মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খাঁন জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘির একমাত্র কুমিরটি প্রশাসন কর্তৃক সরিয়ে নেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাজারের প্রধান খাদেম ও স্থানীয় যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম। একই সঙ্গে অবিলম্বে কুমিরটিকে মাজারের দিঘিতে ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তিনি ও একদল দর্শনার্থী। তবে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারণ মানুষের একাংশ।
পটভূমি ও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত
গত ১ জুন মাজারের দিঘির এই কুমিরটির আক্রমণে এক শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর জেলা প্রশাসক তাঁর দপ্তরে এক জরুরি মিটিং ডাকেন এবং দিঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (৩ জুন) দুপুরে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় বন বিভাগ কুমিরটি ধরে নিয়ে যায়। বর্তমানে প্রাণীটি খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ও সুস্থ অবস্থায় রয়েছে।
খাদেম ও সমর্থকদের প্রতিবাদ
প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সাড়ে ৫০০ বছর ধরে তাঁদের পরিবার এই মাজার ও দিঘির দেখভাল করে আসছে। তিনি অভিযোগ করেন, তিনি খুলনায় থাকা অবস্থায় পুলিশ প্রশাসন আচমকা এসে কুমিরটি ধরে নিয়ে যায়, যা ঠিক হয়নি। মাজার, দিঘি ও আশপাশের জমিকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি দাবি করে তিনি বলেন,
"একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে এভাবে হুট করে পুলিশ দিয়ে কুমির নিয়ে যাওয়া ভালো কাজ হয়নি। দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে, তার জন্য সাড়ে ৫০০ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য একেবারে নষ্ট করে দেওয়া ঠিক না।"
তিনি আরও জানান, এর আগে কুমিরের কুকুর খাওয়া নিয়ে সমস্যা হওয়ায় মাজার পক্ষ থেকে ৮ জন দারোয়ান রাখা হয়েছিল। প্রয়োজনে নিরাপত্তার আরও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হবে, তবুও দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই কুমিরটিকে দ্রুত ফিরিয়ে আনা হোক।
দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
মাজারে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী শেখ বাদশা ও খুলনা থেকে আসা আসরাফুল ইসলাম জানান, কুমির মাজারের ঐতিহ্য। কুমির না থাকলে দিঘি মাছ চাষের জন্য দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তারা। অনেক দর্শনার্থী দিঘিতে একটি নিরাপদ বেষ্টনী তৈরি করে কুমিরটি রাখার দাবি জানান।
অন্যদিকে, নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকে। মাজারের পাশে বসবাসকারী কুলসুম বেগম বলেন, খাঁন জাহান আমলের কুমিরগুলো ভালো ছিল, কিন্তু বর্তমান কুমিরটি অত্যন্ত হিংস্র, যার ভয়ে তারা দিঘির পানিতে নামতে পারেন না। মোল্লাহাট থেকে পরিবারসহ আসা শাহিদা বেগমও একই মত দিয়ে বলেন, সাময়িকভাবে কুমির সরিয়ে নেওয়া ঠিক আছে। তবে ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কুমিরটিকে আবার উন্মুক্ত করা উচিত।
বন বিভাগের বক্তব্য
খুলনা অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল জানান, মিঠাপানির এই কুমিরটিকে যদি সুন্দরবনের নোনাপানিতে ছাড়া হয়, তবে সেটি বাঁচবে না। তাই তারা প্রাণীটির উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে কুমিরটিকে ঠিক কোথায় অবমুক্ত করা হবে।