| বাংলার জন্য ক্লিক করুন

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   প্রবন্ধ -
                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                 
আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে!

ইলিয়াস সাগর

ছোটবেলা নানুর মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। গল্পটি হলো- অনেকদিন আগের কথা। এক দেশে ছিল এক গোয়ালা। গোয়ালার ছিল বিভিন্ন প্রজাতির কয়েকশ’ গরু। আর এই গরুগুলোকে কেন্দ্র করে গোয়ালা স্বপ্নের জাল বুনত। কারণ, গোয়ালার পৈতৃক নিবাস ছিল অজো পাড়াগাঁয়ের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানকার মানুষগুলো ছিল অত্যন্ত দরিদ্র এবং অশিক্ষিত। আর যেখানে অশিক্ষা বাসা বাঁধে সেখানে কুসংস্কার দাপিয়ে বেড়ায়। কুসংস্কারের কালো থাবায় আচ্ছন্ন সমাজ বা গোষ্ঠীর মানুষগুলোর শিক্ষা ও চেতনা ক্রমেই লোপ পায়। শিক্ষাহীন জাতি কখনোই ভাগ্যের উন্নয়ন করতে পারে না। ফলে তারা ক্রমেই ধাবিত হয় দারিদ্র থেকে দারিদ্র সীমার আরও নীচে। ক্ষুধা নিবারণের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের যোগাড় করাটাই তাদের পক্ষে অত্যন্ত দূরূহ হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্রতার যাতাকলে নিষ্পেষিত অভূক্ত মানুষগুলো পুষ্টিহীনতার ফলে রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জরাগ্রস্ত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই জরাজীর্ণ মানুষগুলোকে বোঝা থেকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করাই ছিল গোয়ালার বাবার লক্ষ্য। তাই বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত প্রজাতির গরু কিনে এনে গড়ে তুলেছিলেন এই ফার্ম। গোয়ালার বাবা স্বপ্ন দেখতেন এই ফার্মটি অনেক বড় হবে এবং সেই সাথে হবে এলাকার দুস্থ অসহায় মানুষের কর্মসংস্থান। পুষ্টিহীনতার ফলে একটি মানুষও রোগে ভুগবে না। কর্মচাঞ্চল্যে মুখর নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে সচেষ্ট হবে। স্বপ্নপূরণের আগেই গোয়ালার বাবা তিন দিনের জ্বরে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। বাবার মৃত্যুর পর সুযোগ্য পুত্র হিসেবে গোয়ালার ফার্মটির হাল ধরে। অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে কিছু দিনের মধ্যে ফার্মের পরিধির প্রসার ঘটে। গরুর সংখ্যাও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সেই সাথে যুক্ত হয় কিছু তোষামোদকারী ও চাটুকারের দল। তোষামোদকারীরা মধুর মাছির মতো গোয়ালার চারপাশে সারাক্ষণই ঘ্যাঁন ঘ্যাঁন করত।

গোয়ালারকে চাটুকারদের চটকদার মিষ্টি কথার ফাঁদে ফেলতে খুব একটা সময় লাগল না। গোয়ালা চাটুকারদের শুভাকাঙ্খি ভেবে ফার্ম রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোতে তাদের নিয়োগ দিল। চাটুকাররা নিয়োগ পেয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে দেখল, গোয়ালা যদি প্রতিদিন ফার্মে এসে তদারকি করে তবে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই তারা একদিন গোয়ালাকে বলল- ‘প্রতিদিন কষ্ট করে আপনার ফার্মে আসার দরকার কি? আমরা তো রয়েছি। আপনি মালিক মহাশয়। আপনি বসে বসে আয়েশ করবেন, ঘুমোবেন আর আমাদের হুকুম দেবেন। আপনার বাবা ছিলেন আমাদের জ্যাঠামশাই। মানুষের কল্যাণ করাই ছিল তার কাজ। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যদি আপনি এতটা পরিশ্রম করতে পারেন তবে আমরা পারব না কেন?”

এহেন কথায় সরল গোয়ালা ভীষণ খুশী হয়ে গেল। এরপর থেকে সে বাড়িতে বসে আয়েশ করত আর ঘুমাত। মাসেও একবার ফার্মে যেত না। এই সুযোগে যে যার মতো পারল লুটেপুটে খাওয়া শুরু করে দিল। কিছুদিনের মধ্যে ফার্মটি ধ্বংসের মোহনায় এসে দাঁড়ল। গরুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ল। আর অসুস্থ গরুর দুধ কেউই কিনতে চাইল না। তাই গরুগুলোর চিকিৎসার জন্য বাধ্য হয়ে গোয়ালা সুদী কারবারীদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিল। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। একে একে সবকটি গরু মারা গেল। নিঃস্ব গোয়ালা চাটুকারদের কাছে সাহায্য চাইল। কিন্তু কেউই তাকে সাহায্য করল না। সবাই তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। অবশেষে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাগলপ্রায় গোয়ালা অচিন দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যাওয়ার সময় শুধু বিড়বিড় করে বলল- ‘সেই ঘুম তো ভাঙল, কিন্তু সময় থাকতে ভাঙল না।’

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি-

প্রত্যেক জাতির জীবনেই বিশেষ কিছু গৌরবময় দিন থাকে যা অত্যুজ্জল হয়ে থাকে মানুষের মনের মনিকোঠায় এবং মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে সেসব দিবস উদযাপন করে। বাংলাদেশে বিজয় দিবস এমনি একটি মর্যাদাপূর্ণ ও গৌরবময় দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালী জাতির বিজয় সাধিত হয়েছে আর সেই সাথে বিশ্বের মানচিত্রে অঙ্কিত হয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মানচিত্র। আমরা অর্জন করেছি সবুজের মাঝে রক্তিম লাল সূর্য খচিত একটি গৌরবময় স্বাধীন দেশের পতাকা। এই বিজয় আমরা একদিনে অর্জন করিনি। বিজয় অর্জন করতে আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। দীর্ঘ নয় মাসের কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লাখ লাখ কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-যুবক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী সকলের তাজা প্রাণ আর অসংখ্য মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। অর্জন করেছি স্বাধীনতা। কিন্তু এর বীজ বাঙালীর মনে বপিত হয়েছিল আরোও অনেক আগে। ৫২`র ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতিতে সংঘটিত হয় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে জাতিকে মুক্ত করার সংগ্রাম; মুক্তির সংগ্রাম।

৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহসিক ভাষণ- `এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম!` বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণের বাণীতে কোটি কোটি বাঙালীর তিমিত রক্ত টগবগ করে ওঠে। মুক্তি নেশায় শিহরণ জাগে প্রতিটি মানুষের প্রাণস্পন্দনে। এ ভাষণ কেবল ভাষণই ছিলনা, এটি ছিল বাঙালীর বিজয় অর্জনের চালিকা শক্তি; স্বধীনতার মূলমন্ত্র। এ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই বাংলার মানুষ দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয় অর্জন করে। বাঙালীর স্বাধীনতার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ইয়াহিয়া সরকার ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করার জন্য জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর নেতৃত্বে সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, সাবেক ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, কৃষক-শ্রমিক প্রভৃতি গোষ্ঠির সমন্বয়ে গঠিত হয় মুক্তি বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা নামে মাত্র ট্রেনিং নিয়ে অদম্য সাহসিকতার সাথে মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান নিয়াজী ৯৩ হাজার সৈন্যসহ আত্মসমর্পন করে। এভাবেই অর্জিত হয় আমাদের গৌরবময় বিজয়।

`স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন` এর সত্যতা বাঙালী জাতি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছে। যে চেতনা ও সাহস নিয়ে বাঙালী মুক্তিযুদ্ধ করেছে, বাংলাদেশের সাহিত্যে সেই মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ ও পর্যাপ্ত প্রতিফলন এবং প্রতিভাস পড়েনি। বরং জাতীয় জীবনের অনেক স্তরেই আজ মিথ্যার কালিমা লেপ্টে আছে। এর ফলে আমাদের সব গৌরবই যেন অনেকাংশে ঢেকে যেতে বসেছে। মানবিক মূল্যবোধ প্রায় নিঃশেষিত ও বিপন্ন। বিবেক ও মনুষ্যত্ব আজ লাঞ্ছিত ও অপমানিত। এমতাবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রমের মূল্যে অর্জিত বিজয় আজ কতটুকু অটুট ও অক্ষত আছে ? নয় মাস ব্যাপী অবরুদ্ধ বাংলাদেশে কী অমানবিক নির্যাতন চলেছিল তার কোন স্মৃতি আমাদের আছে বলে মনে হয় না এবং নতুন প্রজন্মকেও আমরা হস্তান্তর করিনি সেই অভিজ্ঞতা ঘটনা পঞ্জি। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তথা বাঙালীর ত্যাগ তিতিক্ষা ও বীরত্বের সঠিক ইতিহাস ধোয়াচ্ছন্ন।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ প্রতিফলন ঘটেনি। এজন্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভুলুন্ঠিত হতে চলেছে। সাধারণ মানুষ আজ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল ও মূল্যস্ফীতির ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্যায়, অবিচার, অনাচার ও অসত্য আজ সমাজে দেদীপ্যমান। বিজয় অর্জনের এতোটা বছর পরে এসে আমরা বিজয়ের স্বা’দ কতটা গ্রহন করতে পারছি ? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গণাদের আজও কী আমরা দিতে পেরেছি তাদের প্রাপ্য অধিকার ? আজও ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ! দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে বিচারপতিদের শপথ গ্রহনকে কেন্দ্র করে চলে পেশী শক্তির মহরা ! ব্যক্তিস্বার্থকে তরান্বিত করতে হরতালের নামে চলছে জালাও পোড়াও সংস্কৃতি ! ধ্বংস হচ্ছে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। অপরাজনীতির নির্মম থাবায় অকালে ঝরে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ ! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে অধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে লাশের মিছিল ! প্রতিদিন সকালে পত্রিকা খুললে এখনো দেখি পত্রিকার সিংহ ভাগ দখল করে আছে খুন ধর্ষণ আর রাহাজানির সংবাদ ! মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ ছিল পরাধীনতার বলয় থেকে জাতিকে মুক্ত করে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা আজও কী পেয়েছি মৌলিক অধিকার ? এখনো দু’মুঠো ভাতের জন্য আমাদের মা বোনদের প্রতিনিয়ত করতে হচ্ছে হাড়ভাঙা পরিশ্রম। দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও পাচ্ছে না তাদের ন্যায্য মজুরি। প্রাপ্য বেতন ভাতা আদায়ের দাবীতে মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে আমাদের মা বোনেরা অহরহ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
বিগত দিনে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। “ক্রস ফায়ার” শব্দটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড অনেকাংশে বেড়ে যায়। তৎকালীন সময়ের প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগ এসব কর্মকান্ডের প্রবল বিরোধীতা করলেও বিএনপি-নিজামী সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একটি বিবৃতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ। তা হলো- “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ।” “আইন শৃঙ্খলা আগের চেয়ে অনেক উন্নত ও কোথায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটছেনা।” মহাজোট সরকারের এক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীও এ দুইটি বিবৃতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। রানা প্লাজা ধ্বসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী সরকারের এক মন্ত্রী মিডিয়ায় বিবৃতি দিতে এসে বলেছিলেন- “রানা প্লাজার কাঠামো একটু দুর্বল ছিল। বিরোধীদল মিছিল নিয়ে এসে রানা প্লাজাকে ধরে ঝাকাঝাকি করেছিল তাই রানা প্লাজা ধ্বসে পড়েছে।” বিশ্বের স্বাধীন সর্বভৌম কোন দেশের কোন মন্ত্রী কোনও কালে কখনও এমন উক্তি করেছে কিনা আমার জানা নেই। অপরদিকে এলিট ফোর্স হিসেবে স্বীকৃত র‌্যাব এর ভুল টার্গেটে বলী হচ্ছে বাপ্পীরা। এলিট ফোর্স র‌্যাব এর কিছু বিপথগামী সদস্যকে ভাড়াটে খুনির ভুমিকায় অবতীর্ন হতে আমরা দেখেছি। উদাহরণ স্বরূপ নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার এর কথা বলা যেতে পারে। পুলিশের ডিডেক্টিভ ব্র্যাঞ্চ এর কিছু অসাধু সদস্যকে আমরা অপহরণ এর মত নোংরা কর্মে লিপ্ত হতে দেখেছি। বিজয়ের ছিচল্লিশ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে এসেও পুলিশি হেফাজতের নামে নিরিহ মানুষকে জিম্মি করে কতিপয় বিপদগামী পুলিশ সদস্য কর্তৃক চলছে ঘুষ বাণিজ্য। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ধাবা থেকে বেরিয়ে এসে নিজ নিজ দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষে ব্রিটেন ও ভারতের মত দেশ যখন ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করছে। ঠিক তখনই আমাদের মত উন্নয়ণশীল দেশে এম.পি. মন্ত্রীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সেই সাথে চলছে এম.পি. ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের জন্য বিলাস বহুল গাড়ি আমদানীর মহড়া। অপর দিকে এনজিও’র খোলসে কতিপয় সুদী কারবারীদের সুদের বোঝা পরিশোধ করতে গিয়ে সল্প আয়ের মানুষগুলো শেষ সম্বর ভিটে মাটি বিক্রি করে ভাসমান জনতায় পরিণত হচ্ছে। কেউ কেউ সুদের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

পক্ষান্তরে আমাদের অর্জনও নেহায়েত কম নয়। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মত বিশাল সম্মান আমাদের ঝুলিতে জমা হয়েছে। আমাদের ছেলেরা জ্ঞান বিজ্ঞানে অবদান রাখার জন্য বিশ্বের দরবারে প্রশংসিত হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মূলধারার রাজনীতিতে আমাদের সন্তানরা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রেখে চলেছে। বিশ্ব ক্রিকেটে শক্তিধর অবদান রাখার ফলে বাংলাদেশে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট এর আসর। অমর একুশে বিশ্বের বুকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এর স্বীকৃতি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। যুদ্ধাপরাধীর বিচারও হয়েছে বাংলার মাটিতে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অবদানের জন্য বিশ্ব আমাদের ঝুলিতে গুজে দিয়েছে বিশেষ স্বীকৃতি। বিজয়ের ৪৬ বছর পর আমাদের আর নতুন করে কোন অঙ্গীকার করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। যে আদর্শ ও চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ বিজয় অর্জন করেছে সেই আদর্শকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই আমরা দেখতে পাবো আমাদের স্বপ্নের সেই সোনার বাংলা। প্রতি বছর বিজয় দিবস আমাদের কর্ণকুহরে যে পরিবর্তন ঘটায় বাস্তব জীবনে তা থেকে আমরা আর বিচ্যুত না হই। আমরা যেন বিজয়ের চেতনাকে মশাল করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য চেষ্টায় মেতে উঠি। আসুন আমরা সেই আশায় বুক বেধে সফলতার জন্যে অপেক্ষা করি। আসুন আমরা বাঙালী জাতির বিজয়ের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে একতাবদ্ধ হই। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান স্বাধীনতার খোলসে মোড়ানো স্বেচ্ছাচারীতার ভূতটাকে দূর করি। কারণ প্রকৃত স্বাধীনতা ছাড়া কোন জাতি গৌরবের আসনে উন্নীত হতে পারেনা। আমরা চাই বাঙালী জাতির মানবিক বিজয়। আর এই বিজয় প্রতিষ্ঠার জন্য যে সততা ও জবাব দিহিতার প্রয়োজন তা আমরা পাচ্ছি কোথায়! বিগত সব সরকারের আমলেই রাঘব বোয়ালদের আমরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকতে দেখেছি। সেই সব রাঘব বোয়ালদের মদদপূষ্ট পুটি টেংরাদের ধরতেই কেবল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর থাকতে দেখেছি। ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার খবরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন- “আমরা এখনও আইনের সু-শাসন দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি।” তবে কি সেই গোয়ালার মতো আমরাও ঘুমিয়ে পড়েছি! যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আজ বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে- ‘আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে?’

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
প্রধান নির্বাহী, বিশ্বসাহিত্য একাডেমি।
ই-মেইল :eliasshagar@gmail.com

আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে!
                                  

ইলিয়াস সাগর

ছোটবেলা নানুর মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। গল্পটি হলো- অনেকদিন আগের কথা। এক দেশে ছিল এক গোয়ালা। গোয়ালার ছিল বিভিন্ন প্রজাতির কয়েকশ’ গরু। আর এই গরুগুলোকে কেন্দ্র করে গোয়ালা স্বপ্নের জাল বুনত। কারণ, গোয়ালার পৈতৃক নিবাস ছিল অজো পাড়াগাঁয়ের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানকার মানুষগুলো ছিল অত্যন্ত দরিদ্র এবং অশিক্ষিত। আর যেখানে অশিক্ষা বাসা বাঁধে সেখানে কুসংস্কার দাপিয়ে বেড়ায়। কুসংস্কারের কালো থাবায় আচ্ছন্ন সমাজ বা গোষ্ঠীর মানুষগুলোর শিক্ষা ও চেতনা ক্রমেই লোপ পায়। শিক্ষাহীন জাতি কখনোই ভাগ্যের উন্নয়ন করতে পারে না। ফলে তারা ক্রমেই ধাবিত হয় দারিদ্র থেকে দারিদ্র সীমার আরও নীচে। ক্ষুধা নিবারণের জন্য দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের যোগাড় করাটাই তাদের পক্ষে অত্যন্ত দূরূহ হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্রতার যাতাকলে নিষ্পেষিত অভূক্ত মানুষগুলো পুষ্টিহীনতার ফলে রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জরাগ্রস্ত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই জরাজীর্ণ মানুষগুলোকে বোঝা থেকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করাই ছিল গোয়ালার বাবার লক্ষ্য। তাই বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত প্রজাতির গরু কিনে এনে গড়ে তুলেছিলেন এই ফার্ম। গোয়ালার বাবা স্বপ্ন দেখতেন এই ফার্মটি অনেক বড় হবে এবং সেই সাথে হবে এলাকার দুস্থ অসহায় মানুষের কর্মসংস্থান। পুষ্টিহীনতার ফলে একটি মানুষও রোগে ভুগবে না। কর্মচাঞ্চল্যে মুখর নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে সচেষ্ট হবে। স্বপ্নপূরণের আগেই গোয়ালার বাবা তিন দিনের জ্বরে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। বাবার মৃত্যুর পর সুযোগ্য পুত্র হিসেবে গোয়ালার ফার্মটির হাল ধরে। অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে কিছু দিনের মধ্যে ফার্মের পরিধির প্রসার ঘটে। গরুর সংখ্যাও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সেই সাথে যুক্ত হয় কিছু তোষামোদকারী ও চাটুকারের দল। তোষামোদকারীরা মধুর মাছির মতো গোয়ালার চারপাশে সারাক্ষণই ঘ্যাঁন ঘ্যাঁন করত।

গোয়ালারকে চাটুকারদের চটকদার মিষ্টি কথার ফাঁদে ফেলতে খুব একটা সময় লাগল না। গোয়ালা চাটুকারদের শুভাকাঙ্খি ভেবে ফার্ম রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোতে তাদের নিয়োগ দিল। চাটুকাররা নিয়োগ পেয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে দেখল, গোয়ালা যদি প্রতিদিন ফার্মে এসে তদারকি করে তবে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই তারা একদিন গোয়ালাকে বলল- ‘প্রতিদিন কষ্ট করে আপনার ফার্মে আসার দরকার কি? আমরা তো রয়েছি। আপনি মালিক মহাশয়। আপনি বসে বসে আয়েশ করবেন, ঘুমোবেন আর আমাদের হুকুম দেবেন। আপনার বাবা ছিলেন আমাদের জ্যাঠামশাই। মানুষের কল্যাণ করাই ছিল তার কাজ। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যদি আপনি এতটা পরিশ্রম করতে পারেন তবে আমরা পারব না কেন?”

এহেন কথায় সরল গোয়ালা ভীষণ খুশী হয়ে গেল। এরপর থেকে সে বাড়িতে বসে আয়েশ করত আর ঘুমাত। মাসেও একবার ফার্মে যেত না। এই সুযোগে যে যার মতো পারল লুটেপুটে খাওয়া শুরু করে দিল। কিছুদিনের মধ্যে ফার্মটি ধ্বংসের মোহনায় এসে দাঁড়ল। গরুগুলো অসুস্থ হয়ে পড়ল। আর অসুস্থ গরুর দুধ কেউই কিনতে চাইল না। তাই গরুগুলোর চিকিৎসার জন্য বাধ্য হয়ে গোয়ালা সুদী কারবারীদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিল। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। একে একে সবকটি গরু মারা গেল। নিঃস্ব গোয়ালা চাটুকারদের কাছে সাহায্য চাইল। কিন্তু কেউই তাকে সাহায্য করল না। সবাই তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। অবশেষে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাগলপ্রায় গোয়ালা অচিন দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যাওয়ার সময় শুধু বিড়বিড় করে বলল- ‘সেই ঘুম তো ভাঙল, কিন্তু সময় থাকতে ভাঙল না।’

এবার মূল প্রসঙ্গে আসি-

প্রত্যেক জাতির জীবনেই বিশেষ কিছু গৌরবময় দিন থাকে যা অত্যুজ্জল হয়ে থাকে মানুষের মনের মনিকোঠায় এবং মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে সেসব দিবস উদযাপন করে। বাংলাদেশে বিজয় দিবস এমনি একটি মর্যাদাপূর্ণ ও গৌরবময় দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালী জাতির বিজয় সাধিত হয়েছে আর সেই সাথে বিশ্বের মানচিত্রে অঙ্কিত হয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মানচিত্র। আমরা অর্জন করেছি সবুজের মাঝে রক্তিম লাল সূর্য খচিত একটি গৌরবময় স্বাধীন দেশের পতাকা। এই বিজয় আমরা একদিনে অর্জন করিনি। বিজয় অর্জন করতে আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। দীর্ঘ নয় মাসের কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লাখ লাখ কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-যুবক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী সকলের তাজা প্রাণ আর অসংখ্য মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। অর্জন করেছি স্বাধীনতা। কিন্তু এর বীজ বাঙালীর মনে বপিত হয়েছিল আরোও অনেক আগে। ৫২`র ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতিতে সংঘটিত হয় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে জাতিকে মুক্ত করার সংগ্রাম; মুক্তির সংগ্রাম।

৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহসিক ভাষণ- `এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম!` বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণের বাণীতে কোটি কোটি বাঙালীর তিমিত রক্ত টগবগ করে ওঠে। মুক্তি নেশায় শিহরণ জাগে প্রতিটি মানুষের প্রাণস্পন্দনে। এ ভাষণ কেবল ভাষণই ছিলনা, এটি ছিল বাঙালীর বিজয় অর্জনের চালিকা শক্তি; স্বধীনতার মূলমন্ত্র। এ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই বাংলার মানুষ দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয় অর্জন করে। বাঙালীর স্বাধীনতার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে ইয়াহিয়া সরকার ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করার জন্য জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর নেতৃত্বে সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, সাবেক ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, কৃষক-শ্রমিক প্রভৃতি গোষ্ঠির সমন্বয়ে গঠিত হয় মুক্তি বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা নামে মাত্র ট্রেনিং নিয়ে অদম্য সাহসিকতার সাথে মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান নিয়াজী ৯৩ হাজার সৈন্যসহ আত্মসমর্পন করে। এভাবেই অর্জিত হয় আমাদের গৌরবময় বিজয়।

