আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:- বন্যার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গ্রাম। এতে অন্তত ১৬০টি পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই রাস্তার ধারে কিংবা অন্যের জমিতে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। ভুক্তভোগীরা নদীভাঙন রোধে সরকারের কাছে স্থায়ী তীর সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতী, ঘুঘুমারী, খেদাইমারীসহ কয়েকটি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা ব্রহ্মপুত্র নদের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও অসংখ্য বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে অন্তত ১৬০টি পরিবার। ভাঙনের আতঙ্কে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিজেদের ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটে অনেকেই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে ভাঙনকবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিওব্যাগ (বস্তা) ফেলার কাজ করা হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও নদীভাঙন রোধ করা যাচ্ছে না।
চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতী গ্রামের বাসিন্দা মোঃ হায়দার আলী (৪০) বলেন, “কয়েক দিনের মধ্যেই নদীভাঙন আমার বাড়ির সীমানার কাছাকাছি চলে এসেছে। যেকোনো সময় বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। তাই বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু এরপর কোথায় থাকব, সেটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।”
ঘুঘুমারী এলাকার বাসিন্দা জয়নাল, আফসার ও আব্দুল কাদেরসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, তাদের পূর্বপুরুষের বসতভিটা ছিল বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে। গত ১০ থেকে ১২ বার নদীভাঙনের শিকার হয়ে তারা এখন কার্যত ঠিকানাহীন। পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান দুলাল বলেন, “প্রতিবছর স্থায়ী তীর সংরক্ষণের পরিবর্তে বস্তা ডাম্পিংয়ের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা টেকসই কোনো সমাধান আনতে পারছে না। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের অনিয়মের কারণেও কাজের কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত স্থায়ী তীর সংরক্ষণের কাজ শুরু করলে এখনও ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।”
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোঃ শামসুদ্দিন জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত চারটি পরিবারকে ইতোমধ্যে ঢেউটিন ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলেন, “সুখেরবাতী ও ঘুঘুমারী এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। একই সঙ্গে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যও আমরা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
এদিকে, ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ব্রহ্মপুত্র নদের স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হবে এবং নতুন করে শত শত পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে।