হুমায়ুন কবির
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলো গোপালগঞ্জের। সোমবার (১০ আগস্ট ২০২৬) থেকে ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন। এর মধ্য দিয়ে গোপালগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিল।
সোমবার বিকেলে কাশিয়ানী উপজেলার রেলস্টেশন এলাকায় আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিমুজ্জামান সেলিম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর। বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনেও নতুন এই ট্রেন চালু উপলক্ষে পৃথক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বক্তব্য দেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেল মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
গোপালগঞ্জের রেলযান পরীক্ষক (টিএক্সআর) পল্লব কান্তি বিশ্বাস জানান, গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত তিন সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম, এস এম জিলানী ও ডা. কে এম বাবরের প্রচেষ্টায় ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ট্রেন সার্ভিস চালু হয়েছে।
১৪৫ টাকায় ঢাকা যাত্রা
‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেনে সাধারণ শ্রেণির সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪৫ টাকা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) তথ্য অনুযায়ী, ট্রেনটিতে রয়েছে ৮টি কোচ ও মোট ৬০৯টি আসন। সড়কপথে যেখানে ঢাকা যেতে একজন যাত্রীকে প্রায় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়, সেখানে ট্রেনে অনেক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ট্রেনটি ঢাকা থেকে যাত্রার পথে কেরানীগঞ্জ, শ্রীনগর, মাওয়া, শিবচর, ভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা ও মহেশপুর স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে। নিয়মিত সময়সূচি অনুযায়ী ঢাকা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টায় ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে গোপালগঞ্জে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। গোপালগঞ্জ থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে। শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকবে।
অর্থনীতি ও যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা
নতুন এই রেল যোগাযোগ শুধু গোপালগঞ্জ নয়, পার্শ্ববর্তী নড়াইল, বাগেরহাট ও পিরোজপুর জেলার মানুষের জন্যও যোগাযোগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য ভবিষ্যতে লাগেজ বা পণ্যবাহী বগির মাধ্যমে কম খরচে ঢাকার বাজারে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গোপালগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহসভাপতি আলহাজ মো. মোশাররফ হোসেন নতুন ট্রেন সার্ভিসকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত পণ্যবাহী বগি যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে চার জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরাও ট্রেন চালু হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কম ভাড়া, তুলনামূলক নিরাপদ যাতায়াত এবং যানজটমুক্ত চলাচলের সুযোগ গোপালগঞ্জবাসীর জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ
রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল গোপালগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। অবশেষে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ চালুর মাধ্যমে সেই দাবির বাস্তবায়ন হলো। স্থানীয়দের আশা, এই রেল যোগাযোগের ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জের মানুষের ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও এই ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে ভবিষ্যতে আরও কমিউটার ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
ঢাকা-গোপালগঞ্জ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালুর মধ্য দিয়ে তাই শুধু একটি নতুন ট্রেন নয়, গোপালগঞ্জবাসীর যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ারও খুলে গেল।