শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   সারাদেশ
কুড়িগ্রামে সার সিন্ডিকেটের মূলহোতাই বিএনপি নেতা, তার সহযোগী আঃ লীগের সহ-সভাপতি
  Date : 19-09-2026
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-  কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলায় বিতরণে অব্যবস্থাপনা এবং ডিলার-খুচরা বিক্রেতা সিন্ডিকেটে সার বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে তাদের। তবে সার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন অর্থাৎ মূলহোতা বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার বিএনপি নেতা। তাকে সহযোগিতা করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। আবার তারাই বলছেন, কৃষকরা বেশি সার মজুত করছেন। অথচ কৃষকরা সার পাচ্ছেন না।
 
কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগ বলছে, চর রাজিবপুর উপজেলায় প্রায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন এবং প্রায় ২০০ হেক্টর সবজি রয়েছে। সারের চাহিদা ও বরাদ্দে কোনও সংকট নেই। কিন্তু আগামী রবি মৌসুমে সবজি ও ভুট্টা চাষকে সামনে রেখে সংকটের আশঙ্কায় অনেক কৃষক মজুতের উদ্দেশ্যে সার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এ ছাড়াও কিছু অসাধু ব্যক্তি বেশি দামে সার বিক্রির উদ্দেশে কৃষক বেশে ডিলার পয়েন্টে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।
 
গত বুধবার সকালে কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলা শহরের রাজিবপুর বাজারে ‘মেসার্স শফিউর রহমান’ নামক বিসিআইসি ডিলারের গুদামে ঢুকে বেশ কিছু সারের বস্তা তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক স্থানীয় বিএনপি নেতা শফিউর রহমান। বিতরণে দেরি এবং ডিলারের বাড়িতে বসে স্লিপ বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে গুদামে হামলা চালান ক্ষুব্ধ কৃষকরা। বেশ কিছু সারের বস্তা নিয়ে যান। এ সময় গুদামের টিনের বেড়া, সিসি ক্যামেরা, ভেতরে থাকা টেবিল ও ফ্যান ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ তুলেছেন ডিলার।
 
ঘটনার কিছু ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফুটেজগুলোতে দেখা গেছে, সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কৃষকের সঙ্গে কিছু সাধারণ মানুষ এমনকি অপ্রাপ্ত বয়স্করাও ছিল। এ ঘটনাকে পরিকল্পিত এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের চিহ্নিত লোকজনের ইন্ধন বলে দাবি করেছেন ডিলার শফিউর। তবে তার এই দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
 
ঘটনার পুনরাবৃত্তির কারণ:
চলতি মৌসুমের শুরুতে গত ২৩ আগস্ট জেলার ভূরুঙ্গামারীতে এবং গত ৭ সেপ্টেম্বর কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলায় ডিলারের গুদাম থেকে সার লুটের ঘটনা ঘটে। এরপর চাপ সামাল ও কৃষকদের সুবিধার কথা বিবেচনায় জেলা প্রশাসন ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সার বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলায় অন্য উপজেলায় শুরু হলেও চর রাজিবপুর উপজেলায় ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা সার বিক্রি শুরু করা হয়নি। ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশে সিন্ডিকেট করে খুচরা বিক্রেতা ও অসাধু ব্যক্তিরাও সার কিনছেন। এতে প্রকৃত কৃষক সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ক্ষোভ ও হতাশা দানা বাঁধছে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলার একটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক বলেন, ‘কৃষকদের কোনও তালিকা নেই। সিন্ডিকেট কাজ করছে। অকৃষক ও খুচরা বিক্রেতারা লোক দিয়ে ডিলার পয়েন্ট থেকে সার তুলে বেশি দামে বিক্রি করছে। বিতরণে অব্যবস্থাপনায় প্রকৃত কৃষকরা সার কম পাচ্ছেন।’
 
ওই শিক্ষক আরও বলেন, ‘আরেকটা বড় সমস্যা হলো খুচরা বিক্রি না করা। এতে কৃষকরা এক জায়গায় ভিড় করছেন। একটু উসকানিতেই গন্ডগোল বাঁধছে। বুধবারের ঘটনা এ কারণেই হইছে। সব ওয়ার্ডে খুচরা সার পাওয়া গেলে এমন গন্ডগোল হতো না।’
 
ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট:
কুড়িগ্রাম কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চর রাজিবপুর উপজেলায় বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার রয়েছেন আট জন। এ ছাড়াও বিএডিসি অনুমোদিত নন-ইউরিয়া সার ডিলার রয়েছেন আরও ছয় জন। চলতি মৌসুমে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে উপজেলায় ৬৩০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৫২০ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ১৯৫ মেট্রিক টন টিএসপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৫০ মেট্রিক টন।
 
স্থানীয় কৃষক ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, রাজিবপুরে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট রয়েছে। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপি নেতা ও বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার মোঃ শফিউর রহমান। তিনি ডিলার সমিতির সভাপতি। তার সহযোগী হিসেবে আছেন সদর ইউনিয়নের আরেক ডিলার ও চর রাজিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোঃ সিরাজুদ্দৌলা।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ সিরাজুদ্দৌলা এবং তার বড় ভাই চর রাজিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি মোঃ আব্দুল হাই বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার। মোঃ সিরাজুদ্দৌলার স্ত্রী বিএডিসি অনুমোদিত সার ডিলার। একই পরিবারে তিন জন ব্যক্তি সার ডিলার হওয়ায় বিএনপি নেতা মোঃ শফিউর রহমানের ছত্রছায়ায় তারা সার বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করছেন। নানা কৌশলে খুচরা বিক্রেতা ও নিজেদের পরিচিত কৃষকদের সার দিচ্ছেন। 
 
