আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:- কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নে বর্ষা আসার আগেই ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত শতাধিক পরিবারের বসতভিটা ও কয়েকশ একর ফসলি জমি। ভাঙনের কবলে পড়ে দক্ষিণ নামাজের চর গ্রামটি ইতিমধ্যে অর্ধেক বিলীন হয়ে গেছে। নদীপারের মানুষের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ও রৌমারী উপজেলার সীমান্তবর্তী সাহেবের আলগা ও চর শৌলমারী ইউনিয়নের হবিগঞ্জ বাজার থেকে সোনাপুর এবং চর শৌলমারী হয়ে শেখেরবাজার থেকে ঘুঘুমারী পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র ভাঙন চলছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অসংখ্য পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে অথবা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিচ্ছে। অনেকে তাদের শেষ সম্বল ঘরবাড়ি ও গাছপালা সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নটি ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বেষ্টিত এবং জেলার অন্যতম অবহেলিত এলাকা। এখানকার প্রায় ১৫ হাজার ভোটারের জীবন প্রতিনিয়ত নদীর সাথে যুদ্ধ করে চলে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও অন্তত দুই শতাধিক পরিবার। স্থানীয়রা দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য কুড়িগ্রামে একটি পৃথক ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
বিআইডিএস-এর তথ্যমতে, কুড়িগ্রাম দেশের সবচেয়ে দরিদ্রতম জেলা, যেখানে দারিদ্র্যের হার ৭০.৮ শতাংশ। এর প্রধান কারণ নদী ভাঙন। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ ১৬টি নদ-নদীর ভাঙনে প্রতি বছর এ জেলায় প্রায় ৫ হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারায়।
ভাঙনের কবলে পড়া সোনাপুর এলাকার বাসিন্দা মোঃ শরিফ আহমেদ ও মোঃ রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বাড়ি নদীর পেটে চলে গেছে। এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো সেই জায়গা নেই। ত্রাণ চাই না, আমরা স্থায়ী বাঁধ চাই।’ দক্ষিণ নামাজের চরের মোঃ মাইনুল ইসলাম মেম্বার বলেন, ‘নদী যেভাবে ভাঙছে, গাছপালা ফেলেও ঠেকানো যাচ্ছে না। নতুন করে ঘর তোলার মতো জমিও অবশিষ্ট নেই।’
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘গত এক বছরে প্রায় ২ হাজার পরিবার ভিটে হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। হাবগঞ্জ বাজার থেকে ঘুঘুমারী পর্যন্ত যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, তাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ইউনিয়নটি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আমরা জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছি।’
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মোঃ শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, নদী ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদী নদী শাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য একটি কার্যকর আইনি নীতিমালা প্রয়োজন।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন পরিস্থিতি গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। চরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবটিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।