আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:- কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি বাড়া-কমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের তীব্র স্রোতে একের পর এক বিলীন হচ্ছে মানুষের আজীবনের সঞ্চয়ে গড়া বসতভিটা। চোখের সামনে ঘরবাড়ি নদীতে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন অনেক পরিবার। আর যাদের ঘর এখনো টিকে আছে, তারাও প্রতিটি মুহূর্ত কাটাচ্ছেন ভাঙনের আতঙ্কে।
গত দুই দিনে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরি গ্রামে তিস্তার ভাঙনে মোঃ ইদ্রিস আলী, মোঃ শহিদুল ইসলাম ও মোঃ আতাউল হকের তিনটি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই গ্রামের মোঃ আব্দুর রশিদ, মোঃ বছার উদ্দিন, মোঃ আব্দুর ছালাম, মোঃ রব্বানী হোসেন ও মোঃ আব্দুল মালেকসহ অন্তত ৪০টি বসতবাড়ি এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এখন ভাঙনের মুখে।
অন্যদিকে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার চর গোরকমন্ডল এলাকায় ধরলা নদীর তীব্র ভাঙনে গত এক সপ্তাহে চারটি পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এবং প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে রয়েছে।
এ ছাড়া কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে দুধকুমার নদের ভাঙনে আরও চার থেকে পাঁচটি পরিবার নিজেদের বসতভিটা সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
তিন উপজেলার শতাধিক পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
কুড়িগ্রাম জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষ বন্যা পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকিও আরও বেড়ে যেতে পারে।
ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মোঃ ইদ্রিস আলী, মোঃ শহিদুল ইসলাম ও মোঃ আতাউল হক বলেন, চোখের সামনে আমাদের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন মাথা গোঁজারও কোনো জায়গা নেই।
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার চর গোরকমন্ডলের দিনমজুর মোঃ মজনু সরকার বলেন, জীবনে পাঁচ-ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছি। শেষ সম্বল বসতভিটাটুকুও এখন নদীগর্ভে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার রামহরি গ্রামের বাসিন্দা মোঃ জাহেরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি এবং কাজের ধীরগতির কারণে স্থানীয়রা আজ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। লেবার সর্দারের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করায় কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্ধারিত সময়ে জিওব্যাগ ডাম্পিং শেষ না হলে বরাদ্দের অর্থেরও অপচয় হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোঃ আয়াজ উদ্দিন জানান, গত এক বছরে নদীভাঙনে শতাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। নতুন করে শুরু হওয়া ভাঙনে আরও শতাধিক পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা এবং স্থায়ী নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়া পাড়া এলাকার মোঃ লেবু মিয়া বলেন, দুধকুমারের ভাঙনে গত ২ বছরে আমার গ্রামের অসংখ্য পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। এখনো ভাঙছে, দেখার কেউ নাই।
কুড়িগ্রাম জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বলেন, কুড়িগ্রাম জেলায় তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের ৩৬টি পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। চর গোরকমন্ডল এলাকায় ভাঙনরোধে দুই হাজার জিওব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার রামহরি গ্রামে ভাঙন প্রতিরোধে ছয় হাজার জিওব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।