মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   খেলাধুলা
পরিবার ইউরোপে থাকলেও, ফুটবলার বানাতে কুড়িগ্রামেই থেকে গেছেন লাইজু
  Date : 14-06-2026
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-  কারও পায়ে বুট নেই, কারও গায়ে নেই নাম-নম্বর লেখা জার্সি। কিন্তু চোখে আছে স্বপ্ন। কেউ জাতীয় দলে খেলতে চায়, কেউ গায়ে তুলতে চায় বড় কোনো ক্লাবের জার্সি। সেই স্বপ্নগুলোর পাশে প্রতিদিন ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকেন একজন মানুষ। তাঁর নাম জালাল হোসেন। তবে কুড়িগ্রামে সবাই তাঁকে চেনেন এক নামেই লাইজু।  
নিজের অর্থ, শ্রম আর সময় ঢেলে তিনি গড়ে তুলেছেন কুড়িগ্রাম ফুটবল প্রশিক্ষণ স্কুল। যার একটাই লক্ষ্য—তৃণমূলের ছেলে-মেয়েদের মাঠে ফিরিয়ে আনা, তাদের পায়ে একটি ফুটবল তুলে দেওয়া।  
২০১৭ সালে ‘একটি বল, একটি গ্রাম, ফুটবলের নগরী কুড়িগ্রাম’ স্লোগান নিয়ে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ। শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। ছিল না নিজস্ব মাঠ, ছিল না নির্ভরযোগ্য কোনো পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু স্বপ্ন ছিল। আর ছিল একজন মানুষের একরোখা বিশ্বাস—ফুটবল বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন।  
আজও মজিদা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের একটি কক্ষই এই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যালয়। বিকেল হলেই কলেজ মাঠে শুরু হয় অনুশীলন। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে ছুটে আসে কিশোর-তরুণেরা। কেউ সাইকেলে, কেউ অটোরিকশায়, কেউ আবার কয়েক কিলোমিটার হেঁটে। বর্তমানে নিয়মিত প্রশিক্ষণে অংশ নেয় শতাধিক খেলোয়াড়। আর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে প্রায় এক হাজার ছেলে-মেয়ে। 
তবে এই স্কুলের কাজ শুধু ফুটবল শেখানো নয়। অনেক শিশুর হাতে এখানে তুলে দেওয়া হয় বই-খাতা। কারও পড়াশোনার খরচ দেওয়া হয়, কারও জন্য কেনা হয় জার্সি কিংবা বুট। কখনো কখনো পরিবারের কাছেও পৌঁছে যায় সহায়তা। দারিদ্র্যের কারণে যাদের স্কুলজীবন থেমে গিয়েছিল, তাদের অনেকে আবার ফিরে গেছে শ্রেণিকক্ষে। ফুটবল তাদের কাছে শুধু খেলা নয়, জীবনে ফেরার একটি সেতু।  
মোঃ জালাল হোসেনের নিজের জীবনও কম ঘটনাবহুল নয়। বাবা মনির হোসেন ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলার পরিচিত ফুটবলার। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার পরিবেশে বেড়ে ওঠা। লাইজু পড়াশোনা করেছেন কুড়িগ্রাম সরকারি বালক বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। 
পরে ঢাকায় দীর্ঘদিন বিভিন্ন পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর ২০১৫ সালে একটি প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার (ফাইন্যান্স) হিসেবে অবসর নেন। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো ইউরোপে স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনির কাছে ফিরে যাবেন তিনি। কিন্তু লাইজু চলে গেলেন কুড়িগ্রাম। 
প্রশ্নটা শুনে তিনি হেসে বলেন, ‘ইউরোপে আমার পরিবার আছে, নাতি আছে। কিন্তু কুড়িগ্রামে আমার আরও এক হাজার সন্তান আছে। তারা প্রতিদিন মাঠে আসে, স্বপ্ন দেখে। তাদের ছেড়ে আমি কীভাবে একেবারে চলে যাই?’ 
কুড়িগ্রামের বহু শিশু-কিশোরের কাছে তিনি শুধু কোচ নন; অভিভাবক, পরামর্শদাতা, কখনো কখনো আশ্রয়ও।  
নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ তিনি একসময় ব্যয় করেছেন খেলোয়াড়দের জন্য। এখন বয়স বেড়েছে, সামর্থ্যও আগের মতো নেই। তবু চেষ্টা থেমে নেই। অনুশীলনের পর খেলোয়াড়দের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা, দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো—সবই চলছে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে।   
তবে আক্ষেপও আছে, ‘ কুড়িগ্রাম জেলায় ক্রীড়াপ্রেমী ও সামর্থ্যবান মানুষের অভাব নেই। তাঁরা যদি মাসে এক দিনের খাবারের খরচও দিতেন, তাহলেও অনেক শিশু উপকৃত হতো। ফুটবল সবাই ভালোবাসে, কিন্তু খেলোয়াড়ের পাশে দাঁড়াতে চায়, এমন মানুষ খুব বেশি পাওয়া যায় না।’  
শুধু কুড়িগ্রাম ফুটবল প্রশিক্ষণ স্কুল নয়, তাঁর হাত ধরেই গড়ে উঠেছে লাইজু কিডস ফুটবল একাডেমি, এফসি উত্তরবঙ্গ, কুড়িগ্রাম মোহামেডান ফুটবল একাডেমি, জারা-গ্রিন ভয়েস ফুটবল একাডেমি, কিশোর বাংলা ক্লাবসহ একাধিক উদ্যোগ। তৃণমূল ফুটবলের বিস্তারে তাঁর কাজ কুড়িগ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের নানা জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।  
এই দীর্ঘ পথচলায় সাফল্যও এসেছে। কুড়িগ্রাম ফুটবল প্রশিক্ষণ স্কুলের ছয়জন খেলোয়াড় বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছে। দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর বয়সভিত্তিক দলে জায়গা করে নিয়েছে কয়েকজন। প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে রংপুর বিভাগের সেরা দলের পেছনেও ছিল এই স্কুলের অবদান। 
বয়স মোঃ জালাল হোসেনের স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। ধরলাতীরে নিজের জমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ফুটবল একাডেমি গড়ার স্বপ্ন দেখেন। যেখানে থাকবে আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা, শিক্ষার সুযোগ এবং থাকার ব্যবস্থা। প্রত্যন্ত গ্রামের প্রতিভাবান ছেলে-মেয়েদের খুঁজে এনে সেখানে গড়ে তোলা হবে। 
হয়তো একদিন সেই একাডেমির কোনো খেলোয়াড় জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তুলে মাঠে নামবে। হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। সেই দিনের অপেক্ষাতেই আছেন লাইজু।


সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট : 14
  
  সর্বশেষ
কুড়িগ্রামে মহামারী আকার ধারণ করছে গবাদি পশুর লাম্পি ও খুরারোগ
কুড়িগ্রামে ভ্যাপসা গরমে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে চরাঞ্চলের শ্রমজীবী নারীরা
রাজশাহীতে বিএসটিআই’র অনুমোদনহীন লাইভ বেকারীকে জরিমানা
ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকার তারল্যসহায়তা দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

Md Reaz Uddin Editor & Publisher
Editorial Office
Kabbokosh Bhabon, Level-5, Suite#18, Kawran Bazar, Dhaka-1215.
E-mail:manabadhikarkhabar11@gmail.com
Tel:+88-02-41010307
Mobile: +8801978882223 Fax: +88-02-41010308