`স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন` এর সত্যতা বাঙালী জাতি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছে। যে চেতনা ও সাহস নিয়ে বাঙালী মুক্তিযুদ্ধ করেছে, বাংলাদেশের সাহিত্যে সেই মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ ও পর্যাপ্ত প্রতিফলন এবং প্রতিভাস পড়েনি। বরং জাতীয় জীবনের অনেক স্তরেই আজ মিথ্যার কালিমা লেপ্টে আছে। এর ফলে আমাদের সব গৌরবই যেন অনেকাংশে ঢেকে যেতে বসেছে। মানবিক মূল্যবোধ প্রায় নিঃশেষিত ও বিপন্ন। বিবেক ও মনুষ্যত্ব আজ লাঞ্ছিত ও অপমানিত। এমতাবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রমের মূল্যে অর্জিত বিজয় আজ কতটুকু অটুট ও অক্ষত আছে ? নয় মাস ব্যাপী অবরুদ্ধ বাংলাদেশে কী অমানবিক নির্যাতন চলেছিল তার কোন স্মৃতি আমাদের আছে বলে মনে হয় না এবং নতুন প্রজন্মকেও আমরা হস্তান্তর করিনি সেই অভিজ্ঞতা ঘটনা পঞ্জি। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তথা বাঙালীর ত্যাগ তিতিক্ষা ও বীরত্বের সঠিক ইতিহাস ধোয়াচ্ছন্ন।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ প্রতিফলন ঘটেনি। এজন্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভুলুন্ঠিত হতে চলেছে। সাধারণ মানুষ আজ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল ও মূল্যস্ফীতির ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্যায়, অবিচার, অনাচার ও অসত্য আজ সমাজে দেদীপ্যমান। বিজয় অর্জনের এতোটা বছর পরে এসে আমরা বিজয়ের স্বা’দ কতটা গ্রহন করতে পারছি ? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গণাদের আজও কী আমরা দিতে পেরেছি তাদের প্রাপ্য অধিকার ? আজও ঘাতকদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ! দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ে বিচারপতিদের শপথ গ্রহনকে কেন্দ্র করে চলে পেশী শক্তির মহরা ! ব্যক্তিস্বার্থকে তরান্বিত করতে হরতালের নামে চলছে জালাও পোড়াও সংস্কৃতি ! ধ্বংস হচ্ছে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। অপরাজনীতির নির্মম থাবায় অকালে ঝরে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ ! দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে অধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে লাশের মিছিল ! প্রতিদিন সকালে পত্রিকা খুললে এখনো দেখি পত্রিকার সিংহ ভাগ দখল করে আছে খুন ধর্ষণ আর রাহাজানির সংবাদ ! মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ ছিল পরাধীনতার বলয় থেকে জাতিকে মুক্ত করে মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা আজও কী পেয়েছি মৌলিক অধিকার ? এখনো দু’মুঠো ভাতের জন্য আমাদের মা বোনদের প্রতিনিয়ত করতে হচ্ছে হাড়ভাঙা পরিশ্রম। দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও পাচ্ছে না তাদের ন্যায্য মজুরি। প্রাপ্য বেতন ভাতা আদায়ের দাবীতে মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে আমাদের মা বোনেরা অহরহ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
বিগত দিনে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। “ক্রস ফায়ার” শব্দটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড অনেকাংশে বেড়ে যায়। তৎকালীন সময়ের প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগ এসব কর্মকান্ডের প্রবল বিরোধীতা করলেও বিএনপি-নিজামী সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একটি বিবৃতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ। তা হলো- “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ।” “আইন শৃঙ্খলা আগের চেয়ে অনেক উন্নত ও কোথায় বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটছেনা।” মহাজোট সরকারের এক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীও এ দুইটি বিবৃতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। রানা প্লাজা ধ্বসকে কেন্দ্র করে আওয়ামী সরকারের এক মন্ত্রী মিডিয়ায় বিবৃতি দিতে এসে বলেছিলেন- “রানা প্লাজার কাঠামো একটু দুর্বল ছিল। বিরোধীদল মিছিল নিয়ে এসে রানা প্লাজাকে ধরে ঝাকাঝাকি করেছিল তাই রানা প্লাজা ধ্বসে পড়েছে।” বিশ্বের স্বাধীন সর্বভৌম কোন দেশের কোন মন্ত্রী কোনও কালে কখনও এমন উক্তি করেছে কিনা আমার জানা নেই। অপরদিকে এলিট ফোর্স হিসেবে স্বীকৃত র‌্যাব এর ভুল টার্গেটে বলী হচ্ছে বাপ্পীরা। এলিট ফোর্স র‌্যাব এর কিছু বিপথগামী সদস্যকে ভাড়াটে খুনির ভুমিকায় অবতীর্ন হতে আমরা দেখেছি। উদাহরণ স্বরূপ নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার এর কথা বলা যেতে পারে। পুলিশের ডিডেক্টিভ ব্র্যাঞ্চ এর কিছু অসাধু সদস্যকে আমরা অপহরণ এর মত নোংরা কর্মে লিপ্ত হতে দেখেছি। বিজয়ের ছিচল্লিশ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে এসেও পুলিশি হেফাজতের নামে নিরিহ মানুষকে জিম্মি করে কতিপয় বিপদগামী পুলিশ সদস্য কর্তৃক চলছে ঘুষ বাণিজ্য। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ধাবা থেকে বেরিয়ে এসে নিজ নিজ দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার লক্ষে ব্রিটেন ও ভারতের মত দেশ যখন ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করছে। ঠিক তখনই আমাদের মত উন্নয়ণশীল দেশে এম.পি. মন্ত্রীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সেই সাথে চলছে এম.পি. ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের জন্য বিলাস বহুল গাড়ি আমদানীর মহড়া। অপর দিকে এনজিও’র খোলসে কতিপয় সুদী কারবারীদের সুদের বোঝা পরিশোধ করতে গিয়ে সল্প আয়ের মানুষগুলো শেষ সম্বর ভিটে মাটি বিক্রি করে ভাসমান জনতায় পরিণত হচ্ছে। কেউ কেউ সুদের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

পক্ষান্তরে আমাদের অর্জনও নেহায়েত কম নয়। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মত বিশাল সম্মান আমাদের ঝুলিতে জমা হয়েছে। আমাদের ছেলেরা জ্ঞান বিজ্ঞানে অবদান রাখার জন্য বিশ্বের দরবারে প্রশংসিত হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মূলধারার রাজনীতিতে আমাদের সন্তানরা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রেখে চলেছে। বিশ্ব ক্রিকেটে শক্তিধর অবদান রাখার ফলে বাংলাদেশে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট এর আসর। অমর একুশে বিশ্বের বুকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এর স্বীকৃতি পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। যুদ্ধাপরাধীর বিচারও হয়েছে বাংলার মাটিতে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অবদানের জন্য বিশ্ব আমাদের ঝুলিতে গুজে দিয়েছে বিশেষ স্বীকৃতি। বিজয়ের ৪৬ বছর পর আমাদের আর নতুন করে কোন অঙ্গীকার করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। যে আদর্শ ও চেতনা নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ বিজয় অর্জন করেছে সেই আদর্শকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই আমরা দেখতে পাবো আমাদের স্বপ্নের সেই সোনার বাংলা। প্রতি বছর বিজয় দিবস আমাদের কর্ণকুহরে যে পরিবর্তন ঘটায় বাস্তব জীবনে তা থেকে আমরা আর বিচ্যুত না হই। আমরা যেন বিজয়ের চেতনাকে মশাল করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য চেষ্টায় মেতে উঠি। আসুন আমরা সেই আশায় বুক বেধে সফলতার জন্যে অপেক্ষা করি। আসুন আমরা বাঙালী জাতির বিজয়ের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে একতাবদ্ধ হই। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান স্বাধীনতার খোলসে মোড়ানো স্বেচ্ছাচারীতার ভূতটাকে দূর করি। কারণ প্রকৃত স্বাধীনতা ছাড়া কোন জাতি গৌরবের আসনে উন্নীত হতে পারেনা। আমরা চাই বাঙালী জাতির মানবিক বিজয়। আর এই বিজয় প্রতিষ্ঠার জন্য যে সততা ও জবাব দিহিতার প্রয়োজন তা আমরা পাচ্ছি কোথায়! বিগত সব সরকারের আমলেই রাঘব বোয়ালদের আমরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকতে দেখেছি। সেই সব রাঘব বোয়ালদের মদদপূষ্ট পুটি টেংরাদের ধরতেই কেবল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর থাকতে দেখেছি। ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার খবরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন- “আমরা এখনও আইনের সু-শাসন দেশে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি।” তবে কি সেই গোয়ালার মতো আমরাও ঘুমিয়ে পড়েছি! যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আজ বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে- ‘আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে?’

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
প্রধান নির্বাহী, বিশ্বসাহিত্য একাডেমি।
ই-মেইল :eliasshagar@gmail.com

মানবাধিকার
                                  

 

১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষনা দেয়া হয় জাতিসংঘের সাধারন পরিষদ কর্তৃক। অনেকের মতে, এই দলিলটি হলো বিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন (দঞযব ংরহমষব সড়ংঃ রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ড়ভ ঃযব ঃবিহঃরবঃয পবহঃঁৎু’), কেননা এতে রয়েছে বিশ্বময় সাধারন মানুষের অধিকার সংক্রান্ত কিছু সর্বজনীন দাবি। তা আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর স্বীকৃত ও হয়েছে। কিন্তু বিগত ছয় দশকেও সেই ঘোষনায় বিধৃত দাবিগুলি বাস্তবে রূপলাভ করেনি। বিশ্বময় মানবাধিকার অত্যন্ত নির্মমভাবে দলিত মথিত হয়ে চলেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে পশ্চাত্যের উন্নত গনতান্ত্রিক দেশসূহ উচ্চবাচ্য করলেও নিজেরা নিজ নিজ দেশে, এমন কী নিজ স্বার্থে অন্যান্য দেশে এই অধিকার লঙ্ঘন করতে বিন্দুমাত্র কার্পন্য করছে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্ব ১৯৪৮ সালের পূর্বে যেমন বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যিক ছিল এখনও প্রায় তেমনই রয়েছে।

মানবাধিকার পর্যালোচনার সময় প্রায় আমরা নাগরিক অধিকার (ঈরারষ ষরনবৎঃু) সম্পর্কে মনোযোগী বেশি হই। সাধারনভাবে মানবাধিকার এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করেই কিন্তু আমাদের অগ্রসর হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর কারন দুটি। এক, নাগরিক অধিকার মঞ্জুর করা হয় উপর থেকে, রাষ্ট্র কর্তৃক। এসব অধিকার রাষ্ট্র এবং নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত হয় এবং কিছু শর্ত সাপেক্ষে, কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নাগরিকদের উপভোগ করতে হয়, বিশেষ করে সংবিধানের কাঠামোয়। দুই, তাই নাগরিক অধিকার স্থান, কাল, পাত্র ভেদে বিভিন্ন হতে পারে। কিন্তু মানবাধিকার উপভোগের সুযোগ আসে বিশ্বজননী নৈতিক বোধ থেকে, মানবের শ্রেষ্ঠতম গুণ ইনসাফবোধ থেকে, যে নৈতিক সচেতনতায় স্বীকৃত হয় প্রতেক ব্যক্তির জীবন সত্তার সাম্য এবং যা সকল সমায়ে, সর্বত্র, সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। নীতিগতভাবে তাই এই অধিকার কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। এই জন্যেই মানবাধিকারকে চিহ্নিত করা হয় মানুষের জন্মগত অধিকার রুপে।

মানবাধিকারের তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেøখযোগ্য : এক, মানবাধিকার সর্বজনীন এই অর্থে যে, ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্তা, নারী-পুরুষ, বয়স বা রাজনৈতিক বিশ্বাস অথবা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্যে এই অধিকার। দুই এই অধিকার অপরিবর্তনীয় (ওহপড়হঃৎড়াবৎঃরনষব) সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ (অনংঁষধঃব) এবং সহযাত বা অন্তর্জাত (ওহহধঃব)। এই অধিকার কোন রাষ্ট্র বা কোন কর্তৃপক্ষ থেকে প্রদত্ত নয় এবং কোন রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ এই অধিকার কেড়ে নিতেও পারে না। এমন কী, কোনরুপ দায়িত্বের বন্ধনেও তা আবদ্ধ নয়। তিন, মানবাধিকার হলো আত্মগত বা আত্মনিষ্ঠ (ঝঁনলবপঃরাব) এই অর্থে যে, এই অধিকার তার ব্যক্তিত্বের সম্পত্তি। যেহেতু ব্যক্তির রয়েছে বিচারবুদ্ধি (জধঃরড়হধষরঃু) এবং স্ব-শাসনের ক্ষমতা তাই এই অধিকার তার সহজাত।

যদিও সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে ১৯৪৮ সালে, অধিকারের দাবি কিন্তু মানব জাতির ইতিহাসের মতই প্রাচীন। যে কেউ মানবাধিকার সম্পর্কিত ভাবনা-চিন্তার পরিচয় পেতে পারেন গ্রীক লেখক সফোকিøস (ঝড়ঢ়যড়পষবং), প্লেøটো (চষধঃড়), এরিস্টটলের (অৎরংঃড়ঃষব) লেখায়। পেতে পারেন আইন বিশেষজ্ঞ সিসেরো এবং সেনেকার লেখায়।‘‘বিশ্বের নাগরিকের (পরঃরুবহংযরঢ় ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ) ধারণারও তারা তাদের লেখায় পেতে পারেন। থমাস হবস (ঞযড়সধং ঐড়ননবং) জন লক (ঔড়যহ খড়পশব), রুশো (জড়ঁংংবধঁ) হেগেল, কান্ট, মার্ক্স (ক. গধৎী), ম্যাক্সওয়েবার প্রমুখ দার্শনিকরা মানুষের অধিকার সংরক্ষণ সম্পর্কে উচ্চকন্ঠ ছিলেন। আঠার শতকের আলোকিত যুগ (ঊহষরমযঃবহসবহঃ অমব) মানবাধিকার সংরক্ষন ক্ষেত্রে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। শুধু তাই নয়, গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঐতিহাসিক আন্দোলন এবং শান্তিপূর্ন পৃথিবীর স্বপ্ন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত গণঅধিকার সংরক্ষন এবং অধিকারের গ্যারান্টি নিশ্চিত করার পদক্ষেপের সাথে। জনগনের অধিকারই যদি সংরক্ষিত না হলো তবে কিসের গনতন্ত্র? গনতন্ত্র হলো দ্বন্ধ ও সংঘাতের শান্তিপূর্ন সমাধানের প্রকৃষ্ট পন্থা। অন্য কথায়, গনতন্ত্র হলো নাগরিকদের সমাজ ব্যবস্থা এবং নাগরিকদেও সমাজ ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত না হলে সে ব্যবস্থা গনতন্ত্রই নয়।

কীভাবে মানবাধিকার সংরক্ষন করা সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। কারো মতে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এবং সাধারন মানুষ আইন মেনে চললে তারা নিজ নিজ অধিকার সংরক্ষন করতে পারেন। কেউ বা বলেন, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এবং প্রশাসকগনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে অধিকার লঙ্ঘনের কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে। আবার অনেকের মতে জনগন তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে এবং অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তীব্রভাবে প্রতিবাদী হলে অধিকার ক্ষুণœ হবার ঘটনা হ্রাস পেতে থাকে। কারো মতে আইনের শাসনের সাথে বিচার বিভাগ যদি তৎঃপর হয়ে ওঠে তাহলেও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কমে যাবে। কেউ কেউ আবার বলেন, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম এবং সচেতন সুশীল সমাজ এক্ষেত্রে মণিকাঞ্চন স্বরূপ। আমার ধারনা কিন্তু ভিন্নরূপ। আমি মনে করি, স্বশাসন ও সুশাসনের চমৎকার সমন্বয়ই গনঅধিকার নিশ্চিত করার স্বর্ণালী পন্থা। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা এক্ষেত্রে অপরিহার্য। জনগনের নির্বাচিত সরকার স্বচ্ছভাবে নীতি প্রনয়ন করবেন। দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং দল-নিরপেক্ষ প্রশাসকরা সেই নীতি বাস্তবায়ন করবেন এবং তাদের নীতি ও কাজের জন্য জনগনের নিকট সম্পূর্ন ভাবে দায়ী থাকবেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন ভঙ্গকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন দল-নিরপেক্ষভাবে এবং স্বাধীন বিচার বিভাগের কর্মকর্তাগন নিজেদের বিবেক পরিচ্ছন্ন রেখে বিচার করবেন। তাহলেই তো হয়। একজনের অধিকার রক্ষার জন্যে প্রয়োজন হলে তারা অন্য কয়েকজনের শাস্তি বিধানে কার্পন্য করবেন না।
সার্বজনীন অধিকারের ঘোষনা দান জাতিসংঘের অতীব গুরুত্বপূর্ন অবদান। জাতিসংঘের অনেক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মানবাধিকার সংরক্ষনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অবদান নেহাত অপ্রতুল নয়। মানবাধিকার কমিশন গঠন, শরনার্থীদের অধিকার সংরক্ষনের লক্ষে হাইকমিশন গঠন, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষন কমিটি গঠন, ১৯৬৬ সালের চুক্তি মনিটর প্রভৃতি এক্ষেত্রে উল্লেøখযোগ্য। তবে জাতিসংঘ হলো স্বাধীন সার্বভৌম সদস্য রাষ্ট্রসমূহের তৎপরতার উপরই জাতিসংঘের কৃতিত্বের অনেকটাই নির্ভরশীল। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের অধিকাংশ গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ। কোন কোন ক্ষেত্রে এসব নব্য গনতান্ত্রিক দেশের শাসক-প্রশাসকরা ভীষন ক্ষমতাশ্রীয়। নির্বাচিত হলেই তারা নিজেদের গনতান্ত্রিক সরকার বলে বাগাড়ম্বর করেন। গনতন্ত্রে নির্বাচন অপরিহার্য বটে, কিন্তু নির্বাচন শুধু ঐ জনপদকে গনতন্ত্রের মহাসরকে টেনে তোলে। গনতন্ত্রকে জনগনের নিকট অর্থপূর্ন করতে হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দল-নিরপেক্ষ দক্ষ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে গড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা, দল-নিরপেক্ষ জনকল্যাণকামী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সীমিতভাবে ক্ষমাত প্রয়োগ, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন বিশেষ করে কার্যকারী মানবাধিকার কামিশন এবং সু-শাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমে গণতন্ত্রের জন্যে অপরিহার্য। এসব দেশে এমন ব্যবস্থা অনুপস্থিত বলে নব্য গনতন্ত্র রূপান্তরিত হয়েছে ওষষরনবৎধষ ফবসড়পৎধপু ব্যবস্থায় যেখানে মানবাধিকার সংরক্ষিত হবার কোন সম্ভবনা নেই। বাংলাদেশে মানবাধিকার রয়েছে এক করুন অবস্থায়। দেশে যখন কিছ’ ব্যক্তি আইনের ঊর্ধে উঠে যায় তখনই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটে থাকে। অন্য কথায়, দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা যখন ঐসব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয় অথবা তাদের বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখনই এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, সিয়েরালিওন প্রভৃতি দেশে এভাবেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ঐগুলি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত হয়। বর্তমানে এমনি বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ডের জন্যে পাকিস্তান, ইয়েমেন, সুদান, কসোভো, সার্বিয়া, জর্জিয়া প্রায়-ব্যর্থ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে সাবধান হতে হবে আগে থেকেই। সরকারের প্রিয়ভাজনদেও বিচার হবে না, যেহেতু তারা “আমাদের লোক” এমন অবস্থা কাঙ্খিত নয়। এই প্রেক্ষাপটে দেশে গনতন্ত্রেও স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই। দেশের পত্যেকটি প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের অভিশাপে অভিশপ্ত। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন আকাশছোঁয়া। ক্ষমতাশ্রয়ের মাত্রা উচ্চতম শিখর স্পর্শী। দায়িত্বহীনতা চরম। এই অবস্থায় মানবাধিকার সংরক্ষনের কথা শুধু কথার কথা। তবে এসব কথা উচ্চারিত হোক সর্বত্র। দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত। দেশের সাধারন মানুষ এসব কিছু জানুক এবং প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠুক। জনগনই পারেন অন্ধকার এই অচলায়তনে অধিকারের আলো জ্বালাতে। তারাই পারেন মানবাধিকারের আলোয় চারদিককে ঝলমল করে তুলতে।

লেখক : সাবেক উপাচাযর্, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রধানমন্ত্রী ও রোহিঙ্গানীতি এবং দেশের সংখ্যালঘু ইস্যু
                                  

রোহিঙ্গা কারা? বার্মার এই জনগোষ্ঠীর কোনও দেশ নেই। তারা সেখানকার বৃহৎ জনগোষ্ঠী, তারা আক্রান্ত ও অপমানিত। নিজের দেশ থেকে তারা পালাতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা অভিমুখে। ’শান্তির দেশ’ বার্মাতে নির্বিচারে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। বার্মা সরকারের কার্যত প্রধান সু কি, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত। মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তিনি সারা বিশ্বের সামনে থেকেছেন। সবার মর্যাদা পেয়েছেন। পারিবারিক ঐতিহ্যেও তিনি সম্মানিত। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট প্রশ্নে তিনি কোনও ইতিবাচক পদক্ষেপ নেননি। রাখাইন বার্মার একটি রাজ্য।

এখানেই বেশি রোহিঙ্গাদের বসবাস। একসময় স্বাধীন-স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল। এই রাজ্য বা প্রদেশকে আরাকানও বলা হয়। বার্মার সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা রাখাইনের কোনও ঐতিহ্যবাহী নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। তারা বহিরাগত এবং ব্রিটিশ আমলে রাখাইনে বসতি গড়ে তুলেছে। অনেক ইতিহাসবিদ এটাকেই জোর প্রচার করেন। কিন্তু ঘটনা পুরো উল্টো। আরাকানে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এই এলাকায় প্রথম ইসলাম ধর্মের আর্বির্ভাব ঘটে অষ্টম-নবম শতাব্দীতে। তখন এখানে শাসন কাজ চালাতেন চন্দ্রবংশীয় হিন্দু রাজারা। রাজধানী ছিল উজালি। বাংলা সাহিত্যে যা বৈশালী নামে পরিচিত।

রোহিঙ্গা কারা এবং এই শব্দের উৎপত্তি কিভাবে? এই নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক আছে। কিন্তু মোটামুটি একটি সাধারণ বিষয় তার মধ্য থেকে প্রকাশ পেয়েছে তা হলো, আরবীয় মুসলমনেরা সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এই এলাকার তীরে ভিড়লে ’রহম’ ’রহম’ শব্দ উচ্চারণ করে স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করতেন। ’রহম’ শব্দের অর্থ ’দয়া করা’। স্থানীয় মানুষেরা মনে করতেন এরা ‘রহম’ জাতির লোক।

রহম শব্দটি বিকৃত হয়ে রোয়াং এবং রোয়াং থেকে রোহাংগ, রোসাঙ্গ ও রোহিঙ্গা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। এরা প্রকৃত অর্থে ধর্মে মুসলমান।

সাম্প্রতিককালে এই রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চরমে উঠেছে। কিন্তু সমস্যা বহু বছরের পুরনো। বৌদ্ধ রাজা বাইন-নুঙ্গের (১৫৫০-১৫৮৯) মুসলমানদের হালাল মাংস খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, কোরবানি করতে বাধা দেয়, জোর করে ধর্মান্তর ঘটায়। ১৯৯২ সালে সামরিক সরকার প্রধান নে উইন সামরিক বাহিনী থেকে মুসলমানদের বের করে দেয়। বামিয়ানে বুদ্ধমুর্তি ধ্বংসের সময় নির্বিচারে মুসলমান হত্যা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে বার্মার জান্তা সরকারের আমল থেকে আক্রমণ আরও তীব্র হয়। কেমন হিংস্র আক্রমণ তার সামান্য একটা বর্ণনা দেই। রেঙ্গুন থেকে একটি বাস ফিরে যাচ্ছিল রাখাইনে। মাঝপথে বৌদ্ধরা সেটা থামায়। ৯জন মুসলমানকে বাস থেকে নামায়। তার মধ্যে তিনজন ধর্ম প্রচারের কাজে যাচ্ছিলেন। সবাইকে টুকরো টুকরো করে কেটে মৃতদেহের উপর মদ ও থুথ ছেটানো হয়। সারা বিশ্ব তখন এই ছবি দেখেছে।

বার্মায় বৌদ্ধদের রাখাইন বলা হয়। শান্তির বাণী তারা প্রচার করে। মানুষ তো বটেই, পশু হত্যাও ধর্মত তাদের নিষেধ। তারা কেন এত চিন্তার অগম্য।

আসলে ধর্মের আধিপত্য ও সম্প্রদায়গত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতার কাছে ’ধর্ম মানুষের জন্য’ একথা নিতান্তই আপ্তবাক্য। এই ছবি সবাই দেখেছেন, একদল রোহিঙ্গাকে তরবারি উচিয়ে তেড়ে নিয়ে যাচ্ছে ’শান্তিবাদী’ রাখাইনেরা আর বাংলাদেশ সীমান্তে বন্দুক তাদের দিকে তাক করে আছে। সমুদ্রে ভাসছে অসহায় মানুষদের নৌকা। তা ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জল, খাবার কিছু নেই। মা নিজের জিভ সন্তানের মুখে দিয়ে চুষতে বলছেন-তৃষ্ণা মেটাবার জন্য। একটু বয়স হওয়া মেয়েরা বাধ্য হয়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন নানা দেশের পতিতালয়ে। এমন অত্যাচারও করা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মের নামে।

কোথাও কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলা হলেই রোহিঙ্গাদের দিকে নজর পড়ছে। অভিযোগ উঠেছে পুলিশ ফাঁড়ি, সেনা ছাউনি আক্রমণের। অভিযোগ হয়তো অস্বীকার করার নয়, তবে আন্তর্জাতিক চক্র যে এতে মদত দিচ্ছে, সময় সুযোগমত তাতে ঘৃত ঢেলে দিচ্ছে, একথা কি অস্বীকার করা যাবে? যখন কোন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হয়, সন্ত্রাসী হওয়া ছাড়া আর কি উপায় থাকে তাদের।

অত্যাচারিতদের পক্ষে আত্মরক্ষা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সন্ত্রাসী হওয়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এজন্য সরকার সন্ত্রাসী অভিযোগ তুলে আক্রমণ করবে, নির্যাতনের নৃশংসতা বাড়িয়ে দেবে, তারা দেশের নাগরিক নয় ইত্যাদি অভিযোগ তুলে বিশ^বাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করবে এটাও স্বাভাবিক। তাই ইদানিং তাদের নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। প্রাণের ভয়ে নদী-নালা সাঁতরিয়ে, নৌকা করে দুর্গম বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে হাজারে হাজারে অসহায় রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে ঢুকছে।

বাংলাদেশ সরকারের ওপর এই অনাকাঙ্কিত বোঝা সেই ’৭৮ সাল থেকে। এবারের মতো এত বড় আকারে শরণার্থী আগে আসেনি। সরকারও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণে তেমন জোরালো উদ্যোগ নেয়নি। যারা এসেছিল তাদের অনেকেই দেশের মূল স্রোতের সাথে মিশে গেছে।

যারা শরণার্থী ক্যাম্পে ছিল তারা একসময় বিহারীদের মতো থেকে যাবে এমনটিই অনুমান করা যাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে বি জি বি এবং বার্মার সীমান্তরক্ষীদের মাঝে ফ্লাগ বৈঠক হয়েছে, এই যা। রোহিঙ্গারা ব্যবহৃত হয়েছে ড্রাগ ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের অপকর্মে।

এবার একসাথে এত বিরাট সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী আসায় সরকারের কিছটা টনক নড়েছে। এত বড় বোঝা বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

তথাপি অত্যাচারের নির্মমতায় মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার সহানুভূতি দেখিয়েছে। সেটা যত বাধ্য হয়েই হোক আপাতত মানবতাই তো বড় বিষয়। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে যত শীঘ্র সম্ভব বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত। এজন্য সরকার আক্রমণ নির্যাতনের তীব্রতা ও শরণার্থী অনুপ্রবেশের চিত্র বি বাসীর কাছে তুলে ধরেছেন।

ইতিমধ্যে তার প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জাতিসংঘ সহ প্রধান প্রধান অনেক দেশ এগিয়ে এসেছে। বার্মা সরকারের প্রতি তাদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বানও জানানো হয়েছে। শরণার্থীদের জন্য বিভিন দেশ সাহায্য নিয়েও এগিয়ে এসেছে।

এমনি সময় জাতিসংঘের বাৎসরিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ সপ্তাহে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক পৌছেছেন। বিশ্ব বাসীর কাছে রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে ধরা এবার তাঁর অন্যতম প্রধান বিষয় বলে জানা গেছে।

গতবছর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে সিরিয়ার শরণার্থীদের পাশে থাকার জন্য বিশ্ব বাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবিতে ভেসে আসা শরণার্থী শিশু আজলানের লাশের দৃশ্য দেখে বিশ^বাসীর ন্যায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মনও ভারাক্রান্ত হয়েছিল। এবার মানবতার দৃষ্টিকোন থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, একাত্তরে তিনি নিজেও শরণার্থী ছিলেন। শরণার্থী হওয়ার যন্ত্রণা তিনি উপলব্ধি করেন। তার এ মমত্ববোধ ও মানবিক আবেগে অবশ্যই আমরা গর্ববোধ করি।

আমরা চাই এবং আশা করি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আবেগ-উচ্ছ্বাস, মমত্ববোধ ও ন্যায়পরাছুতা এরূপ মাপকাঠির নিরিখেই পরিমাপিত হবে। কিন্তু কেন জানি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দু’চোখা দ্বৈত নীতি অবলম্বন করে চলেছেন। বিদ্বেষ ও বিমাতাসূলভ আচরণ দেখাচ্ছেন। বার্মা সরকারের অভিযোগ রোহিঙ্গারা সেদেশের নাগরিক নয়। তারা নাকি বাংলাদেশের নাগরিক।

ধরে নিলাম এই অভিযোগে তাদেরকে দেশছাড়া করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসীরা তো জন্মসূত্রে এদেশের নাগরিক। তারা কেন দেশছাড়া হবেন। শোনা যায় রোহিঙ্গারা মুসলিম বলে তাড়িয়ে দিতে তাদের ওপর বৌদ্ধদের এই অত্যাচার-আক্রমণ। তাহলে ধরে নেওয়া কি অন্যায় হবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসীরা মুসলিম নয় বলে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে?

