মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) খুলশী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে অপহরণ ও ডাকাতি মামলার চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ভুক্তভোগীর কাছ থেকে লুণ্ঠিত ইয়ামাহা আর১৫ আর২এম মডেলের মোটরসাইকেলসহ ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত আরও দুটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর ২০২৬) খুলশী থানা পুলিশের একটি দল বায়েজিদ লিংক রোড, পাহাড়তলী থানাধীন বিটাক বাজার এবং ফইল্লাতলি বাজার এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। খুলশী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা ও সদস্য অংশ নেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—অনিক দাশ (২৭), ওয়াহিদ মোহাম্মদ জেবল হোসেন অনিক ওয়াহিদ (৩৯), মহিউদ্দিন সেলিম (৫২) এবং মোহাম্মদ ওয়াহেদ নাছির ডায়মন্ড (৩৮)। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে ভুক্তভোগীর মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়।
কক্সবাজার পথে অপহরণ ও ডাকাতির শিকার তরুণ
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে মারুফুর রহমান অপু (২২) তাঁর তিন বন্ধু এমরান (২৪), নিশাত (২৬) ও আসিফকে (২৩) সঙ্গে নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেলে কক্সবাজার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ বাড়ি থেকে রওনা হন।
পরদিন ১৭ অক্টোবর রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে অপু তাঁর নিজের ইয়ামাহা আর১৫ আর২এম মডেলের মোটরসাইকেল চালিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী থানাধীন জাকির হোসেন রোডের ফয়েজ লেক চক্ষু হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে একটি মেরুন রঙের প্রাইভেট কার ও দুটি মোটরসাইকেল তাঁর পথরোধ করে।
এ সময় প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে নেন। পরে তাঁকে গালিগালাজ ও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে তাঁকে জোরপূর্বক প্রাইভেট কারে তুলে নেওয়া হয়। এ সময় একজন তাঁর মোটরসাইকেলটি নিয়ে অন্যত্র চলে যান এবং অন্যরা তাঁকে গাড়িতে করে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘোরাতে থাকেন।
মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার অভিযোগ
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে ভুক্তভোগীকে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন শেরশাহ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর ব্যবহৃত প্রায় ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ভিভো মোবাইল ফোন নিয়ে তাঁকে প্রাইভেট কার থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁকে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ইয়ামাহা আর১৫ আর২এম মোটরসাইকেলটি লুণ্ঠিত হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
ফেসবুকে মোটরসাইকেল বিক্রির বিজ্ঞাপন, সেখান থেকেই তদন্তে অগ্রগতি
মামলার তদন্তে একটি ফেসবুক স্টোরিকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। পুলিশ ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, অনিক দাশ নামের এক ব্যক্তি তাঁর ফেসবুক আইডিতে একটি মোটরসাইকেল বিক্রির স্টোরি শেয়ার করেন। সেটি দেখে ভুক্তভোগী মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
মোটরসাইকেলটির দাম ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলে ভুক্তভোগী সেটি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং অগ্রিম ৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। পরে মোটরসাইকেল হস্তান্তরের জন্য তাঁকে বায়েজিদ লিংক রোডের মুখে পুলিশ বক্সের সামনে যেতে বলা হয়।
এ সূত্র ধরে খুলশী থানা পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে। ২০ অক্টোবর প্রথমে অনিক দাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাহাড়তলী থানাধীন বিটাক বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওয়াহিদ মোহাম্মদ জেবল হোসেন অনিক ওয়াহিদ ও মহিউদ্দিন সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাহাড়তলী থানাধীন ফইল্লাতলি বাজারের সিদ্দিক কমিশনারের বাড়ির সড়কে কুদ্দুছের গ্যারেজে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে মোহাম্মদ ওয়াহেদ নাছির ডায়মন্ডকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর হেফাজত থেকে ভুক্তভোগীর লুণ্ঠিত ইয়ামাহা আর১৫ আর২এম মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত আরও দুটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একজন পুলিশ কনস্টেবল
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার অনিক দাশ বান্দরবান জেলা পুলিশ লাইন্সে কর্মরত একজন পুলিশ কনস্টেবল। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং মামলায় তাঁর সংশ্লিষ্টতা আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের বিষয়।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে খুলশী থানায় মামলা করা হয়েছে।
মামলার নম্বর ২৯, তারিখ ২০ অক্টোবর ২০২৬। মামলায় দণ্ডবিধির ৩৬৫/৩৯৫/৩৯৭/৪১২ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশের অভিযান অব্যাহত
অপহরণ, ডাকাতি ও লুণ্ঠিত মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনায় খুলশী থানা পুলিশের এ অভিযান তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলগুলো মামলার আলামত হিসেবে তদন্তে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।