| বাংলার জন্য ক্লিক করুন

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   শেয়ার করুন
Share Button
   প্রবন্ধ
  ভালোবাসার পয়লা বৈশাখ
  April, 2017, 12:06:45:PM

সন্দেহবাদীরা প্রশ্ন উত্থাপন করতেই পারেন, পয়লা বৈশাখ অন্য দশটা দিনের চেয়ে আলাদা কিভাবে। সেই তো একইভাবে সূর্য ওঠে এবং অস্ত যায়, দিনের আলো নিভে আসে, সন্ধ্যার আঁধার ঘনায়। তারপরের দিন বা আগের দিনের থেকে পয়লা বৈশাখ ভিন্ন কী হিসেবে?
শিশুরা যখন জন্মায় তখন আর দশটা শিশুর সঙ্গে তার কি তেমন কোনো পার্থক্য থাকে? তবু মায়ের কাছে তার শিশু মহার্ঘ্য, অমনটি আর হয় না। কেন এমন মনে হয়? ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখেন বলে। তেমনি পয়লা বৈশাখকে আমরা ভালোবাসার চোখে দেখি, তাই ওই দিনটা অন্য সকল দিনের থেকে আলাদা লাগে আমাদের কাছে।
এ-প্রশ্নও উঠতে পারে যে, সারা বছর বাংলা পঞ্জির খোঁজ কজন রাখে? তাহলে পয়লা বৈশাখে এত সাজসজ্জা, এত নৃত্যগীতবাদ্যপুষ্প দিয়ে সাড়ম্বরে তাকে বরণ করা কি একটা লোক দেখানো ব্যাপার, একটা ভণ্ডামি নয়?
আমাদের ব্যবহারিক জীবনে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহার নেই বললে চলে। তাই হঠাৎ করে কাউকে বাংলা তারিখ জিজ্ঞেস করলে সে প্রায়ই ঠিক জবাব দিতে পারে না। যদি বাংলা মাসের হিসেবে আমরা মাস-মাইনে পেতাম, আদালতে আমাদের ডাক পড়ত, বিদ্যুৎ-গ্যাস-টেলিফোনের বিল দিতে হতো, তাহলে বাংলা তারিখ আমাদের ঠিকই মনে থাকত। তবু যে বছরের প্রথম দিনে আমরা অনুষ্ঠান করে, আড়ম্বর করে তাকে আবাহন করি, তাও মিথ্যে নয়। আমাদের যে একটা নিজস্ব বর্ষপঞ্জি আছে, আমরা যে সকল ক্ষেত্রে পরনির্ভর নই, সেটা আমরা উপলব্ধি করতে চাই, অন্যকে জানাতে চাই। তাই এমন আয়োজন।
 
আমাদের দেশে নববর্ষ-উৎসব পালিত হতো গ্রামাঞ্চলে মেলা করে। শহরাঞ্চলে ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে সম্বৎসরের দেনা-পাওনার হিসাবের সারসংগ্রহ করতেন, ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ-রীতি, মনে হয়, আবহমান কালের। ইংরেজদের দেখাদেখি বাঙালিরাও নিউ ইয়ার্স ডে পালন করতেন দেখে ব্যথিত হয়ে উনিশ শতকের শেষে রাজনারায়ণ বসু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা নববর্ষ-উৎসব পালনের রীতি প্রবর্তন করেন, পরে তা ছড়িয়ে যায়।
আমার ছেলেবেলা কেটেছে কলকাতায়। সেখানে হালখাতার অনুষ্ঠানে গেছি পিতার হাত ধরে। মিষ্টি শুধু খেয়ে আসিনি, প্যাকেটে করে নিয়েও এসেছি। দেশভাগের পরে যখন ঢাকায় এলাম, তখন নববর্ষের অনুষ্ঠান প্রথম দেখি মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটেথ বোধহয় লেখক-শিল্পী মজলিসের উদ্যোগে। অন্যত্রও সে-অনুষ্ঠান পালিত হয়েছিল, বোধহয় একবার কার্জন হলেও। পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে আমরাও তার আয়োজন করেছি সওগাত অফিসেথ তবে নিয়মিত নয়।
ধীরে ধীরে টের পাওয়া যায় যে, এই অনুষ্ঠান সরকারের পছন্দ নয়। আমার শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধের শহীদ মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সেই পঞ্চাশ দশকেই এক প্রবন্ধ লিখে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইরানি মুসলমানেরা যদি ইসলামপূর্ব নওরোজ অনুষ্ঠান সাদরে উদ্যাপন করতে পারে, তাহলে আমরা কেন বাংলা নববর্ষ পালন করতে পারব না। বিশেষ করে, যেখানে বাংলা বছরের শুরু সম্রাট আকবরের রাজস্ব-সংস্কারের ফলে, সেখানে তো ওই বর্ষপঞ্জি মুসলমানের দান বলেই গণ্য করতে হবে। থএসব প্রশ্নের উত্তর কেউ কখনো দেয়নি। যারা নববর্ষ পালন করার, তারা তা করে গেছে। সরকার তাদের সন্দেহের চোখে দেখেছে, নথিপত্রে তাদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের উত্তরাধিকারীরা কিন্তু তাতে দমেনি। ষাটের দশকে ছায়ানটের উদ্যোগে সংগঠিতভাবে নববর্ষ পালন শুরু হলো। সে-যাত্রা এখনো চলছে। এমনকি পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা মেরেও তা থামানো যায়নি।

