মোঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা : কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় ধানক্ষেতের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমন মিয়া (৩৫) নামের এক ব্যক্তিকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তির দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে, নিহত স্কুলছাত্রীর ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর ২০২৬ সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর গ্রামের উত্তরপাড়ায় ধানক্ষেতের আইলের পাশে এক কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকার খবর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানানো হয়। খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ শনাক্তকরণ ও আইনগত কার্যক্রম শুরু করে। পরে নিহতের বাবা মরদেহটি শনাক্ত করেন। নিহত কিশোরীর নাম জান্নাতুল তাজমিন (১৫)।
জান্নাতুলের স্থায়ী বাড়ি যশোর জেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে সে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত। সে নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। অল্পবয়সী এই শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় লালমাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলা রুজুর পরপরই জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও লালমাই থানা পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে সন্দেহভাজন সিএনজিচালক সুমন মিয়াকে শনাক্ত করা হয়। পরে গত ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
যেভাবে অটোরিকশায় ওঠে জান্নাতুল
পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে জান্নাতুল পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করতে যায়। সেখানে চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে ৩০০ টাকায় ভাড়া ঠিক হয়।
অটোরিকশায় ওঠার পর কিছুদূর গিয়ে জান্নাতুল চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনে। এরপর চালক তাকে সংক্ষিপ্ত পথ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অন্য পথে নিয়ে যায় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুরগামী সড়ক ধরে বিজরা বাজার হয়ে অটোরিকশাটি নির্জন এলাকার দিকে নিয়ে যায় চালক। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অটোরিকশাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যার অভিযোগ
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্ধকার ও নির্জন স্থানে পৌঁছে জান্নাতুল ভয় পেয়ে চালকের কাছে জায়গাটি সম্পর্কে জানতে চায়। তখন চালক তাকে জানায়, এটি রেসকোর্স এলাকা নয়। এ সময় আতঙ্কিত হয়ে জান্নাতুল অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করে।
পুলিশের দাবি, এ সময় সুমন মিয়া তাকে আটকানোর চেষ্টা করে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে এগোলে জান্নাতুল চিৎকার শুরু করে। একপর্যায়ে চালক তার গামছা কিশোরীর গলায় পেঁচিয়ে ধরে। ধস্তাধস্তির পর জান্নাতুল দুর্বল হয়ে পড়লে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তি ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে বলে জানানো হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পরে জান্নাতুলকে ধানক্ষেতে উপুড় করে রেখে মাথা পা দিয়ে চেপে ধরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে।
ঘটনার পর নিহতের ব্যবহৃত হ্যান্ডব্যাগ থেকে আইফোনটি নিয়ে নেওয়া হয় এবং ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে রাখা হয় বলে পুলিশের তদন্তে জানা গেছে।
গোসল করে স্থান ত্যাগ, আইফোন লুকিয়ে চট্টগ্রামে
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর সুমন মিয়া অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে রেখে কাচিকাটা মসজিদের সামনে যায়। সেখানে একটি পুকুরে গোসল করার পর ভাড়ায় চালিত অন্য একটি সিএনজিতে করে বাখরাবাদ এলাকায় চলে যায়।
পরে বাখরাবাদ এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে জান্নাতুলের কাছ থেকে নেওয়া আইফোনটি লুকিয়ে রেখে সে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরদিন, অর্থাৎ ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম থেকে সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে বাখরাবাদ এলাকার পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে নিহত স্কুলছাত্রীর ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত অব্যাহত
মাত্র ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি শিক্ষার্থীর নিরাপদে বাড়ি ফেরার যাত্রা কীভাবে ভয়াবহ পরিণতিতে গড়াল, তা মামলার তদন্তে উঠে আসা তথ্যের মাধ্যমে সামনে এসেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যৌথ তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। মামলার অন্যান্য আইনগত কার্যক্রম তদন্তের অগ্রগতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া হবে।