মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণ দেখিয়ে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’ নামের একটি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে কারখানাটির ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক-কর্মচারী হঠাৎ কর্মহীন হয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকালে গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খলিলুর রহমান কারখানাটি বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, গত ১৬ জুন থেকে মালিকপক্ষ আর্থিক সংকটের কারণে কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। তবে শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন এবং সার্ভিস বেনিফিটসহ অন্যান্য পাওনা বিধি মোতাবেক পরিশোধ করা হবে।
এদিকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে শিল্প পুলিশ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফ) এবং শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মালিকপক্ষের পক্ষে অংশ নেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ। এছাড়া বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিক প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, “ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানায় মালিকপক্ষ। তবে দেশের প্রচলিত বিধি মোতাবেক শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব আইনগত পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে আমাদের এবং শ্রমিকদের আশ্বস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।”
বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও শ্রমিকদের পাওনা:
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের বাকি ১৫ দিনের এবং মে মাসের ১৮ দিনের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। একইসঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সব বকেয়া বেতন দেওয়া হবে। চাকরি না থাকায় শ্রমিকদের ৩০ দিনের বেসিক (মূল) বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নোটিশ-পে হিসেবে দেওয়া হবে। চাকরির প্রতি বছরের জন্য ২০ দিনের বেসিক বেতন হারে সার্ভিস বেনিফিট দেওয়া হবে। এছাড়া প্রমাণ সাপেক্ষে মাতৃত্বকালীন সুবিধা, অর্জিত ছুটির অর্থ, পদত্যাগকারী শ্রমিকদের চাকরি থেকে অব্যাহতি বেনিফিট এবং বিভিন্ন তহবিলে জমাকৃত অর্থ পরিশোধ করা হবে। এসব পাওনা আগামী ২৭ জুলাই শ্রমিকদের একসঙ্গে পরিশোধ করার কথা রয়েছে।
শ্রমিক নেতাদের অসন্তোষ ও শ্রমিকদের দুর্দশা:
এদিকে এই চুক্তি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর মহানগর সভাপতি শফিউল আলম। তিনি বলেন, “২১ জুনের এই চুক্তি মোটেও শ্রমিকবান্ধব হয়নি। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য সুবিধা ও ক্ষতিপূরণ এখানে পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়নি। যার ফলে শত শত শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “ঈদের আগে বেতন-ভাতা ও বোনাস নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। এরপরও মালিকপক্ষ কারখানা চালু না করে স্থায়ীভাবে বন্ধের পথ বেছে নিলো। এতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা শত শত শ্রমিক একসঙ্গে বেকার হয়ে পড়লেন। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেলো।”
হঠাৎ চাকরি হারিয়ে সাধারণ শ্রমিকেরা এখন দিশেহারা। গ্রামীণ পরিবারগুলোতে তাদের মা-বোনসহ অন্যান্য সদস্যরা এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কারখানাটি আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা। শ্রমিকরা এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন আগামী ২৭ জুলাইয়ের দিকে, যেদিন তাদের সব পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে।