ে উঠতো তবে ‘রোহিঙ্গা মুসলমানরা’ বিশ্বেও সবচেয়ে নির্যাতিতো জাতি হিসেবে গন্য হতো না। এখন একটি কথাই জানতে ইচ্ছে করছে- শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি’র চেয়ে কি আমার ‘কাজলী’ই উত্তম ছিল ?

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
প্রধান নির্বাহী, বিশ্বসাহিত্য একাডেমি।

ই-মেইল : eliasshagar@gmail.com        

বাংলাদেশে ধর্ষণপ্রবণতা ও প্রতিকার ড. খুরশিদ আলম
                                  

মহান সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষের জন্য বিনামূল্যে অক্সিজেন বা নির্মল বায়ু সেবনের ব্যবস্থা রেখেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ এ জন্মগত মৌলিক অধিকার ভোগ করে। আমরা বায়ুপ্রাপ্তির উৎস নিয়ে মোটেও চিন্তা করি না। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্রমাগত কার্বন নির্গমনের ফলে ভূমণ্ডলের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক বাড়ছে। দূষিত হয়ে উঠছে আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ বায়ু। প্রতি বছর জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়ে আলোচনা করছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। লক্ষ্য একটাইÑ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী রাখা। কিন্তু ধনী দেশগুলোর আগ্রাসী মনোভাবের জন্য কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও আশার বাণী হচ্ছে, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ১৭৫টি দেশ তাপমাত্রা ও দূষণ কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে রাজি হয়েছে।
ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমগ্র বিশ্ব কয়লাকে নোংরা জ্বালানি আখ্যায়িত করে এটা বর্জন করছে বা কয়লাপ্রযুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দূষণ থেকে বাঁচার জন্য বেলজিয়াম ৩০ মার্চ ২০১৬ তাদের শেষ কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করে কয়লাকে বিদায় দিয়েছে। ফ্রান্স ২০২৩, ইংল্যান্ড ২০২৫ ও নেদারল্যান্ড ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সব কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ভারত ২০১৬ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার চারটি প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে। (সূত্র ঃ অস্ট্রেলিয়ার রিনিউ ইকোনমি অনলাইন পত্রিকা, ৬ অক্টোবর ২০১৬)। চীনের ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনআইএ) ১৪ জানুয়ারি ২০১৭ কয়লাভিত্তিক ১০৩টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের আদেশ জারি করেছে। ১১টি প্রদেশে অবস্থিত এ প্রকল্পগুলো ১০০ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। কয়লার পরিবর্তে ২০২০ সালের মধ্যে ১৩০ গিগাওয়াটে উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। (সূত্র ঃ প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি ২০১৭)।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। ভারতের দিল্লি রয়েছে সবার শীর্ষে। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। এই দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে ২০১৫ সালে ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। (সূত্র ঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানচেটে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। বায়ুদূষণের প্রভাবে এসব শহরে প্রতি মিনিটে দুইজন মানুষ মারা যায়। দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান, ১০ মার্চ ২০১৩-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লা বিদ্যুৎ দূষণের জন্য ভারতে প্রতি বছর এক লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যায়।
গত ৮ এপ্রিল ২০১৭ ঢাকায় একটি সেমিনারে ভারতীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সৌম দত্ত বলেন, দিল্লি শহরের বায়ুদূষণের জন্য শতকরা ৭২ ভাগ দায়ী হচ্ছে ৭৫০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তিনি আরো বলেন, গুজরাটের মুদ্রাতে টাটা পাওয়ার এবং আমদানি গ্রুপ দু’টি বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করে ২০০৮-২০০৯ সালে, ইতোমধ্যে প্রকল্পসংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বন শতকরা ৬০ ভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে পানিদূষণের জন্য নদীতে মাছ নেই বা কোনো প্রাণী নেই। মানুষের জন্য খাবার পানি সঙ্কট তাই লরির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৭ পরিবেশবিষয়ক সংগঠন গ্রিন পিচ এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণের কারণে এক লাখের মতো মানুষ মারা যায়। কয়লা ব্যবহারের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রা ব্যাপক হারে বাড়বে। এতে মৃত্যুর হার তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ৫০ হাজার মানুষের জীবন বাঁচবে, যদি ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, কোরিয়া, জাপান নতুন কোনো কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ না করে বা নতুন সব কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ২০১১ সালের তুলনায় ২০৩৫ সালে বিদ্যুতের চাহিদা শতকরা ৮৩ ভাগ বাড়বে। গ্রিন পিচের বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ লাউরি মাইলিভিটরা বলেছেন, কয়লার পাশাপাশি চীন ও ভারত জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। চীন ২০১৩ সলে থেকে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে তারা প্রায় পুরোটাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে। ভারতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ছে। (সূত্র ঃ গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনাল, প্রেস রিলিজ, ১৩ জানুয়ারি ২০১৭)।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০২২ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১৭৫ গিগাওয়াটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মোদি সরকার সম্প্রতি ৫০টি ‘সোলার পার্কের’ অনুমোদন দিয়েছে। এগুলোর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৪০ গিগাওয়াট। (সূত্র ঃ প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৭)।
বেশ কয়েক বছর ধরে চীনের বিভিন্ন শহরে বায়ুদূষণ প্রকট আকার ধারণ করছে। বিশেষভাবে বেইজিং ও সাংহাই শহরে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। চীনা নাগরিক লিয়াং কিগান ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম ফ্রান্স থেকে একটি জারে করে বিশুদ্ধ বাতাস এনে বায়ুদূষণের প্রতিবাদে নিলামে তা বেইজিংয়ে ৮৬০ মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। (সূত্র ঃ ইউএসএ টুডে, ১১ এপ্রিল ২০১৪)। বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের জন্য চীনের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা বোতলজাত বায়ু ক্রয় করে ব্যবহার করছেন। লিও ডি অটস ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েক শ’ বিশুদ্ধ বায়ুর জার ইংল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করে চীনে বিক্রি করেন। প্রতি জার ৮০ পাউন্ড এবং চায়না নিউ ইয়ার উপলক্ষে ১৫ জার একসাথে ৮৮৮ পাউন্ড বিক্রি করেন। (সূত্র ঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ইউ কে, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। এখন অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করা বিশুদ্ধ বায়ুর বোতল চীনের বায়ুদূষিত শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছে।
আগেই উল্লেখ করেছি, ঢাকা এখন বায়ুদূষণে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অবশ্য বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষে ওঠা এবারই প্রথম নয়; ইকোনমিস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ঢাকা দ্বিতীয় বসবাসের অযোগ্য শহর বলে বিবেচিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। ফোর্বসের ২০০৮ সালের রিপোর্টে ঢাকাকে নোংরা শহর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পরিবেশসহ সব অধিদফতর থাকা সত্ত্বেও আমরা ঢাকাকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে পারিনি, বরং সেটা বেড়েই চলছে। বিগত বছরগুলোয় বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য, টেক্সটাইল ও ডাইং বর্জ্য, অন্যান্য কারখানার দূষণ সবই নদীতে পড়ছে। ঢাকার বায়ুদূষণ হয়েছে ইটের ভাটা, কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির দূষণ ইত্যাদি কারণে। অর্থাৎ কয়লা বিদ্যুতের ধোঁয়া ছাড়াই। আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিল্পপতি তাদের কলকারখানায় ইটিপি ব্যবহার করেন না বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে আগ্রহী নন। অধিক মুনাফার লোভে, পরিবার ও সন্তানদের জন্য ধন-সম্পদ বানাতে গিয়ে তাদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করেছেন! উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বা উন্নত দেশের সাথে আমাদের তুলনা করলে চলে না। কারণ আমাদের নদীদূষণ, বায়ুদূষণসহ সব ধরনের পরিবেশ দূষণের জন্য আমাদের ব্যক্তি স্বার্থ বা হীন মানসিকতাই দায়ী। এটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের আইনকানুন প্রয়োগের সক্ষমতা সম্পর্কে তুলে ধরা এবং বাস্তবতার আলোকে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে সহযোগিতা করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক দেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবল ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে। এমনই ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ২৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার, যার বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। (সূত্র ঃ দৈনিক সকালের খবর, ১৭ জানুয়ারি ২০১৭)। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৫৫৫০.৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তার মধ্যে কয়লা থেকে আসছে প্রায় ১.৬১ শতাংশ। সরকার ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫০ শতাংশ কয়লা থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। বলা যেতে পারে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন, উন্নয়ন বা অর্জন যা হয়েছে তা কয়লা ছাড়াই হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো জ্বালানি ব্যবহার করতে আমাদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দামও ওঠানামা করছে। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক শক্তি থেকে প্রাপ্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সূর্যের আলো, বায়ু ও পানি ব্যবহার করতে আমাদের কোনো টাকা খরচ হচ্ছে না। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অফুরন্ত সূর্যের আলো আমরা জ্বলানি হিসেবে পাচ্ছি। পরিশেষে বলতে চাই, সভ্যতার ঊষালগ্নে প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা যৌথভাবে মোকাবেলা করার জন্য মানুষ যে সমাজ গঠন করেছিল তা ব্যক্তিস্বার্থে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। যদিও হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, তারপরও আমি হাল ছেড়ে দিতে চাই না, থাকতে চাই আশাবাদী, দেখতে চাই সরকার একটি সবুজ বাসযোগ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের সম্ভাবনা যখন সঙ্কুচিত, বায়ুদূষণে মানুষের জীবন যখন সঙ্কটাপন্ন, তখন আমাদের উচ্চাভিলাষী মেগা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কতটুকু যৌক্তিক ও নীতিনৈতিক, সেটা সরকারকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি। এ প্রবন্ধের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে আবেদন-নিবেদন করে বলতে চাই- ‘কয়লাকে না বলুন’। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন টেকসই জ্বালানি। এ ক্ষেত্রে কয়লা নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সমাধান।
লেখক ঃ পরিবেশকর্মী ও চেয়ারম্যান, সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি চাই, কয়লা নয়
                                  


