মোঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে চান্দের পাড়াতে ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে ঝিনুক আকৃতির দৃষ্টিনন্দন ‘আইকনিক রেলস্টেশন’। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই স্টেশনটি উদ্বোধন করা হলেও, দীর্ঘ আড়াই বছর পার হয়ে গেলেও নিশ্চিত করা যায়নি কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার বিশাল ঘোষণা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, যার ফলে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা।
আধুনিকতার আড়ালে অব্যবস্থাপনার চিত্র
২৯ একর জমিতে নির্মিত ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছয়তলা ভবনে সুযোগ-সুবিধার কোনো কমতি থাকার কথা ছিল না। উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল, পর্যটকরা চাইলে হোটেল ভাড়া না করেই স্টেশনে লকার বা লাগেজ রাখার স্থানে মালামাল রেখে সারা দিন সমুদ্রসৈকত ঘুরে রাতের ট্রেনে আবার ফিরে যেতে পারবেন। অথচ বাস্তব চিত্র হলো—
- বন্ধ লকার ও লাগেজ সুবিধা: দূর থেকে আসা যাত্রীদের মালামাল নিরাপদে রাখার মতো কোনো লকার সেবা এখনো চালু হয়নি।
- টয়লেটের তীব্র সংকট: হাজারো যাত্রীর জন্য মাত্র একটি টয়লেট খোলা রাখা হয়েছে, যেখানে নারী-পুরুষ ও শিশুদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
- বন্ধ স্ক্যানার ও চলন্ত সিঁড়ি: আধুনিকতার বড় বড় বিজ্ঞাপন থাকলেও ভেতরের স্ক্যানার এবং চলন্ত সিঁড়িগুলো বন্ধ রয়েছে। এমনকি ভবনের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য তৈরি করা পানির ফোয়ারাটিও বন্ধ এবং এর প্রবেশপথ তালাবদ্ধ।
- দোকান ও রেস্তোরাঁ শূন্য: স্টেশনের ভেতরে কোনো ওষুধের দোকান বা মানসম্মত রেস্তোরাঁ চালু করা সম্ভব হয়নি।
সংকীর্ণ প্ল্যাটফর্ম ও হুড়োহুড়ি
স্টেশনটি ঘুরে দেখা গেছে, ট্রেন থেকে নেমে যাত্রীরা পূর্ব পাশের একটি মাত্র সরু প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বের হচ্ছেন। একই সময়ে ট্রেনে ওঠার জন্য অন্য পাশ থেকে ছুটছেন আরেক দল যাত্রী। এই মুখোমুখি সংকীর্ণ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে তৈরি হচ্ছে তীব্র ভিড় ও হুড়োহুড়ি। লাগেজ ও শিশুসন্তানদের নিয়ে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী যাত্রীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন টিকিট কালেক্টর জানান, "দুটি ট্রেনের যাত্রীরা যখন ভবনের বাইরে একটি মাত্র গেট দিয়ে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ ও বের হন, তখন টিকিট চেক করতে গিয়ে আমাদের চরম ঝামেলায় পড়তে হয়। প্রায়শই যাত্রীদের সঙ্গে তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটে।"
ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী যাত্রীরা
ঢাকা মোহাম্মদপুর থেকে আসা পর্যটক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "দৃষ্টিনন্দন এই রেলস্টেশনের এমন বেহাল দশা হবে তা জানা ছিল না। মাত্র একটি টয়লেটে নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। সন্তানদের কোলে নিয়ে লাগেজ-ব্যাগ টানাটানি করে পার্কিং পর্যন্ত যাওয়া খুবই বিরক্তিকর।"
ঢাকার বাসাবো থেকে আসা আরেক ব্যবসায়ী বলেন, "এত বড় স্টেশন অথচ নামাজের সঠিক ব্যবস্থা নেই। নিচতলায় তথ্যকেন্দ্র, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, পদচারী-সেতু, রেস্তোরাঁ থাকলেও প্রায় সবই বন্ধ।"
রেললাইন ও যাতায়াতে ঝুঁকি
১০২ কিলোমিটারের ‘দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ’ চালু হলেও লাভজনক এই রুটে এখনো বাড়েনি ট্রেনের সংখ্যা। উল্টো নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এই রেলপথে প্রাণহানির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। পাশাপাশি এই রেলপথ দিয়ে পণ্য পরিবহনের যে বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ছিল, তাও আড়াই বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
স্টেশনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড’ কর্তৃপক্ষের দাবি, আইকনিক রেলস্টেশনের সব কাজ শেষ করে গত মার্চ মাসেই তা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রেলস্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার গোলাম রব্বানী বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেন, "পূর্ণাঙ্গ ভবন পরিচালনার জন্য আগামী জুলাই মাসে এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আশা করা যাচ্ছে তখন সব ধরণের নাগরিক ও পর্যটক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।"