মােঃ জানে আলম সাকী,ঢাকা:- ২৫ বছরের চাকরির সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো সরকারি কর্মচারী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে তিনি কোনো ধরনের পেনশন বা অবসর সুবিধা পাবেন না বলে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
গত ১১ মার্চ আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। সম্প্রতি ২৮ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়েছে। বেঞ্চের নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক এবং অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
মামলার পটভূমি ও হাইকোর্টের রায়
আদালতের সূত্র অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সহকারী জজ হিসেবে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন মো. মাহবুব মোরশেদ। পরবর্তীতে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি তিনি পদত্যাগ করেন। দীর্ঘ ১৯ বছরের চাকরিজীবন শেষে পদত্যাগ করার পর তিনি পেনশন ও অন্যান্য বকেয়া সুবিধার দাবি জানান।
২০২১ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে মো. মাহবুব মোরশেদকে পেনশন ও অন্যান্য বকেয়া সুবিধা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আইন মন্ত্রণালয় আপিল আবেদন করে।
আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
আপিল বিভাগ তাদের পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের সেই নির্দেশটিকে আইনগতভাবে কার্যকরযোগ্য নয় বলে বাতিল করে দেন। রায়ের মূল পর্যবেক্ষণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- বিদ্যমান আইনের বাধ্যবাধকতা: আইনপ্রণেতারা যুক্তিসংগত বিবেচনায় নির্ধারিত ২৫ বছরের চাকরির সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগকারী কোনো সরকারি কর্মচারীর জন্য পেনশন সুবিধার বিধান রাখেননি। ফলে, সময় পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করলে পেনশন পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
- শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা: সরকারি চাকরি শুধু স্বল্পমেয়াদি কোনো কর্মসংস্থান নয়, বরং এটি একটি ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি কাঠামোবদ্ধ পেশা। নির্ধারিত সময়ের আগে অবাধে পেনশন সুবিধা দেওয়া হলে সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে।
- অকাল পদত্যাগ ও জনবল সংকট: কর্মকর্তারা যদি নির্ধারিত সময়ের আগেই পদত্যাগ করে পূর্ণ পেনশন সুবিধা ভোগ করতে পারেন, তবে অনেকেই সরকারি চাকরিকে কেবল অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা অর্জনের একটি `অস্থায়ী প্ল্যাটফর্ম` হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে অকাল পদত্যাগ উৎসাহিত হবে, অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ধরে রাখা কঠিন হবে এবং সরকারি জনবল পরিকল্পনা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
সর্বোপরি, দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট করেছেন যে সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতি বজায় রাখতেই যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরির এই ২৫ বছরের নির্ধারিত মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা একটি যৌক্তিক নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন।