মােঃ জানে আলম সাকী,ঢাকা।
ঢাকাই চলচ্চিত্রের আলোচিত অভিনেত্রী পরীমনিকে ঘিরে বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত কর্মকাণ্ড—বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনা ও আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তিনি। কখনো আইনি জটিলতা, কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
২০২১ সালের ৯ জুন রাতে ঢাকার বোট ক্লাবে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসেন পরীমনি। ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি নাসির উদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা এবং পরবর্তী সময়ে মামলা দায়েরের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনাটি শুধু বিনোদন অঙ্গনেই নয়, জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
এরপর ২০২১ সালের ৪ আগস্ট রাতে বনানীতে পরীমনির বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। ওই অভিযানে তাঁকে আটক করা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলা, রিমান্ড, কারাবাস এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। প্রায় এক মাস কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পান এই অভিনেত্রী।
এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী সময়ে পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) গোলাম সাকলায়েনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সাকলায়েনের সরকারি বাসভবনে পরীমনির অবস্থানের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মুখে পড়েন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা।
সাম্প্রতিক সময়েও সাংবাদিকদের সঙ্গে আচরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কিছু বক্তব্য ও পোস্ট নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় অশোভন ভাষা ব্যবহারের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট ও বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়েও আলোচনা
পরীমনির ব্যক্তিগত জীবন, বিয়ে এবং সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলে আসছে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তির সম্পর্ক ও বিয়ের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সম্পর্কের তালিকা কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে করা সব দাবি নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন তাঁর নিজস্ব বিষয়। তবে যখন সেই ব্যক্তিকে সমাজের একটি অংশ আদর্শ বা অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে, তখন তাঁর প্রকাশ্য আচরণ, বক্তব্য ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা হওয়াটাও স্বাভাবিক।
সাহসী নারী হওয়ার সংজ্ঞা কি বদলে যাচ্ছে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। পরীমনিকে ঘিরে নানা বিতর্কের মধ্যেও সমাজের একটি অংশ তাঁকে সাহসী নারী, প্রতিবাদী নারী কিংবা নারীর স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। কেউ তাঁর স্পষ্টবাদিতার প্রশংসা করেন, কেউ আবার তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও অবস্থানকে সমর্থন করেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সাহসী নারী হওয়ার প্রকৃত সংজ্ঞা কী?
নিজের ইচ্ছেমতো জীবন পরিচালনা করা, প্রকাশ্যে অশালীন ভাষা ব্যবহার করা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া কিংবা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নিজেকে মনে করাই কি সাহসিকতার পরিচয়?
একজন নারী সাহসী হবেন, এতে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং নারীদের সাহসী হওয়া উচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। একজন নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচবেন—এটাই প্রকৃত সাহসিকতা।
তবে স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা এক বিষয় নয়। নিজের মত প্রকাশের অধিকার যেমন প্রত্যেক মানুষের রয়েছে, তেমনি অন্যের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও রয়েছে। কোনো ব্যক্তির আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই তাঁর স্বাধীনতার বিরোধিতা করা নয়।
সমালোচনা করলেই কি নারীর স্বাধীনতার বিরোধিতা?
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক সময় ব্যক্তির ভালো-মন্দ বিচার না করেই তাঁকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। আবার কোনো পরিচিত ব্যক্তির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেই সেই সমালোচনাকে নারীর স্বাধীনতার বিরোধিতা হিসেবে দেখার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়।
অথচ একজন নারীকে সম্মান করা এবং তাঁর প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। একইভাবে একজন পুরুষের ক্ষেত্রেও এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য।
একজন শিল্পী জনপ্রিয় হলেই তিনি সমাজের সব মানুষের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠবেন, এমন কোনো কথা নেই। জনপ্রিয়তা, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও আদর্শ—প্রতিটি বিষয় আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আগামী প্রজন্মের সামনে কেমন আদর্শ তুলে ধরছি আমরা?
আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে কেমন মানুষকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একজন মানুষের সাফল্য, প্রতিভা ও পেশাগত অর্জনের প্রশংসা অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক কিংবা প্রকাশ্য আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকারও সমাজের রয়েছে।
নারীর স্বাধীনতা মানে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান ও অন্যের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও জড়িত।
পরীমনি কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান কিংবা অযাচাইকৃত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তার কারণে তাঁর সব কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নাতীত মনে করারও সুযোগ নেই।
শেষ কথা হলো—নারীর স্বাধীনতা অবশ্যই জরুরি, নারীর সাহসিকতাও প্রয়োজন। কিন্তু সাহসিকতা আর স্বেচ্ছাচারিতা কখনো এক হতে পারে না। একজন মানুষকে আইডল বানানোর আগে তাঁর জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যক্তিত্ব, দায়িত্ববোধ, সামাজিক আচরণ ও কাজের মূল্যায়ন করাও জরুরি।
কারণ, আমরা শুধু একজন জনপ্রিয় মানুষকে অনুসরণ করছি না; অনেক সময় তাঁকে অনুসরণ করে আগামী প্রজন্মও নিজেদের আদর্শ নির্ধারণ করছে।
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি সত্যিকারের সাহসী ও প্রতিবাদী নারীদের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরছি, নাকি জনপ্রিয়তার মোড়কে বিতর্ককেই সাহসিকতার নাম দিচ্ছি?