মহান সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষের জন্য বিনামূল্যে অক্সিজেন বা নির্মল বায়ু সেবনের ব্যবস্থা রেখেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ এ জন্মগত মৌলিক অধিকার ভোগ করে। আমরা বায়ুপ্রাপ্তির উৎস নিয়ে মোটেও চিন্তা করি না। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্রমাগত কার্বন নির্গমনের ফলে ভূমণ্ডলের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক বাড়ছে। দূষিত হয়ে উঠছে আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ বায়ু। প্রতি বছর জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়ে আলোচনা করছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। লক্ষ্য একটাইÑ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী রাখা। কিন্তু ধনী দেশগুলোর আগ্রাসী মনোভাবের জন্য কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও আশার বাণী হচ্ছে, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ১৭৫টি দেশ তাপমাত্রা ও দূষণ কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে রাজি হয়েছে।
ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমগ্র বিশ্ব কয়লাকে নোংরা জ্বালানি আখ্যায়িত করে এটা বর্জন করছে বা কয়লাপ্রযুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দূষণ থেকে বাঁচার জন্য বেলজিয়াম ৩০ মার্চ ২০১৬ তাদের শেষ কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করে কয়লাকে বিদায় দিয়েছে। ফ্রান্স ২০২৩, ইংল্যান্ড ২০২৫ ও নেদারল্যান্ড ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সব কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ভারত ২০১৬ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার চারটি প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে। (সূত্র ঃ অস্ট্রেলিয়ার রিনিউ ইকোনমি অনলাইন পত্রিকা, ৬ অক্টোবর ২০১৬)। চীনের ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনআইএ) ১৪ জানুয়ারি ২০১৭ কয়লাভিত্তিক ১০৩টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের আদেশ জারি করেছে। ১১টি প্রদেশে অবস্থিত এ প্রকল্পগুলো ১০০ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। কয়লার পরিবর্তে ২০২০ সালের মধ্যে ১৩০ গিগাওয়াটে উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। (সূত্র ঃ প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি ২০১৭)।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। ভারতের দিল্লি রয়েছে সবার শীর্ষে। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। এই দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে ২০১৫ সালে ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। (সূত্র ঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানচেটে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। বায়ুদূষণের প্রভাবে এসব শহরে প্রতি মিনিটে দুইজন মানুষ মারা যায়। দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান, ১০ মার্চ ২০১৩-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লা বিদ্যুৎ দূষণের জন্য ভারতে প্রতি বছর এক লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যায়।
গত ৮ এপ্রিল ২০১৭ ঢাকায় একটি সেমিনারে ভারতীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সৌম দত্ত বলেন, দিল্লি শহরের বায়ুদূষণের জন্য শতকরা ৭২ ভাগ দায়ী হচ্ছে ৭৫০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তিনি আরো বলেন, গুজরাটের মুদ্রাতে টাটা পাওয়ার এবং আমদানি গ্রুপ দু’টি বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করে ২০০৮-২০০৯ সালে, ইতোমধ্যে প্রকল্পসংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বন শতকরা ৬০ ভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে পানিদূষণের জন্য নদীতে মাছ নেই বা কোনো প্রাণী নেই। মানুষের জন্য খাবার পানি সঙ্কট তাই লরির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৭ পরিবেশবিষয়ক সংগঠন গ্রিন পিচ এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণের কারণে এক লাখের মতো মানুষ মারা যায়। কয়লা ব্যবহারের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রা ব্যাপক হারে বাড়বে। এতে মৃত্যুর হার তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ৫০ হাজার মানুষের জীবন বাঁচবে, যদি ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, কোরিয়া, জাপান নতুন কোনো কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ না করে বা নতুন সব কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ২০১১ সালের তুলনায় ২০৩৫ সালে বিদ্যুতের চাহিদা শতকরা ৮৩ ভাগ বাড়বে। গ্রিন পিচের বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ লাউরি মাইলিভিটরা বলেছেন, কয়লার পাশাপাশি চীন ও ভারত জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। চীন ২০১৩ সলে থেকে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে তারা প্রায় পুরোটাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে। ভারতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ছে। (সূত্র ঃ গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনাল, প্রেস রিলিজ, ১৩ জানুয়ারি ২০১৭)।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০২২ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১৭৫ গিগাওয়াটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মোদি সরকার সম্প্রতি ৫০টি ‘সোলার পার্কের’ অনুমোদন দিয়েছে। এগুলোর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৪০ গিগাওয়াট। (সূত্র ঃ প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৭)।
বেশ কয়েক বছর ধরে চীনের বিভিন্ন শহরে বায়ুদূষণ প্রকট আকার ধারণ করছে। বিশেষভাবে বেইজিং ও সাংহাই শহরে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। চীনা নাগরিক লিয়াং কিগান ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম ফ্রান্স থেকে একটি জারে করে বিশুদ্ধ বাতাস এনে বায়ুদূষণের প্রতিবাদে নিলামে তা বেইজিংয়ে ৮৬০ মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। (সূত্র ঃ ইউএসএ টুডে, ১১ এপ্রিল ২০১৪)। বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের জন্য চীনের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা বোতলজাত বায়ু ক্রয় করে ব্যবহার করছেন। লিও ডি অটস ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েক শ’ বিশুদ্ধ বায়ুর জার ইংল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করে চীনে বিক্রি করেন। প্রতি জার ৮০ পাউন্ড এবং চায়না নিউ ইয়ার উপলক্ষে ১৫ জার একসাথে ৮৮৮ পাউন্ড বিক্রি করেন। (সূত্র ঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ইউ কে, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। এখন অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করা বিশুদ্ধ বায়ুর বোতল চীনের বায়ুদূষিত শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছে।
আগেই উল্লেখ করেছি, ঢাকা এখন বায়ুদূষণে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অবশ্য বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষে ওঠা এবারই প্রথম নয়; ইকোনমিস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ঢাকা দ্বিতীয় বসবাসের অযোগ্য শহর বলে বিবেচিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। ফোর্বসের ২০০৮ সালের রিপোর্টে ঢাকাকে নোংরা শহর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পরিবেশসহ সব অধিদফতর থাকা সত্ত্বেও আমরা ঢাকাকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে পারিনি, বরং সেটা বেড়েই চলছে। বিগত বছরগুলোয় বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য, টেক্সটাইল ও ডাইং বর্জ্য, অন্যান্য কারখানার দূষণ সবই নদীতে পড়ছে। ঢাকার বায়ুদূষণ হয়েছে ইটের ভাটা, কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির দূষণ ইত্যাদি কারণে। অর্থাৎ কয়লা বিদ্যুতের ধোঁয়া ছাড়াই। আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিল্পপতি তাদের কলকারখানায় ইটিপি ব্যবহার করেন না বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে আগ্রহী নন। অধিক মুনাফার লোভে, পরিবার ও সন্তানদের জন্য ধন-সম্পদ বানাতে গিয়ে তাদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করেছেন! উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বা উন্নত দেশের সাথে আমাদের তুলনা করলে চলে না। কারণ আমাদের নদীদূষণ, বায়ুদূষণসহ সব ধরনের পরিবেশ দূষণের জন্য আমাদের ব্যক্তি স্বার্থ বা হীন মানসিকতাই দায়ী। এটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের আইনকানুন প্রয়োগের সক্ষমতা সম্পর্কে তুলে ধরা এবং বাস্তবতার আলোকে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে সহযোগিতা করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক দেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবল ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে। এমনই ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ২৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার, যার বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। (সূত্র ঃ দৈনিক সকালের খবর, ১৭ জানুয়ারি ২০১৭)। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৫৫৫০.৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তার মধ্যে কয়লা থেকে আসছে প্রায় ১.৬১ শতাংশ। সরকার ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫০ শতাংশ কয়লা থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। বলা যেতে পারে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন, উন্নয়ন বা অর্জন যা হয়েছে তা কয়লা ছাড়াই হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো জ্বালানি ব্যবহার করতে আমাদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দামও ওঠানামা করছে। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক শক্তি থেকে প্রাপ্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সূর্যের আলো, বায়ু ও পানি ব্যবহার করতে আমাদের কোনো টাকা খরচ হচ্ছে না। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অফুরন্ত সূর্যের আলো আমরা জ্বলানি হিসেবে পাচ্ছি। পরিশেষে বলতে চাই, সভ্যতার ঊষালগ্নে প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা যৌথভাবে মোকাবেলা করার জন্য মানুষ যে সমাজ গঠন করেছিল তা ব্যক্তিস্বার্থে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। যদিও হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, তারপরও আমি হাল ছেড়ে দিতে চাই না, থাকতে চাই আশাবাদী, দেখতে চাই সরকার একটি সবুজ বাসযোগ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের সম্ভাবনা যখন সঙ্কুচিত, বায়ুদূষণে মানুষের জীবন যখন সঙ্কটাপন্ন, তখন আমাদের উচ্চাভিলাষী মেগা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কতটুকু যৌক্তিক ও নীতিনৈতিক, সেটা সরকারকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি। এ প্রবন্ধের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে আবেদন-নিবেদন করে বলতে চাই- ‘কয়লাকে না বলুন’। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন টেকসই জ্বালানি। এ ক্ষেত্রে কয়লা নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সমাধান।
লেখক ঃ পরিবেশকর্মী ও চেয়ারম্যান, সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন।