বিষয়টি সত্য বলে বিশ^াস করতে চাইনা। কিন্তু যখন দেখি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের সমব্যথী হয়ে বিশ্ব বাসীর কাছে আবেদন জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য সমব্যথী হন, আজলানের লাশ দেখে ব্যথিত হন, তখন তারই দেশের সংখ্যালঘু আদিবাসী, পাহাড়ীরা আক্রান্ত হচ্ছে দেখে মনে সে প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া অযৌক্তিক মনে করি না।
যখন দেখি রোহিঙ্গাদের ন্যায় রাজশাহীর চিলিরবন্দর, পাবনার সাথিয়া, গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর, নোয়াখালির বেগমগঞ্জ, চট্টগ্রামের হাটহাজারি, রামু, লংগডু, ব্রাম্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং পাহাড়ীরা একই কায়দার আক্রমণের শিকার, তখন প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। দেশের সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং পাহাড়ীরা দেশত্যাগ করছে, তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এটা দেশের পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে।

স্বাধীনতার পর ৩৩ শতাংশ সংখ্যালঘু এখন ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। চট্টগ্রামে পাহাড়ী ও আদিবাসীরা ছিল ৯১ শতাংশ। সেখানে বাঙালি অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সে সংখ্যা এখন ৪৯ শতাংশ। আর কয়েক বছরে সেখানে বাঙালিদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বাঙালি অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশে।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে রোহিঙ্গা অত্যাচারের সমাধান চাইবেন, ভালো কথা। চাওয়া অবশ্যই যৌক্তিক এবং প্রয়োজন, এতে দ্বিমতের অবকাশ নেই। দেশের জনগণও এ বিষয়ে একমত সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে চরম মানবতা দেখিয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য মানবতা দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। বার্মা সরকারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে এক্ষেত্রে সমঝোতার সুযোগ নেই। যদি ব্যাপারটি তাই হয়, তবে বাংলাদেশের যেসব সংখ্যালঘু ভারতে শরণার্থী হয়েছেন তাদেরকে ফিরিয়ে আনার দাবিটিও নিশ্চয় যৌক্তিক। সাথে যদি রোহিঙ্গাদের সেদেশে থাকার নিশ্চয়তার দাবি তোলা হয়, একইভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের থাকার নিশ্চয়তা বিধানের দাবি তোলাও নিশ্চয় ন্যায়সঙ্গত।আরো যে কারণে যৌক্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত তাহলো, যদি তিনি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন তবে সকলের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সমান।

তবে একথাও ঠিক, গণতন্ত্রের গায়ে তিনি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের আলখেল্লা পরিয়ে রেখেছেন। সুতরাং তাকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা কিংবা নিরপেক্ষ বলি কিভাবে?

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সমস্যা জাতিসংঘে উত্থাপন করতে পারেন না। আপনি নিজের বিরুদ্ধে নিজে অভিযোগ দায়ের করতে পারেননা। অতএব, রোহিঙ্গা ইস্যুই আপনার মূল ইস্যু। এজন্য দুঃখ ও আক্ষেপ করে বলেই রেখেছেন, বিশে^র সব মুসলমান এক হলে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধান কোন বিষয়ই নয়।

অতএব মুসলমান রোহিঙ্গাদের ইস্যুতেই আপনাকে সোচ্চার হতে হবে। আমি কেবল আপনার একমুখী মানবতা ও আড়াল রাখা কর্তব্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিলাম মাত্র।

লেখক: কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

পরিবর্তিত জলবায়ু ও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা
                                  

ড. মুহা: শফিকুর রহমান

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারনে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কৃষি তথা সার্বিক জীবনযাত্রার উপরে। ভৌগলিক অবস্থান, জনসংখ্যার আধিক্য, আর্থসামাজিক অবস্থার কারনে জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বিপদাপন্ন দেশ হিসেবে পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি বিষয়, যা সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ডকে প্রভাবিত করতে পারে। পৃথিবী সৃষ্টির আদিকাল থেকে পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু। এর প্রভাব পড়েছে পরিবেশ ও মানুষের উপরেপরিবেশ, মানুষ ও জলবায়ু অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে আন্ত:সম্পর্কযুক্ত। আমাদের কৃষির সাথেও পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষিক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে পরিবর্তিত পরিবেশে বদলে যাচ্ছে এদেশের খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থা। কৃষিতে সূর্যের আলো, তাপমাত্রা, বাতাসের আদ্রতার মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তনের সাথে ফসলের ধরন, জাত, চাষ পদ্ধতি, উৎপাদনশীলতা নির্ধারিত হয়ে থাকে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমানে তারতম্য ঘটছে এবং এর প্রভাব পড়ছে ফসলের উৎপাদনশীলতার উপর। এ কারণে দেশে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। বাংলাদেশের কৃষি মূলত আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি নির্ভর হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মাত্রাও কৃষিখাতে সবচেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অসম বৃষ্টিপাত, বন্যা, ভুমিক্ষয়, জলবায়ু, শুষ্ক মৌসুমে অনাবৃষ্টি, উপকুলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, শীত মৌসুমে হঠাৎ শৈত্যপ্রবাহ, খরা, টর্নেডো, সাইক্লোন, জলোচ্ছাসের প্রভাবে প্রাদূর্ভাব ও মাত্রা বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও এ দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে ক্রমাগত বিপর্যস্ত করে যা মানব কল্যান ও জনগোষ্ঠির টেকসই জীবনযাত্রা এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিরূপ পরিস্থিতির সাথে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার সামঞ্জস্য বিধান করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষিকে মুক্ত রাখা বা ঝুঁকি কমানো, দূর্যোগমুক্ত সময়ে শস্য বহুমূখীকরন পুষিয়ে নেয়া বিশেষ ভাবে বিবেচ্য। এ রকম পরিস্থিতিতে দেশের খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও দূর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য উপাত্ত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উপযোগি কলাকৌশল ও সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা যায়। যথা প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট কারণ। প্রাকৃতিক কারনগুলোর মধ্যে রয়েছে তাপমাত্রার হ্রাসবৃদ্ধি, মহাসাগরে উত্তাপ শক্তির পরিবর্তন, সুমদ্র স্রোতের পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির দূষন, লানিনো এবং এলনিনোর প্রভাব ইত্যাদি। মনুষ্য সৃষ্ট কারনগুলোর মধ্যে- শিল্প বিপ্লবের পর ঊনবিশংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে জীবাশ্ম জালানীর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া, বন উজাড়, জৈবিক পচন, কৃষিক্ষেত্রে সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারসহ বহুবিধ কারনে বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন প্রকার গ্যাস বিশেষ করে কাবন-ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, এবং গ্রীনহাউজ গ্যাসের পরিমান বেড়ে যাওয়ায় সূর্য থেকে আগত তাপ রশ্মিকে পুনরায় মহাকাশে প্রতিফলিত হওয়ার পথে বাধার সৃষ্টি করে। ফলে পৃথিবী ক্রমাগত উষ্ণ হচ্ছে। আইপিসির (ওহঃবৎ মড়াবৎহসবহঃ ঢ়ধহবষ ড়হ পষরসধঃব পযধহমব) সমীক্ষা অনুযায়ী বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি। আইপিসির পঞ্চম সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্ব তাপমাত্রা ১-২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধির ফলে ফসল উৎপাদন, পানির প্রাপত্যা, জীব বৈচিত্র, তাপ প্রবাহ, অতিবৃষ্টি, উপকূলীয়, জলোচ্ছাস ইত্যাদির উপর প্রভাব পড়েছে। ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা একবিংশ শতাব্দীর শেষে ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করবে ও বিশ্ব পানি চক্রে অসমতা পরিলক্ষিত হবে।

আশংকা করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ গড় তাপমাত্রা ১.০ ডিগ্রী, ২০৫০ সালে ১.৪ ডিগ্রী এবং ২১০০ সালে ২.৪ ডিগ্রী বেড়ে যেতে পারে। সম্প্রতি দেশে উষ্ণ ও শৈত্য প্রবাহের মাত্রা বেড়েছে। বাংলাদেশের ক্রমান্বয়ে শীতকালীন ব্যাপ্তি ও শীতের তীব্রতা দুই-ই কমে আসছে। বেশির ভাগ রবি ফসলেরই স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে ফসলের উপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এছাড়া শীত মৌসুমে উষ্ণ প্রবাহ দেখা দিলে বেশি সংবেদনশীল ফসল যেমন গমের ফলন খুব কমে যায় এবং উৎপাদন অলাভজনক হয়। শৈত্য প্রবাহের সাথে দীর্ঘ সময় কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে অনেক ফসল বিশেষ করে গমের পরাগায়ন ও গর্ভধারন (ফার্টিলাইজেশন) না হওয়ায় আংশিক বা সম্পূর্ণ ফসল চিটা হয়ে যায় এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যায়। এছাড়া প্রজাতি বৈচিত্র কমতে পারে ও প্রজননে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

ধানের ফুল ফোঁটা বা পরাগায়নের সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা তার উপরে গেলে চিটার সংখ্যা বেড়ে যেয়ে শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে। যা ধানের ফলনকে কমিয়ে দেবে। ধানের প্রজনন পর্যায়ে বাতাসের গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে ধানগাছের অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ও অতিরিক্ত চিটা হয় ও ফলনের মারাত্বক প্রভাব পড়ে।

এ কথা অবশ্য স্বীকার্য যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বৈরী জলবায়ুর ( বন্যা, খরা, লবনাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অধিক তাপ সহিষ্ণু) সাথে খাপ খাওয়ানোর মতো উচ্চ ফলনশীল ফসলের নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন ও ব্যবহার এবং এগুলোর চাষাবাদ বাড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে। নতুন শষ্য পর্যায় ও অভিযোজন কৌশলের উপর ব্যাপক গবেষনা জোরদার করতে হবে।

অভিযোজন কৌশল ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা বাড়াতে হবে। লবন সহিষ্ণু, বন্যা সহিষ্ণু, খরা সহিষ্ণু, ঠান্ডা ও তাপ সহিষ্ণু, আলোক সংবেদনশীল ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করে ভবিষ্যত কৃষিকে টেকশই করার জন্য অগ্রাধিকার ভিক্তিতে কৃষিকে যান্ত্রিকিকরন করা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, দেশের প্রতিটি উপজেলায় জলবায়ু ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করে কৃষি, খাদ্য ও অবকাঠামোসহ সবগুলো বিষয় নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা, গবেষনার মাধ্যমে বৈরী জলবায়ুর সাথে অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও তার স্বত:স্ফূর্ত বাস্তবায়ন ঘটানোর মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: পরিবেশ চিন্তক


একজন নোবেল বিজয়ী বনাম রাষ্ট্রহীন একজাতি এবং কিছু কথা
                                  

ইলিয়াস সাগর

ছোটবেলা থেকেই আমার পশু-পাখি পোষার শখ। আব্বা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। যার দরুন আমার ছেলেবেলার অধিকাংশ সময়ই কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আমার পৈত্রিক নিবাস গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানাধীন বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের তালুকদার বাড়ীতে কৈশোরে কিছুটা সময় কাটিয়েছি। তখন আমি দু’টো কুকুর পোষতে শুরু করেছিলাম। কুকুর দুটিই ছিল মাদি কুকুর। একটির রং ছিল সাদা ও আরেকটির রং ছিল কালো। সাদা কুকুরটির নাম রেখেছিলাম ‘ধবলী’ আর কালো কুকুরটির নাম রেখেছিলাম- ‘কাজলী’ কিছু দিনের মধ্যেই কাজলী ও ধবলী আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছিল। ওরা দিনের বেশীরভাগ সময়ই আমাদের ঘরের দরজার সিড়ির দুপাশে বসে থাকতো। আম্মা দরজা খোলা রেখে বাহিরে কাজ করার সময় ধবলী ও কাজলী কে বলতেন “দেখিস, কেউ যাতে ঘরে না আসে” ওরা আম্মা আসার আগ পর্যন্ত একটি মুরগীকেও ঘরে ঢুকতে দিতো না।

আমাদের বাড়ীতে থাকা অবস্থায় ধবলী বেশ ক’টি বাচ্চা প্রসব করলো। ধবলীর বাচ্চাগুলোকে কাজলী মায়ের মতো আগলে রাখতো। একবার আমাদের পাশের বাড়ীর একটি ছেলে একটি বাচ্চাকে ধরেছিলো, অমনি কাজলী সেই ছেলেকে ধাওয়া করে পুকুরে নিয়ে ফেলেছিল।

ধবলী ও কাজলী একসাথে থাকতে থাকতে ওদের মাঝে মমত্ববোধ গড়ে উঠেছিল। যা বর্তমানে মানুষের মাঝে দেখা যায় না। কুকুরদের কিন্তু গোত্র বা ধর্ম নেই। আর ওদেরকে ধর্মপরায়ণ ও মানবিক করার জন্যে পৃথিবীতে কোনকালেই কোন মহামানবের আগমন ঘটেনি। পক্ষান্তরে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষগুলো বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মে বিভক্ত। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন মহামানবের আগমন হয়েছে। আমার জানা মতে প্রতিটি ধর্মই ন্যায়ের কথা বলে, কোন ধর্মই অন্যায়কে সমর্থন করে না। যদিও বিশেষ কোন ধর্মকে নিয়ে আমার অতিমাত্রায় মাথাব্যথা কেনোকালেই ছিল না, এখনও নেই। প্রতিটি ধর্মের মূলমন্ত্রই মানবতা রক্ষা। আমি সাম্প্রদায়িকতার পূজারী নই। আমি বরাবরই অসাম্প্রদায়িক; মানবতার পক্ষে। তবুও যখন দেখি কোন নির্দিষ্ট দল বা গোত্র কোন নির্দিষ্ট গোত্র বা নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের উপর নির্বিচারে লুন্ঠন, হত্যা, ধর্ষণ চালিয়ে তদেরকে দেশছাড়া করছে তখন একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে আমি চুপ করে থাকতে পারি না। তাই আজ আমার এই লেখার অবতারনাÑ

সাম্প্রতিক বিশ্বে জাতিসংঘের বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের অর্থ হলো নৌকার মানুষ, যারা সমুদ্রজলে নৌকা ভাসিয়ে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ‘রোহিঙ্গা’ মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে বসবাসকারী এক মুসলমান জনগোষ্ঠীর নাম। মায়ানমারে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রতিনিয়ত মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা চালাচ্ছে এবং তাদের নেতৃত্বেই দেশ থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ণে চলছে- লুন্ঠন, ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নিসংযোগের মত ঘৃণিত কর্মযজ্ঞ। আর এই রোহিঙ্গা নির্যাতনের পৃষ্ঠপোষক এমন এক মহামানবী যিনি ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। এই মহামানবী ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার আনার পথে নিউইয়র্কবাসীর সামনে তার মুখ গহ্বর থেকে একটি অমূল্য বানী প্রসব করেছিলেন। বাণীটি হলোÑ ‘চূড়ান্তভাবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ বাস্তুচ্যুত, গৃহহীন ও আশাহীন মানুষ মুক্ত একটি পৃথিবী নির্মাণ। তা হবে এমন একটি পৃথিবী, সেখানে প্রতিটি মানুষ থাকবে স্বাধীন এবং তাতে থাকবে শান্তিতে বসবাসের পরিস্থিতি।` ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের পক্ষে(!) কাজ করার জন্য মহামানবী কে নোবেল কমিটি পুরষ্কারটি প্রদান করেন। ১৯৯১ সালে মায়ানমারের সামরিক সরকার কর্তৃক গৃহবন্দি থাকায় ২০১২ সালে তিনি পুরষ্কারটি গ্রহণ করেন।

প্রিয় পাঠক, সবচেয়ে মজার বিষয় কি জানেন ? শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এই মহামানবী আর কেউ নন। নৃশংসতার জন্য হিটলারের পর যার নামটি সাম্প্রতিক বিশ্বে সবার মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে; যিনি রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের মূলহোতাÑ অং সান সু চি !

অং সান সু চি একজন বৌদ্ধ ধর্মালম্বী মানুষ। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক- গৌতম বুদ্ধ। বৌদ্ধ ধর্ম মতে ‘জীব হত্যা মহাপাপ’। তাই তারা নিরামিষ ভোজী। তারা আমিষ অর্থাৎ মাছ-মাংস খায় না। সেই ধর্মের অনুসারী হয়ে সে কিভাবে লুন্ঠন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘৃনিত নৃশংস কর্মযজ্ঞের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন তা কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে বোধগম্য নয়।
এই একবিংশ শতাব্দীতে কি পৃথিবীর আর কোথাও রোহিঙ্গাদের এমন কোন জনগোষ্ঠী আছে যারা অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে পারে না, আর হাসপাতালে গেলেও তাদের চিকিৎসা দেয়া হয় না। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না, তরুণ-তরুণীদের বিয়ে ও সন্তান ধারণে বাঁধা দেয়া হয়। শত শত বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাস করলেও তাদের নাগরিকত্ব নেই। এত অত্যাচার-নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করেও বর্তমানে প্রায় ৮ লক্ষাধীক রোহিঙ্গা মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে বসবাস করেছে। বিভিন্ন সময়ে অত্যাচারের মাত্রা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ ও ওআইসি মিয়ানমার সরকারকে এই সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানালেও মায়ানমার সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না।

প্রতিনীয়ত প্রাণ বাঁচাতে ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধরা ছোট ছোট নৌকায় করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোও তাদের গ্রহণ করতে চাচ্ছে না।

আরাকানের রোহিঙ্গারা সেখানে বসবাস করছেন কয়েক শতাব্দী ধরে। প্রচলিত ধারণায় রোহিঙ্গারা ষোলশ শতকের দিকে আরকানে (বর্তমান রাখাইন রাজ্য) আসা আরব বনিকদের বংশধর। আর মগরা রাখাইন রাজ্যের ভূমিপুত্র। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। পূর্ব ভারত হতে খৃস্টপূর্ব ১৫০০ এর দিকে অস্ট্রিক জাতির একটি শাখা ‘কুরুখ’ এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এরপর ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু (পরবর্তীকালে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম), পাঠান, পার্সিয়ান, আরব, তুর্কি ও মোঘলরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর আবাসস্থল গড়ে তোলেন। বস্তুত এ সকল নৃগোষ্ঠী শঙ্করজাতই রোহিঙ্গা।

পক্ষান্তরে ১০৪৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজ্য দখলদার কট্টর বৌদ্ধ বর্মী রাজা ‘আনাওহতা’ (অহধধিযঃধ) মগদের বার্মা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে আসেন। রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করে আরকানে বৌদ্ধ বসতি স্থাপন করেন। সে হিসেবে রোহিঙ্গাদেরকেই আরাকানের প্রকৃত ভূমিপুত্র বলা যায়, আর মগদের অভিবাসী। পরবর্তীতে সম্রাট নারামেখলার (১৪৩০-১৪৩৪) বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ শাহের সহায়তায় আরকান পুনর্দখল করে এই অঞ্চলের নাম দেন রোসাং বা রোহাং। ধারণা করা হয়, এখান থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি। সেই থেকে আরকানে পাশাপাশি দু’টি ভিন্ন জাতির বসবাস। মোঙ্গোল বংশোদ্ভূত মগ আর পূর্ব-ভারতীয় রোহিঙ্গা। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ পর্যন্ত এখানকার প্রায় ২২ হাজার বর্গমাইলের একটা অঞ্চল রোসাংগ নাম নিয়ে স্বাধীন থাকে।

এ সময় ছোটখাট কিছু দুর্ঘটনা ঘটলেও মগ আর রোহিঙ্গারা মোটামুটি সহাবস্থানেই ছিল। এরপর আসে মহান ব্রিটিশ রাজ। যাদের কূটনামি হিন্দি সিরিয়ালের বউ শাশুরিদের কাজকারবারকেও হার মানায়। আঠার’শ সালের দিকে ব্রিটিশরা এমন একটা খেলা খেলে, যে খেলা পরবর্তীতে উপমহাদেশের মানচিত্রই পাল্টে যায়। খেলার নাম ঐতিহাসিক ‘ডিভাইড এন্ড রুল’। রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে তৎকালীন বার্মার ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীকে তালিকাভুক্ত করে ব্রিটিশরা খেলার বাশিটা বাজিয়ে দেয়। স্বভাবতই ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মুসলিম নিধনের এহেন বাম্পার সুযোগ চিনিতে ভুল করার কথা না, করেনি। রোহিঙ্গারা বহিরাগত আরকানে জোর করে বসতি স্থাপনকারী, মগরা এধরনের প্রোপাগান্ডা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এর চাইতে রোহিঙ্গাদের হত্যা করা, তাদের সম্পদ লুট করার গ্রহণযোগ্য কারণ আর কি হতে পারে। যার ফলে আরকানে ছড়িয়ে পড়ে জাতিগত বিদ্বেষের ভয়ঙ্কর দাবানল। যার সাময়িক অবসান ঘটে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বার্মা তথা বর্তমান মিয়ানমারের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে।

নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবীদদের মতে, বাংলার সঙ্গে আরাকানের রয়েছে হাজার বছরের দীর্ঘ সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক যোগসূত্র। আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসতি হাজার বছরের পুরনো। ঐতিহাসিক এন এম হাবিব উল্লøাহ রচিত ‘ রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস’ বইয়ে লেখা হয়েছে, ৭ম শতকে আরব বণিকদের মাধ্যমে আরাকানের সঙ্গে মুসলমানদের প্রথম পরিচয় ঘটে। আরাকানের চন্দ্রবংশীয় রাজবংশের সংরক্ষিত ইতিহাস ‘রদজাতুয়ে’ এ তথ্য উল্লেøখ রয়েছে। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ এ সম্পর্কের সূত্রপাত দেখিয়েছেন খলিফা হজরত ওমর বিন আব্দুল আজিজের সময়কালে। নানা ইতিহাসগ্রন্থের সাক্ষ্য মতে, ১৪০৬ সালে মিয়ানমার রাজা আরাকান আক্রমণ করলে রাজা নরমিখলা বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তিনি সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন। ১৪৩০ সালে গৌড়ের সহায়তায় আরাকান পুনরুদ্ধার করেন। ১৫৩০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০০ বছর গৌড়ের সুলতানকে কর দিতো আরাকান। ১৫৩০ সালের পর গৌড়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে আরাকান স্বাধীন হয় এবং ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ম্রাউক রাজবংশের অধীনে শাসিত হয়। দীর্ঘ এ সময় পর্যন্ত আরাকানের সব শাসক তাদের নামের সঙ্গে মুসলিম উপাধি ব্যবহার করতেন। গৌড়ের অনুকরণে তাদের মুদ্রার এক পিঠে আরবিতে কালিমা ও রাজার মুসলিম নাম ও তার ক্ষমতা আরোহণের সময় উল্লেøখ থাকতো। সরকারি ভাষা ছিল ফার্সি এবং সৈনিকদের প্রায় সবাই ছিল মুসলমান। পরে জেকুক শাহ’র আমলে পুর্তুগীজ নৌ-সেনাদের সহায়তায় মগদের নিয়ে গঠিত তাদের নৌবাহিনী পরবর্তীতে জলদস্যুতে পরিণত হয়। মগ জলদস্যুরা চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় নির্বিচার লুণ্ঠন আর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সময় অগণিত মুসলমান নর-নারী ধরে নিয়ে যায় আরাকানে এবং তাদের দাস হিসেবে বিক্রি করে। এভাবেও বিপুলসংখ্যক মুসলমানের আগমন ঘটে আরাকানে। ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা ভোদাপায়া দখল করে নেয়ার পর তাদের অধীনে শাসিত হয় আরাকান।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য আরাকান নামে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত প্রায় সব সময়ই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১৭৮৫ সালে বার্মা রাজ ভোদাপায়া আরাকানের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে রাষ্ট্রটি দখল করে নিজ রাজ্যভুক্ত করেন। তখন থেকে আরাকান বার্মার একটি প্রদেশ হিসেবেই আছে।

১৮২৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর সংঘটিত চুক্তিতে আরাকান, আসাম ও ত্রিপুরার ওপর থেকে দাবি প্রত্যাহার করে তৎকালীন বার্মা সরকার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা ভোদাপায়া আরাকান দখল করে নিয়ে এককালের স্বাধীন আরাকান রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটার পাশাপাশি বর্মী বাহিনীর অত্যাচারে রোহিঙ্গা হিন্দু-মুসলিম, রাখাইন নির্বিশেষে দলে দলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে প্রবেশ করে। বর্মী বাহিনীর হত্যা ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে ১৭৯৮ সালে আরাকানের তিন ভাগের এক ভাগ জনসংখ্যা আশ্রয় নেয় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। ১৯৪৮ সালে বার্মা বৃটিশ কর্তৃক স্বাধীনতা লাভ করার পর বিপুলসংখ্যক আরাকানি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আসে। বিশেষ করে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় দুটি জনগোষ্ঠী চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠী।

