মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- আলোচিত ও সমালোচিত এলিট ফোর্স ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ (র্যাব)-এর নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাহিনীটির জন্য নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি খসড়াও প্রস্তুত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে শীঘ্রই এই খসড়াটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।
মূল উদ্দেশ্য ও প্রস্তাবনা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং এই বিশেষায়িত বাহিনীর কার্যক্রমকে আরও জবাবদিহির আওতায় আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে র্যাব বিলুপ্ত করে `এসআরবি` নামে বাংলাদেশ পুলিশের সহায়ক একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত রাখা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে `সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ, ১৯৭৯`-এর অধীনে গঠিত র্যাবকে বিলুপ্ত করে নতুন এই বাহিনী পরিচালনা করা প্রয়োজন।
আইনি প্রক্রিয়া ও সম্পদের স্থানান্তর
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খসড়া আইনটি বর্তমানে প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। এতে কিছু কারিগরি পরিবর্তন আসতে পারে, তবে মৌলিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। মন্ত্রিসভার প্রাথমিক অনুমোদনের পর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে এটি আবার মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। পরে সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হলে পাসের মাধ্যমে তা আইনে পরিণত হবে।
নতুন আইনে র্যাবের সব সম্পদ, দায়-দায়িত্ব, চুক্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রশাসনিক কাঠামো এসআরবি-র অধীনে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত র্যাবের বিদ্যমান বিধিমালা কার্যকর থাকবে।
এসআরবি-র দায়িত্ব ও ক্ষমতা
এসআরবি-র দায়িত্বের মধ্যে থাকবে:
- দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ।
- অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা।
- সন্ত্রাস দমন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা প্রদান।
- সরকার বা আদালত নির্দেশিত তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা ও আসামিদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা।
এর আগে র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বাহিনীটির পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানবাধিকার সমুন্নত রেখে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স গঠনে কাজ করছে সরকার।
পটভূমি ও সমালোচনার মুখে সংস্কার
র্যাব ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একই বছরের ১৪ এপ্রিল প্রথম অপারেশনাল দায়িত্ব পালন শুরু করে। বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড এবং আনসার-ভিডিপির সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এ বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস ও সংগঠিত অপরাধ দমনে কাজ করে আসছে।
তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়ে র্যাব। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় বাহিনীটির কয়েকজন সদস্যের সম্পৃক্ততা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো র্যাবের সংস্কার কিংবা বিলুপ্তির দাবি জানায়।
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। একইভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) একটি প্রতিবেদনেও বাহিনীটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। কমিশনের তথ্যমতে, দেশে সংগঠিত মোট গুমের প্রায় ২৫ শতাংশ ঘটনায় র্যাবের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া গোপন বন্দিশালা পরিচালনার অভিযোগও উঠে আসে বাহিনীটির বিরুদ্ধে।
বিশিষ্টজনদের মতামত
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন `হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ`-এর সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এ প্রসঙ্গে বলেন:
"র্যাব বিলুপ্ত না করে নাম পরিবর্তন করা যেতে পারে। তবে যে নামেই বাহিনী পরিচালিত হোক না কেন, সদস্যদের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে."
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন আইন ও কাঠামোর মাধ্যমে এই বিশেষায়িত বাহিনীকে আরও গণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও মানবাধিকারসম্মত প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।