| |
| ২৬ মার্চ স্বাধীনতার চেতনা ও জাতীয় অঙ্গীকার |
| |
|
|
|
|
|
|
|
| |
| |
|
| |
| |
| বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৬ মার্চ একটি অবিস্মরণীয় ও গৌরবময় দিন। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাঙালি জাতির স্বাধীনতার অমর ঘোষণার দিন, বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্মারক এবং জাতীয় গৌরবের প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। তাই ২৬ মার্চ বাংলাদেশের মানুষের কাছে গভীর আবেগ, গর্ব ও শ্রদ্ধার দিন। ২৬ মার্চকে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে প্রতি বছর অত্যন্ত মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়। এই দিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে সেই সব বীর শহীদদের, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের আত্মত্যাগের ফলেই আজ আমরা স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারছি। তাই স্বাধীনতা দিবস কেবল উৎসবের দিন নয়; এটি আমাদের জন্য আত্মসমালোচনা, অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও দিন। স্বাধীনতার পটভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত হয়। কিন্তু শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ, শিক্ষা, শিল্প ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে সবসময় বঞ্চিত করা হয়। এর পাশাপাশি ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরও আঘাত হানা হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক ছাত্র-জনতা শহীদ হন। এই আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি ধীরে ধীরে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও বাড়তে থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। তার সেই ভাষণ বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। ২৫ মার্চের কালরাত্রি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্মম হামলা চালায়। ইতিহাসে এই রাতটি “কালরাত্রি” নামে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি জাতি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুরু করে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ২৬ মার্চের পর শুরু হয় দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক—সবাই অংশগ্রহণ করে। তারা অকুতোভয় সাহস নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন এবং লক্ষাধিক নারী নির্যাতনের শিকার হন। অসংখ্য মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হয়। তবুও বাঙালি জাতি স্বাধীনতার লক্ষ্যে অটল থাকে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য ২৬ মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক।
|
| |
|
|
|