চৌদ্দ এপ্রিল মানেই পহেলা বৈশাখ?
                                  


বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন অর্থাৎ বাংলা নতুন সনকে সাদর সম্ভাষণ জানানো একটি বিশেষ পর্ব যার মূলে রয়েছে একটি অর্থ- জাতিগত চেতনা। অবশ্য সমাজ-রাজনীতির আবর্তন-বিবর্তনে এই পর্বটি আজ নানাভাবে ক্ষত-বিক্ষত। তবু একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন ধর্ম ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব শ্রেণির বাঙালির আজো জাতীয় উৎসব।
বাঙালির জীবনে নানা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধন করেছিল একমাত্র এই ‘বাংলা নববর্ষ’। ধর্মীয় পার্থক্য বাঙালি জাতিকে যেভাবেই হোক, খানিকটা বিভক্ত করেছে। একই দেশের দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাঙালিরা বিভক্ত নামে, সম্বোধনে, আদব-কায়দায়, আহার-পানীয়তে, পোশাক-পরিচ্ছদে এবং আরো নানাভাবে। কিন্তু জীবনচর্চাতে তাদের পার্থক্য নেই। এই জীবনচর্চাটিই মূল। বাঙালি মুসলিমদের সঙ্গে অন্য দেশীয় মুসলিমদের ধর্ম ও ব্যক্তিনামের সাদৃশ্য থাকলেও জীবনচর্চায় সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। কিন্তু বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে বাঙালি মুসলিমদের ধর্ম ও ব্যক্তিনামের মিল না থাকলেও জীবনচর্চায় তারা এক। এখানেই সংস্কৃতির প্রাণসুতো বিদ্যমান। বাঙালি বৌদ্ধ বা বাঙালি খ্রিস্টানদের মধ্যেও ধর্ম ও ব্যক্তিনামের পার্থক্য দেখা যাবে। কিন্তু জীবনচর্চায় তারা এক। এই অভিন্নত্বই মহামূল্যবান। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বিভক্ত পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ দুটি স্বাধীন দেশ ভারত ও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পৃথক রাষ্ট্রীয সত্তায় বাঙালিরা নিজেদের অজান্তেই পরস্পর থেকে খানিকটা দূরে সরে আসে। ১৯৫২ সালে অবাঙালিদের গ্রাস থেকে বাংলা ভাষাতে মুক্ত করার আন্দোলন অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, তার ধারাবাহিকতায় গর্বিত হয় সমগ্র বাঙালি জাতি। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি দিবসটি একান্তভাবে এবং সরকারিভাবে বাংলাদেশের বাঙালিদের। আজ অবশ্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কারণে একুশে ফেব্রুয়ারির বৈশ্বিক পরিচিতি মিলেছে। তার পরও একুশে ফেব্রুয়ারির আবেদন ও চেতনা বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে যেমন, অন্য বাঙালিদের কাছে তেমন নয়, এমন কি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের কাছেও নয়। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন: পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ হবে ‘বাংলাদেশ’; ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ; দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তা হিসেবে ‘বাঙালি’র স্বীকৃতি; পরবর্তীকালে সামরিক শাসনের প্রতিক্রিয়ায় ‘বাঙালি জাতীয়তা’কে বদল করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তা’ করা ইত্যাদি বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে যেমন সংগ্রামের ও স্মরণযোগ্য ইতিহাস, ভারতীয় বাঙালিদের কাছে তেমনটি নয়। অন্য দিকে, ১৯৯২-’৯৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গ’ নাকি ‘বাংলা’ নাকি ‘গৌড়’ রাখা হবে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক  বিশেষ মাত্রায় পৌঁছেছিল। পশ্চিমবঙ্গের পত্র-পত্রিকা, সভা-সেমিনার, রাজনৈতিক মঞ্চ এমন কি পার্লামেন্টে প্রস্তাব ও তর্কের ঝড় বয়ে গিয়েছিল সে সময়। এই বিতর্কে তৎকালে জড়িয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিজনই; দেখা গেছে বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে এ আলোচনা মোটেও আগ্রহব্যঞ্জক ছিল না, কেউ কেউ এর সামান্য খবর রেখেছে মাত্র। রাষ্ট্রীয় এই চেতনাগত পার্থক্য জাতীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনকে প্রভাবিত করে না, হলফ করে এ কথা বলা যায় না।
উচ্চারিত ভাষাভঙ্গি থেকে শুরু করে ব্যবহৃত শব্দ এমন কি অনেক ক্ষেত্রে বাক্য গঠনগত মৌল পার্থক্য বাংলাদেশের বাঙালি ও ভারতীয় বাঙালিদের পৃথক করেছে। সাহিত্য ও সংবাদপত্রের ভাষাতেও এই পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়। দৈনিক ‘আনন্দবাজার’, ‘বর্তমান’, ‘আজকাল’ বা ‘সংবাদ প্রতিদিন’ নামের সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশনের ঢঙ্ এবং সংবাদের ভাষা অবশ্যই পৃথক ঢাকার পত্রিকা দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’, ‘সংবাদ’, ‘ইত্তেফাক’, ‘জনকণ্ঠ’ ইত্যাদি থেকে। দৈনিক ‘কালের কণ্ঠে’র নিয়মিত একজন পাঠকের সংবাদপঠন গতি এ কারণেই ব্যাহত হতে বাধ্য ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ পাঠ করার সময়Ñ যদিও উভয় পত্রিকার ভাষাই বাংলা এবং ভাষারীতি চলিত। পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত ‘আধিকারিক’ বা ‘নিগম’ শব্দের সঙ্গে ‘অফিসার’ / ‘কর্মকর্তা’ বা ‘কর্পোরেশন’ ব্যবহারকারী বাংলাদেশের বাঙালিজন পরিচিত নন। অন্যদিকে ‘সড়কদ্বীপ’ শব্দটি শুনে যে কোনো ভারতীয় বাঙালি চমকে উঠতে পারেন। তাকে কষ্ট করে বুঝে নিতে হবে, এটা তাদের দেশের ‘ট্রাফিক আইল্যান্ড’। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ‘মরিচ’কে ‘লংকা’ বলতেই অভ্যস্ত। রান্নার ‘চুলা’কে তারা ‘উনুন’ বলে থাকেন। এ পার্থক্যগুলো ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার ওপর হিন্দি ভাষার প্রভাব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। অন্য দিকে বাংলাদেশের বাংলা ভাষার ওপর আরবি-পারসি ভাষার প্রভাবও যথেষ্ট। বাংলাদেশের কোনো লেখায় ঈশ্বর দাস সকাল সকাল ‘গোশল’-এর পর ‘নাস্তা’ সেরে এক গ্লাস ‘পানি’ পান করেন। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের লেখায় তেমনি আবদুর রহমান ‘স্নান’ শেষে সকালের ‘জলখাবার’ সেরে এক গ্লাস ‘জল’ পান করেন। ‘জল’ ও ‘পানি’ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাঙালিরা স্পষ্ট বিভক্ত। বাংলাদেশের মুসলিমদের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল এবং এখনো অনেকের মধ্যে আছে যে, ‘পানি’ হলো মুসলমানি শব্দ অর্থাৎ আরবি বা পারসি। তাই বাংলাদেশের মুসলিম পরিবার ও সমাজে ‘পানি’ ব্যবহারের প্রচলন হয়। একই দেশ ও সমাজভুক্ত বলে বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে সে ধারাতেই ‘জল’ ব্যবহার এখন বেশ কমে গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের হিন্দুরাতো বটেই, অনেক এলাকাতেও হিন্দুদের ঘরে ‘পানি’ ব্যবহার হয়। পশ্চিমবঙ্গে ‘পানি’ ব্যবহার করে অবাঙালিরা; মুসলিমরাও ‘জল’ বলায় অভ্যস্ত। ‘পানি’ মুসলমানি শব্দÑ এ ধারণাটি সত্য নয়। তার প্রমাণ বাঙালির প্রাচীন ও মধ্যযুগের গ্রন্থগুলো। সে সব গ্রন্থে প্রয়োজন অনুসারে ‘পানি’ ও ‘জল’ উভয় শব্দের ব্যবহার আছে। আসলে ‘পানি’ হলো হিন্দি শব্দ যা মূলত সংস্কৃত ‘পান’ থেকে এসেছে। সংস্কৃতের ‘পানীয়’ই হলো হিন্দি ‘পানি’। আর ‘জল’ সংস্কৃত শব্দ। অর্থাৎ দুটোরই মূল সংস্কৃত। কিন্তু ‘জল’ ও ‘পানি’র ব্যবহার নিয়ে বাঙালিদের অ™ভুত রকমের ছুঁৎমার্গ দেখা যায়! অথচ মজার ব্যাপার, যারা সচেতনভাবে ‘জল’ ব্যবহার করে তারা প্রাত্যহিক জীবনে কিন্তু ‘পানিফল’ বা ‘পান্তা’ (পানি+তা) খেয়ে বা বলে থাকে। আবার যারা ‘পানি’ ছাড়া অন্য কিছু বলবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে, তারাও কিন্তু ছবি আঁকার সময় ‘জলরং’ ব্যবহার করে; ‘জলবায়ু’র পরিবর্তনে হঠাৎ ‘জলোচ্ছ্বাস’ এলে ভয় পেতেই হয়; মন্দ কিছু তারা ‘জলাঞ্জলি’ দিয়ে থাকে; ‘জলছাদ’ ফেটে গেলে তাদের ঘরে পানি পড়ে! অর্থাৎ ‘জল’ ও ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ও বাংলাদেশের বাঙালিদের মধ্যে পার্থক্যরেখা টানা গেলেও ‘পানিফল’, ‘পান্তা’, ‘জলছাদ’, ‘জলোচ্ছ্বাস’, ‘জলবায়ু’, ‘জলরং’, ‘জলকামান’, ‘জলাঞ্জলি’, ‘জলাশয়’ ইত্যাদি বহু শব্দ দিয়ে তারা মিশে গেছে একে অপরের সঙ্গে। এখানেই সংস্কৃতির প্রাণসুতোটি এক ও অভিন্ন ধারায় প্রবাহিত। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল ‘শ্রী’ নূরুল হাসান কিন্তু বাংলাদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী ‘জনাব’ দিলীপ বড়–য়া। ‘শ্রী’ এবং ‘জনাব’ ব্যবহারের এই রীতিটিও কিন্তু লক্ষ্যযোগ্য।
অনেকে এই বিষয়গুলোকে ‘মামুলি ধরনের’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইবেন কিংবা সংস্কৃতি বিচারে এগুলোকে উপরিকাঠামোগত পার্থক্য বলে বিবেচনায় আনতে অপারগতাও প্রকাশ করতে চাইতে পারেন। কিন্তু জীবনপ্রয়াসে অঙ্গীভূত, রাষ্ট্রীয় চেতনায় আত্তীকৃত (যে রাষ্ট্র বা সরকারব্যবস্থা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত), সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে যাপিতজীবনে সংযুক্ত যে উপাদানগুলি একান্ত সহযোগী বা অবশ্য প্রয়োজনীয়Ñ তাকে যদি ‘সংস্কৃতি’ বলে আমরা সংজ্ঞায়িত করে থাকি, তাহলে গুরুত্বের নিরিখে উপরিউক্ত বিষয়সমূহ নিতান্তই অপ্রধানÑ একথাও বলার দুঃসাহস আমাদের নেই। কেননা ইংরেজি ‘কালচার’ আর বাংলায় যাকে আমরা ‘সংস্কৃতি’ বলে থাকি, সেখানে ‘চর্চা’র প্রসঙ্গটি প্রধান বিবেচ্য। মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী বলেই সামাজিক সংস্কার-কুসংস্কারকে তারা যেমন সহজেই অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করতে পারে না, ঠিক তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় প্রভাবকে এড়িয়ে সমাজ বিকশিত হয় না। কারণ সংস্কৃতি হলো মানবজীবনের অলিখিত ইতিহাস, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরণের সঙ্গে যুক্ত। যদিও সমাজে সংস্কৃতি নির্ভরতা লক্ষ করা যায়, তথাপি সমাজই সংস্কৃতির ওপর প্রভুত্ব বা আধিপত্য বিস্তার করে তাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ সমাজের আন্তরকাঠামোজাত গতিশীলতাই একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ধরন নির্ণয়ের মৌল অবলম্বন। তাই জাতিগত মূল পরিচয়টি সংস্কৃতিতেই ধারণ করা থাকে। সমাজকাঠামোর ওপর সমকালীন রাজনীতির প্রভাবকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। তবে রাজনীতি ধীরে ধীরে সমাজকে বদলে দিতে পারে: সৎ রাজনীতি সমাজকে ভালোভাবে বদলায়, প্রগতিমুখী করে; অপরাজনীতি সমাজকে বদলায় কি¤ভূতকিমাকার করে। সমাজের বাঁক বা বদলরূপেও এখানে অন্তঃসলীলার মতো প্রবাহিত থাকে সংস্কৃতি।
