মামলা, জিডি ও স্মারকলিপির পরও মিলছে না স্বস্তি; নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার
কুমিল্লা নগরীতে সাংবাদিক ও পেশাজীবী মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্রকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। হামলা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, প্রাণনাশের হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সাইবার হয়রানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে একাধিক মামলা, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করলেও তিনি এখনো কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেছেন। এ অবস্থায় তিনি ও তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তিনি দাবি করেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কাজ করার কারণেই একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ড আরও সংগঠিত ও বেপরোয়া রূপ নেয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩ মে থেকে ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে তিনি একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এসব অভিযোগে পেশাগত কাজে বাধা সৃষ্টি, চাঁদা দাবি, অনুসরণ করা, প্রকাশ্যে হামলা, প্রাণনাশের হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
মওদুদ আব্দুল্লাহ শুভ্র দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে মোটরসাইকেলে আসা হেলমেটধারী দুর্বৃত্তরা তাঁর গতিরোধ করে হামলা চালিয়েছে। কখনও সংবাদ সংগ্রহে যাওয়ার পথে, আবার কখনও ব্যক্তিগত কাজে বের হলে তাঁকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়। কয়েকটি ঘটনায় তাঁর ব্যবহৃত ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসম্বলিত ডিভাইস এবং নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তাঁর ভাষ্য, এসব ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে নীরব করে রাখা। তবে তিনি প্রতিটি ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রেখে আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছেন।
চলমান মামলা
সর্বশেষ ১৬ অক্টোবর ২০২৫ সালে তিনি কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-১-এ একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানাকে দেন।
এছাড়া বর্তমানে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়ের করা দুটি জিআর মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
১. এফআইআর নং-৪১, জিআর-৮৫০ (তারিখ: ১৪ নভেম্বর ২০২৪)
ধারা: ১৪৩/৩৪২/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৪২৭/৩৮৫/৫০৬(৩)/৩৪।
২. এফআইআর নং-৫১, জিআর-৮১২ (তারিখ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫)
ধারা: ৩৯২/৩৪ (দস্যুতা সংক্রান্ত)।
ভুক্তভোগীর দাবি, উভয় মামলাই বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আদালত এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের গ্রেপ্তার করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এখনও চক্রটির মূল সদস্যরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে তিনি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত-১-এ আরও একটি নালিশি (সি আর) মামলা দায়ের করেন। মামলাটি সি আর নং-৬১৫/২৬ (কোতোয়ালি) হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানাকে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩/৩২৩/৩০৭/৩৮৫/৩৬৫/৪২০/৫১১/৫০০/৩৭৯/৫০৬(২)/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
সাইবার হয়রানি ও অপপ্রচারের অভিযোগ
সাংবাদিক শুভ্র অভিযোগ করেন, সংঘবদ্ধ চক্রটি বিভিন্ন সময় তাঁর মোবাইল ফোন হ্যাকিং, কথোপকথনে আড়ি পাতা, ফেসবুক আইডি হ্যাক ও ক্লোনিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে তাঁর পেশাগত ও ব্যক্তিগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন ভুয়া ফেসবুক আইডি, পেজ ও মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর বিকৃত ও আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কাফনে মোড়ানো প্রতীকী ছবি প্রচার করে তাঁকে ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় তিনি ও তাঁর পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেন।
প্রশাসনের কাছে আবেদন
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অনলাইন জিডি (নং-১৩৫৭) করেন। এছাড়া ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে এসডিআর নং-৪৮৫৩ মূলে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
পরবর্তীতে ৭ জুন ২০২৬ তারিখে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে এবং ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে পুলিশ সুপারের কাছে পৃথক স্মারকলিপি দিয়ে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানান।
এ ছাড়া বিষয়টি অবগতির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাব মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, ডিবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতি এবং কুমিল্লা প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীর প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকারকর্মী ও ‘মানবাধিকার খবর’-এর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
পুলিশের বক্তব্য
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলা ও জিডিগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, অভিযুক্তরা ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করায় গ্রেপ্তারে কিছুটা সময় লাগছে। তবে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং দ্রুত বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সচেতন মহলের মতামত
দীর্ঘদিন ধরে একজন গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে হামলা, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ কুমিল্লার সচেতন মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা জরুরি। একই সঙ্গে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শুধু একজন ব্যক্তির সুরক্ষা নয়, বরং স্বাধীন গণমাধ্যম ও আইনের শাসনের প্রতিও সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।