মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- গণমাধ্যমে বা মিডিয়ার মাধ্যমে যেন কোনো কারণে কারও বিচার (মিডিয়া ট্রায়াল) না হয়, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, "আমাদের দেশে বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিচার হবে আদালতের মাধ্যমে। মিডিয়ার মাধ্যমে যেন কোনো কারণে বিচার না হয়, সে ক্ষেত্রে আপনাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে।"
শনিবার ঢাকা ক্লাবে সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) বার্ষিক সাধারণ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বিচার ব্যবস্থার নানা দিক নিয়েও কথা বলেন তিনি।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "আমাদের সংবিধানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কিন্তু সুনিশ্চিত, কিন্তু এটি সরাসরি ফান্ডামেন্টাল রাইটস (মৌলিক অধিকার) কিন্তু না। এর কতগুলো ক্ষেত্রে আমাদের যৌক্তিক বিধিনিষেধ, বাধানিষেধ সাপেক্ষেই কিন্তু এটি। একদিকে যেমন জনগণের এবং প্রত্যেকটা মানুষের তথ্য জানার অধিকার আছে, তেমনিভাবে আপনারা অবাধ সংবাদ প্রবাহ সেটাও যেন সুনিশ্চিত থাকে তার একটা ব্যালেন্স করতে হবে।"
আদালতের খণ্ডিত বক্তব্য প্রকাশের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "অনেক সময় আমরা যখন বিচারিক প্রক্রিয়ায় অনেক বিচারপতির সঙ্গে যখন আইনজীবীদের যখন কথা বলি, সব কথা কিন্তু আলটিমেটলি রিপোর্টেড হয় না, চূড়ান্ত রায়ে কিন্তু প্রতিধ্বনিত হয়। কিন্তু একটা মামলা বোঝার জন্যে বিচারকদের পক্ষ থেকেও হয়তো অনেক মন্তব্য করা হয়... এই মন্তব্যগুলো অনেক সময় মাঝপথের কেউ টুইস্ট করে; এবং এর প্রেক্ষাপট যেহেতু কেউ জানতে পারে না, এগুলো কিন্তু অনর্থক একটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।"
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ‘অপতথ্য’ ও ‘গুজব’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এর অপব্যবহারের বিষয়েও সাংবাদিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তির যেকোনো তথ্যকে হুট করে বিশ্বাস করা যাবে না।
দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় মামলা জট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমাদের বিচারকের অপ্রতুলতা আছে, আমাদের অনেকের দক্ষতার অভাব আছে, অনেক ক্ষেত্রে মামলার নানা বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যেটা আইনসম্মত হওয়া দরকার সেটি না হয়ে নানারকম ‘রাজনীতি’ কাজ করেছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী দিনগুলোতে আমরা বাংলাদেশে বিভিন্ন বিচারিক অফিসারদের নানারকম অবিচারের কথা শুনেছি।" তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আপিল নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি অতি সম্প্রতি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেছেন জানিয়ে কাজল বলেন, "আমি প্রত্যাশা করব মৃত্যুদণ্ডের আসামি যারা থাকেন... তাদেরও কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব বিচার, বিচারের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয় খালাস অথবা তাদের সাজা বহাল করার অন্তত একটা রায় হওয়া দরকার; এবং এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এটি নিশ্চিত করা।"
এদিকে আপিল বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করেছেন বলে অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, "প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিশ্চয়ই ভাববেন। আমার মনে হয় আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে যদি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলাদাভাবে বিষয়টি বলতে পারি, আমি নিশ্চিত উনি আমাদের এই বিষয় বিবেচনা করবেন।"
অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মোহাম্মদ শিশির মনিরও আপিল বিভাগে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কথা বলেন। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "যেহেতু সাংবাদিক বন্ধুগণ প্রচলিত প্রসিডিংয়ের সঙ্গে নিজেদেরকে পার্টিসিপেট করতে পারছেন না, আমার ধারণা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেও এক ধরনের হ্যাম্পার ফিল হচ্ছে।"
এই সমস্যার সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি তৈরির প্রস্তাব করে শিশির মনির বলেন, "এখন আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি যে কারণে কাজটা করেছেন, প্রয়োজন হলে ওই কারণটাকে ঠিক রেখে কোনো একটা সুলিখিত আচরণ বিধি তৈরি করে একদিকে সুপ্রিম কোর্টের স্ট্যান্ডার্ডও ঠিক থাকতে পারে, আরেকদিকে সাংবাদিক বন্ধুদেরও পেশাগত দায়িত্ব পালনে যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, এটাও হতে পারে।" অনুষ্ঠানে শিশির মনির প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানেরও স্মৃতিচারণ করেন।