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। সমস্যা হল সামরিক শাষকদের ক্ষমতায় টিকে থাকতে সবসময় শত্রু শত্রু খেলা খেলতে হয়। নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের জন্য জনগণের সামনে বাস্তব হোক আর কাল্পনিক একটা শত্রু দাড় করাতে হয়। নে উইনেরও একটা গ্রহণযোগ্য কিন্তু দুর্বল শত্রু দরকার ছিল, যাকে ইচ্ছা মত মারধর করা যাবে। কিন্তু তার পক্ষ নিয়ে বাঁধা দেওয়ার মত কেউ থাকবে না। নতুন করে শত্রু খোঁজার চাইতে নে উইন পুরানো দুর্বল প্রতিপক্ষ রোহিঙ্গাদের বেছে নিলেন। নানাভাবে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে দেয় তার নাসাকা বাহিনী! সাথে যোগ দেয় উগ্র ধর্মান্ধ কিছু মানুষ।

একাধিক ইতিহাসবীদের উপরোক্ত লেখাগুলো বিশ্লেষণ করে এটাই প্রতিয়মান হয়েছে যে শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে অনেক উত্থান পতনের পরও বংশানুক্রমিকভাবে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেই বসবাস করছে। ওরা মিয়ানমারেরই নাগরীক। বিভিন্ন সময়তারা বৌদ্ধদের কর্তৃক শোষণের শিকার হয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ে যেসব তথ্য সামনে এসেছে তাতে বোঝা যায়, সমস্যা অতি পুরনো ও অত্যন্ত জটিল। ৭০০-৮০০ বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন বা আরাকানে বসবাস করা সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করছে না। বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে সমস্যাটিকে ব্যবহার করে আসছে।

১৯৭৮ সালে দিনের বেলা রোহিঙ্গাদের উপর নেমে আসে নিকষ কালো অন্ধকার, সরকারি বাহিনী সামরিক অভিযান পরিচালনা করে নিরস্ত্র রোহিঙ্গাদের উপর। নিপীড়নের দেয়ালে শেষ পেরেক ঠুকে ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে। যাকে মগের মুল্লøুক বলে আর কি। সেই থেকে রোহিঙ্গা আদ্যবধি রাষ্ট্রহীন জাতি। ঐতিহ্যগত ভাবে ভারতীয়দের সহ্য ক্ষমতা অসীম এবং কিছুটা স্বার্থপর যে কারণে তাদের শোষণ করা অন্যান্য অঞ্চল থেকে তুলনামূলক সহজ। রোহিঙ্গারাও এর বাইরে না। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে তাদের শিক্ষা, ভ্রমণ, বিয়ে, সন্তানগ্রহণের মত মৌলিক অধিকারের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও বাংলাদেশে প্রবেশ করা ছাড়া স্থানীয় রোহিঙ্গাদের দিক থেকে দৃশ্যমান কোনো প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি। এই সুযোগটি লুফে নিয়ে সামরিক সরকার নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। পূর্বে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করলেও ১৯৮২ সালের পর তারা এই পথ থেকে সরে আসে। যেকোনো ভাবে রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়া করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এক্ষেত্রে ধর্মীয় উস্কানির মাধ্যমে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া ছিল সামরিক জান্তা সরকারের তুরুপের তাস।

১৯৯১-৯২ সালে এসে সামরিক জান্তা সফল হয়। রোহিঙ্গাদের সাথে মগদের ভয়াবহ দাঙ্গা বেধে যায়। পেছন থেকে মগদের সাহায্য করে সেনাবাহিনী। দাঙ্গায় প্রায় ৮,০০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা এবং ২ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাস্তুচ্যুত করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি এবারও রোহিঙ্গারা দৃশ্যমান প্রতিরোধ করতে ব্যার্থ। তাদের লক্ষ্যই যেন মগদের ঠেঙ্গানি খেয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ। ২০১০ সালে অং সান সু চি বন্দিত্ব দশা থেকে মুক্তি পান। রোহিঙ্গারা নতুন আশায় বুক বাধে। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেত্রী নিশ্চয় তাদের জন্য শান্তি বয়ে আনবেন। কিন্তু বোকা রোহিঙ্গারা জানে না নেত্রীর লক্ষ্য শান্তি কায়েম না, ক্ষমতার হিস্যা হওয়া। ২০১২ সালের নির্বাচনে তিনি সেটা পেয়েও যান। এরপর রোহিঙ্গারা বাঁচল না মরল তা নিয়ে উনার ভাবার অবকাশ কোথায়! নিউইয়র্ক, নরওয়ে স্টোকহোমে বক্তৃতা দিলে অনেক হাততালি জোটে। খামোখা রোহিঙ্গা নিয়ে কথা বলে মোড়ল দেশগুলোর বিরাগভাজন হতে যাবেন কেন? আশাহত রোহিঙ্গাদের সামনে সশস্ত্র আন্দোলন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

২০১২ সালের জুলাইয়ে সু চি যখন নিউইয়র্কবাসিকে বাস্তুহীন মানুষের জন্য কাল্পনিক পৃথিবী গড়ার ফাকাবুলি আওড়াচ্ছিলেন, তখন তার জাত ভাইয়েরা আরও বেশি মানুষকে বাস্তুহীন করার জন্য প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছিল। এবার অবশ্য বর্মীরা রোহিঙ্গা নিধনে খুব বেশি সফল হতে পারেনি।

অবশ্য বাস্তুহীন করার ক্ষেত্রে এবারো তারা সফল, আনুমানিক ২২ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে ঘরছাড়া হয়। বার্মার গণতান্ত্রীক সরকার! বুঝতে পারে শান্তিপূর্ণভাবে আর রোহিঙ্গা নিধন সম্ভব না। দীর্ঘদিন মার খেতে খেতে এরা প্রতিরোধ শিখে গেছে। তাই রাখঢাক ছেড়ে ২০১৫ থেকে আবারো সামরিক অভিযান শুরু করে। আইওয়াশ হিসেবে বিশ্ববাসীকে দেখায় আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা সংক্ষেপে আরসার সৃষ্টিকে যা আরকানের অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী বলে দাবি করা হয়। ২০১৫ থেকে দফায় দফায় নানা ছুতোয় সেনাবাহীনি রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন জারি রাখে। কখনো উসিলা দেখায় নিরাপত্তা চৌকিতে আক্রমন, আবার কখনোবা বর্মী নারী ধর্ষণ। আমরাও নাসাকা বাহিনীর প্রোপাপান্ডা গিলে বলছি রোহিঙ্গারা জন্মগতভাবে অপরাধী। অথচ একবারও ভেবে দেখিনি নাসাকা বাহীনির কথা! যদি সত্যিও হয় তবু একজন মানুষের অপরাধে তারা কিভাবে একটা নৃগোষ্ঠীকে বাস্তুহীন করার অধিকার পায়? কোনো বেসামরিক মানুষকে হামলা না করে সামরিক চৌকিতে হামলা করার পরও আরসাকে আমরা জঙ্গি বলছি।

রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কিছুই নেই। আছে ফোর্স লেভার দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। টেকনাফ ও উখিয়ার পথে পথে মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষদের জানা গেছে- রাষ্ট্রীয় কাজে বিনে পারিশ্রমিকে রোহিঙ্গাদের শ্রম দিতে বাধ্য হওয়ার এমন অনেক গল্প। তবু তারা নিজ দেশেই থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক সরকার যে উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা শুরু করেছিল, তা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

বৃটিশ আমলসহ বিভিন্ন সময়ে এসব অঞ্চল একই প্রশাসনের অধীনে থাকায় নানা সময়ে নানা জনগোষ্ঠীর মানুষ মিয়ানমারে যেমন গেছে, তেমনি এসেছে বাংলায়। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে বঙ্গ এবং চট্টগ্রাম থেকে যেমন মানুষ আরাকানে গেছে তেমনি আরাকানসহ মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দলে দলে রাখাইন, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর লোকজন এসেছে বাংলাদেশে। বর্তমানে তারা চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করছেন। ইতিহাসবিদরা বলছেন, মিয়ানমারের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর নাম। মাত্র দুই দশক আগেও বার্মার মূলধারার রাজনীতি এবং নির্বাচনে ছিল তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতি। কিন্তু দেশটির সামরিক জান্তা দেশ, রাজধানী, আরাকান, আকিয়াবের নামের মতোই পাল্টে দিয়েছে অনেক কিছুই। সুপরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলতে চাইছে একটি জাতিগোষ্ঠীর চিহ্ন।

আজকে রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে এসেছে, এক সময় চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের রাখাইনরাও কিন্তু সেখান থেকে শরণার্থী হিসেবেই এদেশে এসেছিল। স্বার্থ ও রাজনীতির কারণে এখন যুক্তি ও মানবতা মার খাচ্ছে।

সু চি দেশে-বিদেশে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছে । বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে মেনে নেয়নি সু চি’র সে অযৌক্তিক দাবি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে একাধিকবার।

রাশিয়া, চীন ও ভারত মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। অনেক সরকার ও কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ মানবিক বিপর্যয় দেখে সেদিক থেকে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে থেকে সমস্যার সমাধানের কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ বাংলাদেশের ভূমিকার খুব প্রশংসা করছে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কথার ওপর আস্থা রাখা যায় না। আর জাতিসংঘে তো শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোরই সংঘ।

রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বড় সমস্যা হিসেবে দেখছে কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সিভিল সোসাইটি সেভাবে উপলব্ধি করছে বলে মনে হয় না। তাদের বক্তব্যেও পারস্পরিক ভিন্নতা ফুটে ওঠে। এনজিও মহল তাদের অবস্থানে থেকে কথা বলছে এবং কাজ করছে। এই বহুত্ববাদী বাস্তবতায় বাংলাদেশের জাতীয় অনৈক্য প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুত্ববাদ দারুণ জাতীয় অনৈক্যের পরিচয়কে প্রকটিত করছে। এর ফলে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে দুর্যোগের মুহূর্তে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর সামনে নিজেকে ঐক্যহীন ও দুর্বল প্রমাণ করছে। আমরা চাই, বহুত্ববাদ নয়, বহুত্বমূলক সংহতি; আমরা চাই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। বহুত্ব ও বৈচিত্র্যকে যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে ঐক্য। এনজিও ও সিএসও মহল থেকে প্রচারিত বহুত্ববাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জনজীবনের জন্য সমূহ বিপদের কারণ হচ্ছে। আমি তবুও মানবিকতার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের সমস্যা উত্তরণের পক্ষে
রোহিঙ্গাদের ওপর এহেন ভয়াবহ নির্যাতনের পরও বিশ্ববিবেক যেন বধির। বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এতোদিন কোন কার্যকর পদক্ষেপ না নিলেও এখন কিছুটা নড়েচরে বসতে শুরু করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব এক বিবৃতিতে বলেছেন- মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের যে তথ্য পাওয়া গেছে তা রক্ত হিম হওার মতো। নোবেল কমিটি অং সান সু চি’র নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করেছে। কানাডা সু চি’র নাগরিকত্ব বাতিল করে তাকে জাবতজীবন কারাদ-ে দন্ডিত করেছে। বিভিন্ন শক্তিধর দেশগুলো সু চি’র উপর চাপ প্রেয়োগ করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইতোমদ্ধেই বহির্বিশ্বে জনমত তৈরী করতে শুরু করেছে। বিশ্বেও বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বিশ্বসাহিত্য একাডেমি, বাংলাদেশ চলচিত্র পরিবার, বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, মানবাধিকার খবরসহ অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনগুলো মায়ানমাওে রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রতিবাদে সোচ্চার রয়েছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চাপের ফলে অং সান সু চি কে ভোল পাল্টাতে দেখা যাচ্ছে। সু চি তার এক ভাষনে রোহিঙ্গাদেও ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিন্তু পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক চাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য এটা সু চি’র একটা নয়া কৌশল। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে সমস্যার সাময়িক সমাধান হতে পারে। তাছাড়া মিয়ানমারকে প্রভাবমুক্ত করে রাখাইনকে আবার স্বাধীন আরাকানে পরিণত করতে পারলেই শুধু এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তা না হলে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বাঁচানো সম্ভব নয়। জাতিসংঘ, ওআইসি, মুসলিম বিশ্ব ও বিশ্বের সকল মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হলে এবং এ ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলেই নির্যাতনের অবসান সম্ভব।

আজ কয়েক যুগ পরে ‘ধবলী’ ও ‘কাজলী’কে আমার বড্ড বেশী মনে পরছে। ওদের মধ্যে যে মমত্ববোধ আমি দেখেছি তা সত্যিই দৃষ্টান্ত স্থাপনের দাবীদার। ওরা কুকুর হয়েও একে অপরের বাচ্চাকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে। যা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রানী মানুষের মাঝে তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না। আর মিয়ানমারের বৌদ্ধদের মধ্যেতো নয়ই। কিছুদিন একসাথে থাকার ফলে ‘ধবলী’ ও ‘কাজল’র মধ্যে যে মমত্ববোধ গড়ে উঠেছিল তার কিয়দাংশ যদি মায়ানমারের বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের মাঝে গড়ে উঠতো তবে ‘রোহিঙ্গা মুসলমানরা’ বিশ্বেও সবচেয়ে নির্যাতিতো জাতি হিসেবে গন্য হতো না। এখন একটি কথাই জানতে ইচ্ছে করছে- শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি’র চেয়ে কি আমার ‘কাজলী’ই উত্তম ছিল ?

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
প্রধান নির্বাহী, বিশ্বসাহিত্য একাডেমি।

ই-মেইল : eliasshagar@gmail.com        

বাংলাদেশে ধর্ষণপ্রবণতা ও প্রতিকার ড. খুরশিদ আলম
                                  

মহান সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষের জন্য বিনামূল্যে অক্সিজেন বা নির্মল বায়ু সেবনের ব্যবস্থা রেখেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ এ জন্মগত মৌলিক অধিকার ভোগ করে। আমরা বায়ুপ্রাপ্তির উৎস নিয়ে মোটেও চিন্তা করি না। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্রমাগত কার্বন নির্গমনের ফলে ভূমণ্ডলের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক বাড়ছে। দূষিত হয়ে উঠছে আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ বায়ু। প্রতি বছর জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়ে আলোচনা করছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। লক্ষ্য একটাইÑ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী রাখা। কিন্তু ধনী দেশগুলোর আগ্রাসী মনোভাবের জন্য কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও আশার বাণী হচ্ছে, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ১৭৫টি দেশ তাপমাত্রা ও দূষণ কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে রাজি হয়েছে।
ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমগ্র বিশ্ব কয়লাকে নোংরা জ্বালানি আখ্যায়িত করে এটা বর্জন করছে বা কয়লাপ্রযুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দূষণ থেকে বাঁচার জন্য বেলজিয়াম ৩০ মার্চ ২০১৬ তাদের শেষ কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করে কয়লাকে বিদায় দিয়েছে। ফ্রান্স ২০২৩, ইংল্যান্ড ২০২৫ ও নেদারল্যান্ড ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সব কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ভারত ২০১৬ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার চারটি প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে। (সূত্র ঃ অস্ট্রেলিয়ার রিনিউ ইকোনমি অনলাইন পত্রিকা, ৬ অক্টোবর ২০১৬)। চীনের ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনআইএ) ১৪ জানুয়ারি ২০১৭ কয়লাভিত্তিক ১০৩টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের আদেশ জারি করেছে। ১১টি প্রদেশে অবস্থিত এ প্রকল্পগুলো ১০০ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। কয়লার পরিবর্তে ২০২০ সালের মধ্যে ১৩০ গিগাওয়াটে উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। (সূত্র ঃ প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি ২০১৭)।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। ভারতের দিল্লি রয়েছে সবার শীর্ষে। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। এই দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে ২০১৫ সালে ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। (সূত্র ঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানচেটে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। বায়ুদূষণের প্রভাবে এসব শহরে প্রতি মিনিটে দুইজন মানুষ মারা যায়। দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান, ১০ মার্চ ২০১৩-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লা বিদ্যুৎ দূষণের জন্য ভারতে প্রতি বছর এক লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যায়।
গত ৮ এপ্রিল ২০১৭ ঢাকায় একটি সেমিনারে ভারতীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সৌম দত্ত বলেন, দিল্লি শহরের বায়ুদূষণের জন্য শতকরা ৭২ ভাগ দায়ী হচ্ছে ৭৫০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তিনি আরো বলেন, গুজরাটের মুদ্রাতে টাটা পাওয়ার এবং আমদানি গ্রুপ দু’টি বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করে ২০০৮-২০০৯ সালে, ইতোমধ্যে প্রকল্পসংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বন শতকরা ৬০ ভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে পানিদূষণের জন্য নদীতে মাছ নেই বা কোনো প্রাণী নেই। মানুষের জন্য খাবার পানি সঙ্কট তাই লরির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৭ পরিবেশবিষয়ক সংগঠন গ্রিন পিচ এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণের কারণে এক লাখের মতো মানুষ মারা যায়। কয়লা ব্যবহারের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রা ব্যাপক হারে বাড়বে। এতে মৃত্যুর হার তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ৫০ হাজার মানুষের জীবন বাঁচবে, যদি ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, কোরিয়া, জাপান নতুন কোনো কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ না করে বা নতুন সব কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ২০১১ সালের তুলনায় ২০৩৫ সালে বিদ্যুতের চাহিদা শতকরা ৮৩ ভাগ বাড়বে। গ্রিন পিচের বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ লাউরি মাইলিভিটরা বলেছেন, কয়লার পাশাপাশি চীন ও ভারত জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। চীন ২০১৩ সলে থেকে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে তারা প্রায় পুরোটাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে। ভারতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ছে। (সূত্র ঃ গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনাল, প্রেস রিলিজ, ১৩ জানুয়ারি ২০১৭)।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০২২ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১৭৫ গিগাওয়াটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মোদি সরকার সম্প্রতি ৫০টি ‘সোলার পার্কের’ অনুমোদন দিয়েছে। এগুলোর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৪০ গিগাওয়াট। (সূত্র ঃ প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৭)।
বেশ কয়েক বছর ধরে চীনের বিভিন্ন শহরে বায়ুদূষণ প্রকট আকার ধারণ করছে। বিশেষভাবে বেইজিং ও সাংহাই শহরে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। চীনা নাগরিক লিয়াং কিগান ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম ফ্রান্স থেকে একটি জারে করে বিশুদ্ধ বাতাস এনে বায়ুদূষণের প্রতিবাদে নিলামে তা বেইজিংয়ে ৮৬০ মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। (সূত্র ঃ ইউএসএ টুডে, ১১ এপ্রিল ২০১৪)। বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের জন্য চীনের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা বোতলজাত বায়ু ক্রয় করে ব্যবহার করছেন। লিও ডি অটস ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েক শ’ বিশুদ্ধ বায়ুর জার ইংল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করে চীনে বিক্রি করেন। প্রতি জার ৮০ পাউন্ড এবং চায়না নিউ ইয়ার উপলক্ষে ১৫ জার একসাথে ৮৮৮ পাউন্ড বিক্রি করেন। (সূত্র ঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ইউ কে, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। এখন অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করা বিশুদ্ধ বায়ুর বোতল চীনের বায়ুদূষিত শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছে।
আগেই উল্লেখ করেছি, ঢাকা এখন বায়ুদূষণে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অবশ্য বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষে ওঠা এবারই প্রথম নয়; ইকোনমিস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ঢাকা দ্বিতীয় বসবাসের অযোগ্য শহর বলে বিবেচিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। ফোর্বসের ২০০৮ সালের রিপোর্টে ঢাকাকে নোংরা শহর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পরিবেশসহ সব অধিদফতর থাকা সত্ত্বেও আমরা ঢাকাকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে পারিনি, বরং সেটা বেড়েই চলছে। বিগত বছরগুলোয় বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য, টেক্সটাইল ও ডাইং বর্জ্য, অন্যান্য কারখানার দূষণ সবই নদীতে পড়ছে। ঢাকার বায়ুদূষণ হয়েছে ইটের ভাটা, কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির দূষণ ইত্যাদি কারণে। অর্থাৎ কয়লা বিদ্যুতের ধোঁয়া ছাড়াই। আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিল্পপতি তাদের কলকারখানায় ইটিপি ব্যবহার করেন না বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে আগ্রহী নন। অধিক মুনাফার লোভে, পরিবার ও সন্তানদের জন্য ধন-সম্পদ বানাতে গিয়ে তাদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করেছেন! উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বা উন্নত দেশের সাথে আমাদের তুলনা করলে চলে না। কারণ আমাদের নদীদূষণ, বায়ুদূষণসহ সব ধরনের পরিবেশ দূষণের জন্য আমাদের ব্যক্তি স্বার্থ বা হীন মানসিকতাই দায়ী। এটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের আইনকানুন প্রয়োগের সক্ষমতা সম্পর্কে তুলে ধরা এবং বাস্তবতার আলোকে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে সহযোগিতা করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক দেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবল ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে। এমনই ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ২৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার, যার বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। (সূত্র ঃ দৈনিক সকালের খবর, ১৭ জানুয়ারি ২০১৭)। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৫৫৫০.৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তার মধ্যে কয়লা থেকে আসছে প্রায় ১.৬১ শতাংশ। সরকার ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫০ শতাংশ কয়লা থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। বলা যেতে পারে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন, উন্নয়ন বা অর্জন যা হয়েছে তা কয়লা ছাড়াই হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো জ্বালানি ব্যবহার করতে আমাদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দামও ওঠানামা করছে। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক শক্তি থেকে প্রাপ্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সূর্যের আলো, বায়ু ও পানি ব্যবহার করতে আমাদের কোনো টাকা খরচ হচ্ছে না। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অফুরন্ত সূর্যের আলো আমরা জ্বলানি হিসেবে পাচ্ছি। পরিশেষে বলতে চাই, সভ্যতার ঊষালগ্নে প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা যৌথভাবে মোকাবেলা করার জন্য মানুষ যে সমাজ গঠন করেছিল তা ব্যক্তিস্বার্থে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। যদিও হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, তারপরও আমি হাল ছেড়ে দিতে চাই না, থাকতে চাই আশাবাদী, দেখতে চাই সরকার একটি সবুজ বাসযোগ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের সম্ভাবনা যখন সঙ্কুচিত, বায়ুদূষণে মানুষের জীবন যখন সঙ্কটাপন্ন, তখন আমাদের উচ্চাভিলাষী মেগা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কতটুকু যৌক্তিক ও নীতিনৈতিক, সেটা সরকারকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি। এ প্রবন্ধের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে আবেদন-নিবেদন করে বলতে চাই- ‘কয়লাকে না বলুন’। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন টেকসই জ্বালানি। এ ক্ষেত্রে কয়লা নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সমাধান।
লেখক ঃ পরিবেশকর্মী ও চেয়ারম্যান, সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি চাই, কয়লা নয়
                                  


