সম্পাদকীয়
  মাতৃভাষা অধিকার আদায়ের মাস ফেব্রুয়ারি
  10-02-2019

আমাদের জাতীয় জীবনে ফেব্রুয়ারি মাসটি একদিকে স্বরণের অন্যদিকে উজ্জীবিত হবার মাস। আজ থেকে ৬৭ বছর আগে এই ফেব্রুয়ারিতেই মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন গড়ে উঠে। তাই, বাঙালি জাতির জন্য এই মাসটি হচ্ছে চরম শোক ও বেদনার, অনদিকে মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায়
উদ্ভাসিত। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেয়ার মাস ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাংলার বহু ধামাল ছেলেরা সেদিন রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় রক্ত পলাশ হয়ে ফোটা সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর, আউয়াল, অহিউল্লাহর রক্তে রাঙানোর মাস ফেব্রুয়ারি। ভাষার জন্য এভাবে প্রাণ দেয়া বিশ^ ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। আমাদের এ মহান ভাষা আন্দোলন এবং তারই পথ ধরে স্বাধীনতা অর্জন বিশ্বের দরবারে আমাদের গৌরবকে অনেক উচ্চেতুলে ধরেছে। আমরা আরো বেশি গর্বিত হয়েছি যখন আমাদের ভাষা দেশের গ-ি পেরিয়ে গোটা বিশ্বের কাছেও স্বীকৃতি লাভ করেছে। আমাদের শহীদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি এখন ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’র স্বীকৃতি পেয়ে গৌরবের আরেক ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছে। আর এ মহান কাজে যারা অবদান রেখেছেন তারাও বাংলাদেশী। তারা এ জাতির কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিশ্বে বাংলাভাষা জনগণের সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরে পাকিস্তান, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল সংখ্যক বাঙালির বসবাস। মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি দেশ মালয়েশিয়া, কোরিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষী বসবাস করছেন। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের বাংলাভাষী সৈনিকদের কর্মকা-ে-কৃতজ্ঞতা স্বরুপ আফ্রিকান দেশ সিয়েরালিয়ন বাংলা ভাষাকে সে দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর আগে থেকে পাকিস্তান ও ভারতে বাংলাভাষা অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। এদিক থেকে বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইতোমধ্যে মর্যাদার দাবিদার। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ-ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে জন্ম নেয় ভাষা-বিরোধ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে কৃত্রিম ভাষা উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে। প্রতিবাদে সোচ্চার হন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা। ১৯৪৮ সালেই গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সে বছরের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দম্ভভরে উচ্চারণ করেন, ‘উর্দু, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়।’ এ কথায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে বাংলাজুড়ে।শুরু হয় ভাষার জন্য বাঙালির প্রাণপণ সংগ্রাম। ১৯৫২ সালে আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠলে শাসকগোষ্ঠী নিষেধাজ্ঞা জারি করে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভা থেকে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়। মিছিল বের হয় ১০ জন, ১০ জন করে। পুলিশ বাধা দিলে বাধে সংঘর্ষ। একপর্যায়ে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। শহীদ হন আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ ও আবদুল জব্বারা। ছাত্র মিছিলে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে আরো উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। ফলে,
রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করতে করে পাকিস্তানি সরকার। বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় তারা। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে শোক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের রীতি চালু হয়। একুশের পথ ধরে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রাম। জন্ম নেয় স্বাধীন রাষ্ট্র। তাই, আজকের দিনে বিন¤্র শ্রদ্ধা জানায় সেই সব ভাষা শহীদদের প্রতি যারা মাতৃভাষার জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে গেছেন।