হুমায়ুন কবির : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ বা নবম পে-স্কেল অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। সোমবার (৩১ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন স্কেলটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হবে।
নতুন বেতন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। এতে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ, আর ১ম গ্রেডে নির্ধারিত মূল বেতন দ্বিগুণ হয়েছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন
সরকার একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর না করে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর অন্যতম কারণ হলো সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্বল্প আয়ের সরকারি কর্মচারীদের কথা বিবেচনায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডকে বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
গ্রেডভিত্তিক এই নতুন মূল বেতন কাঠামো বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত অনুমোদিত তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পেনশনেও বড় পরিবর্তন
নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের নিট পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনামূলক বেশি হারে সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
-
৯ হাজার টাকা বা কম নিট পেনশন হলে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি
-
৯,০০১–২০,০০০ টাকা হলে ৭৫ শতাংশ
-
২০,০০১–৩০,০০০ টাকা হলে ৬৫ শতাংশ
-
৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা হলে ৬০ শতাংশ
-
৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি হলে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি
পেনশন বৃদ্ধিও ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
প্রথমবার প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য প্রতি সন্তান মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি নতুন পে-স্কেলের উল্লেখযোগ্য নতুন সুবিধাগুলোর একটি।
এ ছাড়া ১ম থেকে ২০তম—সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগে এ সুবিধা সীমিত পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য ছিল।
কতজন উপকৃত হবেন?
সরকারের হিসাবে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী এর আওতায় আসবেন। এর ফলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের সংস্থান সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে রাখার কথা জানিয়েছে সরকার।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কী হবে?
নতুন পে-স্কেলে প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না—এ বিষয়ে আজও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
প্রজ্ঞাপন কবে?
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এসব প্রজ্ঞাপনে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, এই সপ্তাহেই প্রজ্ঞাপন জারির আশা রয়েছে।
অর্থাৎ, আজকের সিদ্ধান্তের পর নবম পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়ে গেছে; কার্যকর তারিখ ১ জুলাই ২০২৬; মূল বেতন তিন ধাপে এবং ভাতাগুলো ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।