বিশেষ প্রতিবেদক,মো:জানে আলম সাকী, ঢাকা: পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটকদের উপচে পড়া ঢল নেমেছে। ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতসহ কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। গত দুই দিনে অন্তত দুই লক্ষাধিক পর্যটক কক্সবাজারে আগমন করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন ও হোটেল মালিক সমিতি। সমুদ্রস্নান, পাহাড়-ঝরনা দর্শন, মেরিন ড্রাইভে ভ্রমণসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরে উৎসবমুখর ও ব্যস্ত সময় পার করছেন আগত দর্শনার্থীরা। পর্যটকদের এই ব্যাপক পদচারণায় মুখরিত ও সরগরম হয়ে উঠেছে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন খাতসহ সকল পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, ঈদের আট দিনের এই দীর্ঘ ছুটিতে প্রায় সাত লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় প্রথম দুই দিনেই প্রায় দুই লাখ পর্যটক চলে এসেছেন। শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ ও রিসোর্টের প্রায় ৯৫ শতাংশ কক্ষ ইতিমধ্যেই বুকিং হয়ে গেছে। ফলে বর্তমানে কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেলেই নতুন করে কোনো কক্ষ খালি নেই। আগামী ৬ জুন পর্যন্ত পর্যটকদের এই অভূতপূর্ব চাপ অব্যাহত থাকবে বলে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ মনে করছেন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবুদ্দের শুক্কুর বলেন, "পর্যটকদের বিপুল আগমনে স্থানীয় অর্থনীতিতে এক দারুণ গতিশীলতা ফিরে এসেছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং বিপণিবিতানগুলোতে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন হচ্ছে। আমাদের ধারণা, এবারের ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারের পর্যটন খাতকেন্দ্রিক ব্যবসার পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।"
সৈকত জুড়ে উৎসবের আমেজ ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থান:
সরেজমিনে সৈকতের সুগন্ধা, লাবণী, সিগাল ও কলাতলী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার পর্যটক সমুদ্রস্নানে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে খেলায় মেতেছেন, কেউবা জেটস্কিতে চড়ে গভীর সমুদ্রের দিক থেকে ঘুরে আসছেন। অনেকে বালুচরে বসে সমুদ্রের বিশালতা ও সূর্যাস্ত উপভোগ করছেন। বিচবাইক, ঘোড়ায় চড়া এবং ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে বহু মানুষকে। ঢাকা কমলাপুর থেকে সপরিবারে ঘুরতে আসা পর্যটক জানান, ঈদের দ্বিতীয় দিনে তারা কক্সবাজার এসেছেন। সমুদ্রস্নান ও সূর্যাস্ত দেখে তাদের সময় চমৎকার কাটছে, তবে উৎসবের সুযোগে পরিবহন, হোটেল ও খাবারের দাম কিছুটা বেশি রাখা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শুধু মূল সমুদ্রসৈকতই নয়, পর্যটকদের ভিড় ছড়িয়ে পড়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানেও। মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন দরিয়ানগর ইকো-ট্যুরিজম পার্ক, প্রাচীন শাহেনশাহ গুহা, প্যারাসেইলিং স্পট, হিমছড়ি ঝরনা ও পাহাড়, এবং ইনানী ও পাটোয়ারটেকের পাথুরে সৈকতে দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া অনেকে টেকনাফ সৈকত, নাফ নদীর তীর, নেটং পাহাড়, কুদুম গুহা ও ন্যাচার পার্ক ঘুরে দেখছেন। পর্যটকদের একটি বড় অংশ সাগরপথে মহেশখালী, সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়া ভ্রমণেও যাচ্ছেন। বিশেষ করে মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, রাখাইন পল্লি এবং সোনাদিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করছে। একই সাথে কক্সবাজার থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরের রামুতে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা, রাংকুট বনাশ্রমে বিশাল শায়িত বুদ্ধমূর্তি এবং চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কেও পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনের নজরদারি:
পর্যটকদের এই বিশাল সমাগমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশ, লাইফগার্ড এবং জেলা প্রশাসনের বিচকর্মীরা নিরলস দায়িত্ব পালন করছেন। সি-সেফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ জানান, কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকত এলাকায় সি-সেফের ২৬ জন লাইফগার্ড এবং জেলা প্রশাসনের ২৫ জন বিচকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। জোয়ার-ভাটা, রিপ কারেন্ট ও উত্তাল ঢেউ সম্পর্কে পর্যটকদের সতর্ক করতে নিয়মিত মাইকিং ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো পর্যটক নিখোঁজ বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি এবং ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাওয়ার সময় বেশ কয়েকজনকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পরিবেশবিষয়ক সংগঠন `ধরিত্রী রক্ষায় আমরা` (ধরা) কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কক্সবাজার সৈকতের দক্ষিণে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত অরক্ষিত সৈকত এলাকায় কোনো স্থায়ী উদ্ধারব্যবস্থা নেই। ফলে নির্ধারিত নিরাপদ এলাকার বাইরে গোসলে নামলে পর্যটকদের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা ও হয়রানি বন্ধে প্রশাসনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, "পর্যটকদের কাছ থেকে যাতে অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া কিংবা খাবারের মূল্য আদায় না করা হয়, সে জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে সার্বক্ষণিক কাজ করছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"