মােঃ জানে আলম সাকী,ঢাকা:- বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন খাতে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা। নিজেদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে ২১টি ব্র্যান্ডনিউ বোয়িং ৭৩৭-৮ এয়ারক্রাফট।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান `বোয়িং`-এর তৈরি এই আধুনিক বিমানগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১.১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে পাঠানো ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি চিঠি থেকে এই মেগা বিনিয়োগের তথ্য জানা গেছে।
আঞ্চলিক হাব ও রুট সম্প্রসারণের মহাপরিকল্পনা
ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন এই বোয়িং উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হওয়ার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এই তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করবে এয়ারলাইন্সটি।
বিডার চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে এয়ারলাইন্সটি উল্লেখ করেছে—
"নতুন উড়োজাহাজ সংযোজন শুধু একটি ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ নয়; বরং এটি দেশের এভিয়েশন খাতে একটি যুগান্তকারী বিনিয়োগ।"
বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, একসাথে ২১টি নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল সংখ্যক দক্ষ জনবল। এর ফলে এভিয়েশন খাতে সৃষ্টি হবে হাজারো নতুন কর্মসংস্থান।
- প্রয়োজনীয় জনবল: প্রচুর পরিমাণে নতুন পাইলট, এয়ারক্রাফট মেইনটেইন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মী ও ডিসপ্যাচার প্রয়োজন হবে।
- তরুণদের সুযোগ: দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য পাইলট ও এয়ারক্রাফট মেইনটেইন্যান্স প্রকৌশলী হিসেবে আন্তর্জাতিক মানের ক্যারিয়ার গড়ার পথ আরও বিস্তৃত হবে।
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা
বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আকাশপথের একটি বড় অংশই বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলস্বরূপ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউএস-বাংলার এই সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় ক্যারিয়ারের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং বিদেশী এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভরতা কমবে। এর ফলে দেশের ভেতরে যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারিত হবে, তেমনি সাশ্রয় হবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা।
বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক মূল্যায়ন
বিশিষ্ট এভিয়েশন ও বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন:
"এটি বাংলাদেশের এভিয়েশন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। দেশের কোনো সরকারি বা বেসরকারি এয়ারলাইন্স এর আগে একসঙ্গে এত বড় পরিসরে বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়নি। আমার বিশ্বাস, এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পর্যটন শিল্প, রপ্তানি ও বিনিয়োগ আরও গতিশীল হবে।"
একইভাবে মেঘনা এভিয়েশন লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) মো. আনোয়ারুল হক সরদার এই ঐতিহাসিক অর্জনের জন্য ইউএস-বাংলা পরিবারকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এটি আঞ্চলিক ভ্রমণ ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
আসছে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
আগামী ২৯ জুলাই রাজধানীর হোটেল শেরাটনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ইউএস-বাংলা। উক্ত অনুষ্ঠানে বোয়িং এবং ইউএস-বাংলা যৌথভাবে এই বহর সম্প্রসারণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে। জমকালো এই অনুষ্ঠানে বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত, আন্তর্জাতিক এয়ারক্রাফট লিজিং প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিমান ও পর্যটন খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।