| রহমত উল্যাহ পাটোয়ারী, রামগঞ্জ(লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি: বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির(বিসিএস) সভাপতি এবং দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পরিবেশক স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেডের এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বন্দর, কাস্টমস ও মহাসড়ক খাতকে বানিজ্যের প্রধান “বটলনেক” বা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে,পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য এই তিন খাতের বিদ্যমান জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা অত্যান্ত জরুরি। সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পোস্টে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন এবং সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন বাস্তবসম্মত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন- “বাংলাদেশে আমরা রপ্তানি বাড়াতে চাই, এফডিআই চাই, শিল্পায়ন চাই, দাম নিয়ন্ত্রণ চাই। কিন্তুু একটা বিষয়কে আমরা এখনও “সাপোর্টিং সেক্টর” ভেবে অবহেলা করি: লজিস্টিকস। বাস্তবে লজিস্টিকস কোনো সহায়ক বিষয় নয়; এটাই অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন। পণ্য যদি বন্দরে আটকে থাকে, কাস্টমসে ঝুলে থাকে কিংবা মহাসড়কে সময় নষ্ট হয়, তাহলে দেশের উৎপাদনশীলতা কমে, খরচ বাড়ে, এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নষ্ট হয়। বহু দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, লজিস্টিকস দক্ষতা বাড়াতে পারলে একটি দেশ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১-২ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত গতি যোগ করতে পারে। কারণ একই কারখানা, একই শ্রম, একই পণ্য দিয়েই বেশি কাজ হয়, অপচয় কম হয়। বাংলাদেশে লজিস্টিকসের তিনটি বড় বাধা খুবই পরিচিত। বন্দরের ধীরগতি, কাস্টমসের জটিলতা এবং মহাসড়কের বটলনেক। এগুলো আলাদা সমস্যা নয়; একটার প্রভাব আন্যটিকে বড় করে তোলে। আপনি যদি কারখানায় সময়মতো কাঁচামাল আনতে না পারেন, উৎপাদন ব্যাহত হবে। আপনি যদি শিপমেন্ট সময়মতো ছাড় করতে না পারেন, ক্রেতা হারাবেন। আর পণ্য যদি মহাসড়কে আটকে থাকে, সেটা “ইনভেন্টরি” হয়ে পড়ে থাকে এবং মূলধন আটকে যায়। প্রথম সমস্যা বন্দর। বন্দরে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, ইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট এবং অফ-ডক কানেকশন- সব খানেই সময়ের অপচয় হয়। সময়ের অপচয় মানেই অর্থের অপচয়, আর রপ্তানিতে অর্থের অপচয় মানেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া। ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়া যে জায়গায় এগিয়েছে, তারা বন্দরে সময় কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। ফলে তাদের পণ্য দ্রুত বাজারে পোঁছায় এবং তাদের সাপ্লাই চেইন আরও নির্ভরযোগ্য হয়েছে। দ্বিতীয় সমস্যা কাস্টমস। বাংলাদেশে কাস্টমস মানে এখনও অনেকাংশে “কাগজের দেশ”। একই ডকুমেন্ট বারবার জমা দিতে হয়, একই ইনস্পেকশন বারবার পরিদর্শন করা হয়, আর ভিন্ন অফিসে ভিন্ন ব্যাখ্যায় দেওয়া হয়। এই অনিশ্চয়তাই বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় ভয়। আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থা মানে হলো-রিস্ক-বেসড ইনস্পেকশন (সব কিছু খুলে দেখা নয়), প্রি-ক্লিয়ারেন্স এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য ছাড়। সময় নির্ধারিত না থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা করতে পারে না। তৃতীয় সমস্যা মহাসড়ক ও লাস্ট-মাইল সংযোগ। চট্টগ্রাম-ঢাকা করিডোরে সামান্য জট মানেই দেশের অর্ধেক বাণিজ্য কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাওয়া। শিল্পাঞ্চলের সংযোগ সড়ক, ট্রাক টার্মিনাল, ওয়্যারহাউস ও কোল্ড চেইনের ঘাটতি থাকলে মহাসড়ক যত বড়ই হোক,বটলনেক থেকেই যায়। এছাড়া রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ পরিবহনের ব্যবহার কম থাকায় সব চাপ পড়ে সড়কের ওপর। ফলে কস্ট (ব্যয়)বাড়ে, দুর্ঘটনা বাড়ে, সময় নষ্ট হয়। এই লজিস্টিকস দুর্বলতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তিনটি জায়গায়। প্রথমত, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ হয় না; কারণ খাদ্য, ওষুধ ও ইলেকট্রনিক্সের মতো সংবেদনশীল পণ্যের সময় ও কোল্ড চেইন অত্যান্ত জরুরি। দ্বিতীয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) রপ্তানিতে প্রবেশ করতে পারে না; কারণ বিলম্বজনিত অতিরিক্ত ব্যয় বহন করার সক্ষমতা তাদের নেই। তৃতীয়, এফডিআই আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই দেখে-পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে কত সময় লাগে, কাস্টমস কতটা প্রেডিক্টেবল, লজিস্টিকস ব্যয় কত। তাহলে করণীয় কী? প্রথমত,বন্দরের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল ইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট, দ্রুত কন্টেইনার ক্লিয়ারেন্স, অফ-ডক সমন্বয় এবং ২৪/৭ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত,কাস্টমস ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। পেপারলেস ট্রেড, সিঙ্গেল উইন্ডো, রিস্ক-বেসড অডিট, এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পণ্য ছাড়ের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, জাতীয় লজিস্টিক্স পরিকল্পনা দরকার। যেখানে সড়ক, রেল, নৌপথ, ওয়্যারহাউসিং এবং কোল্ড চেইনকে একসাথে পরিকল্পনা করা হবে। চতুর্থত, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক “লজিস্টিক্স জোন” গড়ে তুলতে হবে, যাতে কারখানার গেট থেকে বন্দর পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের খরচ ও সময় কমে আসে। শেষ কথা-বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের চ্যালেঞ্জ নয়, বরং সেই অবকাঠামোকে অর্থনীতির গতিতে রূপান্তর করার চ্যালেঞ্জ। লজিস্টিক্স যদি দ্রুত, সাশ্রয়ী ও প্রেডিক্টেবল না হয়, তাহলে উন্নয়ন প্রকল্প যতই বাস্তবায়ন করা হোক না কেন-অর্থনীতিতে গতি বাড়বে না। আর লজিস্টিক্সের উন্নয়ন মানে শুধু পণ্য দ্রুত চলা নয়; এটা মানে ডলার দ্রুত আসা, চাকরি বাড়া, বিনিয়োগ বাড়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়া।”
|