মাে: জানে আলম সাকী, ঢাকা: দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিল করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তা করতে পারেনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ ও নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ সময় কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি দলটির শীর্ষ নেতাদের। তবে সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে চলতি বছরেই দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে এবং কাউন্সিল রোডম্যাপ তৈরির জন্য দলের বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক তারিখ চূড়ান্ত না হলেও ইতোমধ্যে দল গোছানোর প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সাথে দলের ভেতর-বাইরে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে—কারা আসছেন বিএনপির আগামী দিনের শীর্ষ নেতৃত্বে?
চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই
দলের নীতি-নির্ধারণী সূত্র এবং তৃণমূলের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই মুহূর্তে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তথা চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই এই পদে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বহাল থাকছেন। দলের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হবে না। এর আগে ২০১৬ সালের ষষ্ঠ কাউন্সিলেও তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিপক্ষে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবরণ করার পর এবং পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর পর দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান।
মহাসচিব পদ নিয়ে নানা সমীকরণ ও আলোচনা
দলের দ্বিতীয় শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদ `মহাসচিব` নিয়ে বর্তমানে বিএনপিতে দুই ধরনের মূল্যায়ন ও আলোচনা চলছে। বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিগত ১০ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে দলটির এই গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের শারীরিক অসুস্থতা ও ক্লান্তির কথা উল্লেখ করে আগামী কাউন্সিলের পর রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
মির্জা ফখরুল যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, তবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন তা নিয়ে দলের ভেতর চারজন শীর্ষ নেতার নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে:
১. সালাহউদ্দিন আহমদ: বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই প্রভাবশালী সদস্য দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের দক্ষতাকে বিবেচনায় রাখছে দলের হাইকমান্ড।
২. আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগাযোগ, নীতি-নির্ধারণ এবং অর্থনৈতিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি হাইকমান্ডের বিশেষ গুডবুকে রয়েছেন।
৩. অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী: দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে দলের দফতর ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সফলভাবে সামলাচ্ছেন। ছাত্রজীবন থেকে পরিচ্ছন্ন ইমেজ ও দলের দুঃসময়ে মাঠের সক্রিয়তার কারণে তিনিও সাধারণ সম্পাদক পদের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার।
৪. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি: পরিচ্ছন্ন ইমেজ ও সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার কারণে যুগ্ম মহাসচিব পদের এই নেতাকেও শীর্ষ পদের আলোচনায় রাখা হচ্ছে।
তবে দলের একটি বড় অংশ মনে করছে, দলের কঠিন ও প্রতিকূল সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেভাবে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন, তাতে দল হয়তো এই মুহূর্তে তাঁকে ছাড়তে চাইবে না। শেষ পর্যন্ত তিনি যদি একেবারেই অপরাগ হন, তবেই কেবল নতুন মুখ দেখা যেতে পারে।
স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হতে পারেন নতুন মুখ
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বেশ কিছু পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। এছাড়া স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য মির্জা আব্বাস বর্তমানে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। শূন্যতা পূরণে এবং দলে নতুন গতি আনতে স্থায়ী কমিটিতে বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে যুক্ত করার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
স্থায়ী কমিটিতে স্থান পাওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন দলের বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন:
- হাবিব উন নবী খান সোহেল (যুগ্ম মহাসচিব)
- শামসুজ্জামান দুদু (ভাইস চেয়ারম্যান)
- সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল (চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা)
দলের তৃণমূল কর্মীদের আশা, এই কাউন্সিলের মাধ্যমে যোগ্য ও ত্যাগী নেতারা মূল্যায়িত হবেন এবং আগামী দিনে দলের সাংগঠনিক শক্তি আরও বেগবান হবে।