মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার ও প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত ও গতিশীল করতে দীর্ঘ সাত বছর পর আবারও জলসীমা (পোর্ট লিমিট) পুনর্নির্ধারণের বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) এ সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
সীমানা বাড়ানোর পরিকল্পনা:
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান ৬২ নটিক্যাল মাইল জলসীমা বাড়িয়ে ৭২ নটিক্যাল মাইল করার চিন্তা করা হচ্ছে। এই ১০ নটিক্যাল মাইল জলসীমা সম্প্রসারিত হলে উত্তর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূল, দেশের বৃহত্তম শিপ রিসাইক্লিং শিল্পাঞ্চল এবং মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল সংলগ্ন সমুদ্র এলাকা বন্দরের প্রশাসনিক ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। ফলে দক্ষিণে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এলাকা থেকে শুরু করে উত্তরে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বিশাল কার্যক্রম বিস্তৃত হবে।
সন্দ্বীপ চ্যানেলে নতুন ‘এস’ অ্যাংকরেজ:
বর্তমানে বন্দরে আগত জাহাজগুলো প্রধানত তিনটি— এ (আলফা), বি (ব্রাভো) এবং সি (চার্লি) অ্যাংকরেজে (জাহাজ নোঙর করার এলাকা) অবস্থান করে। নতুন পরিকল্পনায় সন্দ্বীপ চ্যানেলকে ঘিরে ‘এস’ (সন্দ্বীপ) অ্যাংকরেজ নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি নোঙর এলাকা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে কর্ণফুলী মোহনা ও পতেঙ্গা উপকূলে অপেক্ষমাণ লাইটারেজ জাহাজগুলোকে তুলনামূলক নিরাপদ ও বিস্তৃত এলাকায় স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। এতে সন্দ্বীপ চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি নদীপথে জাহাজের চাপ কমবে এবং নৌ চলাচলের শৃঙ্খলা বাড়বে।
রাজস্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা:
বর্তমানে বন্দরের নির্ধারিত জলসীমায় প্রবেশ ও অবস্থানকারী জাহাজ থেকে বিভিন্ন ধরনের মেরিন চার্জ, পোর্ট ডিউসসহ অন্যান্য ফি আদায় করা হয়। বন্দর সূত্রের তথ্যমতে, শুধুমাত্র এই জলসীমাভিত্তিক রাজস্ব থেকেই বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি আয় করে চট্টগ্রাম বন্দর। নতুন সমুদ্রসীমা বাড়লে মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সামুদ্রিক লজিস্টিক কার্যক্রম যুক্ত হবে, যা বন্দরের রাজস্ব ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ সমুদ্রপথের বাণিজ্য এই বন্দর দিয়েই সম্পন্ন হয় এবং চলতি অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ৩৫ লাখ টিইইউএস ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ীর সাথে সমন্বয়:
পতেঙ্গা উপকূলে নির্মাণাধীন ‘বে টার্মিনাল’ প্রকল্পকে সামনে রেখেই মূলত এই জলসীমা সম্প্রসারণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। বে টার্মিনাল চালু হলে বড় আকারের কনটেইনার জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারবে। অন্যদিকে মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরও ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী—এই তিনটি বৃহৎ অবকাঠামোর মধ্যে একটি সমন্বিত সমুদ্র ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মতামত:
বন্দর খাতের বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর কেবল কর্ণফুলীভিত্তিক একটি নদী বন্দর হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি মাতারবাড়ী, বে টার্মিনাল ও মীরসরাই শিল্পনগরকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত সামুদ্রিক অর্থনৈতিক করিডোরে পরিণত হবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা কিছু সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তারা বলছেন, শুধু জলসীমা বাড়ালেই হবে না; বর্ধিত এলাকায় পর্যাপ্ত নৌ নির্দেশনা ব্যবস্থা, বয়া স্থাপন, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ, নিয়মিত ড্রেজিং এবং জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। জাহাজ চলাচল বাড়লে সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ চ্যানেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও জলদস্যুতার মতো ঘটনা রোধে নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আধুনিক রাডার নেটওয়ার্ক, ড্রোন নজরদারি এবং দ্রুতগতির টহল জাহাজের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
অবশ্য নিরাপত্তার বিষয়টিকে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন না চট্টগ্রাম বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তাদের মতে, বর্তমান ৬২ নটিক্যাল মাইল এলাকায় সফলভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন করে ১০ নটিক্যাল মাইল বাড়লে তা খুব বেশি সমস্যা তৈরি করবে না, কারণ আমাদের নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সেই সক্ষমতা রয়েছে।