মােঃ জানে আলম সাকী ঢাকা:- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আঁচল ভরা ফুল’ গানটি গেয়ে রাতারাতি ব্যাপক পরিচিতি (ভাইরাল) পাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন মহলের টানাহেঁচড়ায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন ফরিদপুরের ভবঘুরে মাটির শিল্পী লাইলী বেগম। অতি সাধারণ মানুষের একজন হয়ে শেষ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চাওয়া এই শিল্পী জানান, তিনি এখন কিছুটা বিরক্ত ও ক্লান্ত।
শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে এসে সাংবাদিকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি নিজের এই মানসিক অবস্থার কথা প্রকাশ করেন।
লাইলী বেগম বলেন,
"মানুষ আমাকে নিয়ে এই যে যা ইচ্ছে করছে, টানাহেঁচড়া করছে, আমার একটু রেস্ট দরকার। কেউ যেন নিজের গুরুত্ব বাড়াতে আমাকে টানাহেঁচড়া না করে। মানে, কেউ ব্যবসার জন্য টানল, কিছু পাওয়ার জন্য, কারও নাম বাড়ানোর জন্য—আমাকে যেন না টানে। আমি কথা বলতে বলতে অসুস্থ হইয়া যাইতেছি। আমি তো একটা মানুষ, মেশিন না। সুইচ দিয়া ছাইড়া দিলেই সে চলতে থাকবে? কয়েক দিন ধইরা আমার ওপর দিয়া অনেক ধকল গেছে, আমি দুর্বল হইয়া গেছি।"
তবে গণমাধ্যমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে তিনি ভোলেননি। তিনি বলেন, "তোমরা আমার জন্য অনেক কিছু করতেছ, আমি তোমাদের জন্যই সবকিছু পাইতেছি, মিডিয়ার জন্য কিছু পাইতেছি। এজন্য আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। গান গাওয়া আর মানুষের পাশে থেকে তাদের ভালোবাসা পাওয়াই আমার মনের আশা। আমি যে একবারে লাফ দিয়ে স্বর্গে যাব, তা না, ওইডা আমার ইচ্ছাও না।"
মায়ের অর্জনে গর্বিত সন্তান
প্রেসক্লাবে লাইলী বেগমের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর ছেলে আপন শেখ। পেশায় রংমিস্ত্রি আপন শেখ তাঁর মায়ের এই নতুন পরিচিতি ও অর্জন নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। তিনি বলেন,
"আমার মা পৃথিবীর সেরা মা। সারা বিশ্বের মানুষ আজ তাঁকে চিনছে। এটি আমাদের পরিবারের জন্য গর্বের বিষয়। আমাদের পরিবারে দুই ভাই ও দুই বোন রয়েছেন এবং লাইলী বেগম তাঁদের স্নেহ-মমতা ও ত্যাগের মাধ্যমে বড় করে তুলেছেন। মায়ের এই অর্জন শুধু পরিবারের নয়, ফরিদপুরবাসীরও গর্ব।"
শৈশব ও বৈরাগ্য জীবন
আজন্ম ভবঘুরে এই সহজাত শিল্পী ফরিদপুরের অলিতে-গলিতে পদচারণার পাশাপাশি এই শহরের ধুলাবালুতেই বেড়ে উঠেছেন। শহরতলির হারুকান্দি এলাকায় তাঁর ছোট একটা ঠিকানা থাকলেও সে বাড়িতে তিনি বসবাস করেন না। যেখানে রাত, সেখানেই কাত—এভাবেই চলে তাঁর দিন-রাত্রি।
লাইলী বেগম জানান, ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরেই গান শেখা হয় তাঁর। সে সময় একটি হারমোনিয়ামও কিনে দিয়েছিলেন তাঁর মা। খুব অল্প বয়সেই বিয়ে হয় তাঁর। বিয়ের পরেও গান গেয়ে যান, তবে কিছুটা বাধাও ছিল তাঁর স্বামীর। স্বামী তাঁর মতামত না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে যান বিদ্রোহী লাইলী। সেই থেকেই তিনি সংসার বিরাগীর পথ বেছে নেন। সম্প্রতি নজরুলজয়ন্তী উপলক্ষে ফরিদপুরে এক অনুষ্ঠানে দরাজ ও আবেগঘন কণ্ঠে ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’ গানটি গেয়েও তিনি প্রশংসা কুড়ান।
সরকারি স্বীকৃতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
গত বুধবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল লাইলী বেগমকে। সেখানে আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে লাইলী বেগমের হাতে তিন লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। ওই অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর অনুরোধে লাইলী বেগম গান গেয়ে শোনান। এছাড়া ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মহল থেকে তাঁকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে লাইলী বেগম বলেন, "গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা না পেলে আমি আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারতাম না। গান আমার সাধনা। ভবিষ্যতেও মানুষের জন্য গান গেয়ে যেতে চাই এবং চলচ্চিত্রেও গান গাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে। আমি যেন সুস্থ ও সুন্দর এবং মানুষের কাছে সব সময় শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে থাকতে পারি।"