 

 

                                                                         
এরই মধ্যে, এবারে, আওয়ামী ওলামা লীগ নামধারী এক ভুঁইফোড় সংগঠন ফতোয়া দিয়েছে, বাংলা নববর্ষ-পালন অনৈসলামিক, ওটা বন্ধ করে দিতে হবে। যে-কথা পাকিস্তান আমলেও জোরেশোরে বলা যেত না, বাংলাদেশে তা অনায়াসে বলে ফেললেন এই ধর্মব্যবসায়ীরা।
সরকার আবার নিরাপত্তার অজুহাতে দুটি ব্যবস্থা নিয়েছেন। চারুকলা অনুষদ থেকে যে মঙ্গল-শোভাযাত্রা বের হয়, তাতে মুখোশপরা চলবে না এবং বিকেল পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করে ফেলতে হবে।
মঙ্গল-শোভাযাত্রায় মুখোশধারী কেউ প্রবেশ করে নাশকতামূলক কিছু করে ফেলবেথ এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। দুর্বৃত্তের ভয়ে গৃহস্থকে তাহলে প্রতিরোধের ব্যবস্থা না নিয়ে পলায়নের পথ খুঁজতে হবে। মেয়েদের লাঞ্ছিত করার ভয় থাকায় যাঁরা আজ পাঁচটার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে বলছেন, কাল যে তাঁরা মেয়েদেরকে ঘরের বাইরে বেরোতে নিষেধ করবেন না, তার নিশ্চয়তা কী?
বাংলাদেশে তাহলে কি আমরা কেবল পেছন দিকে চলতে থাকব? শহিদ মিনারে আলপনা আঁকাকে, পুষ্পার্ঘ্য দেওয়াকে একসময় অনৈসলামিক বলা হয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে, বরকত ও সফিউর রহমানের কবরে যেতে মেয়েদের বাধা দেওয়া হয়েছিল। তখন তাঁরা কেউ নিজের জায়গা থেকে সরে যাননি এবং ছাত্রনেতারা আজিমপুর গোরস্তানের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের সঙ্গে যুক্তিতর্কে বিজয়ী হয়ে তাঁদের প্রবেশাধিকার আদায় করে নিয়েছিলেন। ছয় দশকের বেশি সময় পরে আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি।
যে-পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শকে আমরা ভেঙেচুরে বহু ত্যাগের বিনিময় বাংলাদেশ অর্জন করেছি, সেই বাংলাদেশকে কি আমরা আরেকটা পাকিস্তান বানাতে চাই? নিশ্চয় কিছু লোক চায়, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ তা চায় না। আমাদের কি আবার ১৯৫২র মতো রক্ত দিতে হবে, ১৯৬৯-এর মতো গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে হবে? তবেই ধর্মব্যবসায়ীরা ইঁদুরের গর্তে লুকাবেন এবং দেশে সুস্থ সবল স্বাধীন সংস্কৃতিচর্চা সম্ভবপর হবে? ইতিহাসের শিক্ষা কি আমরা নেবো না? তারপরও অযৌক্তিক বাধানিষেধ থাকবে?
ছায়ানটের নববর্ষের অনুষ্ঠানে যখন বোমার আক্রমণ ঘটেছিল, তারপর ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের টেলিভিশন সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা কি আগামী বছরে এখানে আবার আসবে? নিদ্বর্ধিয় তারা জবাব দিয়েছিল, আমরা আবার আসব। এখানেই বাংলাদেশের শক্তি। প্রতিক্রিয়াশীলদের ভয়ে এই শক্তিকে আমরা যেন দুর্বল না করে ফেলি।



সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট : 453        
   আপনার মতামত দিন
     প্রবন্ধ
জাগ্রত হোক মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা
.............................................................................................
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব
.............................................................................................
বন্ধ হোক ক্রসফায়ারের গল্প
.............................................................................................
বড়দিন : মঙ্গল আলোকে উদ্ভাসিত হোক মানবজীবন : শান্তা মারিয়া
.............................................................................................
ঐতিহাসিক বদর দিবসের তাৎপর্য, গুরুত্ব ও শিক্ষা
.............................................................................................
নির্বোধ
.............................................................................................
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক সূচনা ২৬শে মার্চ
.............................................................................................
আজন্ম অধিকার বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার নারী
.............................................................................................
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়
.............................................................................................
ঈদ-উল ফিতরঃ জয়হোক মানবতার
.............................................................................................
বেলা ডুবে যায়, জাগ্রত হও
.............................................................................................
আমাদের ঘুম ভাঙবে কবে!
.............................................................................................
মানবাধিকার
.............................................................................................
প্রধানমন্ত্রী ও রোহিঙ্গানীতি এবং দেশের সংখ্যালঘু ইস্যু
.............................................................................................
পরিবর্তিত জলবায়ু ও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা
.............................................................................................
একজন নোবেল বিজয়ী বনাম রাষ্ট্রহীন একজাতি এবং কিছু কথা
.............................................................................................
বাংলাদেশে ধর্ষণপ্রবণতা ও প্রতিকার ড. খুরশিদ আলম
.............................................................................................
নবায়নযোগ্য জ্বালানি চাই, কয়লা নয়
.............................................................................................
চৌদ্দ এপ্রিল মানেই পহেলা বৈশাখ?
.............................................................................................
ভালোবাসার পয়লা বৈশাখ
.............................................................................................
নতুন ধারায় আসছে মানবাধিকার খবর
.............................................................................................
বড়দিন বারতা ও তাৎপর্য
.............................................................................................
মানবাধিকার সংস্কৃতির স্বরূপ
.............................................................................................
বিজয় দিবসটি একান্তভাবে বাঙালির
.............................................................................................
বুলবুল চৌধুরী বেঁচে আছেন তার সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী কর্মকান্ডে
.............................................................................................
পর্নোগ্রাফি জীবন ধ্বংসের হাতিয়ার
.............................................................................................
বাঙালির দুর্গোৎসব: ইতিহাস ফিরে দেখা
.............................................................................................
বঞ্চিত ও দরিদ্রদের জন্য কোরবানীর পশু বন্টনঃ একটি মডেল উপস্থাপন
.............................................................................................
ঈদ মোবারক! ঈদ আসলো ফিরে খুশির ঈদ, মানবতার ভাঙুক নীদ
.............................................................................................
রোযা: খোদাভীতি ও মানবতাবোধের শ্রেষ্ঠ দর্শন - আবুবকর সিদ্দীক
.............................................................................................
গরম ভাতের পান্তা : আনন্দের না উপহাস
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

Editor & Publisher: Rtn. Md Reaz Uddin
Corporate Office
53,Modern mansion(8th floor),Motijheel C/A, Dhaka
E-mail:manabadhikarkhabar34@gmail.com,manabadhikarkhabar34@yahoo.com,
Tel:+88-02-9585139
Mobile: +8801978882223 Fax: +88-02-9585140
    2015 @ All Right Reserved By manabadhikarkhabar.com    সম্পাদকীয়    আর্কাইভ

Developed By: Dynamic Solution IT & Dynamic Scale BD