সাধারণ কৃষকরা বঞ্চিত:
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলার বাজারের ডিলারের গুদাম ঘেঁষা একজন দোকানদার বলেন, ‘রাজিবপুরে সারের অভাব নাই। কিন্তু মোঃ শফিউর রহমান আর মোঃ সিরাজুদ্দৌলা মিইলা সিন্ডিকেট করে সার বেচে। পরিচিতদের রাতেও সার দেয়। খুচরা বিক্রেতার কাছে একসঙ্গে অনেকগুলা আইডি কার্ড নিয়া সার বের করে দেয়। তখন সাধারণ কৃষক সার পায় না। বাইর থাইকা বেশি দামে কেনে।’
 
বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রদল নেতাও:
কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কৃষক ও চর রাজিবপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মোঃ বাবুল আক্তার বলেন, ‘কৃষকদের সারের প্রয়োজন আছে। সংকটের চেয়ে বিতরণ ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়েছে। উপজেলায় কৃষকদের কোনও তালিকা নাই। কিন্তু ডিলারদের সিন্ডিকেট আছে। শফি ডিলার (বিএনপি নেতা) এসবের হোতা। এরা গোপনে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে একসঙ্গে অনেক আইডি কার্ড নিয়া বেশি দামে বস্তায় বস্তায় সার দেয়। এখানেই সিন্ডিকেট মুনাফা লোটে। এছাড়াও পাশ^বর্তী রৌমারী উপজেলার খেওয়ারচর ও আলগারচর এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের অনক কৃষক রাজিবপুর থেকে সার সংগ্রহ করেন। ফলে এলাকার কৃষকরা সার পায় না।’
 
যা বলছেন ডিলার শফিউর ও আওয়ামী লীগ নেতা:
সিন্ডিকেট করে সার বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা মোঃ শফিউর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ সিরাজুদ্দৌলা। মোঃ সিরাজুদ্দৌলা  বলেন, ‘সিন্ডিকেট জানি না। খুচরা বিক্রেতারা লাইনে তাদের লোক দিয়া সারের বস্তা নেন এটা সত্য। আমরা সেটা সবসময় বুঝতে পারি না। সার নিয়া যেটা চলতাছে তা আমি ৩১ বছরের ব্যবসা জীবনে দেখি নাই। কৃষকরা আগাম সার নিয়া মজুত করতেছে। আর কয়েক দিনের মধ্যে এটা থাইমা যাবো।’
 
একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা ও ডিলার সমিতির সভাপতি মোঃ শফিউর রহমান বলেন, ‘কিছু পরিচিত লোকদের তো সার দিতে হয়। কিন্তু সিন্ডিকেট নাই। খুচরা বিক্রেতারা তাদের কিছু লোকদের আইডি কার্ড দিয়া সার তোলে। আমরা তো সবাইকে চিনি না। কৃষি অফিসাররা দাঁড়ায় থেকে সার দেন। তারা যাদেরকে দিতে বলে তাদেরকে সার দিই।’ অধিক পরিমাণে সার ব্যবহারের প্রবণতা এবং সংকটের আশঙ্কায় কৃষকদের আতঙ্ক বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করছে বলে দাবি করেন এই ডিলার।
 
কুড়িগ্রাম কৃষি অফিস বলছে ঘাটতি নেই:
কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ তৌফিক আল জুবায়ের বলেন, ‘সারের ঘাটতি নেই। চর রাজিবপুরে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়। ভুট্টা এবং রবি মৌসুমের সবজির জন্য সংকটের আশঙ্কা থেকে কৃষকরা আগাম সার সংগ্রহ করছেন। আগামী কয়েক মাস আরও বেশি বরাদ্দ আছে। কিন্তু কৃষকদের এটা বোঝানো যাচ্ছে না। তারা পেনিক থেকে সারের জন্য ছুটছেন।’
 
চর রাজিবপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ সায়েকুল হাসান খান বলেন, ‘আগামী দুই তিন মাস ভুট্টা চাষের জন্য কৃষকরা আগাম সার সংগ্রহ করে মজুত করা শুরু করেছেন। এটা একটা বড় সমস্যা তৈরি করছে। ওয়ার্ডভিত্তিক খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সার বিক্রির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ডিলাররা যাতে বস্তা খুলে বিক্রি করেন আমরা সে ব্যবস্থা নিচ্ছি। ডিলারদের কারসাজি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট : 3
  
  সর্বশেষ
কুড়িগ্রামে সার সিন্ডিকেটের মূলহোতাই বিএনপি নেতা, তার সহযোগী আঃ লীগের সহ-সভাপতি
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের আগে স্থানতরিত বিদ্যালয়, ৬ বছরেও সংকট কাটেনি
রাজশাহীতে সর্প দংশন সচেতনতা দিবস উপলক্ষে প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত
কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে ১৫ জন গ্রেপ্তার

Md Reaz Uddin Editor & Publisher
Editorial Office
Kabbokosh Bhabon, Level-5, Suite#18, Kawran Bazar, Dhaka-1215.
E-mail:manabadhikarkhabar11@gmail.com
Tel:+88-02-41010307
Mobile: +8801978882223 Fax: +88-02-41010308