মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা। বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ক্রমেই নতুন মোড় নিচ্ছে। তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের আগের রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। বিশেষ করে তিন নারীর সঙ্গে তাহসিফ ও তার বন্ধু দীপের কথাকাটাকাটি, পুলিশের টহল দলের উপস্থিতি এবং তাহসিফের মুঠোফোন থেকে মায়ের কাছে পাঠানো রহস্যময় খুদেবার্তা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার রাতের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত আটটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ফুটেজে দেখা যায়, মৃত্যুর আগের রাতে তাহসিফ তার বন্ধু দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় প্রবেশ করেন। এরপর রাতের বিভিন্ন সময়ে তাদের চলাচল ও অবস্থানের কিছু দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
তিন নারীর বাধা, অন্ধকার গলিতে কী ঘটেছিল?
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তাহসিফ ও দীপ বস্তির একটি অন্ধকার গলিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত তিন নারী তাদের বাধা দেন। একপর্যায়ে ওই নারীদের সঙ্গে তাদের কথাকাটাকাটির ঘটনাও ক্যামেরায় ধারণ হয়।
ওই নারীদের দাবি, জায়গাটি আগে মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিযোগে পুলিশ ভেঙে দিয়েছিল। এ কারণে তারা তাহসিফ ও দীপকে সেখানে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন।
তবে তিন নারীর সঙ্গে ঠিক কী বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল, তাদের সঙ্গে তাহসিফ ও দীপের আগে কোনো পরিচয় ছিল কি না কিংবা ওই ঘটনার সঙ্গে পরবর্তী সময়ের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।
তুরাগ নদসংলগ্ন মাঠে পুলিশের টহল
তিন নারীর বাধার মুখে পড়ার পর তাহসিফ ও দীপ বস্তির পাশের তুরাগ নদসংলগ্ন একটি মাঠের দিকে যান।
ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১টা ৫ মিনিটের দিকে পুলিশের আট সদস্যের একটি টহল দল ওই মাঠে প্রবেশ করে। প্রায় ১৪ মিনিট অবস্থানের পর রাত ১টা ১৯ মিনিটের দিকে তারা সেখান থেকে চলে যায়।
এই সময়ের মধ্যেই দীপকে বস্তির বিভিন্ন গলিতে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় বলে ফুটেজ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ঘটনার রাতে ওই এলাকায় পুলিশের টহল দলের উপস্থিতি এখন তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সদস্যরা সেখানে কী কারণে গিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে তাহসিফ বা দীপের কোনো কথা হয়েছিল কি না এবং তারা ওই সময় কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখেছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
রাত ১টা ৫২ মিনিটে তাহসিফকে রেখে চলে যান দীপ
সিসিটিভি ফুটেজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো রাত ১টা ৫২ মিনিটের ঘটনা। ফুটেজ অনুযায়ী, ওই সময় তাহসিফকে মাঠে রেখে দীপ সেখান থেকে চলে যান।
কিন্তু এর আগেই রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মুঠোফোন থেকে তার মায়ের কাছে একটি খুদেবার্তা পাঠানো হয়েছিল।
এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য। কারণ, দীপের বক্তব্য অনুযায়ী যদি তারা একপর্যায়ে আলাদা হয়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে ওই সময় তাহসিফের ফোন ব্যবহার করেছিলেন কে?
তাহসিফের ফোন থেকে মাকে পাঠানো বার্তাটি কে লিখেছিলেন?
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন এই খুদেবার্তার উৎস।
রাত ১টা ৩৫ মিনিটে পাঠানো বার্তাটি কি তাহসিফ নিজেই লিখেছিলেন? নাকি অন্য কেউ তার মুঠোফোন ব্যবহার করে বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন? বার্তা পাঠানোর সময় তাহসিফ ঠিক কোথায় ছিলেন এবং তার সঙ্গে তখন আর কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
মুঠোফোনের ডিজিটাল তথ্য, বার্তা পাঠানোর সময়, সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ এবং সিসিটিভি ফুটেজের সময়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হলে এ রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
দীপের বক্তব্য ও সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা কিছু ঘটনার মিল পাওয়া গেছে। তবে তার বক্তব্যের প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
বিশেষ করে তাহসিফের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কারা ছিলেন, কখন তারা আলাদা হন, রাতের বিভিন্ন সময়ে তাদের অবস্থান কোথায় ছিল এবং মুঠোফোন থেকে পাঠানো বার্তার প্রকৃত প্রেরক কে—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ঘটনার রাতে দায়িত্ব পালন করা পুলিশের টহল দলের সদস্যদের ভূমিকাও তদন্তে বিবেচনায় রয়েছে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি মিনিট
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী? তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগে তার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কারা ছিলেন? টঙ্গীর মাজার বস্তিতে তিন নারীর সঙ্গে কথাকাটাকাটির ঘটনাটি কি নিছক পরিস্থিতিগত, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে? আর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তার মুঠোফোন থেকে মায়ের কাছে পাঠানো খুদেবার্তার প্রকৃত প্রেরকই বা কে?
এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
আটটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ তদন্তে নতুন কিছু সূত্র সামনে আনলেও তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে দায়ী করা সমীচীন নয়।
তদন্তের স্বার্থে ওই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত, মুঠোফোনের ডিজিটাল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে তাহসিফের মৃত্যুর রহস্যের জট খুলতে এখন সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে টঙ্গীর মাজার বস্তির সেই রাত, তিন নারীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি, পুলিশের টহল এবং মায়ের কাছে পাঠানো রহস্যময় খুদেবার্তা।