মােঃ জানে আলম সাকী,ঢাকা:- জুলাই গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে একসময় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজপথে সোচ্চার ছিল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনএসপি) এবং হেফাজত ইসলামসহ বেশ কয়েকটি দল। তবে সে সময় বিএনপি সরাসরি দল নিষিদ্ধের দাবিতে না গিয়ে আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু সরকার গঠনের কয়েক মাসের মাথায় এসে সেই একই আইনি কাঠামো বহাল রেখে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে বিএনপি সরকার। ফলে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিষয়ে আসলে কী ভাবছে বিএনপি?
সরকার গঠনের পর অবস্থানের দৃশ্যমান পরিবর্তন
গত ৪ জুলাই রাজধানীতে `জুলাই গণঅভ্যুত্থানে` নিহতদের এক স্মরণসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "দেশে আওয়ামী লীগ আর রাজনীতি করতে পারবে না। দলটির রাজনৈতিক পতন হয়েছে, আর দাফন হয়েছে দিল্লিতে।" তিনি আরও জানান, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের আলোকে রাজনৈতিক দলের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধন করে দ্রুতই আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
অথচ নির্বাচনের আগে বিএনপির অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ঐক্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। এমনকি নির্বাচনের আগে ও পরে দলটির শীর্ষ নেতারা একাধিকবার বলেছিলেন, যেসব আওয়ামী লীগ নেতা অপরাধে জড়িত নন, তারা ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে পারবেন।
যেভাবে নিষিদ্ধ হলো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম
২০২৫ সালের ১১ মে জামায়াত ও এনএসপিসহ বিভিন্ন দলের আন্দোলনের মুখে `সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯` সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পরদিনই এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। তবে দলটিকে তখন পুরোপুরি বিলুপ্ত বা নিষিদ্ধ করা হয়নি। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর, গত ৮ এপ্রিল বিএনপি সরকার ওই অধ্যাদেশটিকে কোনো পরিবর্তন না করেই `সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬` হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস করে।
কেন এই কঠোর অবস্থান?
আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির এই আকস্মিক কঠোরতা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে:
- ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা: নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না জানান, বিএনপি মনে করে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগই তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। জামায়াত বিরোধী দলে থাকলেও তারা বিএনপির জন্য একই মাত্রার রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারবে না। তাই আওয়ামী লীগ যাতে আবার সংগঠিত হতে না পারে, সেজন্য সরকার এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
- দীর্ঘমেয়াদী আইনি প্রক্রিয়া: অনেক বিশ্লেষকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াত ও এনএসপির আন্দোলনকে বিএনপি তাৎক্ষণিক হুমকি মনে না করলেও, আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হলে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে। তাই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলটিকে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতির বাইরে রাখার কৌশল নিচ্ছে সরকার।
- আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয়তা: সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ নিজেরাও এখন প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফেরার কোনো তৎপরতা বা দৃশ্যমান কর্মসূচি দেখাচ্ছে না। বর্তমান বিরোধী রাজনীতিতে মূল ভূমিকা পালন করছে জামায়াত ও এনএসপি। সরকার সম্ভবত এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আইনি পথেই সমাধান চায় বিএনপি
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পুরো বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জানান, জুলাই গণহত্যার অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন মহল দলটিকে নিষিদ্ধের দাবি তুললেও বিএনপি কোনো নির্বাহী আদেশে এটি করতে চায় না। বিএনপি চায় পুরো বিষয়টি যেন একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যাতে ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো আইনি প্রশ্ন বা বিতর্ক না থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও বিএনপির সেই আইনি পথে হাঁটার অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের শাসন আমলে দল হিসেবে নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯—দুটি আইনই আওয়ামী লীগের আমলে প্রণীত হওয়ায়, এই আইনের অধীনেই দলটির বিচার করা পুরোপুরি সম্ভব।