আজ বাঙালি ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত, উপরন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে খ-িত। অনেকে আবার নির্বাসিত জীবিকার প্রয়োজনে এই ব্যস্ত পৃথিবীর কোনো প্রান্তে। সমাজ, রাজনীতি ও কালের প্রবাহে বাঙালির দেহ আজ খ--বিখ-। এই খ-িতাবস্থা দূরত্বের সৃষ্টি করছে। একে একদেহ করা আজ আর সম্ভবপর নয়। এ দূরত্ব বরং স্পষ্টতর হয়ে উঠছে দিনকে দিন। তাই যারা আজো ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ অভিধাটি ব্যবহার করছে, তাদের আবেগ থাকতে পারে, কিন্তু সেখানে বস্তুগত বাস্তবতা নেই। কিন্তু পৃথিবীর তাবৎ বাঙালির খ-িত দেহে যে শোণিত প্রবাহিত তার বর্ণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য অভিন্ন। এই অভিন্নতাই বাঙালিকে পৃথক ও স্বতন্ত্র রেখেছে পৃথিবীর অন্য জাতিগুলো থেকে। বিশ্বের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের সুর তাই আজো এক তন্ত্রীতে ধ্বনিত।
এই অভিন্ন রাগিণীর সুর-মূর্ছনায় আমরা বছরে অন্তত একদিন পরস্পরের খুব সন্নিকটে চলে আসতাম। আরো কিছু দিবস ছিলÑ যেমন, চৈত্র সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি ইত্যাদি। কিন্তু সেগুলো আজ খ- খ-ভাবে পালিত হলেও সমষ্টিগতভাবে আমাদের নাগালের প্রায় বাইরে। এই কিছু দিন আগেও ধর্মীয় বা দৈশিক সব সংস্কার নিষেধের ঊর্ধ্বে সমগ্র বাঙালি জাতি অখ-িতভাবে মেতে উঠতাম একটিমাত্র জাতীয় উৎসবেÑ ‘বাংলা নববর্ষে’। কিন্তু আজ আর তা হয় না। বাঙালিরা আজ বিশ্ব জুড়ে সত্যি দ্বিধা বিভক্তÑ এই পহেলা বৈশাখের দিনেও। ফসল ফলানো ও খাজনা আদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে চান্দ্র বছর হিজরির পাশাপাশি মুসলিম সম্রাট আকবরের সময় সৌর বৎসর হিসেবে ‘ফসলি সন’ বা ‘বাংলা সন’ প্রবর্তিত হয়। মুসলিম সম্রাট প্রবর্তিত হলেও বাঙালি হিন্দু-মুসলিম ধর্ম নির্বিশেষেই এই সনকে আপন সন হিসেবে গ্রহণ করে। ‘হাল’ ও ‘খাতা’ এ দুটি আরবি শব্দকে একীভূত করে বাঙালিজন আরম্ভ করে ‘শুভ হালখাতা’র পালা। এ সব ক্ষেত্রে তারা ভাবেনি ভারতভূমিতে আরবি ভাষায় উৎসবের নামকরণ হবে কেন? যে নামেই হোক, উৎসবটাকে তারা আপন করে নিয়েছে। কিন্তু কালক্রমে সমাজ ও রাজনীতির অনিবার্য অভিঘাত ও তার প্রভাবে বাংলা সন ও তার আনুষ্ঠানিকতায় পাকিস্তান আমলে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার লেবেল সাঁটার অপচেষ্টা চলে। বলা হয়, এটা হিন্দুদের অনুষ্ঠান! সাধারণ মুসলিমরা এই ভাষ্যকেই সত্য ভেবেছে। তাই এতে ক্ষতিও হয়েছে অনেক। তবে এই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয় হিন্দু-মুসলিম সমন্বিত সাধনার কাছে।
অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসনামলে সম্পন্ন হয় ‘পঞ্জিকা সংস্কার’! যাদের বাড়িতে পঞ্জিকা ছিল না, যাদের পূর্বপ্রজন্ম পঞ্জিকা দেখবার প্রয়োজন বোধ করত না, এমন কি যাদের জীবনে পঞ্জিকার গুরুত্ব দেখা যায়নি কোনো দিন, তারাই উদ্যোগী হয় পঞ্জিকা সংস্কারের জন্য। বুঝতে অসুবিধা হয় না, পঞ্জিকা সংস্কার তাদের উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য বাঙালির অখণ্ড চেতনার মধ্যে ধর্মীয়ভাবে একটি ভেদরেখা টানা।  বাঙালি জীবনের প্রচলিত পঞ্জিকা সংস্কারের নামে খ্রিস্টীয় সনের এপ্রিলের চৌদ্দ তারিখের সঙ্গে সেঁটে দেয়া হয় পহেলা বৈশাখ! শুধু তাই নয়, বাংলা সন আরম্ভ হতো সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। এই নতুন নিয়মে রাত বারটার পর থেকে এখন বাংলা সন আরম্ভ হবে। কী অ™ভুত, কী উপনিবেশকামী মানসিকতা, কী কূটসাম্প্রদায়িকতা!! খ্রিস্টীয় সনে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুসারে লিপইয়ার থাকবে, বছরের দিবস কম-বেশি হবে, মাসগুলোও যে যার বৈশিষ্ট্য নিয়ে থাকবে আর তাকে অনুসরণ করবে বাংলা সন। বাংলা সনের নিজস্ব কোনো বৈশিষ্ট্য থাকবে না। ইংরেজদের যে দিন চৌদ্দই এপ্রিল আমাদের সেদিন পহেলা বৈশাখ! ভাবটা এমন, এ ছাড়া বাংলা সন বা তারিখের বাঙালির জীবনে আর কোনো প্রয়োজন নেই। তাহলে প্রশ্ন: পহেলা বৈশাখের নামে আমরা কি প্রকারান্তরে চৌদ্দই এপ্রিলই উদ্যাপন করছি না? বাংলা সনকে কি শুধুই পহেলা বৈশাখে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি না আমরা? এ রকম অনেক জিজ্ঞাসার মধ্যেই প্রতি বছর আসে পহেলা বৈশাখ। নতুন প্রজন্ম এখন জানে, পহেলা বৈশাখ দুদিনÑ বাংলাদেশে এক দিন, পশ্চিমবঙ্গে আরেক দিন। এই জানাকে সাম্প্রদায়িকতা দিয়েও বোঝে অনেকেÑ বলে, হিন্দুদের পহেলা বৈশাখ এক দিন, মুসলিমদের পহেলা বৈশাখ আরেক দিন!! কিন্তু তারা আজ জানে না, এই স্বাধীন বাংলাদেশেই কিছু কাল আগে পঞ্জিকা সংস্কারের নামে বাংলা সনের সর্বনাশ করা হয়। সন প্রতিষ্ঠার সময় বাংলা মাসগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল নক্ষত্রের নামে। তাই বিশাখা নক্ষত্র সমাগমের আগেই বৈশাখ মাস গণনা আরম্ভ হতে পারে না। আমাদের পঞ্জিকা সংস্কারে নক্ষত্রের ধার ধারা হয়নি। বাংলাদেশে চৌদ্দ এপ্রিল মানেই পহেলা বৈশাখ! এ-ও সম্ভব!!            লেখকঃ অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভালোবাসার পয়লা বৈশাখ
                                  