মহান সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষের জন্য বিনামূল্যে অক্সিজেন বা নির্মল বায়ু সেবনের ব্যবস্থা রেখেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ এ জন্মগত মৌলিক অধিকার ভোগ করে। আমরা বায়ুপ্রাপ্তির উৎস নিয়ে মোটেও চিন্তা করি না। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর ক্রমাগত কার্বন নির্গমনের ফলে ভূমণ্ডলের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক বাড়ছে। দূষিত হয়ে উঠছে আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ বায়ু। প্রতি বছর জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়ে আলোচনা করছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। লক্ষ্য একটাইÑ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী রাখা। কিন্তু ধনী দেশগুলোর আগ্রাসী মনোভাবের জন্য কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও আশার বাণী হচ্ছে, ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ১৭৫টি দেশ তাপমাত্রা ও দূষণ কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে রাজি হয়েছে।
ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পকে বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমগ্র বিশ্ব কয়লাকে নোংরা জ্বালানি আখ্যায়িত করে এটা বর্জন করছে বা কয়লাপ্রযুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দূষণ থেকে বাঁচার জন্য বেলজিয়াম ৩০ মার্চ ২০১৬ তাদের শেষ কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করে কয়লাকে বিদায় দিয়েছে। ফ্রান্স ২০২৩, ইংল্যান্ড ২০২৫ ও নেদারল্যান্ড ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সব কয়লা বিদ্যুৎ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ভারত ২০১৬ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার চারটি প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে। (সূত্র ঃ অস্ট্রেলিয়ার রিনিউ ইকোনমি অনলাইন পত্রিকা, ৬ অক্টোবর ২০১৬)। চীনের ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনআইএ) ১৪ জানুয়ারি ২০১৭ কয়লাভিত্তিক ১০৩টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের আদেশ জারি করেছে। ১১টি প্রদেশে অবস্থিত এ প্রকল্পগুলো ১০০ গিগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। কয়লার পরিবর্তে ২০২০ সালের মধ্যে ১৩০ গিগাওয়াটে উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। (সূত্র ঃ প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি ২০১৭)।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। ভারতের দিল্লি রয়েছে সবার শীর্ষে। ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। এই দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে ২০১৫ সালে ৪২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। (সূত্র ঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭)। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানচেটে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। বায়ুদূষণের প্রভাবে এসব শহরে প্রতি মিনিটে দুইজন মানুষ মারা যায়। দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান, ১০ মার্চ ২০১৩-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লা বিদ্যুৎ দূষণের জন্য ভারতে প্রতি বছর এক লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যায়।
গত ৮ এপ্রিল ২০১৭ ঢাকায় একটি সেমিনারে ভারতীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সৌম দত্ত বলেন, দিল্লি শহরের বায়ুদূষণের জন্য শতকরা ৭২ ভাগ দায়ী হচ্ছে ৭৫০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তিনি আরো বলেন, গুজরাটের মুদ্রাতে টাটা পাওয়ার এবং আমদানি গ্রুপ দু’টি বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করে ২০০৮-২০০৯ সালে, ইতোমধ্যে প্রকল্পসংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বন শতকরা ৬০ ভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে পানিদূষণের জন্য নদীতে মাছ নেই বা কোনো প্রাণী নেই। মানুষের জন্য খাবার পানি সঙ্কট তাই লরির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৭ পরিবেশবিষয়ক সংগঠন গ্রিন পিচ এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণের কারণে এক লাখের মতো মানুষ মারা যায়। কয়লা ব্যবহারের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রা ব্যাপক হারে বাড়বে। এতে মৃত্যুর হার তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ৫০ হাজার মানুষের জীবন বাঁচবে, যদি ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, কোরিয়া, জাপান নতুন কোনো কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ না করে বা নতুন সব কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ২০১১ সালের তুলনায় ২০৩৫ সালে বিদ্যুতের চাহিদা শতকরা ৮৩ ভাগ বাড়বে। গ্রিন পিচের বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ লাউরি মাইলিভিটরা বলেছেন, কয়লার পাশাপাশি চীন ও ভারত জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। চীন ২০১৩ সলে থেকে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে তারা প্রায় পুরোটাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছে। ভারতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ছে। (সূত্র ঃ গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনাল, প্রেস রিলিজ, ১৩ জানুয়ারি ২০১৭)।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০২২ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১৭৫ গিগাওয়াটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মোদি সরকার সম্প্রতি ৫০টি ‘সোলার পার্কের’ অনুমোদন দিয়েছে। এগুলোর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৪০ গিগাওয়াট। (সূত্র ঃ প্রথম আলো, ৩ এপ্রিল ২০১৭)।
বেশ কয়েক বছর ধরে চীনের বিভিন্ন শহরে বায়ুদূষণ প্রকট আকার ধারণ করছে। বিশেষভাবে বেইজিং ও সাংহাই শহরে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। চীনা নাগরিক লিয়াং কিগান ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম ফ্রান্স থেকে একটি জারে করে বিশুদ্ধ বাতাস এনে বায়ুদূষণের প্রতিবাদে নিলামে তা বেইজিংয়ে ৮৬০ মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। (সূত্র ঃ ইউএসএ টুডে, ১১ এপ্রিল ২০১৪)। বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের জন্য চীনের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরা বোতলজাত বায়ু ক্রয় করে ব্যবহার করছেন। লিও ডি অটস ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েক শ’ বিশুদ্ধ বায়ুর জার ইংল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করে চীনে বিক্রি করেন। প্রতি জার ৮০ পাউন্ড এবং চায়না নিউ ইয়ার উপলক্ষে ১৫ জার একসাথে ৮৮৮ পাউন্ড বিক্রি করেন। (সূত্র ঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ইউ কে, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। এখন অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করা বিশুদ্ধ বায়ুর বোতল চীনের বায়ুদূষিত শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছে।
আগেই উল্লেখ করেছি, ঢাকা এখন বায়ুদূষণে বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অবশ্য বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষে ওঠা এবারই প্রথম নয়; ইকোনমিস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ঢাকা দ্বিতীয় বসবাসের অযোগ্য শহর বলে বিবেচিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে বায়ুদূষণে ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। ফোর্বসের ২০০৮ সালের রিপোর্টে ঢাকাকে নোংরা শহর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পরিবেশসহ সব অধিদফতর থাকা সত্ত্বেও আমরা ঢাকাকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে পারিনি, বরং সেটা বেড়েই চলছে। বিগত বছরগুলোয় বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য, টেক্সটাইল ও ডাইং বর্জ্য, অন্যান্য কারখানার দূষণ সবই নদীতে পড়ছে। ঢাকার বায়ুদূষণ হয়েছে ইটের ভাটা, কলকারখানার ধোঁয়া, গাড়ির দূষণ ইত্যাদি কারণে। অর্থাৎ কয়লা বিদ্যুতের ধোঁয়া ছাড়াই। আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিল্পপতি তাদের কলকারখানায় ইটিপি ব্যবহার করেন না বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে আগ্রহী নন। অধিক মুনাফার লোভে, পরিবার ও সন্তানদের জন্য ধন-সম্পদ বানাতে গিয়ে তাদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করেছেন! উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বা উন্নত দেশের সাথে আমাদের তুলনা করলে চলে না। কারণ আমাদের নদীদূষণ, বায়ুদূষণসহ সব ধরনের পরিবেশ দূষণের জন্য আমাদের ব্যক্তি স্বার্থ বা হীন মানসিকতাই দায়ী। এটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের আইনকানুন প্রয়োগের সক্ষমতা সম্পর্কে তুলে ধরা এবং বাস্তবতার আলোকে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে সহযোগিতা করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিশ্বের অনেক দেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবল ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে। এমনই ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ২৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার, যার বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। (সূত্র ঃ দৈনিক সকালের খবর, ১৭ জানুয়ারি ২০১৭)। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৫৫৫০.৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তার মধ্যে কয়লা থেকে আসছে প্রায় ১.৬১ শতাংশ। সরকার ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫০ শতাংশ কয়লা থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। বলা যেতে পারে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন, উন্নয়ন বা অর্জন যা হয়েছে তা কয়লা ছাড়াই হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো জ্বালানি ব্যবহার করতে আমাদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দামও ওঠানামা করছে। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক শক্তি থেকে প্রাপ্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সূর্যের আলো, বায়ু ও পানি ব্যবহার করতে আমাদের কোনো টাকা খরচ হচ্ছে না। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অফুরন্ত সূর্যের আলো আমরা জ্বলানি হিসেবে পাচ্ছি। পরিশেষে বলতে চাই, সভ্যতার ঊষালগ্নে প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা যৌথভাবে মোকাবেলা করার জন্য মানুষ যে সমাজ গঠন করেছিল তা ব্যক্তিস্বার্থে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। যদিও হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, তারপরও আমি হাল ছেড়ে দিতে চাই না, থাকতে চাই আশাবাদী, দেখতে চাই সরকার একটি সবুজ বাসযোগ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশুদ্ধ বায়ু সেবনের সম্ভাবনা যখন সঙ্কুচিত, বায়ুদূষণে মানুষের জীবন যখন সঙ্কটাপন্ন, তখন আমাদের উচ্চাভিলাষী মেগা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প কতটুকু যৌক্তিক ও নীতিনৈতিক, সেটা সরকারকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি। এ প্রবন্ধের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে আবেদন-নিবেদন করে বলতে চাই- ‘কয়লাকে না বলুন’। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন টেকসই জ্বালানি। এ ক্ষেত্রে কয়লা নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সমাধান।
লেখক ঃ পরিবেশকর্মী ও চেয়ারম্যান, সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন।

চৌদ্দ এপ্রিল মানেই পহেলা বৈশাখ?
                                  


বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন অর্থাৎ বাংলা নতুন সনকে সাদর সম্ভাষণ জানানো একটি বিশেষ পর্ব যার মূলে রয়েছে একটি অর্থ- জাতিগত চেতনা। অবশ্য সমাজ-রাজনীতির আবর্তন-বিবর্তনে এই পর্বটি আজ নানাভাবে ক্ষত-বিক্ষত। তবু একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন ধর্ম ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব শ্রেণির বাঙালির আজো জাতীয় উৎসব।
বাঙালির জীবনে নানা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধন করেছিল একমাত্র এই ‘বাংলা নববর্ষ’। ধর্মীয় পার্থক্য বাঙালি জাতিকে যেভাবেই হোক, খানিকটা বিভক্ত করেছে। একই দেশের দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাঙালিরা বিভক্ত নামে, সম্বোধনে, আদব-কায়দায়, আহার-পানীয়তে, পোশাক-পরিচ্ছদে এবং আরো নানাভাবে। কিন্তু জীবনচর্চাতে তাদের পার্থক্য নেই। এই জীবনচর্চাটিই মূল। বাঙালি মুসলিমদের সঙ্গে অন্য দেশীয় মুসলিমদের ধর্ম ও ব্যক্তিনামের সাদৃশ্য থাকলেও জীবনচর্চায় সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। কিন্তু বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে বাঙালি মুসলিমদের ধর্ম ও ব্যক্তিনামের মিল না থাকলেও জীবনচর্চায় তারা এক। এখানেই সংস্কৃতির প্রাণসুতো বিদ্যমান। বাঙালি বৌদ্ধ বা বাঙালি খ্রিস্টানদের মধ্যেও ধর্ম ও ব্যক্তিনামের পার্থক্য দেখা যাবে। কিন্তু জীবনচর্চায় তারা এক। এই অভিন্নত্বই মহামূল্যবান। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বিভক্ত পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ দুটি স্বাধীন দেশ ভারত ও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পৃথক রাষ্ট্রীয সত্তায় বাঙালিরা নিজেদের অজান্তেই পরস্পর থেকে খানিকটা দূরে সরে আসে। ১৯৫২ সালে অবাঙালিদের গ্রাস থেকে বাংলা ভাষাতে মুক্ত করার আন্দোলন অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, তার ধারাবাহিকতায় গর্বিত হয় সমগ্র বাঙালি জাতি। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি দিবসটি একান্তভাবে এবং সরকারিভাবে বাংলাদেশের বাঙালিদের। আজ অবশ্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কারণে একুশে ফেব্রুয়ারির বৈশ্বিক পরিচিতি মিলেছে। তার পরও একুশে ফেব্রুয়ারির আবেদন ও চেতনা বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে যেমন, অন্য বাঙালিদের কাছে তেমন নয়, এমন কি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের কাছেও নয়। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন: পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ হবে ‘বাংলাদেশ’; ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ; দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তা হিসেবে ‘বাঙালি’র স্বীকৃতি; পরবর্তীকালে সামরিক শাসনের প্রতিক্রিয়ায় ‘বাঙালি জাতীয়তা’কে বদল করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তা’ করা ইত্যাদি বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে যেমন সংগ্রামের ও স্মরণযোগ্য ইতিহাস, ভারতীয় বাঙালিদের কাছে তেমনটি নয়। অন্য দিকে, ১৯৯২-’৯৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গ’ নাকি ‘বাংলা’ নাকি ‘গৌড়’ রাখা হবে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক  বিশেষ মাত্রায় পৌঁছেছিল। পশ্চিমবঙ্গের পত্র-পত্রিকা, সভা-সেমিনার, রাজনৈতিক মঞ্চ এমন কি পার্লামেন্টে প্রস্তাব ও তর্কের ঝড় বয়ে গিয়েছিল সে সময়। এই বিতর্কে তৎকালে জড়িয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিজনই; দেখা গেছে বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে এ আলোচনা মোটেও আগ্রহব্যঞ্জক ছিল না, কেউ কেউ এর সামান্য খবর রেখেছে মাত্র। রাষ্ট্রীয় এই চেতনাগত পার্থক্য জাতীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনকে প্রভাবিত করে না, হলফ করে এ কথা বলা যায় না।
উচ্চারিত ভাষাভঙ্গি থেকে শুরু করে ব্যবহৃত শব্দ এমন কি অনেক ক্ষেত্রে বাক্য গঠনগত মৌল পার্থক্য বাংলাদেশের বাঙালি ও ভারতীয় বাঙালিদের পৃথক করেছে। সাহিত্য ও সংবাদপত্রের ভাষাতেও এই পার্থক্য স্পষ্ট বোঝা যায়। দৈনিক ‘আনন্দবাজার’, ‘বর্তমান’, ‘আজকাল’ বা ‘সংবাদ প্রতিদিন’ নামের সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশনের ঢঙ্ এবং সংবাদের ভাষা অবশ্যই পৃথক ঢাকার পত্রিকা দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’, ‘সংবাদ’, ‘ইত্তেফাক’, ‘জনকণ্ঠ’ ইত্যাদি থেকে। দৈনিক ‘কালের কণ্ঠে’র নিয়মিত একজন পাঠকের সংবাদপঠন গতি এ কারণেই ব্যাহত হতে বাধ্য ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ পাঠ করার সময়Ñ যদিও উভয় পত্রিকার ভাষাই বাংলা এবং ভাষারীতি চলিত। পশ্চিমবঙ্গে ব্যবহৃত ‘আধিকারিক’ বা ‘নিগম’ শব্দের সঙ্গে ‘অফিসার’ / ‘কর্মকর্তা’ বা ‘কর্পোরেশন’ ব্যবহারকারী বাংলাদেশের বাঙালিজন পরিচিত নন। অন্যদিকে ‘সড়কদ্বীপ’ শব্দটি শুনে যে কোনো ভারতীয় বাঙালি চমকে উঠতে পারেন। তাকে কষ্ট করে বুঝে নিতে হবে, এটা তাদের দেশের ‘ট্রাফিক আইল্যান্ড’। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ‘মরিচ’কে ‘লংকা’ বলতেই অভ্যস্ত। রান্নার ‘চুলা’কে তারা ‘উনুন’ বলে থাকেন। এ পার্থক্যগুলো ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষার ওপর হিন্দি ভাষার প্রভাব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। অন্য দিকে বাংলাদেশের বাংলা ভাষার ওপর আরবি-পারসি ভাষার প্রভাবও যথেষ্ট। বাংলাদেশের কোনো লেখায় ঈশ্বর দাস সকাল সকাল ‘গোশল’-এর পর ‘নাস্তা’ সেরে এক গ্লাস ‘পানি’ পান করেন। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের লেখায় তেমনি আবদুর রহমান ‘স্নান’ শেষে সকালের ‘জলখাবার’ সেরে এক গ্লাস ‘জল’ পান করেন। ‘জল’ ও ‘পানি’ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাঙালিরা স্পষ্ট বিভক্ত। বাংলাদেশের মুসলিমদের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল এবং এখনো অনেকের মধ্যে আছে যে, ‘পানি’ হলো মুসলমানি শব্দ অর্থাৎ আরবি বা পারসি। তাই বাংলাদেশের মুসলিম পরিবার ও সমাজে ‘পানি’ ব্যবহারের প্রচলন হয়। একই দেশ ও সমাজভুক্ত বলে বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে সে ধারাতেই ‘জল’ ব্যবহার এখন বেশ কমে গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের হিন্দুরাতো বটেই, অনেক এলাকাতেও হিন্দুদের ঘরে ‘পানি’ ব্যবহার হয়। পশ্চিমবঙ্গে ‘পানি’ ব্যবহার করে অবাঙালিরা; মুসলিমরাও ‘জল’ বলায় অভ্যস্ত। ‘পানি’ মুসলমানি শব্দÑ এ ধারণাটি সত্য নয়। তার প্রমাণ বাঙালির প্রাচীন ও মধ্যযুগের গ্রন্থগুলো। সে সব গ্রন্থে প্রয়োজন অনুসারে ‘পানি’ ও ‘জল’ উভয় শব্দের ব্যবহার আছে। আসলে ‘পানি’ হলো হিন্দি শব্দ যা মূলত সংস্কৃত ‘পান’ থেকে এসেছে। সংস্কৃতের ‘পানীয়’ই হলো হিন্দি ‘পানি’। আর ‘জল’ সংস্কৃত শব্দ। অর্থাৎ দুটোরই মূল সংস্কৃত। কিন্তু ‘জল’ ও ‘পানি’র ব্যবহার নিয়ে বাঙালিদের অ™ভুত রকমের ছুঁৎমার্গ দেখা যায়! অথচ মজার ব্যাপার, যারা সচেতনভাবে ‘জল’ ব্যবহার করে তারা প্রাত্যহিক জীবনে কিন্তু ‘পানিফল’ বা ‘পান্তা’ (পানি+তা) খেয়ে বা বলে থাকে। আবার যারা ‘পানি’ ছাড়া অন্য কিছু বলবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে, তারাও কিন্তু ছবি আঁকার সময় ‘জলরং’ ব্যবহার করে; ‘জলবায়ু’র পরিবর্তনে হঠাৎ ‘জলোচ্ছ্বাস’ এলে ভয় পেতেই হয়; মন্দ কিছু তারা ‘জলাঞ্জলি’ দিয়ে থাকে; ‘জলছাদ’ ফেটে গেলে তাদের ঘরে পানি পড়ে! অর্থাৎ ‘জল’ ও ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি ও বাংলাদেশের বাঙালিদের মধ্যে পার্থক্যরেখা টানা গেলেও ‘পানিফল’, ‘পান্তা’, ‘জলছাদ’, ‘জলোচ্ছ্বাস’, ‘জলবায়ু’, ‘জলরং’, ‘জলকামান’, ‘জলাঞ্জলি’, ‘জলাশয়’ ইত্যাদি বহু শব্দ দিয়ে তারা মিশে গেছে একে অপরের সঙ্গে। এখানেই সংস্কৃতির প্রাণসুতোটি এক ও অভিন্ন ধারায় প্রবাহিত। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল ‘শ্রী’ নূরুল হাসান কিন্তু বাংলাদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী ‘জনাব’ দিলীপ বড়–য়া। ‘শ্রী’ এবং ‘জনাব’ ব্যবহারের এই রীতিটিও কিন্তু লক্ষ্যযোগ্য।
অনেকে এই বিষয়গুলোকে ‘মামুলি ধরনের’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইবেন কিংবা সংস্কৃতি বিচারে এগুলোকে উপরিকাঠামোগত পার্থক্য বলে বিবেচনায় আনতে অপারগতাও প্রকাশ করতে চাইতে পারেন। কিন্তু জীবনপ্রয়াসে অঙ্গীভূত, রাষ্ট্রীয় চেতনায় আত্তীকৃত (যে রাষ্ট্র বা সরকারব্যবস্থা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত), সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে যাপিতজীবনে সংযুক্ত যে উপাদানগুলি একান্ত সহযোগী বা অবশ্য প্রয়োজনীয়Ñ তাকে যদি ‘সংস্কৃতি’ বলে আমরা সংজ্ঞায়িত করে থাকি, তাহলে গুরুত্বের নিরিখে উপরিউক্ত বিষয়সমূহ নিতান্তই অপ্রধানÑ একথাও বলার দুঃসাহস আমাদের নেই। কেননা ইংরেজি ‘কালচার’ আর বাংলায় যাকে আমরা ‘সংস্কৃতি’ বলে থাকি, সেখানে ‘চর্চা’র প্রসঙ্গটি প্রধান বিবেচ্য। মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী বলেই সামাজিক সংস্কার-কুসংস্কারকে তারা যেমন সহজেই অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করতে পারে না, ঠিক তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় প্রভাবকে এড়িয়ে সমাজ বিকশিত হয় না। কারণ সংস্কৃতি হলো মানবজীবনের অলিখিত ইতিহাস, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরণের সঙ্গে যুক্ত। যদিও সমাজে সংস্কৃতি নির্ভরতা লক্ষ করা যায়, তথাপি সমাজই সংস্কৃতির ওপর প্রভুত্ব বা আধিপত্য বিস্তার করে তাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ সমাজের আন্তরকাঠামোজাত গতিশীলতাই একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ধরন নির্ণয়ের মৌল অবলম্বন। তাই জাতিগত মূল পরিচয়টি সংস্কৃতিতেই ধারণ করা থাকে। সমাজকাঠামোর ওপর সমকালীন রাজনীতির প্রভাবকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। তবে রাজনীতি ধীরে ধীরে সমাজকে বদলে দিতে পারে: সৎ রাজনীতি সমাজকে ভালোভাবে বদলায়, প্রগতিমুখী করে; অপরাজনীতি সমাজকে বদলায় কি¤ভূতকিমাকার করে। সমাজের বাঁক বা বদলরূপেও এখানে অন্তঃসলীলার মতো প্রবাহিত থাকে সংস্কৃতি।
আজ বাঙালি ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত, উপরন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে খ-িত। অনেকে আবার নির্বাসিত জীবিকার প্রয়োজনে এই ব্যস্ত পৃথিবীর কোনো প্রান্তে। সমাজ, রাজনীতি ও কালের প্রবাহে বাঙালির দেহ আজ খ--বিখ-। এই খ-িতাবস্থা দূরত্বের সৃষ্টি করছে। একে একদেহ করা আজ আর সম্ভবপর নয়। এ দূরত্ব বরং স্পষ্টতর হয়ে উঠছে দিনকে দিন। তাই যারা আজো ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’ অভিধাটি ব্যবহার করছে, তাদের আবেগ থাকতে পারে, কিন্তু সেখানে বস্তুগত বাস্তবতা নেই। কিন্তু পৃথিবীর তাবৎ বাঙালির খ-িত দেহে যে শোণিত প্রবাহিত তার বর্ণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য অভিন্ন। এই অভিন্নতাই বাঙালিকে পৃথক ও স্বতন্ত্র রেখেছে পৃথিবীর অন্য জাতিগুলো থেকে। বিশ্বের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের সুর তাই আজো এক তন্ত্রীতে ধ্বনিত।
এই অভিন্ন রাগিণীর সুর-মূর্ছনায় আমরা বছরে অন্তত একদিন পরস্পরের খুব সন্নিকটে চলে আসতাম। আরো কিছু দিবস ছিলÑ যেমন, চৈত্র সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি ইত্যাদি। কিন্তু সেগুলো আজ খ- খ-ভাবে পালিত হলেও সমষ্টিগতভাবে আমাদের নাগালের প্রায় বাইরে। এই কিছু দিন আগেও ধর্মীয় বা দৈশিক সব সংস্কার নিষেধের ঊর্ধ্বে সমগ্র বাঙালি জাতি অখ-িতভাবে মেতে উঠতাম একটিমাত্র জাতীয় উৎসবেÑ ‘বাংলা নববর্ষে’। কিন্তু আজ আর তা হয় না। বাঙালিরা আজ বিশ্ব জুড়ে সত্যি দ্বিধা বিভক্তÑ এই পহেলা বৈশাখের দিনেও। ফসল ফলানো ও খাজনা আদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে চান্দ্র বছর হিজরির পাশাপাশি মুসলিম সম্রাট আকবরের সময় সৌর বৎসর হিসেবে ‘ফসলি সন’ বা ‘বাংলা সন’ প্রবর্তিত হয়। মুসলিম সম্রাট প্রবর্তিত হলেও বাঙালি হিন্দু-মুসলিম ধর্ম নির্বিশেষেই এই সনকে আপন সন হিসেবে গ্রহণ করে। ‘হাল’ ও ‘খাতা’ এ দুটি আরবি শব্দকে একীভূত করে বাঙালিজন আরম্ভ করে ‘শুভ হালখাতা’র পালা। এ সব ক্ষেত্রে তারা ভাবেনি ভারতভূমিতে আরবি ভাষায় উৎসবের নামকরণ হবে কেন? যে নামেই হোক, উৎসবটাকে তারা আপন করে নিয়েছে। কিন্তু কালক্রমে সমাজ ও রাজনীতির অনিবার্য অভিঘাত ও তার প্রভাবে বাংলা সন ও তার আনুষ্ঠানিকতায় পাকিস্তান আমলে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার লেবেল সাঁটার অপচেষ্টা চলে। বলা হয়, এটা হিন্দুদের অনুষ্ঠান! সাধারণ মুসলিমরা এই ভাষ্যকেই সত্য ভেবেছে। তাই এতে ক্ষতিও হয়েছে অনেক। তবে এই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয় হিন্দু-মুসলিম সমন্বিত সাধনার কাছে।
অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসনামলে সম্পন্ন হয় ‘পঞ্জিকা সংস্কার’! যাদের বাড়িতে পঞ্জিকা ছিল না, যাদের পূর্বপ্রজন্ম পঞ্জিকা দেখবার প্রয়োজন বোধ করত না, এমন কি যাদের জীবনে পঞ্জিকার গুরুত্ব দেখা যায়নি কোনো দিন, তারাই উদ্যোগী হয় পঞ্জিকা সংস্কারের জন্য। বুঝতে অসুবিধা হয় না, পঞ্জিকা সংস্কার তাদের উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য বাঙালির অখণ্ড চেতনার মধ্যে ধর্মীয়ভাবে একটি ভেদরেখা টানা।  বাঙালি জীবনের প্রচলিত পঞ্জিকা সংস্কারের নামে খ্রিস্টীয় সনের এপ্রিলের চৌদ্দ তারিখের সঙ্গে সেঁটে দেয়া হয় পহেলা বৈশাখ! শুধু তাই নয়, বাংলা সন আরম্ভ হতো সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। এই নতুন নিয়মে রাত বারটার পর থেকে এখন বাংলা সন আরম্ভ হবে। কী অ™ভুত, কী উপনিবেশকামী মানসিকতা, কী কূটসাম্প্রদায়িকতা!! খ্রিস্টীয় সনে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুসারে লিপইয়ার থাকবে, বছরের দিবস কম-বেশি হবে, মাসগুলোও যে যার বৈশিষ্ট্য নিয়ে থাকবে আর তাকে অনুসরণ করবে বাংলা সন। বাংলা সনের নিজস্ব কোনো বৈশিষ্ট্য থাকবে না। ইংরেজদের যে দিন চৌদ্দই এপ্রিল আমাদের সেদিন পহেলা বৈশাখ! ভাবটা এমন, এ ছাড়া বাংলা সন বা তারিখের বাঙালির জীবনে আর কোনো প্রয়োজন নেই। তাহলে প্রশ্ন: পহেলা বৈশাখের নামে আমরা কি প্রকারান্তরে চৌদ্দই এপ্রিলই উদ্যাপন করছি না? বাংলা সনকে কি শুধুই পহেলা বৈশাখে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি না আমরা? এ রকম অনেক জিজ্ঞাসার মধ্যেই প্রতি বছর আসে পহেলা বৈশাখ। নতুন প্রজন্ম এখন জানে, পহেলা বৈশাখ দুদিনÑ বাংলাদেশে এক দিন, পশ্চিমবঙ্গে আরেক দিন। এই জানাকে সাম্প্রদায়িকতা দিয়েও বোঝে অনেকেÑ বলে, হিন্দুদের পহেলা বৈশাখ এক দিন, মুসলিমদের পহেলা বৈশাখ আরেক দিন!! কিন্তু তারা আজ জানে না, এই স্বাধীন বাংলাদেশেই কিছু কাল আগে পঞ্জিকা সংস্কারের নামে বাংলা সনের সর্বনাশ করা হয়। সন প্রতিষ্ঠার সময় বাংলা মাসগুলোর নামকরণ করা হয়েছিল নক্ষত্রের নামে। তাই বিশাখা নক্ষত্র সমাগমের আগেই বৈশাখ মাস গণনা আরম্ভ হতে পারে না। আমাদের পঞ্জিকা সংস্কারে নক্ষত্রের ধার ধারা হয়নি। বাংলাদেশে চৌদ্দ এপ্রিল মানেই পহেলা বৈশাখ! এ-ও সম্ভব!!            লেখকঃ অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভালোবাসার পয়লা বৈশাখ
                                  

