মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- দেশে অনলাইন জুয়া, অনলাইন বাজি, ম্যাচ ফিক্সিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অবৈধ লেনদেন বন্ধে কঠোর আইনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই লক্ষ্যে ১৮৬৭ সালের `পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট` রহিত করে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী শাস্তির বিধান সম্বলিত ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে তোলা হয়েছে।
মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়ে বিলটি পরীক্ষা করে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। বিলটি উত্থাপনের সময় অধিবেশন পরিচালনা করছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জয়নুল আবেদীন।
অপরাধ ও শাস্তির কঠোর বিধানসমূহ:
প্রস্তাবিত এই বিলে ডিজিটাল মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা এবং সাধারণ জুয়া খেলার অপরাধে পৃথক পৃথক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে:
- অনলাইন জুয়া পরিচালনা: অনলাইন জুয়া বা বাজি পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট বা ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা করলে অথবা বন্ধ করা প্ল্যাটফর্ম পুনরায় চালু করলেও একই শাস্তি (৭ বছর জেল বা ৫ কোটি টাকা জরিমানা) প্রযোজ্য হবে。
- সহযোগিতা বা সম্পৃক্ততা: অনলাইন জুয়া পরিচালনার সাথে কোনোভাবে সম্পৃক্ত বা সহযোগী থাকলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে।
- সাধারণ জুয়া: সাধারণ জুয়া খেলার অপরাধে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
- ভুয়া সিম ও বায়োমেট্রিক জালিয়াতি: ভুয়া সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতি করে জুয়া বা বেটিং চালালে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা হবে।
- সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অর্থপাচার: এই অপরাধ সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে করা হলে শাস্তি বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ কোটি টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।
- বিজ্ঞাপন ও বিভ্রান্তকর প্রচার: জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রচার, স্পন্সরশিপ বা অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সেলিব্রিটি বা ইনফ্লুয়েন্সার জুয়ার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তকর প্রচার চালালে সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড পেতে পারেন।
- ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং: ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। আদালত চাইলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট মেয়াদে বা স্থায়ীভাবে খেলাধুলা থেকে নিষিদ্ধ করতে পারবে।
মানি লন্ডারিং ও জামিন অযোগ্য ধারা:
বিলে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হুন্ডি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ স্থানান্তর বা গোপন করাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই আইনের অধীনে সকল অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হবে। সাইবার ট্রাইব্যুনাল বা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে এসবের বিচার হবে এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও বিচার করা যাবে।
`জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট` ও এআই মনিটরিং:
জুয়া ও অর্থপাচার প্রতিরোধে বিলে কিছু আধুনিক ও শক্তিশালী প্রযুক্তিগত পদক্ষেপের প্রস্তাব করা হয়েছে:
১. ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট: জুয়া ও বেটিংয়ের সাথে জড়িত অপরাধীদের তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, সিম, ডিভাইস এবং আইপি অ্যাড্রেস অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ ডেটাবেজ তৈরি করা হবে।
২. লিংকিং সিস্টেম: এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেমসহ বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবস্থা চালু করা হবে。
৩. এআই (AI) নজরদারি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) মনিটরিং সিস্টেম, ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন এবং রিস্ক স্কোরিং ব্যবহারের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন ও অনলাইন জুয়া শনাক্ত করা হবে।
এছাড়াও, পুলিশকে আদালতের পরোয়ানা নিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তির কম্পিউটার, সার্ভার, অ্যাপস বা ডিভাইস তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং তথ্য মুছে ফেলার আশঙ্কা থাকলে তাৎক্ষণিক গ্রেফতারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জুয়া সংশ্লিষ্ট যেকোনো ওয়েবসাইট, অ্যাপ, আইপি বা সোশ্যাল মিডিয়া পেজ ব্লক ও অপসারণ করতে পারবে।