সন্দেহবাদীরা প্রশ্ন উত্থাপন করতেই পারেন, পয়লা বৈশাখ অন্য দশটা দিনের চেয়ে আলাদা কিভাবে। সেই তো একইভাবে সূর্য ওঠে এবং অস্ত যায়, দিনের আলো নিভে আসে, সন্ধ্যার আঁধার ঘনায়। তারপরের দিন বা আগের দিনের থেকে পয়লা বৈশাখ ভিন্ন কী হিসেবে?
শিশুরা যখন জন্মায় তখন আর দশটা শিশুর সঙ্গে তার কি তেমন কোনো পার্থক্য থাকে? তবু মায়ের কাছে তার শিশু মহার্ঘ্য, অমনটি আর হয় না। কেন এমন মনে হয়? ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখেন বলে। তেমনি পয়লা বৈশাখকে আমরা ভালোবাসার চোখে দেখি, তাই ওই দিনটা অন্য সকল দিনের থেকে আলাদা লাগে আমাদের কাছে।
এ-প্রশ্নও উঠতে পারে যে, সারা বছর বাংলা পঞ্জির খোঁজ কজন রাখে? তাহলে পয়লা বৈশাখে এত সাজসজ্জা, এত নৃত্যগীতবাদ্যপুষ্প দিয়ে সাড়ম্বরে তাকে বরণ করা কি একটা লোক দেখানো ব্যাপার, একটা ভণ্ডামি নয়?
আমাদের ব্যবহারিক জীবনে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার নেই বললে চলে। তাই হঠাৎ করে কাউকে বাংলা তারিখ জিজ্ঞেস করলে সে প্রায়ই ঠিক জবাব দিতে পারে না। যদি বাংলা মাসের হিসেবে আমরা মাস-মাইনে পেতাম, আদালতে আমাদের ডাক পড়ত, বিদ্যুৎ-গ্যাস-টেলিফোনের বিল দিতে হতো, তাহলে বাংলা তারিখ আমাদের ঠিকই মনে থাকত। তবু যে বছরের প্রথম দিনে আমরা অনুষ্ঠান করে, আড়ম্বর করে তাকে আবাহন করি, তাও মিথ্যে নয়। আমাদের যে একটা নিজস্ব বর্ষপঞ্জি আছে, আমরা যে সকল ক্ষেত্রে পরনির্ভর নই, সেটা আমরা উপলব্ধি করতে চাই, অন্যকে জানাতে চাই। তাই এমন আয়োজন।
 
আমাদের দেশে নববর্ষ-উৎসব পালিত হতো গ্রামাঞ্চলে মেলা করে। শহরাঞ্চলে ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে সম্বৎসরের দেনা-পাওনার হিসাবের সারসংগ্রহ করতেন, ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ-রীতি, মনে হয়, আবহমান কালের। ইংরেজদের দেখাদেখি বাঙালিরাও নিউ ইয়ার্স ডে পালন করতেন দেখে ব্যথিত হয়ে উনিশ শতকের শেষে রাজনারায়ণ বসু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা নববর্ষ-উৎসব পালনের রীতি প্রবর্তন করেন, পরে তা ছড়িয়ে যায়।
আমার ছেলেবেলা কেটেছে কলকাতায়। সেখানে হালখাতার অনুষ্ঠানে গেছি পিতার হাত ধরে। মিষ্টি শুধু খেয়ে আসিনি, প্যাকেটে করে নিয়েও এসেছি। দেশভাগের পরে যখন ঢাকায় এলাম, তখন নববর্ষের অনুষ্ঠান প্রথম দেখি মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটেথ বোধহয় লেখক-শিল্পী মজলিসের উদ্যোগে। অন্যত্রও সে-অনুষ্ঠান পালিত হয়েছিল, বোধহয় একবার কার্জন হলেও। পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে আমরাও তার আয়োজন করেছি সওগাত অফিসেথ তবে নিয়মিত নয়।
ধীরে ধীরে টের পাওয়া যায় যে, এই অনুষ্ঠান সরকারের পছন্দ নয়। আমার শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধের শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সেই পঞ্চাশ দশকেই এক প্রবন্ধ লিখে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইরানি মুসলমানেরা যদি ইসলামপূর্ব নওরোজ অনুষ্ঠান সাদরে উদ্যাপন করতে পারে, তাহলে আমরা কেন বাংলা নববর্ষ পালন করতে পারব না। বিশেষ করে, যেখানে বাংলা বছরের শুরু সম্রাট আকবরের রাজস্ব-সংস্কারের ফলে, সেখানে তো ওই বর্ষপঞ্জি মুসলমানের দান বলেই গণ্য করতে হবে। থএসব প্রশ্নের উত্তর কেউ কখনো দেয়নি। যারা নববর্ষ পালন করার, তারা তা করে গেছে। সরকার তাদের সন্দেহের চোখে দেখেছে, নথিপত্রে তাদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের উত্তরাধিকারীরা কিন্তু তাতে দমেনি। ষাটের দশকে ছায়ানটের উদ্যোগে সংগঠিতভাবে নববর্ষ পালন শুরু হলো। সে-যাত্রা এখনো চলছে। এমনকি পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা মেরেও তা থামানো যায়নি।

