মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- কুষ্টিয়ায় হঠাৎ কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল এবং কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের কিছু অব্যবস্থাপনা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তবে প্রশাসনের বা হাসপাতালের কোনো চিকিৎসা কর্মকর্তাই মন্ত্রীর এই পরিদর্শনের বিষয়ে আগে থেকে অবগত ছিলেন না।
মৌখিক ছুটির কোনো সুযোগ নেই
বুধবার সকাল ১০টায় মন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে যান। সেখানে তিনি উপস্থিত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাদের ডিজিটাল হাজিরা ও রেজিস্ট্রার খাতার তথ্য পরীক্ষা করেন। কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্সের অনুপস্থিতি দেখে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জানানো হয় যে তারা মৌখিক ছুটি নিয়েছেন। তখন মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে তত্ত্বাবধায়ককে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘মৌখিক ছুটি নেওয়ার কোনো বিধান নাই।’
ওয়ার্ড, রান্নাঘর ও ওয়াশরুম পরিদর্শন
এরপর মন্ত্রী মেডিসিন (পুরুষ) ওয়ার্ডে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসার মান নিয়ে খোঁজখবর নেন। রোগীদের বিছানার কাভার উঁচু করে সেখানে ছারপোকা আছে কি না, তা তিনি নিজে পরীক্ষা করেন। পাশাপাশি মেডিসিন (নারী) ওয়ার্ডে গিয়ে সরাসরি রোগীদের ব্যবহৃত ওয়াশরুম পরিদর্শনে যান। সেখানে একজন নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে পরিষ্কারের কাজ করতে দেখে মন্ত্রী তাকে বলেন, ‘এই রাখো, আমারে দেইখা শুরু করলা পরিষ্কার, রাখো।’ এছাড়া হাসপাতালের রান্নাঘরে গিয়ে রোগীদের জন্য প্রস্তুত হতে থাকা খাবারের গুণগত মান ও পরিবেশ দেখেন এবং সেখানে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে দেওয়া রোগীদের বিনামূল্যে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং উপস্থিত রোগীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘কেউ টাকা চাইলে জানাবেন।’
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের যা বললেন মন্ত্রী
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে দুই ঘণ্টা এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক ঘণ্টা অবস্থান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ময়লা পেয়েছি, বাথরুম আমি আসার পর পরিষ্কার করেছে। বিছানাগুলো দেখলাম, ছারপোকা পাইনি। তবে জনগণের চাপ ও চিকিৎসকের সংখ্যা হিসাবে সেবা ভালোই পেয়েছি। চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতি সন্তোষজনক হলেও কয়েকজন দেরিতে আসায় তাদের সতর্ক করা হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালের নালা পরিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তিন মাসের মধ্যে চালু হবে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রসঙ্গে মন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসে আগামী তিন মাসের ভেতর কুষ্টিয়া মেডিকেল (মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) চালু করব। যত যন্ত্রপাতি আছে চালু করব, ফার্নিচার কেনা হচ্ছে, দরপত্র হয়ে গেছে। লোকবল দেওয়া হবে। এটা চালু হলে জেনারেল হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।’
তিনি আরও জানান, প্রতিটি হাসপাতালে আধুনিক মানের ৩ থেকে ৫টি অ্যাম্বুলেন্স থাকবে এবং মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত ঢাকা বা কাছের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ৪টি হেলিকপ্টার আনা হচ্ছে। এছাড়া চিকিৎসকের সংকট দূর করতে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক এবং জুলাই মাস থেকে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী।
বিগত সরকারের সমালোচনা
আর্থিক লুটপাটের অভিযোগ তুলে বিগত সরকারের সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১৭ বছরে হাসপাতালের উন্নয়নে কোনো কাজ হয়নি। কাজ করলে জবাবদিহি আছে, এটা মানুষ ভুলে গিয়েছিল। জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার অভাব ছিল বলেই স্বাস্থ্য খাতে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা রাতের অন্ধকারে ভোট নিয়েছে। জনগণের কাছে যাওয়ার দরকার পড়ে নাই, এজন্য তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ছিল না।’ তিনি আশ্বাস দেন যে বর্তমান আমলে ভালো যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হবে এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।
মন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শনকালে তাঁর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন এবং সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন প্রমুখ।