মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের নতুন অ্যাপ্রোচ সড়কে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি সরজমিনে যাচাই করতে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৪ ও ৫ নম্বর ফেরিঘাট পরিদর্শন করেছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান।
বুধবার (১ জুলাই) বিকেলে ঘাট পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ঘাটে বাঁশের ব্যবহার কোনো অনিয়ম নয়; বরং এটি অনুমোদিত প্রকৌশল নকশা (ডিজাইন) ও এস্টিমেটেরই অংশ।
প্রকৌশল নকশা ও বাস্তবতার আলোকেই কাজ
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "আমরা তদন্ত করে দেখেছি, এখানে যে বাঁশ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি অনুমোদিত নকশা ও এস্টিমেট অনুযায়ীই করা হচ্ছে। এই অ্যাপ্রোচ রোডগুলো স্থায়ী নয়। এগুলো সাধারণত দুই থেকে তিন মাসের বেশি থাকে না। নদীর পানি ওঠানামা ও তীব্র ভাঙনের কারণে এখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ বাস্তবসম্মত নয়।"
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ১৯৬৩ সাল থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে একই পদ্ধতিতে অস্থায়ী অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ হয়ে আসছে। এখানে বাঁশ ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য হলো যাতে নদীর পাড়ের মাটি সহজে সরে না যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যেন তা দ্রুত স্থানান্তর বা অপসারণ করা যায়। যদি রড ও কংক্রিট দিয়ে স্থায়ী কাঠামো করা হতো, তবে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যেত এবং কয়েক মাস পরেই নদীভাঙন বা পানির পরিবর্তনের কারণে সেই পুরো কাঠামোটি সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়ত।
"প্রকৌশল একটি প্রযুক্তিগত বিষয়। আবেগ বা ধারণার ভিত্তিতে নয়, প্রকৌশল নকশা ও বাস্তবতার আলোকেই এসব কাজ করা হয়।"
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নকশা, এস্টিমেট ও কারিগরি বিষয়গুলো জেনে নেওয়া উচিত। সঠিক তথ্য যাচাই করে সংবাদ পরিবেশন করলে এ ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব।
নদীশাসন ও স্থায়ী সমাধান প্রকল্প
দৌলতদিয়া এলাকার দীর্ঘদিনের তীব্র নদীভাঙন প্রসঙ্গে তিনি জানান, স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে নদীশাসনের একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সেটি পর্যালোচনা শেষে বাস্তবায়ন করা হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। তবে স্থায়ী নদীশাসন না হওয়া পর্যন্ত মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে যাবে।
ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও আধুনিক উদ্যোগ
ঘাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রতিমন্ত্রী কিছু নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন:
- তথ্যসমৃদ্ধ ডিসপ্লে বোর্ড: এখন থেকে প্রতিটি উন্নয়নকাজের স্থানে একটি করে তথ্যসমৃদ্ধ ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা হবে। সেখানে প্রকল্পের নাম, নকশা, কী পরিমাণ উপকরণ ব্যবহার হচ্ছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ থাকবে। এতে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম সহজেই সব তথ্য জানতে পারবেন।
- সিসিটিভি ক্যামেরা ও কন্ট্রোল রুম: প্রতিটি ঘাটে আটটি করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ঘাটের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার হবে।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি-সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে, সরকার দৌলতদিয়া ঘাটকে সাধারণ মানুষের জন্য আরও নিরাপদ, আরামদায়ক ও সুশৃঙ্খল করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।