মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা : তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও বক্তব্যের অসংগতিতে বাড়ছে রহস্য
এই দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন থাকলেও একটি বিষয় প্রায়ই আলোচনায় আসে—ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও অপরাধের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা থেমে থাকে না। এবার সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের নাম।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তাহসিফের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দীপের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ‘দিশা’ নামের এক তরুণীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে অভিযান চালিয়ে নৌপুলিশ ওই তরুণীকে গ্রেপ্তার করে বলে জানা গেছে। একই দিন আদালতের নির্দেশে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় দীপকে। বর্তমানে তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তবে মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত এখনো চলমান।
সিসিটিভি ফুটেজে দীপের সঙ্গে তাহসিফের অবস্থানের তথ্য
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন তাঁর বন্ধু দীপ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দীপ তাহসিফকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে তাহসিফ আর ফিরে আসেননি। পরে দীপ একাই ফিরে আসেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিশেষ করে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে তদন্তকারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দীপের বক্তব্যে অসংগতি, বাড়ছে তদন্তকারীদের সন্দেহ
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দীপের দেওয়া বক্তব্য। তাহসিফের পরিবারের কাছে তিনি যে তথ্য দিয়েছিলেন, তদন্তে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে তার বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও তাঁর বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়েছে বলে জানা গেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্তকারীরা ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তাঁকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে আটক, পরে গ্রেপ্তার
এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে আটক করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
পরবর্তী সময়ে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আদালতে পুলিশের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
উল্লেখ্য, ২৮ বছর বয়সী তাহসিফ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরায় নিজ বাসা থেকে নিখোঁজ হন। পরদিন বুধবার বিকেলে টঙ্গীর রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।
তাহসিফের এমন রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ব্যাপক উদ্বেগ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, দীপ তাঁদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ছেলের নিখোঁজ ও মৃত্যুর পর দীপের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তদন্তে পাওয়া তথ্যের মিল না থাকায় তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
বন্ধুত্বের আড়ালে কী ছিল অন্য কোনো রহস্য?
একজন সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তার এমন রহস্যজনক মৃত্যু কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। যে বন্ধু একসময় পরিবারের কাছে পরিচিত ও বিশ্বাসের মানুষ ছিলেন, সেই বন্ধুর বিরুদ্ধেই এখন তদন্তে উঠে এসেছে গুরুতর অভিযোগ ও সন্দেহের বিষয়।
তবে মনে রাখতে হবে, তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে কারও নাম আসা কিংবা গ্রেপ্তার হওয়া মানেই তিনি অপরাধী প্রমাণিত নন। আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক আসামির আইনগত অধিকার ও নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি
তাহসিফের মৃত্যুর পেছনে প্রকৃত ঘটনা কী, কেন তাঁকে প্রাণ হারাতে হলো, এই ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং পুরো ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
আমরা চাই, কোনো প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হোক। জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হোক এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
তাহসিফের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।
বন্ধুত্ব মানেই বিশ্বাস, আর সেই বিশ্বাসের জায়গায় আঘাত এলে তা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। কারণ বাস্তবতা হলো—সব বন্ধু প্রকৃত বন্ধু হয় না। তবে আবেগ বা সন্দেহ নয়, সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই বেরিয়ে আসুক তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য।
মানবাধিকার খবর