সন্দেহবাদীরা প্রশ্ন উত্থাপন করতেই পারেন, পয়লা বৈশাখ অন্য দশটা দিনের চেয়ে আলাদা কিভাবে। সেই তো একইভাবে সূর্য ওঠে এবং অস্ত যায়, দিনের আলো নিভে আসে, সন্ধ্যার আঁধার ঘনায়। তারপরের দিন বা আগের দিনের থেকে পয়লা বৈশাখ ভিন্ন কী হিসেবে?
শিশুরা যখন জন্মায় তখন আর দশটা শিশুর সঙ্গে তার কি তেমন কোনো পার্থক্য থাকে? তবু মায়ের কাছে তার শিশু মহার্ঘ্য, অমনটি আর হয় না। কেন এমন মনে হয়? ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখেন বলে। তেমনি পয়লা বৈশাখকে আমরা ভালোবাসার চোখে দেখি, তাই ওই দিনটা অন্য সকল দিনের থেকে আলাদা লাগে আমাদের কাছে।
এ-প্রশ্নও উঠতে পারে যে, সারা বছর বাংলা পঞ্জির খোঁজ কজন রাখে? তাহলে পয়লা বৈশাখে এত সাজসজ্জা, এত নৃত্যগীতবাদ্যপুষ্প দিয়ে সাড়ম্বরে তাকে বরণ করা কি একটা লোক দেখানো ব্যাপার, একটা ভণ্ডামি নয়?
আমাদের ব্যবহারিক জীবনে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার নেই বললে চলে। তাই হঠাৎ করে কাউকে বাংলা তারিখ জিজ্ঞেস করলে সে প্রায়ই ঠিক জবাব দিতে পারে না। যদি বাংলা মাসের হিসেবে আমরা মাস-মাইনে পেতাম, আদালতে আমাদের ডাক পড়ত, বিদ্যুৎ-গ্যাস-টেলিফোনের বিল দিতে হতো, তাহলে বাংলা তারিখ আমাদের ঠিকই মনে থাকত। তবু যে বছরের প্রথম দিনে আমরা অনুষ্ঠান করে, আড়ম্বর করে তাকে আবাহন করি, তাও মিথ্যে নয়। আমাদের যে একটা নিজস্ব বর্ষপঞ্জি আছে, আমরা যে সকল ক্ষেত্রে পরনির্ভর নই, সেটা আমরা উপলব্ধি করতে চাই, অন্যকে জানাতে চাই। তাই এমন আয়োজন।
 
আমাদের দেশে নববর্ষ-উৎসব পালিত হতো গ্রামাঞ্চলে মেলা করে। শহরাঞ্চলে ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে সম্বৎসরের দেনা-পাওনার হিসাবের সারসংগ্রহ করতেন, ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ-রীতি, মনে হয়, আবহমান কালের। ইংরেজদের দেখাদেখি বাঙালিরাও নিউ ইয়ার্স ডে পালন করতেন দেখে ব্যথিত হয়ে উনিশ শতকের শেষে রাজনারায়ণ বসু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা নববর্ষ-উৎসব পালনের রীতি প্রবর্তন করেন, পরে তা ছড়িয়ে যায়।
আমার ছেলেবেলা কেটেছে কলকাতায়। সেখানে হালখাতার অনুষ্ঠানে গেছি পিতার হাত ধরে। মিষ্টি শুধু খেয়ে আসিনি, প্যাকেটে করে নিয়েও এসেছি। দেশভাগের পরে যখন ঢাকায় এলাম, তখন নববর্ষের অনুষ্ঠান প্রথম দেখি মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটেথ বোধহয় লেখক-শিল্পী মজলিসের উদ্যোগে। অন্যত্রও সে-অনুষ্ঠান পালিত হয়েছিল, বোধহয় একবার কার্জন হলেও। পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে আমরাও তার আয়োজন করেছি সওগাত অফিসেথ তবে নিয়মিত নয়।
ধীরে ধীরে টের পাওয়া যায় যে, এই অনুষ্ঠান সরকারের পছন্দ নয়। আমার শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধের শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সেই পঞ্চাশ দশকেই এক প্রবন্ধ লিখে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইরানি মুসলমানেরা যদি ইসলামপূর্ব নওরোজ অনুষ্ঠান সাদরে উদ্যাপন করতে পারে, তাহলে আমরা কেন বাংলা নববর্ষ পালন করতে পারব না। বিশেষ করে, যেখানে বাংলা বছরের শুরু সম্রাট আকবরের রাজস্ব-সংস্কারের ফলে, সেখানে তো ওই বর্ষপঞ্জি মুসলমানের দান বলেই গণ্য করতে হবে। থএসব প্রশ্নের উত্তর কেউ কখনো দেয়নি। যারা নববর্ষ পালন করার, তারা তা করে গেছে। সরকার তাদের সন্দেহের চোখে দেখেছে, নথিপত্রে তাদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের উত্তরাধিকারীরা কিন্তু তাতে দমেনি। ষাটের দশকে ছায়ানটের উদ্যোগে সংগঠিতভাবে নববর্ষ পালন শুরু হলো। সে-যাত্রা এখনো চলছে। এমনকি পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা মেরেও তা থামানো যায়নি।

 

 

                                                                         
এরই মধ্যে, এবারে, আওয়ামী ওলামা লীগ নামধারী এক ভুঁইফোড় সংগঠন ফতোয়া দিয়েছে, বাংলা নববর্ষ-পালন অনৈসলামিক, ওটা বন্ধ করে দিতে হবে। যে-কথা পাকিস্তান আমলেও জোরেশোরে বলা যেত না, বাংলাদেশে তা অনায়াসে বলে ফেললেন এই ধর্মব্যবসায়ীরা।
সরকার আবার নিরাপত্তার অজুহাতে দুটি ব্যবস্থা নিয়েছেন। চারুকলা অনুষদ থেকে যে মঙ্গল-শোভাযাত্রা বের হয়, তাতে মুখোশপরা চলবে না এবং বিকেল পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করে ফেলতে হবে।
মঙ্গল-শোভাযাত্রায় মুখোশধারী কেউ প্রবেশ করে নাশকতামূলক কিছু করে ফেলবেথ এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। দুর্বৃত্তের ভয়ে গৃহস্থকে তাহলে প্রতিরোধের ব্যবস্থা না নিয়ে পলায়নের পথ খুঁজতে হবে। মেয়েদের লাঞ্ছিত করার ভয় থাকায় যাঁরা আজ পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে বলছেন, কাল যে তাঁরা মেয়েদেরকে ঘরের বাইরে বেরোতে নিষেধ করবেন না, তার নিশ্চয়তা কী?
বাংলাদেশে তাহলে কি আমরা কেবল পেছন দিকে চলতে থাকব? শহিদ মিনারে আলপনা আঁকাকে, পুষ্পার্ঘ্য দেওয়াকে একসময় অনৈসলামিক বলা হয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে, বরকত ও সফিউর রহমানের কবরে যেতে মেয়েদের বাধা দেওয়া হয়েছিল। তখন তাঁরা কেউ নিজের জায়গা থেকে সরে যাননি এবং ছাত্রনেতারা আজিমপুর গোরস্তানের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের সঙ্গে যুক্তিতর্কে বিজয়ী হয়ে তাঁদের প্রবেশাধিকার আদায় করে নিয়েছিলেন। ছয় দশকের বেশি সময় পরে আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি।
যে-পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শকে আমরা ভেঙেচুরে বহু ত্যাগের বিনিময় বাংলাদেশ অর্জন করেছি, সেই বাংলাদেশকে কি আমরা আরেকটা পাকিস্তান বানাতে চাই? নিশ্চয় কিছু লোক চায়, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ তা চায় না। আমাদের কি আবার ১৯৫২র মতো রক্ত দিতে হবে, ১৯৬৯-এর মতো গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে হবে? তবেই ধর্মব্যবসায়ীরা ইঁদুরের গর্তে লুকাবেন এবং দেশে সুস্থ সবল স্বাধীন সংস্কৃতিচর্চা সম্ভবপর হবে? ইতিহাসের শিক্ষা কি আমরা নেবো না? তারপরও অযৌক্তিক বাধানিষেধ থাকবে?
ছায়ানটের নববর্ষের অনুষ্ঠানে যখন বোমার আক্রমণ ঘটেছিল, তারপর ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের টেলিভিশন সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা কি আগামী বছরে এখানে আবার আসবে? নিদ্বর্ধিয় তারা জবাব দিয়েছিল, আমরা আবার আসব। এখানেই বাংলাদেশের শক্তি। প্রতিক্রিয়াশীলদের ভয়ে এই শক্তিকে আমরা যেন দুর্বল না করে ফেলি।

নতুন ধারায় আসছে মানবাধিকার খবর
                                  

 

 
 
 
 
 
 
 
 

মানবাধিকার খবর পত্রিকাটি নতুন নয়। এটি গত পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে। দেশে-বিদেশে রয়েছে এর ব্যাপক পরিচিতি।পত্রিকাটি এত দিন বাংলাদেশের লাখো পরিবারের মুখপত্র হিসেবে রয়েছে। ফলে আমাদের পাঠক সংখ্যা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।

আমরা এটিকে সারা বিশ্বে পরিচিতি আনতে নতুন সাজে নেমেছি। এখন থেকে মানবাধিকার খবর হবে গণমানুষের হৃদয়ের পত্রিকা।

বড়দিন বারতা ও তাৎপর্য
                                  


ড: ফাদার তপন ডি’ রোজারিও
বড়দিন! ক্রিস্টমাস! প্রভু যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন স্মরণে আনন্দ মহোৎসব। এ উৎসব যত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্যাপন করা হয় যে, খ্রীষ্টানদের আর কোন ধর্মীয় উৎসব তত বাহ্যিক চাকচিক্য আর অনন্দ-স্ফুর্তির মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করা হয় না বললেই চলে। এর কারণ, শতাব্দী ধরে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে ও জাতিতে সুন্দর সুন্দর অর্থপূর্ণ লৌকিক প্রথা ও সংস্কার বড়দিন প্র¯দতিতে যুক্ত হয়ে বাহ্যিকতার পাশাপাশি ভক্তি ও বিশ্বাসের বিস্তার ঘটিয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যবশতঃ বর্তমান যুগে বড়দিনের বাহ্যিক ও ব্যাবসায়িক মূল্য প্রাধান্যের প্রতিযোগিতায় এ পবিত্র ছুটির দিনের ধর্মীয় তাৎপর্য বহুলাংশে নি®প্রভ। মাত্র অল্পসংখ্যক খ্রীষ্টভক্ত স্মরণ করে যে এ বড়দিনের প্রতিটি খ্রিস্টিয় প্রথা ও ঐতিহ্যের এক একটি ভিন্ন ইতিহাস অথচ অভিন্ন ধর্মীয় পটভূমি রয়েছে।
বড়দিন ব্যুৎপত্তি ও শুভেচ্ছা বাণী: বড়দিন বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন জার্মান ভাষায় ভাইনাখ্টেন (পবিত্র রজনী), ফরাসীতে ন্যূয়েল (ঐশ রজনী), স্প্যানিশে নাভিদাদ (জন্ম রজনী) এবং ইতালীয় ভাষায় নাতালে (নবজাতকের রাত্রি) ইত্যাদি। এই বাংলাদেশেও এককালের পর্তুগীজ জমিদারীর খ্রীষ্টান লোকলয়গুলোতে (ভাওয়াল, হুসাইনাবাদ-বান্দুরা, পাদ্রিশিবপুর, দিয়াং-চাটগাঁ) কেউ কেউ বড়দিনকে নাতাল বলতে অভ্যস্ত ছিল। তবে বহুল পরিচিত খ্রীষ্টমাস-এর বুৎপত্তি প্রাচীন ইংরেজী ’খ্রীস্তেস মেসে’ অর্থাৎ ’খ্রীষ্টের মীসা বা খ্রিস্টের স্মরণে উৎসব’ থেকে। যীশু খ্রিস্টের জন্ম হয় রাতে তাই প্রায় সব ভাষায় রাত্রি শব্দটির ব্যবহার আছে কিšদ লক্ষণীয় যে বাংলাতে প্রচলিত আছে দিনের কথা। সম্ভবত বৃটিশ শাসিত ভারতে, ক্রিস্টমাস যে একটি ’গ্রেট ডে’ তা বুঝাতে সংস্কৃত ভাষায় ’মহা দিবাসা’ বা হিন্দি ও উর্দ্দু ’বড়া দিন’ বাংলাভাষীদের কাছে বড়দিন নামে প্রচলিত হয়ে থাকতে পারে! আবার ডিসেম্বর মাসের এ সময় থেকে দিবাভাগ ক্রমে ক্রমে বড় হতে থাকে বলেও উৎসব দিবসটি এ নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকতে পারে বলে মতামত রয়েছে। আসলে রাতে বা দিনে ২৫ ডিসেম্বর আজ থেকে ২০১৬ বছর আগে এ ধরাতে যিনি মানব জন্ম নিয়েছিলেন তিনি সত্যিসত্যি মহান ও বড়। এদিন তাঁর জন্ম হয়েছে বিধায় দিনটি আর সাধারণ দিন নয় বরং বড়দিন! এদিন যে তাঁর সাথে, তাঁর আহ্বান, তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ মতে তাঁর সকল অনুসারীদের অন্তরে ও মনে বড় হবার দিন- তাই ব ড় দি ন।
নানাবিধ খ্রিস্টিয় প্রথা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ বড়দিনের কার্ড, ক্যারোল, কীর্তন, টেক্সট মেসেজ, গিফ্ট, কেইক আর সাক্ষাৎ আনন্দ শুভেচ্ছায় বলা হয় ’উইস্ ইউ এ মেরি ক্রিস্টমাস এন্ড এ হ্যাপী নিউ ইয়ার’ বা ’সুখের বড়দিন ও শান্তি সমৃদ্ধির শুভ নববর্ষ’। ঈশ্বর মানব জাতির পরিত্রাণের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার ইয়েশুয়া বা যীশুকে দান করলেন। তিনি নিয়ে আসেন শান্তি, একতা ও প্রেমের অমোঘ বারতা।
যীশু খ্রিস্টের জন্ম বিষয়ে নবীদের ঘোষণা: অনেক প্রবক্তা বা নবীগণের মধ্য দিয়েই মশীহ অর্থাৎ মুক্তিদাতা ও তাঁর রাজ্যের আগমন এবং সেই রাজ্যের  বৈশিষ্ট তথা শান্তি, একতা, ন্যয্যতা ও ভালবাসার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতীকী ভাষায় ব্যক্ত নবী ইসাইয়ার প্রাবক্তিক বাণী হল: ”সেদিন জেসে বংশের সেই মূল কান্ড থেকে বেরিয়ে আসবে একটি নতুন পল্লব; তার শিকড় থেকে জন্ম নেবে এক নবাঙ্কুর। সেই নবাঙ্কুর যিনি, তাঁর ওপর অধিষ্ঠিত থাকবে পরমেশ্বরের আত্মিক প্রেরণা প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির আত্মিক প্রেরণা, সদ্বিবেচনা ও শক্তির আত্মিক প্রেরণা, জ্ঞান ও ভগবৎ-সম্ভ্রমের আত্মিক প্রেরণা। আর এই ভগবৎ সম্ভ্রম তাঁকে অনুপ্রাণিত করবে। তিনি বাইরের চেহারা দেখেই বিচার করবেন না, পরের কথায় কান দিয়ে রায়ও দেবেন না; বরং তিনি দুঃখী দীনের বিচার করবেন ধর্মের নীতিতে; দেশের দীনজনের সপক্ষে রায় দেবেন ন্যায়েরই বিধানে। ... ধর্মময়তা হবে তাঁর কটিবাস, বিশ্বস্ততা হবে তাঁর কোমরবন্ধনী” (ইসাইয়া ১১:১-৫)।  
যীশু খ্রিস্ট জন্ম নিয়েছেন ঐশ প্রতিশ্রুতির পূর্ণতারূপে: সময় পূর্ণ হলে ঈশ্বর তাঁর পুত্ররূপে (ঐশতাত্বিক অর্থে) তাঁরই পূর্ণ প্রকাশরূপে এই পৃথিবীতে পাঠালেন তাঁকে; তাঁর নাম রাখা হল যীশু অর্থাৎ ত্রাণকর্তা। যীশুর জন্ম কুমারী মারীয়ার গর্ভে (যাকে বিশ্বাসে বলা হয় নিষ্কলঙ্কা) পবিত্র আত্মার শক্তিতে। এখানে একান্তভাবেই উলে¬খ্য যে, পুরো ঘটনাটি একটি ঐশ-রহস্য এবং এখানে রয়েছে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ঐশ-হস্তক্ষেপ। জাগতিক ইতিহাসে, বিশেষ এক কৃষ্টি নিয়ে বিশেষ সময়ে এশিয়া মহাদেশেই তাঁর জন্ম; কিšদ অলৌকিকভাবে। ঈশ্বরের মুখের বাণী হয়ে মানুষেরই মাঝে বসবাস করতে এবং মানুষকে ঈশ্বর-সন্তানের অধিকার দিতে তিনি মানবদেহ ধারণ করে এই পৃথবীতে আগমন করেন। তিনি ঈশ্বরত্বকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করে, পুরো ঈশ্বর থেকেই পাপ ব্যতীত অন্য সবকিছুতেই তিনি পুরোপুরি মানুষরূপে এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। এভাবে মানুষরূপে জন্ম গ্রহণ করে তিনি মানুষের দীনতাকে আলিঙ্গন করেন, মানুষের পাপকে আপন স্কন্ধে নেন যেন মানুষকে পাপমুক্ত করে তার জন্য স্বর্গে যাবার পথ উন্মুক্ত করে দিতে পারেন। যেভাবে তাঁর জন্ম তার বাস্তবতাই এ সত্য প্রকাশ করে। ব্যতিক্রম হলেও সত্য যে, যীশু জন্ম নেন বেথলেহেমের ছোট্ট গোশালায়; যাবপাত্র ছিল তাঁর শয়ন-¯দান। তাঁর এই ব্যতিক্রমধর্মী জন্ম প্রকাশ করে পাপী-তাপী, দুঃখী মানুষের জন্য ক্ষমা, মুক্তি, আনন্দ এবং তার সাথে একাত্মতা! এ যেন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ”স্বর্গের সিড়ি বেয়ে” মর্তে আগমন, মর্তের মানুষকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য। এভাবে মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেন সৃষ্টিকর্তা পরমেশ্বরের কাছে যাবার জন্য  পথ, সত্য ও জীবন। যীশুর এই জন্ম-সংবাদ সর্ব প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল যারা দীনদরিদ্র কিšদ সহজ সরল, সত্য, স্বচ্ছ ও পবিত্র এমন একদল রাখালের কাছে। স্বর্গদূতের বার্তাটি হল: ”ভয় পেয়ো না! আমি এক মহা আনন্দের সংবাদ তোমাদের জানাতে এসেছি; এই আনন্দ জাতির সমস্ত মানুষের জন্যেই সঞ্চিত হয়ে আছে। আজ দাউদ নগরীতে তোমাদের ত্রাণকর্তা জন্মেছেন তিনি সেই খ্রীষ্ট, স্বয়ং প্রভু। এই চিহ্নে তোমরা তাঁকে চিনতে পারবে: দেখতে পাবে কাপড়ে জড়ানো যাবপাত্রে শোয়ানো এক শিশুকে” (লুকের মঙ্গল সমাচার ২:১০-১২)।
তাঁর এই জন্মে স্বর্গদূতবাহিনী গেয়েছিল পরমেশ্বরের মহিমা গান, গেয়ে উঠেছিল শান্তির গান: ”জয় উর্ধ্বলোকে পরমেশ্বরের জয়! ইহলোকে নামুক শান্তি তাঁর অনুগৃহীত মানবের অন্তরে” (লুক ২:১৪)!
অতএব বড়দিন হল প্রভুযীশুর জন্মতিথির মহোৎসব, যীশুর মানবদেহধারণের মহোৎসব। পাপী মানুষের ত্রাণ করতেই তাঁর জন্ম হয়েছিল বলেই যীশুর জন্ম উৎসবে খ্রীষ্টবিশ্বাসীদের এতো আনন্দ উল্লাস। হাজার বছরের বড়দিন ঐতিহ্যে ও ধর্মতত্ত্বে খুঁজে পেতে হয় নানা প্রশ্নের উত্তর।
বড়দিনের বারতা ও চ্যালেঞ্জ: বড়দিনের প্রধান বাণী হলো শান্তি ও সম্প্রীতি।  যীশু এসেছিলেন শান্তির বাণী ও দূত হয়ে।  বর্তমান বিশ্বে  যদিও অনেক দাঙ্গা-হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সন্ত্রাস ও হিংস্রতা তথাপি আমরা দৃঢ়তার সাথেই বলতে পারি যে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ঈশ্বরের দেওয়া শান্তি-শক্তি ও মিলন-শক্তি নিয়ে বলীয়ান।  প্রতিটি মানুষ একান্তভাবেই আকাঙ্খা করে শান্তি, মিলন ও ভ্রাতৃত্ব। মানুষের এমন শক্তি-সামর্থ আছে বলেই বিশ্ব এখনো সামনের দিকে এগিয়ে চলছে ও চলবে। যীশুর আগমন মানুষের মাঝে এই এক ক্ষমা ও মিলনের আধ্যাত্মিক শক্তিকে নিশ্চিত করেছে। এবারের বড়দিনে আমরা যীশুর শান্তি ও মিলনকে মূখ্য বক্তব্যরূপে নিতে পারি, মূখ্য অনুশীলনরূপে নিতে পারি।  হিংস্রতার রূপ নিয়ে একজন অন্যজনকে  ধ্বংস করবে এটা তো কারো প্রত্যাশা নয়। রাজনৈতিক বা কুটনৈতিক কোন কোন্দলে পড়ে মানুষ অসহায়ের মত নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে গুমড়ে কাঁদুক এ-তো আমরা কেউই চাই না। যীশু পৃথিবীতে এসে পাপীকে ক্ষমার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছেন; মৃতকে জীবনদান করেছেন; অবহেলিত ও অবাঞ্চিতকে মানবিক মূল্য দিয়েছেন; পাপময়তার বন্দীদশা থেকে মুক্ত করেছেন। আমাদের দেশে ও সমাজে এই মুক্তি ও আনন্দের আজ ভীষণ প্রয়োজন। বর্তমানকালের অনেক পরি¯িদতিও বাস্তবতা আমাদের দেয় অপরিসীম আনন্দ; আবার অনেক অনেক ঘটনাই আমাদের সামনে নির্যাতন ও হত্যার মতো মারাত্মক পাপের আন্দার ছবি তুলে ধরে। এই বড়দিনে আমরা প্রত্যেকেই আত্ম সমীক্ষামূলক প্রশ্ন করতে পারি:  আমরা কি পারব না একে অন্যের সাথে শ্রদ্ধা-সৌহার্দ নিয়ে বসবাস করতে? আমরা কি পারব না প্রতিশোধ মূলক কর্মকান্ডকে পরিহার করে মিলন ও ভ্রাতৃত্বকে জীবনে প্রকাশ করতে? সমস্ত লোভ-লালসা পরিহার করে আমরা কি পারি না এক সঙ্গে প্রগতি নিয়ে এগিয়ে যেতে? আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে এবং আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে যদি আজ যীশুকে জন্ম নিতে বলি, তিনি জন্ম নিবেন আমাদের এই রূপান্তরিত জীবনেই, রূপান্তরিত সোনার সন্তানদের সোনার বাংলাতেই। এই বড়দিনে আমাদের প্রত্যাশা হল আজ নতুন করে পৃথিবীতে যীশুর জন্ম বাস্তবায়িত হউক আমাদের দ্বারা আমাদের মাঝে। দূর হয়ে যাক যত প্রকার হেরোদীয় হিংসা, ঘৃণা আর বৈষম্য। হেরোদ তো যীশুর আগমনে কুটিল হয়ে সব শিশুদের হত্যা করেছিল। মানুষ হয়ে উঠুক সত্য, সরল, সহজ রাখালদের মত মিলন ও ভ্রাতৃত্বের মানুষ; শান্তি ও সম্প্রীতির মানুষ।
বছরের শেষপ্রান্তে  এসে গোটা বিশ্বেও আশাব্যঞ্জক ও নৈরাশ্যব্যঞ্জক অনেক ঘটনা দেখার পর আমরা আজ এবারের বড়দিনে আমাদের হৃদয়ের তন্ত্রিতে, বিবেকের গভীরে এই শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও মিলনের বাণী শুনতে অন্তত একটিবার ব্যক্তিগতভাবে সাধনা করি। গোয়াল ঘরে শায়িত যীশুকে দেথে আমরা শান্তি ও মিলনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করি। এভাবেই আমরা বড়দিন উৎসবকে কোন এক গন্ডির মধ্যে না রেখে সার্বজনীন রূপ দিতে পারি; এই বড়দিন হয়ে উঠতে পারে আমাদের সকলের ’বড়দিন’। মিলন ও ভ্রাতৃত্বের শুভদিন। এবারের বড়দিনে আমরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবন যাপন দ্বারা এবং আমাদের সাধ্য অনুসারে বাংলাদেশের সকল মানুষের বিষেশভাবে দীনদরিদ্র্র ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত ভাইবোনদের আত্মিক, নৈতিক ও পার্থিব উন্নতি কল্পে নিজেদের নিয়োগ করি। প্রার্থনা করি অমাদের প্রত্যেকের জীবনের যেন শান্তি-শক্তি বৃদ্ধি হয়, প্রার্থনা করি আমাদের  দেশের সার্বিক কল্যাণের জন্য। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রীষ্টান সকলেই বড়দিনে যীশু খ্রিস্টেও মঙ্গল আশীর্বাদে ও তাঁর অনুগ্রহ দ্বারা পুণ্য¯œাত হোক। দৃঢ় হোক বাংলার সম্প্রীতির কৃষ্টি-ঐতিহ্য, লুপ্ত হোক যত দানবীয়-সন্ত্রাস অপকর্ম।
উপসংহার: বড়দিন। ক্রিস্টমাস। বছর বছর ঘুরে আসে এ মহোৎসব। গোটা বিশ্বে এই উৎসবের কৃষ্টি ও প্রথাগত বিভিন্নতা উৎসবের ঐশ্বর্যই প্রকাশ করে। খ্রীষ্টের এ জগতে মানুষ হয়ে জন্ম নে’য়া ঐতিহাসিক ঘটনা সত্যে প্রমাণ মিলে যে, এই ব¯দ জগৎ মন্দ নয় বরং উত্তম। এই জগতের ব্যক্তি ও ব¯দর মধ্য দিয়েই ঈশ্বর তাঁর জীবন আমাদের সাথে সহভাগিতা করেছেন বা আজও করে যাচ্ছেন। ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট প্রতিটি মানুষ মিলিত হতে পারবে তাঁর ¯্রষ্টার সাথে। যীশু খ্রিস্টের মানব দেহধারণ অনšকালীন Í ধ্বংসের বিপরীতে দেহ ও আত্মাকে করে একত্রিত ও উত্থিত। ঐশ কৃপালাভের অন্যতম প্রমান বড়দিন। তাই তো এইদিন বড়দিন উৎসবে বিশ্বাস ও ভক্তি প্রকাশের অন্যতম পূঁজি খ্রীষ্টিয় আধ্যাত্মিক ও লৌকিক সংস্কার পালনের মাধ্যমে আমরা সবায় আনন্দে মেতে উঠি। মানুষের আসল উৎসব হলো আধ্যাত্মিক বড়দিন। ভক্তের অন্তর গহীনে লুকিয়ে থাকা আমিত্ব আর অহমিকাকে জয় করঅ। বড়দিন স্মরণ করিয়ে দেয় এক দিব্য খ্রিস্ট-চেতনা আর ঐশ-প্রজ্ঞালোকে জীবনকে রূপান্তরিত ও আলোকিত করা সম্ভব।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান
বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মানবাধিকার সংস্কৃতির স্বরূপ
                                  