 

 

                                                                         
এরই মধ্যে, এবারে, আওয়ামী ওলামা লীগ নামধারী এক ভুঁইফোড় সংগঠন ফতোয়া দিয়েছে, বাংলা নববর্ষ-পালন অনৈসলামিক, ওটা বন্ধ করে দিতে হবে। যে-কথা পাকিস্তান আমলেও জোরেশোরে বলা যেত না, বাংলাদেশে তা অনায়াসে বলে ফেললেন এই ধর্মব্যবসায়ীরা।
সরকার আবার নিরাপত্তার অজুহাতে দুটি ব্যবস্থা নিয়েছেন। চারুকলা অনুষদ থেকে যে মঙ্গল-শোভাযাত্রা বের হয়, তাতে মুখোশপরা চলবে না এবং বিকেল পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করে ফেলতে হবে।
মঙ্গল-শোভাযাত্রায় মুখোশধারী কেউ প্রবেশ করে নাশকতামূলক কিছু করে ফেলবেথ এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। দুর্বৃত্তের ভয়ে গৃহস্থকে তাহলে প্রতিরোধের ব্যবস্থা না নিয়ে পলায়নের পথ খুঁজতে হবে। মেয়েদের লাঞ্ছিত করার ভয় থাকায় যাঁরা আজ পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে বলছেন, কাল যে তাঁরা মেয়েদেরকে ঘরের বাইরে বেরোতে নিষেধ করবেন না, তার নিশ্চয়তা কী?
বাংলাদেশে তাহলে কি আমরা কেবল পেছন দিকে চলতে থাকব? শহিদ মিনারে আলপনা আঁকাকে, পুষ্পার্ঘ্য দেওয়াকে একসময় অনৈসলামিক বলা হয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে, বরকত ও সফিউর রহমানের কবরে যেতে মেয়েদের বাধা দেওয়া হয়েছিল। তখন তাঁরা কেউ নিজের জায়গা থেকে সরে যাননি এবং ছাত্রনেতারা আজিমপুর গোরস্তানের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের সঙ্গে যুক্তিতর্কে বিজয়ী হয়ে তাঁদের প্রবেশাধিকার আদায় করে নিয়েছিলেন। ছয় দশকের বেশি সময় পরে আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি।
যে-পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শকে আমরা ভেঙেচুরে বহু ত্যাগের বিনিময় বাংলাদেশ অর্জন করেছি, সেই বাংলাদেশকে কি আমরা আরেকটা পাকিস্তান বানাতে চাই? নিশ্চয় কিছু লোক চায়, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ তা চায় না। আমাদের কি আবার ১৯৫২র মতো রক্ত দিতে হবে, ১৯৬৯-এর মতো গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে হবে? তবেই ধর্মব্যবসায়ীরা ইঁদুরের গর্তে লুকাবেন এবং দেশে সুস্থ সবল স্বাধীন সংস্কৃতিচর্চা সম্ভবপর হবে? ইতিহাসের শিক্ষা কি আমরা নেবো না? তারপরও অযৌক্তিক বাধানিষেধ থাকবে?
ছায়ানটের নববর্ষের অনুষ্ঠানে যখন বোমার আক্রমণ ঘটেছিল, তারপর ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের টেলিভিশন সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা কি আগামী বছরে এখানে আবার আসবে? নিদ্বর্ধিয় তারা জবাব দিয়েছিল, আমরা আবার আসব। এখানেই বাংলাদেশের শক্তি। প্রতিক্রিয়াশীলদের ভয়ে এই শক্তিকে আমরা যেন দুর্বল না করে ফেলি।


   Page 1 of 2
     প্রবন্ধ
ঐতিহাসিক বদর দিবসের তাৎপর্য, গুরুত্ব ও শিক্ষা
.............................................................................................
নির্বোধ
.............................................................................................
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক সূচনা ২৬শে মার্চ
.............................................................................................
আজন্ম অধিকার বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার নারী
.............................................................................................
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়
.............................................................................................
ঈদ-উল ফিতরঃ জয়হোক মানবতার
.............................................................................................
বেলা ডুবে যায়, জাগ্রত হও
.............................................................................................
আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে!
.............................................................................................
মানবাধিকার
.............................................................................................
প্রধানমন্ত্রী ও রোহিঙ্গানীতি এবং দেশের সংখ্যালঘু ইস্যু
.............................................................................................
পরিবর্তিত জলবায়ু ও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা
.............................................................................................
একজন নোবেল বিজয়ী বনাম রাষ্ট্রহীন একজাতি এবং কিছু কথা
.............................................................................................
বাংলাদেশে ধর্ষণপ্রবণতা ও প্রতিকার ড. খুরশিদ আলম
.............................................................................................
নবায়নযোগ্য জ্বালানি চাই, কয়লা নয়
.............................................................................................
চৌদ্দ এপ্রিল মানেই পহেলা বৈশাখ?
.............................................................................................
ভালোবাসার পয়লা বৈশাখ
.............................................................................................
নতুন ধারায় আসছে মানবাধিকার খবর
.............................................................................................
বড়দিন বারতা ও তাৎপর্য
.............................................................................................
মানবাধিকার সংস্কৃতির স্বরূপ
.............................................................................................
বিজয় দিবসটি একান্তভাবে বাঙালির
.............................................................................................
বুলবুল চৌধুরী বেঁচে আছেন তার সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী কর্মকান্ডে
.............................................................................................
পর্নোগ্রাফি জীবন ধ্বংসের হাতিয়ার
.............................................................................................
বাঙালির দুর্গোৎসব: ইতিহাস ফিরে দেখা
.............................................................................................
বঞ্চিত ও দরিদ্রদের জন্য কোরবানীর পশু বন্টনঃ একটি মডেল উপস্থাপন
.............................................................................................
ঈদ মোবারক! ঈদ আসলো ফিরে খুশির ঈদ, মানবতার ভাঙুক নীদ
.............................................................................................
রোযা: খোদাভীতি ও মানবতাবোধের শ্রেষ্ঠ দর্শন - আবুবকর সিদ্দীক
.............................................................................................
গরম ভাতের পান্তা : আনন্দের না উপহাস
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

Editor & Publisher: Rtn. Md Reaz Uddin
Corporate Office
53,Modern mansion(8th floor),Motijheel C/A, Dhaka
E-mail:manabadhikarkhabar34@gmail.com,manabadhikarkhabar34@yahoo.com,
Tel:+88-02-9585139
Mobile: +8801978882223 Fax: +88-02-9585140
    2015 @ All Right Reserved By manabadhikarkhabar.com    সম্পাদকীয়    Adviser List

Developed By: Dynamicsolution IT [01686797756]