মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা: পহেলা মে, অর্থাৎ মহান মে দিবস। দুনিয়ার সকল শ্রমজীবী মানুষের সংহতি ও অধিকার আদায়ের এক অনন্য দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেট চত্বরে উপযুক্ত মজুরি এবং দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মসময়ের দাবিতে শ্রমিকরা রাজপথে নেমেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের রক্তঝরা স্মৃতি ও বীরত্বগাথা স্মরণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় এই দিবসটি।
ঐতিহাসিক পটভূমি
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শ্রমিকদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছিল না। মালিকপক্ষ নামমাত্র মজুরিতে দৈনিক ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করত। অমানবিক এই পরিবেশ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ১৮৮৬ সালের পহেলা মে শিকাগোর তিন লক্ষাধিক শ্রমিক ধর্মঘটের ডাক দেন।
- ৪ মে-র ঘটনা: ধর্মঘট চলাকালে শিকাগোর হে মার্কেটে একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়।
- শহীদদের আত্মত্যাগ: পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ হারান এবং অনেককে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি দেওয়া হয়।
- চূড়ান্ত বিজয়: অবশেষে শ্রমিকদের এই বিশাল আত্মত্যাগের কাছে নতি স্বীকার করে বিশ্বজুড়ে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় মালিকপক্ষ।
মে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
মে দিবস কেবল একটি ছুটির দিন নয়, এটি শ্রমিকের শোষণমুক্তির প্রতীক। এই দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম:
1.শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের ভিত্তি: মে দিবস শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে একটি সুশৃঙ্খল ও ন্যায়সম্মত সম্পর্কের পথ প্রশস্ত করেছে।
2.অধিকারের চেতনা: এটি বিশ্বের মেহনতী মানুষকে তাদের প্রাপ্য মজুরি, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার বিষয়ে সচেতন করে তোলে।
3.শ্রমিক ঐক্য: ধর্ম-বর্ণ-দেশ নির্বিশেষে সকল শ্রমিককে একই পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করার এক অনন্য মাধ্যম হলো এই দিবস।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও মহান মে দিবস
বাংলাদেশে মে দিবস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়। দেশের পোশাক শিল্প, পরিবহন খাত ও কৃষি শ্রমিকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে মে দিবসের চেতনা বিদ্যমান। তবে বর্তমান সময়েও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির মতো ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবি আজও ফুরিয়ে যায়নি।
উপসংহার
শ্রমিকের ঘামেই গড়ে ওঠে সভ্যতার ইমারত। অথচ অনেক সময় সেই কারিগররাই অবহেলিত থাকেন। ১৮৮৬ সালের সেই সংগ্রামের মূলে ছিল মানবিক মর্যাদার দাবি। আজকের দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—"শ্রমিক শোষণ বন্ধ হোক এবং প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষ তার ন্যায্য পাওনা ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকুক।" দুনিয়ার মজদুর এক হও!