মানুষের জন্মগত অধিকারই মানবাধিকার। অর্থাৎ যে যে পরি¯িদতিতে জন্মগ্রহণ করুক না কেন তাতে মানুষ হিসেবে তার মর্যাদার কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। সে দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করতে পারে। এই কারণে তাকে শ্রেণি বৈষ্যম্যের পাল্লায় ওঠানো যাবে না। সে যে কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবারে জন্মগ্রহণ করতে পারে, তার জন্য কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক পরি¯িদতি তাকে নৃসংসতম পরি¯িদতিতে ঠেলে দেবে না। মানবাধিকার সংস্কৃতির মৌলিক শর্তই হলো মানুষ হিসেবে অধিকার লঙ্ঘনের কোনো বিপর্যয় মানুষের বেঁচে থাকাকে কলঙ্কিত করবে না। আজকের বিশ্ব এই সত্যকে মেনে চলছে না। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের অন্যায় আচরণের সাংস্কৃতিক দূষণে বিপর্যস্ত হচ্ছে সংস্কৃতির পরিশীলিত জায়গা।
পৃথিবী জুড়ে একথা প্রতিষ্ঠিত যে মানবাধিকার সর্বজনীন। অধিকারের অগ্রগতি যেমন অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করে, এগিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি অধিকার লংঘন অন্য অধিকারকে ক্ষতির পাল্লায় উঠিয়ে দেয়। অধিকারের হেরফের ঘটিয়ে মানুষের মাথা হেট করা উচিত নয়। মানুষকে হেয় বা তাচ্ছিল্য করা যাবে না। এটাই হবে মানবিক সংস্কৃতির মেটালিক শর্ত। এই শর্ত মেনে চললে মানবাধিকারের সংস্কৃতির পূর্ণ মাত্রায় মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। এই প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন যে কথাটি বলেছেন তা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন “যে দেশের মানুষের যত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে সে দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না।”
এই পংক্তির দুর্ভিক্ষ শব্দটি নানা মাত্রা ধারণ করে আছে। অন্যকথায় এখানে দুর্ভিক্ষ মানবাধিকার সংস্কৃতির পিছটানের শব্দ। এই দুর্ভিক্ষ হচ্ছে মানবিক চৈতনাবোধের অভাব, রাষ্ট্রের সুশাসনের অভাব, পরমত সহিষ্ণুতার অভাব ইত্যাদি এমন আরও অনেক কিছু। মত প্রকাশের স্বাধীনতা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাকে দীপ্ত করে। দীপ্ত করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেতনাকেও। এর পাশাপাশি নাগরিক জীবনকে যদি মূল্যবোধ বিপর্যয়ের বড় ঘটনা গ্রাস করে তবে তা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের শামিল হয়। এই দুঃসময়ে নির্যাতনের শিকার হয় শিশুরা। নারী নির্যাতনে ভরে যায় দেশের আনাচ-কানাচ। নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা গ্রাস করে সমাজকে। দুর্নীতি প্রশ্রয় পায়। লাগামহীন দুর্নীতি নষ্ট করে উন্নয়নের মূল ¯্রােত। ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনজীবন। এটাও এক ধরনের দুর্ভিক্ষ। ক্ষুদ্র চেতনার আকাল।
এই আকাল দূর করার জন্য ১৯৪৮ সালে গৃহীত হয়েছিল মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষনাপত্র। এই ঘোষণাপত্রে অধিকারসমূহের দুটি ভাগ রয়েছে। একটি হলো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার। অপরটি হলো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। প্রথমটিতে বাইশটি অনুচ্ছেদ আছে।
অনুচ্ছেদ ১৮ -তে উল্লিখিত আছে ‘নিজস্ব বিশ্বাস ও ধর্যের স্বাধীনতার অধিকার’। অনুচ্ছেদ ১৯-এ আছে ‘মতামত দেওয়া ও তথ্য পাওয়ার স্বাধীনতা’। অনুচ্ছেদ ২০ -তে আছে ‘শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকার’। পরের ধারার ২৫ অনুচ্ছেদে আছে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনযাত্রার অধিকার।’ ২৬ অনুচ্ছেদ ‘শিক্ষার অধিকার।’ ২৭ অনুচ্ছেদ ‘সাংস্কৃতিক জীবনে অবাধে অংশগ্রহণের অধিকার।’
অনেক ধারার মধ্যে মাত্র কয়েকটি ধারার উল্লেখ করা হলো। শেষ ধারাটিতে সাংস্কৃতিক জীবনে অবাধে অংশগ্রহণের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সাংস্কৃতিক জীবন মানুষের পূর্ণ জীবনমানের অধিকার। এই সাংস্কৃতিক চেতনা জীবন প্রবাহের সামগ্রিক বোধ থেকে উৎসারিত হয়। যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের সাংস্কৃতিক শিক্ষাকে বিকশিত করে। মতামত দেওয়া ও তথ্য পাওয়ার অধিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেতনাকে সমৃদ্ধ করে।
মানবিক অধিকারে মানুষের সুনাগরিকের প্রত্যয় দৃঢ় হয়। মানুষ অপশক্তির হাতে পীড়িত হয় না। অন্যায় আচরণের শিকার হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষকে গ্রাস করে না।
তাই মানবাধিকার সংস্কৃতির চর্চা গণমানুষের নৈতিক আচরণের অন্যতম দিক। এর বাইরে মানুষ হিসেবে মানুষের সর্বাদাকে সমুন্নত রাখা কঠিন।


সেলিনা হোসেন

বিজয় দিবসটি একান্তভাবে বাঙালির
                                  


আবদুল মান্নান
বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেরই স্বাধীনতা অথবা জাতীয় দিবস আছে। বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলোর মধ্যে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস অন্যতম। যে কোনো বিষয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হলে পরিশ্রম, ত্যাগ স্বীকার আর দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হয়। এসবের সাথে বাংলাদেশের এই বিজয় ছিনিয়ে আনতে দেশের ত্রিশ লাখ মানুষকে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে, আড়াই লাখ মা-বোনকে নিজের ইজ্জত দিতে হয়েছে। এ বিজয়টা দেশের বিজয়, এ বিজয়টা দেশকে দখলদার পাকিস্তানি সেনা সদস্যদের হাত হতে মুক্ত করার বিজয়, এই বিজয় দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিজয়। বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও যখন দেশ এই বিজয় দিবস উদযাপন করবে তখন যে দলটির নেতৃত্বে দেশের মানুষ একাত্তরে দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধে গিয়েছিল সেই দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। এই কয়েক বছর এটি অনেকটা বাংলাদেশের মানুষের বাড়তি পাওনা, কারণ ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে নিয়মমাফিক স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস পালন করা হয়েছে ঠিক কিšদ তাতে এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের মূল অনুভূতি বা স্পিরিট উপ¯িদত ছিল না। অব¯দা এমন দাঁড়িয়েছিল যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে প্রথমে যে কাজটি করেন তা হচ্ছে আমাদের পবিত্র সংবিধানের মূল ভিত্তি বলে যাকে স্বীকার করা হয় সেই সংবিধানের প্রস্তাবনাকেই পাল্টে ফেলেছিলেন। ১৯৭২-এর সংবিধানের প্রস্তাবনায় শুরুতেই লেখা ছিল ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি।’ জিয়া ১৯৭৮ সালে এক আদেশ বলে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ পরিবর্তে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের’ শব্দ কয়টি প্রতি¯দাপন করেন। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থে সংবিধানের সেই যে ব্যবচ্ছেদের শুরু তা জিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত চলেছে। তার মৃত্যুর পর এরশাদও তা মোটামুটি বজায় রাখেন। জিয়ার এই ব্যবচ্ছেদের একমাত্র কারণ ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের ‘মুক্তির জন্য সংগ্রামকে’ অস্বীকার করা এবং এটি ¯দাপিত করা যে বাঙালির ইতিহাসের শুরু একাত্তরে ২৭ মার্চ যখন তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। তিনি স্বজ্ঞানে বাঙালির দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামের ইতিহাসকে অস্বীকার করার অপচেষ্টা করেছিলেন। ইতিহাস পাল্টানোর চেষ্টা এক ধরনের চরম মূর্খতা। ১৯৭১ সালে বাঙালির জাতীয় মুক্তির জন্য যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব শুরু হলেও তার সূত্রপাত ১৯৪৮ সালে যখন ঢাকায় এসে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করছিলেন পাকিস্তানের মাত্র ৬ ভাগ মানুষের ভাষা উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। জিন্নাহর ধারণা ছিল উর্দু হচ্ছে মুসলমানদের ভাষা এবং তার বহু জাতিভিত্তিক পাকিস্তানকে এক রাখতে হলে একটি তথাকথিত মুসলমানি ভাষার প্রয়োজন এবং তা হচ্ছে উর্দু আর জিন্নাহর পাকিস্তান তো সৃষ্টিই হয়েছিল মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি হিসেবে। জিন্নাহ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভুল রাজনীতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিলেন। জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্বের উদ্ভট ধারণার কারণে পাকিস্তান ও ভারত সীমান্তের উভয় পার হতে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাপ-দাদার ভিটেমাটি হতে উচ্ছেদ হয়েছিলেন, প্রাণ হারিয়েছিলেন আরও লক্ষাধিক মানবসন্তান। শেখ মুজিব (তখনও তিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন নি) তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ লিখেছেন তিনি পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বুঝেছিলেন যে পাকিস্তানের জন্য তিনি নিজেও একজন কর্মী হিসেবে আন্দোলন করেছেন আসলে সেই পাকিস্তানে বাঙালির মুক্তি আসবে না। বাঙালির মুক্তির জন্য বাঙালির নিজেকেই নিজের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হতে হবে। তা করতে হলে চাই একটি রাজনৈতিক সংগঠন। প্রথমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। বস্তুতপক্ষে ছাত্রলীগই ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো প্রথম সংগঠন। ছাত্রলীগের প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন নইমুদ্দিন আহমেদ। আর ছিলেন বিভিন্ন জেলা হতে ১৪ জন সদস্য, যাদের মধ্যে আবদুর রহমান চৌধুরী, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শেখ আবদুল আজিজ, খালেক নেওয়াজ অন্যতম। যদিও নামের সাথে মুসলিম শব্দটি ব্যবহার করা হয় কিšদ বাস্তবে ছাত্রলীগ সব সময় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিল। ১৯৫৩ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ছাত্র সংগঠনটির নামকরণ করা হয় শুধু ‘ছাত্রলীগ’। বর্তমান ছাত্রলীগের কজন এই ইতিহাস জানে? ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে যে কটি সংগঠন সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেয় তার মধ্যে মুসলিম ছাত্রলীগ ছাড়া আরও ছিল তমুদ্দিন মজলিস। ভাষা আন্দোলনের মূল দাবিই ছিল উর্দুর সাথে সাথে বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রথম আন্দোলন যা জিয়া অস্বীকার করার জন্য সংবিধানের প্রস্তাবনায় সংশোধনী এনেছিলেন।
১৯৪৯ সালে জন্ম হয় অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ। এই দল গঠনের পিছনেও অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসক দল মুসলিম লীগের এক চোখা নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার। আওয়ামী লীগের প্রথম কা-ারি ছিলেন সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, ইয়ার মুহাম্মদ খান প্রমুখ। শুরুতেই আওয়ামী লীগ জনগণের মুক্তির জন্য ১২-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে যার প্রারম্ভে বলা হয়েছিল ‘পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে জনগণ।’ অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে জনগণ কখনও দেশটির ক্ষমতার মালিক হন নি। এই ২৩ বছরে ১৯৭০ সাল ছাড়া পাকিস্তানে কখনও একটি জাতীয় নির্বাচন করা সম্ভব হয় নি। ১৯৫৬ সালে একটি সংবিধান প্রণীত হয়েছিল কিšদ তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক দল কখনও কার্যকর করতে দেয় নি। তার আগেই আইউব খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির ক্ষমতা দখল করেছিল। সেই থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তান তাদের সেনাবাহিনী দ্বারা শাসিত হয়েছে। সেই সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ লাগাতার আন্দোলন করেছে। সেই আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব বাঙলির মুক্তি সনদ ৬-দফা ঘোষণা করেন। এই ৬-দফার বিরুদ্ধে দলের ভিতরে অনেক বিরোধিতা ছিল। ১৯৬৭ সালে শেখ মুজিবকে একজন রাজবন্দি হিসেবে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৮ সালে তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামক একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা সাজিয়ে তাকে জেলগেট হতে ফের গ্রেফতার করা হয়। এসব ঐতিহাসিক সত্য জিয়া বা তার উত্তরসূরিরা স্বীকার করেন না। ১৯৬৯-এর ছাত্র জনতার গণ-আন্দোলনের তোড়ে ভেসে যায় স্বয়ং আইউব খান আর তার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু, বাঙলির অবিসংবাদিত নেতা। আইউব খানের পতনের পর ক্ষমতায় আসেন আর এক সেনাশাসক ইয়াহিয়া খান। তার দেওয়া সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এক ধস নামানো বিজয় অর্জন করে। কিšদ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালির হাতে ক্ষমতা ছাড়বেন কেন? শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। তখন মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠে অনিবার্য যার পরিসমাপ্তি হয় একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর, যেটি আমাদের বিজয় দিবস।
১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত বাঙালির এই দীর্ঘ পথচলাকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পরবর্তীকালের সকল শাসক। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এলে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে পালন শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের পুনরায় ক্ষমতায় ফিরাটাও ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফেরার এমন দৃষ্টান্ত শুধু উপমহাদেশেই নয় খুব কম দেশেই পাওয়া যাবে। বিজয় দিবস শুধু একটি দিন নয়। এদিনটি আমাদের পিছনে ফিরে তাকানোর দিন। আজ থেকে ৪৪ বছর আগে বাঙালি কেন যুদ্ধে গিয়েছিল সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার দিন। এটি বাঙালির জাতিসত্তার পুনঃআবিষ্কারের দিন। এটি অতীত ভুল-ভ্রান্তি হতে শিক্ষা নেওয়ার দিন। এটি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের ঋণের কথা স্বীকার করার দিন। ২০১৪ সালের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সকল শহীদদের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বুলবুল চৌধুরী বেঁচে আছেন তার সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী কর্মকান্ডে
                                  

 

রুবিনা শওকত উল্লাহ

 

বুলবুল চৌধুরী অনবদ্য সৃষ্টির এক নাম, কলাদর্শনের প্রবক্তা। যার জীবনের উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃতির জ্ঞানের মাধ্যমে নিজের জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা, সমাজ থেকে সুংস্কার দূর করা। মানবতাবাদী কর্মের মাধ্যমে সমাজের উন্নয়ন করা। তাকে একজন নৃত্য সৈনিক বলা যায়। বুলবুল চৌধুরীর গুনাবলী লেখে শেষ করা যাবে না। কারণ তিনি সাংস্কৃতিক ব্যক্তি হিসেবে সর্বদিকে বিচরণ করেছেন। এক কথায় তাকে সব্যসাচী বলা হয়।

শিল্পী বুলবুল চৌধুরীর পুরো নাম রশিদ আহম্মদ চৌধুরী। প্রেসিডেন্সি কলেজের একটি অনুষ্ঠানেই রশিদ আহমদ চৌধুরী প্রথম বুলবুল চৌধুরী নামে আত্মপ্রকাশ করে। তার জন্ম ১ জানুয়ারী ১৯১৯ সালে বগুড়ায়। পিতৃনিবাস চট্টগ্রাম সাতকানিয়ায় চুনতি গ্রামে। ১৯৫৪ সালে ক্যানসারে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা যান।

বুলবুল চৌধুরীর পিতা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা সেজন্য পিতার কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে তাকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়তে হয়েছে। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৩৪ সালে মানিকগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তারপর কলকাতার স্কটিশ চার্ট কলেজ থেকে বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন।

তিনি প্রথমত উদয়শংকরের নৃত্যে প্রভাবিত ছিলেন এবং দেবদেবীর পৌরানিক চিত্র-ভাস্কর্য থেকে বিভিন্ন ভঙ্গি চয়ন করে, তা নৃত্যে প্রযুক্ত করেন এই অভিনব প্রক্রিয়াতেই প্রতিভাধর বুলবুল চৌধুরী স্বকীয় নৃত্যধারার প্রবর্তন করেন। এই আদর্শে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় তিনি ওফা (ঙৎরবহঃবহঃধষ ঋরহব অৎঃং অংংড়পরধঃরড়হ (ঙ.ঋ.অ) প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনটির অনুষ্ঠানের টিকেট বিক্রয়ের সমুদয় অর্থ মানব কল্যাণে দান করেন তিনি। কংগ্রেস ত্রাণ তহবিল (কলকাতা), নাগরিক কল্যান, তহবিল (ঢাকা), কবি কাজী নজরুল ইসলাম চিকিৎসা তহবিল, (লন্ডন) ইত্যাদি তহবিলে এই অর্থ দান করা হয়।

১৯৩৮ সালের বাংলার ভয়াবহ বন্যায় বুলবুল খুব পীড়িত বোধ করে। ঐ বছর সেপ্টেম্বর মাসের ১৯ ও ২০ তারিখে বুলবুল ওফার ব্যানারে কলকাতা ফাস্ট এমপায়ার হাউসে দু’দিন ব্যাপী নৃত্য ও সংগীত পরিবেশন করে। অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করে প্রথম দিন শুভেচ্ছা বাণী পাঠান নেতাজি সুভাষ চন্দ ্রবসু ও দ্বিতীয় দিন শুভেচ্ছা বাণী পাঠান বাংলার প্রধানমন্ত্রী একে ফজলুল হক।

ব্যালেটিতে মার্কাস দলের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বুলবুলের দলের কয়জন ছেলেমেয়ে নৃত্যে অংশ নিয়েছিল। বুলবুলের প্রতিভায় আকৃষ্ট হয়ে মিঃ মার্কাস (আমেরিকার বিখ্যাত ব্যালে কোম্পানির) মালিক তাকে তার দলে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান ও আমেরিকা যাবার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু প্রচ- আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন শিল্পী বুলবুল জানত যে, মার্কাসের সঙ্গে যোগ দিলে তার নিজের পরিকল্পনা অনুসারে নৃত্য রচনা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। দেশের নিপীড়িত, শোষিত ও দুর্গত মানুষের প্রতি তার দায়িত্ববোধ সম্বন্ধে সে সব সময়েই সচেতন ছিল।

১৯৪৫ সালের বাম ধারার সংগঠন ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (ও.চ.ঞ.অ)’ এর ব্যালে স্কোয়াডের প্রধান হিসেবে যোগদান করে বৃটিশ বিরোধী নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করেন। এই নৃত্য নাট্যগুলি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ার লক্ষ্য ছিল। ঐ সময় ভারতবর্ষে এক দিকে চলছে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন আর একদিকে বইছে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিজমের হাওয়া একজন শিক্ষিত সচেতন মানবতাবাদী শিল্পী হিসেবে বুলবুল সব সময় সমাজের বৃহৎ স্বার্থের কথাই ভেবেছেন। তিনি সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি তবে তার অঙ্গ সংগঠন “ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (ও.চ.ঞ.অ) এর প্রধান নৃত্য প্রশিক্ষক ছিলেন। নিপীড়িত মানুষের অধিকার সম্পর্কিত সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিবেদিত ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (ও.চ.ঞ.অ)’ প্রতিষ্ঠানটি তদানীন্তন বৃটিশ সরকারের অন্যায় ও দুঃশানের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এই জন্য বৃটিশ সরকার তার উপর বিশেষ নজর রেখেছিলেন।

আমাদের বাংলাদেশের তৎকালীন সমাজে শিক্ষা সংস্কৃতির চর্চার অভাবে বাঙালি সমাজ কিছুটা পিছনে ছিল। আমাদের সমাজের এই কুসংস্কারচ্ছন্ন অচলায়তন ভাঙার প্রথম কৃতিত্ব কাজী নজরুল ইসলামের। হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে সকলের মধ্যে জাতীয়তা স্বাধীনার আদর্শ তিনি সার্থকভাবে উদ্দীপ্ত করে তুলেছিলেন। প্রথম মহাযুদ্ধের পর নজুল ইসলামের কবিতা ও গান তরুণ সমাজকে অবসাদ ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে।

কিন্তু নৃত্য শিল্পকে উৎসাহিত করার মত মনোভাব তখন পর্যন্ত আমাদের এ সমাজে দেখা যায়নি। তখনকার সময়ে শিল্প চর্চা করলে তাকে উৎসাহ দেওয়ার তো দূরের কথা, অনুমোদন করার মত মানসিকতা পর্যন্ত তাদের মধ্যে ছিল না। যেখানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইলে গুনাগার বলে বিবেচনা করা হতো, মুক্তচিন্তার প্রকাশকে বাধা দেওয়া হতো, সে সময় নৃত্যকে খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হতো। কিন্তু বুলবুল এই নৃত্য শিল্পকে ভালবেসে নৃত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ বিস্ময়কর ছাড়া আর কি বলতে পারি। তাকে প্রথম থেকেই সামাজিক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তার প্রতিটি ক্ষেত্রে পরম কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে জীবনের শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে। এই বৈরী মনোভাব থেকে তিনি রেহাই পায়নি। অথচ আজ আমাদের দেশে নৃত্যশিল্পের ব্যাপক চর্চা দেখা যায়। এখন অনেকে পরিবারের ছেলেমেয়েদের নৃত্যের জন্য কোন রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয় না, বাবা-মা সন্তানদের এই মাধ্যমে পারদর্শী হতে সাহায্য করেন। কিন্তু বুলবুল যখন এই শিল্পের চর্চা শুরু করে, তখন তিনি এ সমাজে ছিল একা ও নিঃসঙ্গ, তার সমাজ তাকে সাহায্য তো করেইনি বরং নানা ভাবে বাধা দিয়েছে। বুলবুল তার নৃত্য কলা প্রদর্শন করতে গিয়ে জীবনে বহুবার বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমনকি পাকিস্তানি রাজনীতিতে স্বৈরতন্ত্রই প্রধান, শক্তিতে পরিণত হওয়ার ফলে প্রগতিবাদী ও উদার নৈতিক শক্তি, নিদারুন নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছে এই নির্যাতন এতটা প্রবল ও ব্যাপক ছিল যে, এই শেষোক্ত নিজের উদীয়মান প্রভাবকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়।

মুলতান ও লাহোরে এমন সময় গেছে নৃত্যের জন্য বুলবুলকে ‘কাফের’ ফতোয়া দেওয়া হয় এবং অন্যান্য শহরে ও অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু বুলবুল এই সব খবরে কখনোই ভেঙে পড়েনি। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের সচেতন বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটি পাকিস্তান সংস্কৃতি গড়ে, তোলার আকাক্সক্ষা যে ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে পরে দেখা গেছে পাকিস্তানী সংস্কৃতি বা জাতি কোনোটিই গঠিত হতে পারেনি।

১৯৫০ সালে তখনও ১২ ফেব্রুয়ারির কালজয়ী ইতিহাস, সৃষ্টি হয়নি, ১৯৭১ সাল আসতে তখনও পূর্ণ দুই দশক বাকি, বুলবুল যে বাণী উচ্চারণ করেছিল, পরে তা অক্ষরে অক্ষরে যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে।

পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসছিল যে; বুলবুলের নৃত্যচর্চার বিরুদ্ধে অনেকেই বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। ১৯৫৩ সালের ২৯ মার্চ বুলবুল চৌধুরী সদলবলে করাচি থেকে ভিক্টোরিয়া নামের জাহাজে লন্ডন রওনা হয়ে ১৪ এপ্রিল লন্ডন পৌছায়। গ্রেট বৃটেনের রাজধানীতে বুলবুল তার সহশিল্পীদের নিয়ে বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদের মুখোশ উন্মোচন করেন।

আমার জানামতে পৃথিবীতে নৃত্যকে এত ভালবেসেছেন বুলবুল এর মত কম লোকেই। তিনি নৃত্য শিল্পকে প্রসারিত করার জন্য নিজেকে ঢেলে দিয়েছিলেন। নৃত্য কলা প্রদর্শন করতে গিয়ে হত্যা চক্রান্তের হাত থেকে বহুবার পালাতে বাধ্য হয়ে প্রাণে রক্ষা পেতেন।

