আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:- ‘জনতা মাইক সার্ভিস’ নামে আমজাদের বাবার ছিল মাইকের ব্যবসা। ১৯৭৮ সালের দিকে হালখাতা, বিয়ে, পূজাসহ নানা আয়োজনে মাইকে গান বাজাতেন। মাইকের সঙ্গে থাকত গ্রামোফোন সেট। প্লেয়ারে রেকর্ড চাপিয়ে পিন তুলে দিলেই সুরেলা কণ্ঠে ভেসে আসত গান। বাবার সঙ্গে কিশোর আমজাদও চলে যেতেন বিভিন্ন আয়োজনে। এই গানের নেশায় মজে বেশিদূর পড়া হয়নি তার। দশম শ্রেণির পরই জনতা মাইক সার্ভিসে অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন।
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বাজার থেকে ছয় টাকায় ব্যাটারি চার্জ করে এনে মাইক নিয়ে ঘুরতেন গ্রামে গ্রামে। বাবার মৃত্যুর পরও গানের নেশা কাটেনি। আঁকাআঁকিও করতেন। মাঝখানে সেনাবাহিনীতে আর্টিস্ট হিসেবে চাকরি করেছেন। অবসর নিয়েছেন ২০১৫ সালে।
আমজাদের ছিল বিলুপ্তপ্রায় গান আর রেকর্ডার সংগ্রহের নেশা। বাবার মৃত্যুর পর মাইকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি একটি গ্রামোফোন ও রেকর্ড-সিডি সংরক্ষণ করে রাখেন। এরপর চাকরির ফাঁকে ফাঁকে ছুটিতে বাড়ি আসতেন। তখন যারা মাইকের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন, তাদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে কিনে আনতেন রেকর্ড, সিডি ও ক্যাসেট। কোথাও গ্রামোফোন থাকার খবর পেলে ছুটে যেতেন। দরদাম চুকিয়ে হাসিমুখে আনেন সংগ্রহশালায়। এভাবে খেয়ে না খেয়ে তার কাঙ্ক্ষিত যন্ত্র যেমন সংগ্রহ করেছেন, তেমনি এক বাড়িতে কয়েক দফায় গিয়েও তাদের রাজি করাতে না পেরে ফিরেও এসেছেন। স্ত্রীর সহায়তা না পেলে তার এই ‘পাগলামি’ জারি রাখা সম্ভব হতো না বলে অকপটে স্বীকার করে কথাগুলো বলছিলেন আমজাদ।
আমজাদের সংগ্রহে ইংল্যান্ডের তৈরি এইচএমভির ১০টি গ্রামোফোনসহ বিভিন্ন কোম্পানির ২২টি গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ার আছে। এর মধ্যে কিছু বিরল। যেমন—২৫ সিডি ডিস্কের পাইওনিয়ার সেট, যেখানে একইসঙ্গে ২৫টি সিডি ঢুকিয়ে পর্যায়ক্রমে বাজানো যায়। জাপানের টেকনিক কম্পানির টার্নটেবিল গ্রামোফোন, ইংল্যান্ডের ফার্গুসন ব্র্যান্ডের বেল্ট ড্রাইভ অটো রিটার্ন। আছে টেকনিক কম্পানির টার্নটেবিল সিস্টেম, যেখানে একইসঙ্গে রেডিও, অডিও, ভিডিও ক্যাসেট ও গ্রামোফোন রেকর্ড বাজানো যায়। ব্যতিক্রমী এই সংগ্রহশালায় প্রচলিত গানের ছোট-বড় গ্রামোফোন রেকর্ড প্রায় দেড় হাজার। এর মধ্যে এলপি (বড়) রেকর্ড ৪০০টি। ইপি (ছোট) রেকর্ড এক হাজারেও বেশি। সিডি, অডিও, ভিডিও ক্যাসেট রয়েছে তিন হাজারেরও বেশি। ছোট মাইক চারটি, স্পিকার ১৮টি, এম্পিফায়ার আটটি ছাড়াও রেডিও, ক্যাসেটসহ পুরনো বহু দুর্লভ যন্ত্রের সংগ্রহ রয়েছে আমজাদ হেসেনের কাছে।
