মােঃ জানে আলম সাকী, ঢাকা:- কৈশোরে বাবার সামান্য বকুনি খেয়ে বাড়ি ছাড়েন নুরু মিয়া কাজী (ওরফে ইসমাইল হোসেন)। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ চারটি দশক। কোথায় গেলেন, কেমন আছেন—এই প্রতীক্ষায় প্রহর গুনতে গুনতে একসময় মারা যান তাঁর বাবা-মা। স্বজনেরা ধরেই নিয়েছিলেন তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে দীর্ঘ ৪৪ বছর পর অবশেষে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে এসেছেন আনুমানিক ৬০ বছর বয়সী নুরু মিয়া।
এই অবিশ্বাস্য পুনর্মিলনে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চরমোহনা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাজীবাড়িতে এখন বইছে আনন্দের বন্যা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভাইকে ফিরে পেয়ে আনন্দে ভাসছেন ভাই-বোন, স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
যেভাবে শুরু হয়েছিল নুরু মিয়ার যাযাবর জীবন
স্মৃতি হাতড়ে নুরু মিয়া জানান, কিশোর বয়সে কোনো কাজ করতে না পারায় বাবার বকুনি খেয়ে তিনি ভারতের কলকাতায় চলে যান। সেখানে এক মাস থাকার পর পাড়ি জমান পাকিস্তানে। পাকিস্তানের লাহোরে তিন দিন ও তিন রাত কাটানোর পর চলে যান ইরানের রাজধানীতে। সেখানে তিন বছর থাকার পর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে যান এবং তিন মাস কাটান। সেখান থেকে পুনরায় ইরানের রাজধানী তেহরানে ফিরে আরও তিন বছর বসবাস করেন।
পরবর্তীতে পাসপোর্ট না থাকায় ইরানের মিনআপ জেলে তাকে আট মাস কারাভোগ করতে হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ট্রেনে করে আবার পাকিস্তানে চলে যান এবং করাচিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
করাচির সংসার ও বর্তমান জীবন
করাচিতেই নুরু মিয়া দুটি বিয়ে করেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী জমিলা খাতুনের ঘরে দুই ছেলে (মো. ইয়াসিন ও মো. রহিম) এবং এক মেয়ে (ইকরা) রয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রী মোস্তফা খাতুনের ঘরে তিন ছেলে (মো. নুরনবি, মো. আবু বক্কর ও মো. আব্দুল শুক্কুর) এবং এক মেয়ে (কুলসুমা বেগম) রয়েছে। বর্তমানে তিনি করাচিতে নদীতে মাছ ধরার কাজ করেন। সেখানে দুই স্ত্রী ও সাত সন্তানকে নিয়ে তিনি ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন।
তবে রায়পুরে থাকাকালীন কিশোর বয়সেও তাঁর একবার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সেই স্ত্রী ও সন্তানরা এখন কোথায় আছেন, তা তিনি জানাতে পারেননি।
জন্মভূমির টানে ফিরে আসা
বিদেশে কাটানো দীর্ঘ ৪৪ বছরেও জন্মভূমিকে ভুলে যাননি নুরু মিয়া। প্রথমদিকে চিঠির মাধ্যমে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং টাকা পাঠাতেন। কিন্তু পরবর্তীতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে পুনরায় আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার পর, গত শুক্রবার তিনি নিজের গ্রামে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরেই নুরু মিয়া প্রথমে তাঁর বাবা (আলী আহাম্মদ) ও মা (মারুফা খাতুন)-এর কবর জিয়ারত করেন। শেষবার তাঁদের মুখ দেখতে না পারার আফসোস এখনও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
নুরু মিয়া বলেন, “দীর্ঘদিন পর নিজের মাটিতে ফিরে আসতে পেরে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। দেশের মাটি, মানুষ ও আত্মীয়স্বজনকে অনেক মিস করেছি। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এই পুনর্মিলন শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের কাছেই একটি আবেগঘন ও স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।”
স্বজন ও এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া
নুরু মিয়ার ছোট ভাই, দিনমজুর নিজাম উদ্দিন আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “ভাইকে ফিরে পেয়ে আমরা মহাকিশী। মা-বাবা বেঁচে থাকলে আরও খুশি হতেন। আমরা তো ভেবেই নিয়েছিলাম তিনি আর বেঁচে নেই। তবে তিনি আবার পাকিস্তানের করাচিতে চলে যাবেন।” জানা গেছে, নুরু মিয়া মাত্র তিন মাসের জন্য দেশে এসেছেন, এরপর আবার করাচিতে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে যাবেন।
রায়পুর সুলতান কাজী জামে মসজিদের ইমাম আব্দুল কাদির জানান, “নুরু মিয়া গ্রামে ফিরে আসায় সবাই খুশি। গত দুই দিন ধরে তিনি সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলছেন, মসজিদে নামাজ পড়ছেন। বাংলার পাশাপাশি তিনি ফারসি ভাষাতেও কথা বলছেন।”
এদিকে রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, বিষয়টি তাঁর জানা নেই, তবে তিনি খোঁজখবর নিয়ে দেখছেন।