শিল্পী বুলবুলের ৭৮টি নৃত্যনাট্য রচনা পরিচালনা ও মঞ্চস্থ করেন। তার অনেক সৃষ্টি, রচনা আজও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। বুলবুলের লেখা অনেক বই আছে এর মধ্যে তার অসাধারণ উপন্যাস ‘প্রাচী’। গান ও কবিতার বই লেখা থেকে বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করার মাধ্যমে সাহিত্য চর্চা করেন। তিনি সে সময় বেশ কয়েকটি ছোট গল্প রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গল্প : ভ্রান্তি মা, শিকারী। তিনি অজয়কুমার ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। তাঁর রচিত কাব্য : শেফালিকা। এই কাব্যটি তিনি রবিন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন, তার গানের বই বুলবুলি, তার আরও অনেক লেখা রয়েছে। চিত্রকলাতেও তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। অকাল প্রয়াত সাহিত্যিক বুলবুলের অনেক লেখা এখনও অপ্রকাশিত রয়েছে। তিনি একাধারে নাটক পরিচালনা ও প্রধান নায়ক চরিত্রে অভিনয়ে তার প্রতিভার পরিচয় দিয়ে গেছে।

সংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমে সমাজকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন থেকে জাগানোর জন্য সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও চর্চা অপরিহার্য সেই চিন্তায় তিনি কলকাতার ওফার মতো পূর্ববঙ্গের ঢাকা ও বিভিন্ন মফলস্বল শহরে ললিতকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। তিনি তার ঘনিষ্ট বন্ধু মাহমুদ নুরুল হুদার সঙ্গে দীর্ঘদিন আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন যে ১৯৫৩ সালের মধ্যেই ঢাকায় একাডেমী উদ্বোধন করবেন। কিন্তু বুলবুলের সে আশা হঠাৎ করে থমকে গিয়েছিল। বুলবুলের মরণব্যাধি ক্যানসার ধরা পড়ে এবং তিনি বিশ্রামে থাকেন। অসুখের যন্ত্রণা নিয়ে বন্ধু মাহমুদ নুরুল হুদার সঙ্গে ললিতকলা একাডেমী বিষয়ক আলোচনা করেন। বুলবুল তার পরিকল্পিত প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা, সাংগঠনিক কাঠামো, গঠনতন্ত্র, শিক্ষানীতি ও সিলেবাস নুরুল হুদার হাতে অর্পণ করেন এবং ঢাকায় একাডেমী প্রতিষ্ঠার অনুরোধ করেন। নুরুল হুদা এই সময় বুলবুলের নামে একাডেমী করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এই প্রতিশ্রুতিতে বুলবুলের জীবনের যেন শ্রেষ্ঠ পাওয়ার পরম তৃপ্তিতে তার দু’চোখ অশ্রুতে ভরে যায়। কারণ তিনি জানতেন তার স্বপ্ন নিজে পুরোন করতে পারবে না তা বুঝে গিয়েছিলেন।

১৯৫৪ সালের ১৭ মে কলকাতার চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে কলকাতা গবরা কবর স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। তার এ মৃত্যু সংবাদ শোনার পর ঢাকার বুলবুলের শোক সভায় শোকার্ত ভক্ত অনুসারীরা মাহমুদ নুরুল হুদার নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের ‘বুলবুল মেমোরিয়াল কমিটি’ গঠন করেন। অতপর ১৭/০৫/১৯৫৫ তারিখে বুলবুলের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীর সমাবেশে ৭ নং ওয়াইজঘাটে বুলবুলের নামে একাডেমী প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। নুরুল হুদা বুলবুলের স্বপ্নকে সত্যি করেছেন বন্ধুর স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়েছে। আজ এই বুলবুল ললিত কলা প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের দেশের অনেকে সংস্কৃতির চর্চা করতে পারছে। অথচ এই বুলবুল সম্পর্কে আমাদের সমাজে অনেকে পরিচিত নন। মাত্র ৩৫ বছরের সীমিত জীবনে প্রাণ উজাড় করে তিনি যেভাবে সর্বদিকে বিশেষ করে নৃত্য কলাকে সমৃদ্ধ করেছেন এমন দৃষ্টান্ত আর নেই। তার অবদান এই বাংলার সংস্কৃতি প্রেমিরা কোন দিন ভুলতে পারবে না। বুলবুল চৌধুরী বেচে আছেন তার সংস্কৃতি কর্মকান্ডের মধ্যে। যত দিন এই দেশের সংস্কৃতি বেচে আছে, সংস্কৃতি প্রেমিরা বুলবুল চৌধুরীর কাছে চির ঋনী হয়ে থাকবে।

পর্নোগ্রাফি জীবন ধ্বংসের হাতিয়ার
                                  

 

মুহাম্মদ আবদুল কাহহার

 

পর্নোগ্রাফি কথাটির সাথে আমরা এখন বেশ পরিচিত। এর অর্থ হলো- যৌন উদ্দীপনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যৌনসংক্রান্ত বিষয়বস্তুর প্রতিকৃতি অঙ্কন বা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। সম্প্রতি নারীদেহ, নারীর রূপ-সৌন্দর্য, পোশাক-আশাক তথা নারীর সামগ্রীক যৌনতাকে উপজীব্য করে অকথ্য, অব্যক্ত, বিকৃত ও কুরুচিপূর্ণ যৌনতায়ভরা কতিপয় ওয়েবসাইটে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা দেখা যায়। এর আধুনিক নাম হচ্ছে ‘ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি’। কিন্তু এই শব্দটিই যে আমাদের সন্তানদেরসহ গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে কলুষিত বা ধ্বংস করে দিচ্ছে সে বিষয়টি হয়তো কখানো চিন্তা করিনি। আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের রয়েছে নিজস্ব মোবাইল ফোন। আবার অনেকেরই রয়েছে একাধিক ফোন। অধিকাংশ ফোনেই রয়েছে মেমরি কার্ড ব্যবহার সুবিধা। ভাল ও মন্দ দু’ধরণের কাজেই মেমরিকার্ড ব্যবহার হয়। এর মাধ্যমেই খুব সহজে অন্যায় ও গর্হিত কাজে জড়িয়ে পড়া যে কারো পক্ষে খুবই সহজ। বিতর্কীত কাজ থেকে নিজেরা বিরত থাকলেও আমাদের সন্তানদের বিরত রাখছি কি না সেটিও  গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।

কেননা, গত ১ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামের  একটি সংস্থা ‘বাংলাদেশ শিশু পরিস্থিতি: সংবাদ বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞ অভিমত’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ শতাংশ পর্নোগ্রাফি দেখে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেশে তৈরী এই পর্নোগ্রাফিগুলোয় যাদের ভিডিও দেখানো হচ্ছে, তাদের বয়স ১৮ বছরের কম। অনুষ্ঠানে সংস্থার শিশু সুরা কার্যক্রমের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ৫০০ স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, সুস্থ যৌন শিক্ষার বিপরীতে বিকৃত যৌন শিক্ষার মধ্যে বেড়ে উঠছে। সংস্থার গবেষণায় আরো দেখা গেছে, চারটি পদ্ধতিতে অশ্লীল ভিডিও তৈরী হচ্ছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে তৈরী পর্নোগ্রাফির চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ঘিরে পর্নোভিডিও মানুষ বেশি দেখছে। ‘যুক্তরাজ্যে ছেলেদের অনলাইনে প্রথম পর্ন ছবি দেখার গড় বয়স মাত্র ১১! আর  ১৩-১৮ বছর বয়সী ৩ হাজার বালকের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, তাদের ৮১ শতাংংশই অনলাইনে পর্ন দেখছে।’(কালের কন্ঠ, ১১ সেপ্টেম্বর,‘১৬)। ২০১৩ সালে ঢাকার কয়েকটি কয়েকটি স্কুলে পরিচালিত একটি বেসরকারি টেলিভিশনের পরিচালিত অপর এক জরিপে দেখা যায়, ‘স্কুল শিক্ষার্থীদের ৮২ শতাংশ ছেলেমেয় স্বীকার করে যে, তারা সুযোগ পেলে মোবাইলে পর্নো ছবি দেখে। প্রায় ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে বসেই পর্নো ছবি দেখে। প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা মোবাইলের পেছনে ব্যয় করে। অঅর ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানায় তারা কেবল প্রেম করার উদ্দেশ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে।’ (বিবার্তা, ৪ অক্টোবর,‘১৬)।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য বড় একটি ঝুঁকি হলো, অনলাইনে পর্নোগ্রাফি দেখা। বাস্তবে পাওয়া যায় না এমন আকর্ষণ ও চাহিদা মেটাতেই পর্নোগ্রাফি দেখছে বলেই গবেষণা খেকে জানা যায়। যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৫৫ সালে পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতাকে সভ্যতার কালো দাগ বলে মন্তব্য করেছেন। জার্মানের একদল গবেষক বলেছেন, ‘নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখলে  মস্তিষ্কের একটি বিরাট অংশ সংকুচিত হয়ে কার্যক্ষমতা কমে যায়। প্রাপ্তবয়স্করা ‘দোষী’ বিনোদন হিসেবে পর্নোগ্রাফি দেখে। অনেক অভিভাবকরা শিশুদেরকে দামি ফোন, ট্যাব ও সেগুলোয় ইন্টারনেট সংযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু তারা কী কাজে এগুলো ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে খোঁজ খবর রাখা মৌলিক দায়িত্ব। পর্নোগ্রাফি দেখলে মুহূর্তে সে যৌনতার কল্পরাজ্যে ঘুরে বেড়ায়। মানবদেহে সুখানুভূতির অনুভূতি জাগায়। বিভিন্ন কৌশল ও নেতিবাচক চিন্তায় সে জর্জিত হয়ে হয়ে বাস্তবে পরিণত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অবৈধ পন্থায় এমন কর্মে লিপ্ত হতে গিয়ে লজ্জা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে স্বাস্থ্যগত ও মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। এতে করে, শিশুদের যৌন জীবন ও ভবিষ্যত দাম্পত্য সম্পর্ক ধ্বংস হচ্ছে। পর্নো আসক্তি হলে-নৈতিক অবক্ষয়, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক কলহ, হতাশা, সামাজিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। রুচি বোধের অবণতি হয়, নিঃসঙ্গতা চেপে বসে, শারীরিক ক্ষতি হয়, সামাজিকভাবে হেয় হতে হয়,  বৈবাহিক জীবনে নারী-পুরুষ একে অপরে ঘৃণার চোখে দেখে এবং পরকালে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।

পর্নোগ্রাফি থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে চেষ্টা করতে হবে। ‘ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফির প্রায় শতকরা ২০ ভাগ অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে। প্রতি সপ্তাহে ২০,০০০-এর বেশি অপ্রাপ্তদের ছবি ইন্টারনেটে পোস্ট করা হয়।’ (প্রিয় ডটকম)। সীমালংঙ্ঘন ও মন্দ বিষয় থেকে আমাদের সন্তান ও তরুণপ্রজন্মকে সুরক্ষার জন্য পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কতিপয় দায়িত্ব রয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বই মৌলিক ভূমিকা হিসেবে কাজ করবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্নোগ্রাফির সাথে সম্পর্কিত ২০০ শব্দের ওপর সংবরণ দেয়া আছে। কেউ ওই শব্দগুলো লিখে সার্চ দিলে সার্ভারে নোটিফিকেশন যায়। অনুমোদন ছাড়া ওই সব সাইটে ঢোকা যায় না। বিশ্বের অন্যন্য দেশের দিকে তাকালে দেখতে পাই, চীনে পর্নোগ্রাফি ব্যবস্থাপনা রয়েছে, সিঙ্গাপুরে নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে, মালয়েশিয়ায় সমাজোপযোগী ফিল্টারিং ব্যবস্থা, সউদী আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরব মুসলিম সমাজে নেতিবাচক সাইট ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটসমূহ প্রবেশের অগ্রহণযোগ্য। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও নেতিবাচক সাইটগুলোকে সরকার কেন ফিল্টারিং করছে না সে প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কোন ধরণের কটুক্তি করলে বা বিতর্কিত কোনো ছবি পোস্ট করলে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬, তথ্য ও প্রযুক্তি (সংশোধিত) আইন ২০১৩ প্রয়োগ করে জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হলে অশ্লীল ছবি, ভিডিও পোস্টকারী ও পর্নোসাইট নিয়ন্ত্রণে ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এ দ-বিধির যে ধারা উল্লেখ রয়েছে তা কেনো বাস্তবায়ন করা হবে না? যথা শীঘ্রই ইন্টারনেট ব্যবহারে শৃঙ্খলা আনতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষকরে যৌন সংবেদনশীলতা, পর্নো বই, সিডি, ভিডিও তৈরী ও প্রচার কিংবা ডাউনলোড করে যারা সরবরাহ করছেন তাদেরকে অনুসন্ধান করে বের করা উচিত। 

 

মনে রাখতে হবে, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি প্রবল আগ্রহ, পর্নোগ্রাফির অতিমাত্রায় সহজলভ্যতা, সন্তানদের কর্মকান্ডের ওপর অভিভাবকদের যথাযথ নজরদারি, প্রযুক্তির অসৎ ব্যবহার, ধর্মীয় অনুশাসন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে আইনের বাস্তবায়ন ও ইন্টারনেট ফিল্টারিং না থাকা আসক্তির অন্যতম কারণ।

মাতা পিতার উচিত শিশুদের সঙ্গে বয়ঃসন্ধিকালের শুরুতেই অর্থাৎ ১০ বছর বয়সেই স্বাস্থ্যকর ব্যপারে আলাপ-আলোচনা শুরু করা। পর্নোগ্রাফি ব্যবহার আইন করে বন্ধের চেয়ে এর খারাপ দিকগুলো বুঝাতে সক্ষম হলে অবশ্যই ইতিবাচক কাজে সন্তানরা আগ্রহী হবে। ইন্টারনেট ব্রাউজার হিস্টোরী চেক করা।  বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্রাউজিং করতে করতে অনাঙ্খিতভাবে কোনো পর্নো ওয়েবসাইট  সামনে চলে আসতে পারে, তাই ওয়েবসাইট ব্লক করার পদ্ধতি জানতে হবে। কম্পিউটারের মনিটর এমনভাবে সেট করা যাতে বাসার সবাই তা দেখতে পায়।  সন্তানদের সাথে বন্ধুর মতো মিশে বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও কোনো সমস্যার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করা। শিশুদের খেলাধুলাসহ বিনোদানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। মা-বাবা যতই বাস্ত থাকুক না কেন সন্তানকে মানুষ করতে চাইলে তাদেরকে সময় দিতে হবে। কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ সে বিষয়ে পৃথক করার জ্ঞান শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানের মোবাইল ফোন, সিডি, মেমরি, পেনড্রাইভ,  ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ইত্যাদি লুকিয়ে রাখছে কিনা বা পাসওয়ার্ড দিয়ে লক করা, অশ্লিলতার কাজে ব্যবহার সম্পর্কে খোঁজ  রাখা। রাতে কিংবা দিনের কোনো সময়ে একাকি ইন্টানেট ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করুন। কোনো আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও সংরক্ষণ করছে কি না তা খতিয়ে দেখা। এছাড়া পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে ইসলামের দিক নির্দেশনাগুলো মানতে হবে। আল কুরআনে বলা হয়েছে -‘তাদের বলে দাও  হে মুহাম্মদ): আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপকাজ---নিষিদ্ধ করেছেন। (৭:৩৩)। মুসলিম শরীফের এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কোনো পুরুষ বা নারীর উচিৎ নয় অপর কোন পুরুষ বা নারীর গোপনাঙ্গের  দিকে দৃষ্টিপাত না করা। এককথায়, নৈতিক মূল্যবোধের বিকল্প নেই।

 

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বাঙালির দুর্গোৎসব: ইতিহাস ফিরে দেখা
                                  

শ্যামল ভট্টচার্য

আমি ধর্মবিশারদ নই কিংবা সেই অর্থে ধর্মপ্রাণ মানুষও নই। তবে মানবধর্মে বিশ্বাস করি। বাংলার প্রকৃতি আমাকে আকুলিত করে। দুর্গাপূজার বিষয়ে কিছু লেখা আমার জন্য দুঃসাহস বলতে পারেন। এ বিষয়ে অন্য সবাই যা জানেন, আমিও তা-ই জানি। জানি যে এটি হিন্দু বাঙালির শ্রেষ্ঠ সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর মহা ধুমধামে এটি উদ্যাপিত হয় শরৎকালে যখন বাংলার প্রকৃতি অতি মনোরম। তখন গ্রীষ্মকাল প্রায় অপগত। বর্ষার অতিবর্ষণ নেই, বাতাস স্বাদু, সারা দিন আকাশে অলোক মেঘের আনাগোনা, মাঠভর্তি সবুজ ধানের ছায়া, ধানের বুকে দুধ জমছে, তার সুগন্ধে বাতাস আমোদিত, নদীগুলো তাদের স্ফীত কায়া সংবরণ করছে, ধানের শিষে ‘রৌদ্র-ছায়ায় লুকোচুরি খেলা’ চলেছে, বর্ষায় সতেজ পত্রপল্লবে মর্মর ধ্বনি, ফুল আর ফলের সমারোহ, চারদিকে ধানের গন্ধের সঙ্গে ফল-ফুলের গন্ধ মিশে পুরো প্রকৃতি বিপুল সমারোহ সাজিয়ে কিসের আগমনের যেন প্রতীক্ষা করছে। উৎসবের সঙ্গী হওয়ার জন্যই কি?

দুর্গাপূজা আর শারদোৎসব এভাবেই একাকার হয়ে যায়। তাই এই উৎসবের নাম শারদীয় দুর্গোৎসব। শরৎকালে এখানে দুর্গা দেবীর অকালবোধন। আর একটি বোধনও আছে বসন্তকালে। তখন তিনি বাসন্তী। একই পূজাপদ্ধতি, কিন্তু ততটা জনপ্রিয় নয়। তাই আমার মনে হয় এটি ঋতুরই উৎসব। এমন উজ্জ্বল দিন বাংলার বারো মাস্যায় নেই। ঐতিহ্যগতভাবে যে সময়টাকে বসন্তকাল ধরা হয়, সে সময়টায় সূর্য কিন্তু সরাসরি মাথার ওপর থেকে অগ্নি বর্ষণ করে। অগ্নিঝরা দীর্ঘতম দিন। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস। জ্যৈষ্ঠের ঝড় তো বাংলায় সুপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ এটাই মেনে নিয়েছেন। বলেছেন ঋতুরাজ বসন্ত। সংস্কৃত-সাহিত্য অনুসরণ করতে গিয়ে এই প্রমাদ ঘটে থাকতে পারে। উত্তরাখন্ড, যেটা বর্তমান উত্তর ভারতের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান দুটি তীর্থক্ষেত্র কেদারনাথ আর বদ্রিনাথ, সেখানে এখন বাংলার শরৎকালের আবহাওয়া। মহাপ-িত রাহুল সাংকৃত্যায়ন অন্তত সেই কথা বলেছেন তাঁর জয় যৌধেয় উপন্যাসে। কেদার-বদ্রি এ সময় অলোকানন্দা আর মন্দাকিনীর শান্ত জলধারায় সিক্ত হচ্ছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে, নদী দুটি স্বর্গ থেকে প্রবাহিত হয়েছে। হিন্দুর স্বর্গ মহাশূন্যে নয়। আরও উত্তরে ইলাবৃতবর্ষ নামে কোনো এক স্থানে। সাংকৃত্যায়ন জানিয়েছেন, স্থানটি উরাল অঞ্চলে হতে পারে। খননকাজের সময় এখান থেকে বহু প্রাচীন এক পাথরের দুর্গামূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। পুরাণে বর্ণিত স্বর্গের বর্ণনার সঙ্গে এই অঞ্চলের মিল আছে। এতেই মনে হয় প্রাচীনকালে আর্য নামে কোনো জাতি যদি এই উপমহাদেশে এসে থাকে, তাহলে তারা এই অঞ্চল থেকে এসেছিল এবং দুর্গাপূজা বহু প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত।

আমরা জেনেছি বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসামের কিয়দংশ (শিলচরসহ), ওডিশা, বিহার, ঝাড়খন্ড, অরুণাচল আর নেপাল ছাড়া ভারতের কোথাও দুর্গাপূজা হয় না। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য অংশে যে পূজা অনুষ্ঠিত হয় তাকে ‘দশহরা’ বা ‘দশেরা’ বলে। দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতে এ দেশের মতোই দুর্গোৎসব পালিত হয়। এই এলাকার বাইরে প্রথিবীর যেখানেই হিন্দু বাঙালির অবস্থিতি আছে, সেখানেই বাংলা নিয়মে উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে এই পূজা হয়। অবশ্য পাঁজি-পুঁথির তিথি-নক্ষত্র মিলিয়ে হয় না।

দুর্গা বৈদিক দেবী নন, পৌরাণিক দেবী। বেদ শ্রুতিশাস্ত্র আর পুরাণ স্মৃতিশাস্ত্র। কিছুটা ইতিহাসভিত্তিক। অবশ্য মৌখিক ইতিহাস। অষ্টাদশ পুরাণের মধ্যে মার্ক-েয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীপুরাণের চ-ী অংশে দুর্গা দেবীর কাহিনি আছে। দুর্গা কালী আর চ-ী একই আদ্যাশক্তির বিভিন্ন রূপ। এই আদ্যাশক্তি দুর্গারূপে মহিষাসুর নিধন করেছিলেন বলে আরেক নাম মহিষাসুরমর্দিনী। আদ্যাশক্তি এই দেবী বিভিন্ন রূপ ধরে বিভিন্ন অসুর নিধন করে দেবতাদের বারবার রক্ষা করেছিলেন বলে মার্ক-েয় চ-ীতে বর্ণনা আছে। অসুররা দেবতাবিরোধী শক্তি। তারা একবার দেবতাদের হটিয়ে স্বর্গ দখল করে নিয়েছিলেন এমন বর্ণনা আছে। এসব বর্ণনা থেকে প্রাগিতিহাসের কিছু আভাস পাওয়া যায়। প-িত ব্যক্তিরা এ বিষয়টি গবেষণা করে চলেছেন। ‘অসুর’ কারা? অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, প্রাচীন আসেরীয় সভ্যতার লোকেরা ওই নামে পরিচিত ছিল। তাদের দেবতার নামও ছিল অসুর। আসেরিয়ার পরাক্রমশালী দিগ্বিজয়ী সম্রাট ছিলেন অসুর বাণী পাল। তাঁর রাজত্বকাল খ্রিষ্টপূর্ব ৬৬৮ থেকে ৬২৭। তাঁর বিশাল সা¤্র                াজ্য ছিল কাস্পিয়ান সাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত। দক্ষিণের সীমানা ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত ছুঁয়ে। আফগানিস্তান, ইরান তখন এই উপদ্বীপের অন্তর্গত ছিল। অসুর বাণী পাল যতখানি বিদ্যোৎসাহী ছিলেন, ততটাই ছিলেন নিষ্ঠুর। সুতরাং তাঁকে ভয় করার কারণ ছিল। সর্বোপরি তাঁর শিরস্ত্রাণে মহিষের শিং ব্যবহার করা হতো। বোধকরি সে কারণেই অসুরবিনাশী দেবতার স্মরণ নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। এসব বিচার প-িত-গবেষকেরা করবেন। সব ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে ইতিহাসের কিছুটা ক্ষীণ যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের মহারাজা কংসনারায়ণ রায়, ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে। তখন দিল্লির সম্রাট ছিলেন আকবর। কংসনারায়ণ বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম ছিলেন। কথিত আছে, সেই পূজা উপলক্ষে তখনকার দিনে নয় লাখ টাকা খরচ করা হয়েছিল।


   Page 1 of 2
     প্রবন্ধ
আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে!
.............................................................................................
মানবাধিকার
.............................................................................................
প্রধানমন্ত্রী ও রোহিঙ্গানীতি এবং দেশের সংখ্যালঘু ইস্যু
.............................................................................................
পরিবর্তিত জলবায়ু ও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা
.............................................................................................
একজন নোবেল বিজয়ী বনাম রাষ্ট্রহীন একজাতি এবং কিছু কথা
.............................................................................................
বাংলাদেশে ধর্ষণপ্রবণতা ও প্রতিকার ড. খুরশিদ আলম
.............................................................................................
নবায়নযোগ্য জ্বালানি চাই, কয়লা নয়
.............................................................................................
চৌদ্দ এপ্রিল মানেই পহেলা বৈশাখ?
.............................................................................................
ভালোবাসার পয়লা বৈশাখ
.............................................................................................
নতুন ধারায় আসছে মানবাধিকার খবর
.............................................................................................
বড়দিন বারতা ও তাৎপর্য
.............................................................................................
মানবাধিকার সংস্কৃতির স্বরূপ
.............................................................................................
বিজয় দিবসটি একান্তভাবে বাঙালির
.............................................................................................
বুলবুল চৌধুরী বেঁচে আছেন তার সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী কর্মকান্ডে
.............................................................................................
পর্নোগ্রাফি জীবন ধ্বংসের হাতিয়ার
.............................................................................................
বাঙালির দুর্গোৎসব: ইতিহাস ফিরে দেখা
.............................................................................................
বঞ্চিত ও দরিদ্রদের জন্য কোরবানীর পশু বন্টনঃ একটি মডেল উপস্থাপন
.............................................................................................
ঈদ মোবারক! ঈদ আসলো ফিরে খুশির ঈদ, মানবতার ভাঙুক নীদ
.............................................................................................
রোযা: খোদাভীতি ও মানবতাবোধের শ্রেষ্ঠ দর্শন - আবুবকর সিদ্দীক
.............................................................................................
গরম ভাতের পান্তা : আনন্দের না উপহাস
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

Editor & Publisher: Rtn. Md Reaz Uddin
Mobile:+88-01711391530, Email: md.reaz09@yahoo.com Corporate Office
53,Modern mansion(8th floor),Motijheel C/A, Dhaka
E-mail:manabadhikarkhabar@gmail.com,manabadhikarkhabar34@yahoo.com,
Tel:+88-02-9585139
Mobile: +8801978882223 Fax: +88-02-9585140
    2015 @ All Right Reserved By manabadhikarkhabar.com    সম্পাদকীয়    Adviser List

Developed By: Dynamicsolution IT [01686797756]