বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   সারাদেশ
‘তিন দিন ঘুরছি, সার পাই নাই: সরকার মারি ফেলার বুদ্ধি করছে`
  Date : 23-09-2026
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-  কুড়িগ্রামে সার নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তির শেষ হচ্ছে না। একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। বিতরণে অব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের ক্ষোভ বাড়ছে। বিতর্কিত হচ্ছে সরকারও। অব্যবস্থাপনার জন্য কৃষি বিভাগের ‘একগুঁয়েমি’ এবং অবহেলাকে দায়ী করছে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা।
 
স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ, পুলিশ ও সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা বিভাগের দাবি, ডিলারের গুদাম থেকে সরিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকাভুক্ত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এক ডিলার পয়েন্টে শত শত কৃষককে জড়ো করে সার বিতরণ করা হচ্ছে। এতে বিশৃঙ্খলা ঠেকানো যাচ্ছে না। বারবার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েও সার নিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে কৃষক। বিব্রত হচ্ছে সরকার।
 
তবে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের দাবি, তাদের চেষ্টার কমতি নেই। কৃষি বিভাগের আগ্রহে ঘাটতি এবং সহযোগীতার অভাবে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণের সিদ্ধান্ত বাস্তাবায়ন হচ্ছে না। এতে করে স্থানীয় প্রশাসনও বিব্রত।
 
প্রতি সপ্তাহেই কুড়িগ্রাম জেলায় সার নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের নতুন অনন্তপুরে ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের ভিড় দেখে সটকে পড়েন ডিলার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস)। ক্ষোভে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। পরে প্রশাসন ও অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
 
গত রবিবার কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার ঘোগাদহ ও ভোগডাঙা ইউনিয়নে ডিলার পয়েন্টে সার বিতরণকালে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ঘোগাদহে সার বিতরণে বিলম্ব হওয়ায় ডিলার গুদামের সামনে অপেক্ষমান কৃষকরা বিএসকে মারধর করে আহত করেন।
 
তারও আগে গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভেরখাস ইউনিয়নে ডিলারের গুদামে আরেক বিএসকে অবরুদ্ধ করেন কৃষকরা। রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর ইউএনও ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিএসকে উদ্ধার করেন। তার একদিন আগে গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) চর রাজিবপুর উপজেলার রাজিবপুর বাজারের ডিলারের গুদাম ভাঙচুর করে সার নিয়ে যান ক্ষুব্ধ কৃষকরা। 
 
একই ঘটনা ঘটে গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় এবং গত ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলায়। এসব ঘটনায় কৃষি বিভাগের সঙ্গে প্রান্তিক কৃষকদের দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
 
সার নিয়ে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনেনি কৃষি বিভাগ। বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কৃষক, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিএনপি নেতৃবৃন্দ ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকাভুক্ত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের পরামর্শ দিলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না কৃষি বিভাগ।
 
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সার বিতরণে বিশৃঙ্খলার খবরে কুড়িগ্রাম জেলায় আসেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মোঃ শহীদুল ইসলাম। তিনি গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রৌমারীতে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরের দিন রবিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বৈঠকে কৃষকদের সুবিধা এবং সুষ্ঠু বিতরণের স্বার্থে ডিলার গুদামের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক নিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়।
 
বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিরা বলছেন, সম্মেলন কক্ষের সিদ্ধান্ত কক্ষের ভেতরই রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়নি। বৈঠক চলাকালে সদরের ভোগডাঙা, ঘোগাদহ এবং হলোখানা ইউনিয়নে ডিলারদের গুদামের সামনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কৃষি কর্মকর্তা হামলার শিকার হন। এরপরও কৃষি বিভাগের টনক নড়ছে না।
 
কৃষকরা বলছেন, ডিলার পয়েন্টে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী সার মেলে না। বেশিরভাগ কৃষক সার না পেয়ে ফিরে যান। ডিলার পয়েন্টে গিয়ে অনেকে মজুরি আয় থেকে বঞ্চিত হন। খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার দিলে তারা প্রয়োজন মতো নিতে পারবেন। এতে ভিড় কিংবা ভোগান্তি হবে না।
 
মঙ্গলবার কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর বাজারে ‘মেসার্স মোঃ আকবর আলী’ নামে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ইউনিয়নের সব কৃষক সারের জন্য ভিড় করেছেন। পাঁচ জনকে ১ বস্তা সার দেওয়ার পরও অনেক কৃষক সার না পেয়ে ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করেন।
 
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের যমুনা এলাকার কৃষক রুহুল আমিন বলেন, ‘তিন দিন ঘুরি গেছি। আইজ সার নিবার আসছি। পাই নাই। এলা কবার লাগছে পাঁচ জন লাগবে। পাঁচ ভাইয়ের আইডি কার্ড আনছি। সেটা নাকি হবার নয়। পাঁচ জনকেই লাগবে। এলা ওমরা কি কামলা বাদ দিয়া ১০ সের সারের জন্য আসবে। এগলা তো মারি ফেলার বুদ্ধি করছে। এলা হামার আবাদও শ্যাষ, কামলাও শ্যাষ।’
 
একই ইউনিয়নের আরেক কৃষক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মোঃ সোলজার হোসেন বলেন, ‘আগে ডিলারের ঘর থেকে সার নিই নাই। এবার এই নিয়ম করে ভোগান্তি বাড়াইছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ে থাকা লাগে। এভাবে সার নেওয়া সম্ভব? মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। আগে খুচরা দোকানে সার দিতো। মানুষের যার যতটুকু দরকার সেখান থেকে নিত। এখনও সেটাই করা উচিত।’
 
এ বিষয়ে বিসিআইসি সার ডিলার মোঃ রমজান আলী বলেন, ‘গত বছরও খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণ হয়েছে। এবার শুধু ডিলার পয়েন্টে সার বিতরণ হওয়ায় ইউনিয়নের কৃষকরা এক স্থানে জড়ো হচ্ছেন। এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সার দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এমন হতো না।’
 
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত হলেও সেটা চালু হয়নি। শুধু ডিলার গুদাম থেকে সার দেওয়া হচ্ছে।’ অন্য উপজেলাগুলোতেও একইভাবে বিতরণের খবর পাওয়া গেছে।
 
কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোঃ মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, ‘সর্বসম্মতিক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেটা অনুসরণ না করায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এটা কার্যকর করছে না তা বুঝতে পারছি না।’
 
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সার বিতরণে বারবার বলা হলেও তারা গড়িমসি করছে। জেলায় মাঠপর্যায়ে তাদের কাজের গাফিলতি ও অনাগ্রহ রয়েছে। সার বিতরণে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। এজন্য ডিডিকে বদলিও করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। পর্যায়ক্রমে ওয়ার্ডভিত্তিক সার বিতরণ শুরু হচ্ছে।


সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট : 11
  
  সর্বশেষ
এনবিআর সাবেক চেয়ারম্যান মুনীম ও প্রথম সচিব তাজুলের ২৫টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ
‘তিন দিন ঘুরছি, সার পাই নাই: সরকার মারি ফেলার বুদ্ধি করছে`
নিখোঁজের ৮ বছর পর সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায় পঞ্চগড়ে পাওয়া গেল কক্সবাজারের জসিমকে
চট্টগ্রামে ২ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় সাব-রেজিস্ট্রারসহ আটক ৩

Md Reaz Uddin Editor & Publisher
Editorial Office
Kabbokosh Bhabon, Level-5, Suite#18, Kawran Bazar, Dhaka-1215.
E-mail:manabadhikarkhabar11@gmail.com
Tel:+88-02-41010307
Mobile: +8801978882223 Fax: +88-02-41010308