মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে আয়োজিত কর্মসূচিতে সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিকে ইসলাম ধর্মের অবমাননা ও উস্কানিমূলক আখ্যা দিয়ে তার প্রতিবাদে মানববন্ধন এবং বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ‘সচেতন ইসলাম প্রিয় জনতা’র ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে জেলা হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা রুমিন ফারহানার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা রুমিন ফারহানাকে সাবধান করে বলেন, "ইসলাম নিয়ে কটূক্তি করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে কোনও ধরনের অপসংস্কৃতি চলতে দেওয়া হবে না। এসব বিষয়ে অবশ্যই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।"
হেফাজত নেতাদের বক্তব্য ও অভিযোগ
উক্ত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলামের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির যুব বিষয়ক সম্পাদক জুনায়েদ কাসেমী, छात्र বিষয়ক সম্পাদক এরশাদ উল্লাহ কাসেমী এবং সরাইল উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সহ-সভাপতি হাজী মহিবুল ইসলাম।
জুনায়েদ কাসেমী তার বক্তব্যে বলেন, "ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্র প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনে গতকাল ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার নিজ এলাকা সরাইলের শাহবাজপুরে হওয়া প্রতিবাদী মানববন্ধনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইসলামের আজান ও ওয়াজ নিয়ে কটূক্তি করেছেন। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।"
প্রেক্ষাপট ও রুমিন ফারহানার মূল বক্তব্য
এর আগে সোমবার বিকেলে সরাইলের শাহবাজপুর এলাকায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে একটি কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। এতে অংশ নিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে বলেছিলেন, " can বাংলাদেশের সংস্কৃতির राजधानी বলা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০২১ সালে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীতাঙ্গন আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সিনেমা হল নেই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোনও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না। এই কালো নকশা কারা করছে? যারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়, যারা বাংলাদেশকে একটা মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চায়, তারাই এই কাজগুলো করছে।"
চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, "আমি যদি প্রশ্ন করি যে রাষ্ট্র ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণ আর বলাৎকার থেকে রক্ষা করতে পারে না; যেই রাষ্ট্র ৭০ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না; যেই রাষ্ট্রে দুর্নীতি, দুঃশাসন, টাকা পাচার, ব্যাংক লুট এবং কোনও অন্যায় বন্ধ করতে পারে না; সেই রাষ্ট্র কেন সিনেমা বন্ধের মদত দেয়? কারণ আমরা গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, একটার পর একটা মাজার ভাঙা হয়েছে, কবর থেকে তুলে নিয়ে মানুষ পোড়ানো হয়েছে; আমরা দেখেছি দক্ষিণপন্থা বা ডানপন্থার উত্থান। কিন্তু আমার দেশের মানুষ তো এমন ছিল না। এ দেশে আমরা যেমন সুমধুর আজান দেখেছি, আমরা বাউলগানও দেখেছি।"
সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "যাদের আপনারা আজ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন; আপনাদের মদতে যারা আজ গানবাজনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শক্তভাবে প্রতিরোধ করার সাহস পাচ্ছে, একদিন তাদের হাতেই কিন্তু আপনারা পরাজিত হবেন। আমি আশা রাখবো শুভবুদ্ধির উদয় হবে। সামনের প্রজন্মকে আমরা যেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে না রাখি। আমরা এই রকম রাষ্ট্র আশা করি না, যেই রাষ্ট্র মানুষকে পেছনে টেনে নিয়ে যায়।"
চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের বিবরণ
উল্লেখ্য, গত শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সিনেমাটি প্রদর্শন না করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। পরবর্তীতে রবিবার ব্যক্তিগত উদ্যোগে কসবা উপজেলায় একটি স্কুলের মাঠে সিনেমাটির প্রদর্শনীর আয়োজন করার চেষ্টা করা হলে, পুলিশ ও প্রশাসন গিয়ে সেটি বন্ধ করে দেয়