সংগ্রহশালাটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের শিল্পীদের গান দিয়ে। বিলুপ্ত প্রায় গানগুলো সংগ্রহে রেখে ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন আমজাদ। বাংলা, উর্দু ও হিন্দি গান, কাওয়ালি, গজল, লোকসংগীতসহ হরেক রকম গানের মেলা তার সংগ্রহে। ভারতের লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমার, মো. রফি, মান্না দে, শ্যামল মিত্রের মতো জনপ্রিয় শিল্পী ছাড়াও গোষ্ঠ গোপাল দাস, স্বপ্না চক্রবর্তী, অমর পাল, নির্মলেন্দু চৌধুরীর লোকগান রয়েছে তার সংগ্রহে। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের অনেক প্রাচীন ভাওয়াইয়া গানের সন্ধান মেলে এখানে। এর মধ্যে রয়েছে আব্বাসউদ্দীন, আয়শা সরকার ও প্রতিমা বড়ুয়ার ভাওয়াইয়া গান। আব্দুল আলিম, আঞ্জুমান আরা বেগম, বশির আহমেদ, খন্দকার ফারুক আহমেদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, খুরশিদ আলমসহ বহু শিল্পীর নানা ধরনের গান রয়েছে। আছে পাকিস্তানের নুরজাহান, নাহিদ আখতার, রশিদসহ অনেক শিল্পীর উর্দু ও হিন্দি গান।
আমজাদ হোসেনের সংগ্রহের তালিকা দিনে দিনে বাড়লেও আলাদা করে কোনো ঘর নেই রাখার মতো। তার শয়নকক্ষটি ভর্তি গ্রামোফোন, রেকর্ড ও সিডিতে। বেড়ার পাশে ছোট একটি চৌকি আর মাথার কাছে ছোট একটি ফ্যান! জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পাশের দুটি ঘর, বারান্দা—সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছেন মূল্যবান জিনিসপত্র। রোজ রাতে ঘুমানোর আগে শোনেন নিজের পছন্দের গান। তবে এমন অমূল্য রতন সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত জায়গা বা ব্যবস্থা নেই আমজাদের।
আমজাদ হোসেন বলেন, খেয়ে না খেয়ে, স্ত্রী-সন্তানদের কষ্ট দিয়ে আমি যা সংগ্রহ করেছি, তার অবর্তমানে যেন সব শেষ হয়ে না যায়! সরকারি সহায়তায় নিজের জমিতে গ্রামোফোন ও সংগীতের এই ব্যতিক্রমী সংগ্রহশালার স্থায়ী অবকাঠামো যেন তৈরি হয়। সংগ্রহশালার স্থায়ী ভিত্তি গড়তে পারলে আগামী প্রজন্ম এই সংগ্রহ দেখে উজ্জীবিত হবে। নিজেদের সংগীতের শেকড় সন্ধান করবে।
গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক পঞ্চানন রায় বলেন, একজন নিভৃত মানুষ পুরনো দিনের দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ডের গান আঁকড়ে ধরে আছেন। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগুলো জানানোর জন্য সংরক্ষণ করা দরকার। সরকারি উদ্যোগে এগুলো সংরক্ষণ করলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এগুলো সম্পর্কে ধারণা পাবে।
শিক্ষাবিদ ও কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মীর্জা মোঃ নাসির উদ্দিন জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকেও আমজাদ হোসেন যে গানের সংগ্রহশালা তৈরি করে অনন্য নজির গড়ে তুলেছেন। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক সময় এগুলো সম্পর্কে ধারণা পাবে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এগুলো সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।